গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন :রাশিয়ার দখলে যাওয়া ইউক্রেনের শহরে ফিরছে লেনিনের মূর্তি-সোভিয়েত পতাকা

Share

দক্ষিণ ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলের হেনিচেস্ক শহর। গত ২২ এপ্রিল শহরটির প্রধান কাউন্সিল ভবনের বাইরে স্থাপন করা হয় রুশ বিপ্লবের নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের মূর্তি। ভবনটির ছাদে উড়ছিল রাশিয়া আর তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতাকা। সেদিন ছিল লেনিনের ১৫২তম জন্মদিন।

ইউক্রেনের শহরে রুশ নেতার মূর্তি বা রাশিয়ার পতাকা কেন, এমন প্রশ্ন মনে আসতে পারে অনেকের। কারণ, হেনিচেস্ক রাশিয়ার অংশ ছিল না, এখনো নেই। তবে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে অভিযান শুরুর কিছুদিনের মধ্যে খেরসনের নিয়ন্ত্রণ নেয় রুশ বাহিনী। ফলে ২০ হাজার বাসিন্দার হেনিচেস্ক শহরও চলে আসে তাদের অধীনে।

হেনিচেস্কে রুশ সেনাবাহিনীর অনুপ্রবেশের পর একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে। সেখানে একজন রুশ সেনার উদ্দেশে শহরটির এক নারীকে অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা যায়। ওই সেনাকে তিনি বলছিলেন, ‘তুমি দখলদার। তুমি ফ্যাসিবাদী। তুমি বিনা আমন্ত্রণে আমার দেশে এসেছ।’

শুধু ওই নারীই নন, হেনিচেস্কের অনেক বাসিন্দাই নিজ শহরে রুশ বাহিনীর উপস্থিতি মেনে নিতে পারছেন না। এরপরও খেরসনের স্বাধীনতার জন্য খুব শিগগিরই মস্কো সেখানে গণভোট আয়োজনের পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।

একই ধরনের পরিকল্পনা ২০১৪ সালে কাজে লাগিয়েছিল রাশিয়া। সে বছর ইউক্রেনে বিক্ষোভের মুখে রুশপন্থী সরকারের পতনের পর অস্ত্র ও সমর্থন দিয়ে দেশটির পূর্ব দনবাসের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল রাশিয়া। পরে মস্কোর ইশারায় দনবাসের দোনেৎস্ক ও লুহানস্কে গণভোটের আয়োজন করা হয়। ওই ভোটাভুটির মধ্য দিয়ে দুটি অঞ্চলই ‘প্রজাতন্ত্রে’ পরিণত হয়। ইউক্রেনের অন্য অঞ্চলগুলোতেও রাশিয়া এমনটিই করতে চাচ্ছে।

ইউক্রেনে অভিযান শুরুর প্রথম দিকে রাশিয়া বলেছিল, তাদের লক্ষ্য ইউক্রেনকে নাৎসি প্রভাবমুক্ত করা এবং নিরস্ত্র করা। তবে সম্প্রতি ওই লক্ষ্যে পরিবর্তন আনা হয়। রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইউক্রেনে অভিযানের প্রথম ধাপ শেষ হয়েছে, এখন দেশটির পূর্বাঞ্চলে নজর দেবে তারা।

রাশিয়ার নতুন লক্ষ্য অনুযায়ী, আজভ সাগর-সংলগ্ন ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী-নিয়ন্ত্রিত পূর্বাঞ্চল থেকে ক্রিমিয়া পর্যন্ত একটি স্থল করিডর তৈরি করা হবে। এই করিডর মলদোভার ট্রান্সনিসট্রিয়া অঞ্চলকে যুক্ত করবে। এককালে সোভিয়েন ইউনিয়নভুক্ত ছিল মলদোভা। বর্তমানে দেশটিতে রুশ ‘শান্তিরক্ষীরা’ অবস্থান করছেন।

