‘সন্তানের মুখের এক টুকরো মিষ্টি হাসি পথের সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়’

Share

বাড়ি ফিরেছে মানুষ। নাড়ির টানে পথের দুর্ভোগ, কষ্ট আর বাড়তি ভাড়া গুনে বাড়ির পানে ছুটছে মানুষ। সন্তানের মুখে একটু মিষ্টি হাসি, বাবা-মায়ের দোয়া, ভাই-বোনের ভালোবাসা আর স্ত্রীর চোখে-মুখে প্রশান্তির আবেশ দেখতে হাজারো কষ্ট আর দুর্ভোগকে পিছনে ফেলে ঘরের পানে ছুটে চলা।

জীবিকার তাগিদে গ্রামে বাবা-মা,ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তানকে রেখে বড় বড় শহরে আসেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। অধিকাংশ মানুষ ভাড়া বাসায় থাকেন। তাই ঈদের লম্বা ছুটিতে ফাকা শহরে না থেকে সবাই চান পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে। বাড়ি বা গ্রামে দিনকয়েকের জন্য হলেও ফিরে যাওয়া। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ করা, মা-বাবার প্রতি টান, জন্মভিটার প্রতি অনুরাগ, আবার অনেকে সন্তানকে তার শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চান। আবার কেউ চান পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে ভাব বিনিময় করতে।

স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করার জন্য সবাই বাড়ি ফিরছে, চোখ-মুখে খেলা করে অন্য রকম দ্যুতি! কী ওই অমোঘ টান- যার জন্য মানুষ শত কষ্ট স্বীকার করে ঘরে ফিরছে? যানবাহনে কোথাও পা ফেলার উপায় নেই। তবুও কারও মধ্যে এতটুকু বিরক্তি নেই। সবাই নিজে ও চেনা-অচেনা অন্যদের সঙ্গে ফিরছেন আপন নিবাসে।

ঈদ কেন্দ্র করে সব মানুষের থাকে নানা আয়োজন। তার মধ্যে ঈদে বাড়ি ফেরাটাই আসল কথা। নাড়ির টানে পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য মানুষ তাদের কর্মক্ষেত্র বা অস্থায়ী আবাস ছেড়ে পাড়ি জমায় জন্মভিটায়। কেউ বাসে, কেউ ট্রেনে কিংবা লঞ্চে। কখনো ভেঙে ভেঙে ছোট যানবাহনে বাড়তি ভাড়া গুনে কিংবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস-ট্রেন-লঞ্চের ছাদে, ট্রাকে, পিকআপে; যেভাবেই হোক বাড়ি ফিরতে হবে।

প্রতিবছরের মতো এবারো ঈদে বাড়ি ফিরেছেন মিজানুর রহমান মিজান। রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে তার ছোট্ট একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তিনি জানালেন তার বাড়ি ফেরার কথা, পথের কষ্ট আর দুর্ভোগের কথা। কেন বাড়ি গেছেন- মোবাইলে জানালেন তিনি। বললেন- ‘সন্তানের মুখের এক টুকরো মিষ্টি হাসি পথের সব ক্লান্তি আর দুর্ভোগকে এক নিমিষেই ম্লান করে দেয়।’

মিজানের বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বরোবাজার এলাকার সাকো গ্রামে। সেখানেই থাকেন তার স্ত্রী, তিন সন্তান, মা, ভাই-বোনসহ পরিবারের সবাই। বাবা নেই। ঢাকায় একা থাকেন তিনি। তিন-চার মাস পর পর বাড়িতে যান। তবে বাধাই আসুক ঈদে তিনি বাড়ি যাবেনই। করোনাকালের দুই বছরের প্রতিটি ঈদে তিনি বাড়ি গেছেন। যানবাহন না পেয়ে কখনো হেঁটে, কখনো রিকশা-ভ্যান-অটোতে করে হাজারো দুর্ভোগ মাথায় নিয়ে বাড়তি ভাড়া গুনে বাড়িতে গিয়েছিলেন ব্যবসায়ী মিজান। তবে এবার বাড়িতে যেতে খুব একটা দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি বলে জানালেন তিনি।

মিজান বলেন, ছোট থাকতেই ঢাকায় এসেছি জীবিকার টানে। আগে অন্যের দোকানে চাকরি করতাম। এখন নিজেই একটি দোকান দিয়েছি। দেশে বিয়ে করেছি। দুই মেয়ে ও এক ছেলে হয়েছে। সবাই গ্রামেই থাকে। সেখানেই ৪-৫ মাস পর পর বাড়িতে যাই।

তিনি বলেন, ঈদের সময় যত কষ্টই হোক, বাড়িতে যেতেই হয়। ছেলে মেয়ে রাস্তার দিকে চেয়ে থাকে। মা ও স্ত্রীও আশা করে বসে থাকে। সবাই চাই বাড়িতে একসঙ্গে ঈদ করতে।

ছেলে-মেয়েদের জন্য কী নিয়ে গেলেন- জানতে চাইলে মিজান বলেন, বাড়িতে যাওয়ার সময় হাতে করে কিছু না কিছু নিয়ে যাই। কিন্তু ঈদের সময় একটু বাড়তি চাহিদা থাকে। ফোন করে তাদের পছন্দের পোশাক বা অন্য কিছুর কথা বলে রাখে। সাধ্যমত তাদের চাহিদা পূরণের চেষ্টা করি। এবার ছেলে-মেয়েদের জন্য জামা, মা ও স্ত্রীর জন্য শাড়ি কিনেছি।

পথের ভোগান্তির কথা জানতে চাইলে বলেন, এবার তেমন কষ্ট হয়নি। বাসে গাবতলী থেকে পাটুরিয়া। এর পর ফেরিতে নদী পার হয়ে আরেকটি বাসে যশোর হয়ে বাড়িতে। বলেন, অন্য বার ঈদের আগে বাড়ি আসতে যে ভোগান্তি পোহাতে হতো- এবার তা নেই। ভাড়া একটু বেশি গেলেও মোটামুটি নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছেছি।

মিজান শুধু একা নয়। দেশের লাখ-কোটি মানুষ মিজানের মতো নাড়ির টানে ঘরে ফিরেছেন। এ যেন নিয়তির অমোঘ টান। ঈদে পিতা-মাতা স্বজন আর জন্মভিটার টানে সব বাধাকে পিছনে ফেলে বাড়ির পানে ছুটে চলা।

লেখক: মনোজ সরকার

 

Leave A Reply