ধানের দাম নেই, ঈদের আনন্দও নেই

Share

উৎসবপ্রিয় বাঙালির দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে ঈদুল ফিতরের আনন্দ। ঈদ আনন্দকে কেন্দ্র করে সাধারণত হাওরে ১০ রোজার পর থেকেই নিন্মবিত্ত-মধ্যবিত্ত সবাই ঈদের কেনা-কাটায় ব্যস্ত থাকেন। কারণ ঈদুল ফিতরে সামর্থ্য অনুযায়ী শিশু থেকে শুরু করে অশীতিপর পর্যন্ত জামা, পাঞ্জাবিসহ কোনো না কোনো বস্ত্র কিনে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন।

কিন্তু এবার হাওরের জনপদগুলোতে ঈদের আনন্দ নেই। হাওরের দোকানগুলোতে বেচা-বিক্রি নেই। আগাম বন্যায় ধান হারিয়েছে কৃষক। হাওরে বন্যা আতঙ্কে ধান রক্ষা করতে সমুদয় আধা-পাকা ধান কেটে ফেলেছে কৃষক। কিন্তু সেই কাটা ধানের বাজার দর খুবই নিন্মমুখী। ফলে লোকসান দিয়ে এক মণ ধান বিক্রি করেও ঘরের গৃহিণীর জন্য একটি পছন্দের শাড়ি কিনতে পারছেন না কৃষক।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ হাওর জনপদে এবার আধা-পাকা ধান কেটে নিজেদের বাঁচিয়েছেন কৃষক। কিন্তু কাটা ধানের উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে কৃষকের মাথায় হাত পড়েছে। ডিজেল, কীটনাশক, শ্রমিক মজুরি দিতে গিয়ে মহাজনী ঋণ দেওয়া তো দূরের কথা, উৎপাদিত ধান বর্গা ও প্রান্তিক চাষিদের জন্য গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাই এবার ছেলে-মেয়ে ও পরিবারের সদস্যদের জন্য ঈদে নতুন জামা-কাপড় কিনতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন। ধানের উৎপাদন মূল্য যেখানে ৮৮০ টাকার মতো পড়েছে, সেখানে প্রতিমন ধান বিক্রি করতে হচ্ছে সর্বোচ্চ ৫৫০ টাকা ধরে। ফলে গোটা হাওরে ধানের ধানের দামের অভাবে কৃষকের মধ্যে ধান হারানোর আহাজারি দৃশ্যমান।

বুধবার (২৭ এপ্রিল) করিমগঞ্জের বালিখলা ঘাটে করিমগঞ্জের চামড়াঘাট, সূতারপাড়া, ইটনার নয়াহাটি, এলমজুড়িসহ কয়েটি গ্রামের মানুষ জানায়, এবার হাওরবাসীর জীবনধারায় ঈদের ন্যূনতম আনন্দের উপস্থিতি নেই। বছরের একমাত্র বোরো ফসলের ধানের দাম না থাকায় হাওরের ছোট-বড় সকল কৃষক আজ দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

যেখানে ধান বিক্রি করে দৈনন্দিন আহার যোগানোই কষ্টকর হচ্ছে, সেখানে ঈদের পোশাক দেওয়ার মতো সামর্র্থ্য কোথায়? ফলে কৃষকদের ছেলে-মেয়ের মুখ মলিন। অনেকেই মন খারাপ করে বসে আছেন। খাদ্যের উপযুক্ত মূল্যের নিরাপত্তার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন তারা।

সূতারপাড়া গ্রামের আলাল মিয়া বরলেন, ধানের দাম নেই। শুকনো ভালো ধানও নেই। ঈদের চার সন্তান মলিন মুখে তাকিয়ে থাকে। এখনও তাদের জন্য নতুন জামা-কাপড় কেনা হয়নি বলে। সামর্থ্য নেই এই কথাটা বলতেও পারি না, আবার সহ্য করতেও পারি না। স্ত্রী মন খারাপ করে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

নিকলী উপজেলার দামপাড়া গ্রামের কৃষক আবু জেহালসহ একাধিক কৃষক (৫৩) জানায়, ধানের দাম না থাকায় গ্রামের কয়েক শ পরিবারের মধ্যে ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে। কারণ একমাত্র বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল হাওরের মানুষ। ধান নেই তাই এবার তাদের ঈদও নেই।

হাওরের এমন শতাধিক কৃষক পরিবারের সদস্যের সঙ্গে কথা বললে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তারা প্রয়োজনীয় টাকার অভাবে ঈদ উৎসব করতে পারছেন না বলে এই প্রতিবেদককে জানান।

ইটনা উপজেলা চেয়ারম্যান চৌধুরী কামরুল হাসান বলেন, হাওর অঞ্চলে ধানের সঠিক দাম নির্ধারণসহ কৃষকদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠার জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে হাওরের কৃষকের মলিন মুখে হাসি ফুটবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

Leave A Reply