এরই মধ্যে হেনিচেস্ক ও ইউক্রেনের দক্ষিণের এলাকাগুলোয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছে রাশিয়া। স্বার্থ আদায়ে ভয়ভীতি দেখাতেও পিছপা হচ্ছে না তারা। ইউক্রেনের সরকারি কর্মকর্তা, অধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। অনেকে নিখোঁজও হচ্ছেন। নিপার নদীসংলগ্ন কাখোভকা বন্দরনগরের একটি থানায় ইউক্রেনীয় বন্দীদের মারধর করা হয়েছে এবং বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

রুশ-নিয়ন্ত্রিত এ অঞ্চলে স্বাধীন গণমাধ্যমগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই পরিণতি হয়েছে ইউক্রেনীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর। বন্ধ রয়েছে ইন্টারনেট। সেখানে ক্রিমিয়া থেকে সম্প্রচার করা হচ্ছে রাশিয়ায় চ্যানেলগুলো। রুশ বাহিনীর আগমনে জনজীবনের উন্নতি হয়েছে বলে ওই চ্যানেলগুলোয় বার্তা দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে গত ৯ মার্চের পর থেকে হেনিচেস্কের মেয়র ওলেকসান্দ্র তুলুপভের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁকে অপহরণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত মাসেই শহরের পৌরসভার ওয়েবসাইট হ্যাক করে রাশিয়া। এরপর সেখানে ঘোষণা করা হয়, তুপুলভ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। তাঁর বদলে জেনাদি সিভাককে নতুন মেয়র করা হয়েছে। অন্যদিকে খেরসন শহরে ইগর কাস্তসিউকেভিচকে নতুন মেয়র হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে মস্কো। তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দল ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির একজন নেতা।

এসব শহরের বাসিন্দারা যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম অবজারভারকে জানান, সরকারি ভবনগুলো থেকে ইউক্রেনের পতাকা নামিয়ে দিয়েছে রুশ বাহিনী। মেলিতোপোল শহরে শিক্ষকদের রুশ ভাষা ব্যবহারে এবং স্কুলে মস্কোর পাঠ্যসূচি অনুযায়ী পড়াতে বাধ্য করা হচ্ছে। সেখানে ইউক্রনের সাহিত্য ও পাঠ্যপুস্তক ধ্বংস করছে রাশিয়ার সামরিক পুলিশ।

ইউক্রেনে বর্তমানে রাশিয়া যা করছে, একই কাজ ১৯৩৯ সাল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন বাহিনী পোল্যান্ড, বাল্টিক দেশ ও মধ্য ইউরোপের দেশগুলোতে করেছিল বলে জানিয়েছেন ইতিহাসবিদ অ্যানি অ্যাপলবাম। তাঁর ভাষ্যমতে, সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের গোপন পুলিশ বাহিনী ‘এনকেভিডি’ ও রেড আর্মি যে আচরণ করেছিল, রুশ বাহিনী তার পুনরাবৃত্তি করছে।

অ্যানি অ্যাপলবাম বলেন, রুশ বাহিনীর কাছে বিভিন্ন শহরের মেয়র, জাদুঘরের পরিচালক, স্থানীয় নেতাসহ গুরুত্বপূর্ণ লোকজনকে গ্রেপ্তারের একটি তালিকা রয়েছে। ত্রাস ছড়ানোর জন্য তারা পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক লোকজনকে হত্যা ও ধর্ষণ করছে। পাশাপাশি মূর্তি, পতাকা ও স্মৃতিস্তম্ভের মতো স্থানীয় পরিচয় ধারণ করে, এমন চিহ্নগুলো সরিয়ে নিজেদেরগুলো স্থাপন করছে।

লেনিনের মূর্তি ও সোভিয়েত পতাকা রাশিয়া নিজেদের বিজয়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করছে। ২০১৪ সালে ইউক্রেনে ময়দান বিপ্লবের শুরুর দিকে লেনিনের মূর্তিগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। কিয়েভ, খারকিভসহ দেশের বিভিন্ন শহরের স্মৃতিস্তম্ভগুলো রাতারাতি উধাও হয়ে যায়। ইউক্রেনের পার্লামেন্টে আইন পাস করে নিষিদ্ধ করা হয় কমিউনিস্ট স্লোগান।

রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের জাপোরিঝঝিয়ার বেরদিয়ানস্ক বন্দরনগরও। সেখানে ৯ মে রাশিয়া বিজয় প্যারেড আয়োজনের পরিকল্পনা করছে বলে জানান শহরের বাসিন্দা মারিনা। একে দুঃস্বপ্নের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ‘আমি একসময় কমিউনিস্টদের যুব সংগঠনকমসোমলের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলাম। তবে এখন আর লেনিনের আদর্শ মাথায় আসে না। দনবাসে আট বছর আগে যা ঘটেছিল, এখানে এখন তা-ই হচ্ছে। ’

অভিযান শুরুর পরপরই বেরদিয়ানস্ক শহরে ঢুকে পড়েন রাশিয়ার সেনারা। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁরা স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল ও পত্রিকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। তাঁরা পাসপোর্ট অফিসে অভিযান চালিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ করেন মারিনা। তাঁর ভাষ্য, বেরদিয়ানস্কে খাবারের সংকট নেই। তবে ওষুধের মজুত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ইউক্রেন-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো থেকে শহরটিতে মানবিক সহায়তা সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।

মারিনা বলেন, ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের বেশির ভাগ বাসিন্দাই রাশিয়ার দখলদারির বিরোধিতা করেছেন। আবার রাশিয়ার পক্ষে কাজ করতে ইচ্ছুক স্থানীয় এমন অনেকেই রয়েছেন। মারিউপোলে নতুন মেয়র হিসেবে ভাদিম বইচেঙ্কোকে নিয়োগ দিয়েছে মস্কো। তিনি রুশপন্থী একজন রাজনীতিক।

তবে রাশিয়ার পক্ষে কাজ করা অনেক সময় বিপজ্জনক হয়ে দেখা দিচ্ছে। গত বুধবার খেরসনে ভালেরি কুলেশভ নামের একজন রুশপন্থী অধিকারকর্মী ও ব্লগারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁকে কে হত্যা করেছে, তা স্পষ্ট হয়নি। তবে মিকোলেইভের মেয়র ভালেরি কিমের মতে, ‘বিশ্বাসঘাতকদের’ বিরুদ্ধে দেশপ্রেমীদের ঠেকিয়ে রাখা অসম্ভব।

বর্তমান পরিস্থিতিতে এটাই মনে হচ্ছে যে খুব শিগগির ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চল ত্যাগের কোনো পরিকল্পনা নেই ক্রেমলিনের। বেরদিয়ানস্কের নতুন প্রশাসন দাবি করেছে, শহরটির বন্দর রাশিয়ার অংশ। এ ছাড়া সেখানে ইউক্রেনের মুদ্রা হ্রিভনিয়ার বদলে রুশ মুদ্রা রুবল চালুর পরিকল্পনা চলছে। সাধারণ লোকজনকে ইউক্রেনের সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামানোর কথাও ভাবছে রাশিয়া।

সম্প্রতি এক ভিডিও বার্তায় রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের উদ্দেশে কথা বলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি রুশ সেনাদের নানা সমস্যার মুখে ফেলার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে এসব এলাকায় মস্কোর ‘সাজানো’ গণভোটে অংশ না নিতে অনুরোধ করেন।

রুশ সেনারা খেরসন দখলের পর শহরটিতে ইউক্রেনপন্থী আন্দোলনকারীরা রাস্তায় নামেন। তাঁদের সঙ্গে ছিল ইউক্রেনের পতাকা। এ সময় একজনকে একটি ট্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ইউক্রেনীয়দের এই প্রতিরোধ এখনো চলছে। মেলিতোপোলে একটি রুশ পতাকা ছিঁড়ে ফেলেছেন ইউক্রেনীয় পথচারীরা। এসব আন্দোলন অবশ্য শক্ত হাতে দমনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে রুশ বাহিনী।

মস্কোর যেমন দক্ষিণাঞ্চল ত্যাগের কোনো আগ্রহ নেই, তেমনই হেনিচেস্কে সদ্য স্থাপন করা লেনিনের মূর্তি থেকে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শহরের বাসিন্দা মেরিনা বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি না, তারা কী করছে। আমাদের লেনিনের জন্মদিন উদ্‌যাপনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে আমরা যাইনি।’

Leave A Reply