করোনায় চিকিৎসায় দুর্নীতির অভিযোগ টিআইবির : প্রতিক্রিয়া

Share

কোভিড-১৯ করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের টিকা কার্যক্রমে অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখতে পেয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকার হিসাব পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে দুর্নীতি ও সুশাসন নিয়ে কাজ করা এই সংস্থাটি। টিআইবি বলছে, করোনায় আক্রান্ত ২২.২ শতাংশ মানুষকে হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির শিকার হতে হয়েছে। নমুনা পরীক্ষা করাতে গিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির শিকার হয়েছেন ১৫ শতাংশ সেবাগ্রহীতা।

টিআইবির ‘করোনা ভাইরাস সংকট মোকাবিলায় সুশাসন: অন্তর্ভুক্তি ও স্বচ্ছতার চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত মঙ্গলবার (১২ এপ্রিল) এই গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষক মো. জুলকারনাইন ও কাওসার আহমেদ। টিআইবি জানায় গবেষণায় ৪৩টি জেলায় ১০৫টি টিকাকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। যার মধ্যে ৬০টি অস্থায়ী এবং ৪৫টি স্থায়ী টিকা কেন্দ্র। এই গবেষণা কাজে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ৬৭১ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, “করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা ও টিকা কার্যক্রম এবং করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নেওয়া প্রণোদনা কার্যক্রমে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ সুশাসনের চ্যালেঞ্জ অব্যাহত আছে। করোনা সংকট মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ, সম্পদের যথাযথ ব্যবহার, পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং সেবা সম্প্রসারণ করা হয়নি। যা বারবার সংক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মৃত্যুসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্ভোগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। গবেষণায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষকে টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী টিকা সংশ্লিষ্টতার যে কথা বলেছেন, বাস্তবে তার অর্ধেক হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে আমরা জানতে পেয়েছি। টিকায় ১৪ হাজার থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় হয়েছে। এখানেও তথ্যের ঘাটতি থাকতে পারে।”

টিআইবির গবেষণায় টিকা কার্যক্রমে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার ঘাটতি পাওয়া গেছে। ২০২১ সালের জুলাই মাসে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, টিকা প্রতি ব্যয় ৩ হাজার টাকা। চলতি বছরের ১০ মার্চ টিকা কার্যক্রমে মোট ব্যয় ৪০ হাজার কোটি টাকা বলে জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কিন্তু সরকারি পরিকল্পনায় টিকা কার্যক্রম সম্পর্কিত টিকা প্রতি ব্যয় ২ ডলার বা ১৭০ টাকা ধরা হয়েছিল। এর সঙ্গে ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য ব্যয় যোগ করলে টিকা প্রতি ব্যয় ২৪৪ টাকা ৪০ পয়সা দাঁড়ায়। সে হিসেবে টিকা ক্রয় এবং ব্যবস্থাপনাসহ মোট দাঁড়ায় ১২ হাজার ৯৩ কোটি টাকা থেকে ১৬ হাজার ৭২১ কোটি টাকা, যা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেওয়া হিসেবের অর্ধেকেরও কম।

টিআইবির এই গবেষণাপত্র প্রকাশিত হওয়ার পরে ভয়েস অফ আমেরিকা বাংলাদেশে যারা করোনা শনাক্ত, টিকা উৎপাদন, আমদানী, করোনা চিকিৎসা, স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সংবাদ প্রকাশ করেছেন তাদের প্রতিক্রিয়া জানতে চেষ্টা করেছে।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী
প্রতিষ্ঠাতা, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

বাংলাদেশে করোনা শনাক্তের শুরুর দিনগুলো থেকেই আমরা করোনা শনাক্ত ও এর চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে মতামত জানিয়ে আসছিলাম। এরপরে টিকা আবিস্কার হয়ে গেলে দেশেই করোনার টিকা উৎপাদনের কথা বলেছিলাম। কোনটিই সফলতা পায়নি। আমরা শুরু থেকেই বলে আসছিলাম, করোনার শনাক্ত করার জন্য যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, তা ব্যয়বহুল। আমরা করোনা শনাক্তের জন্য তুলনামূলক কম খরচের একটি পদ্ধতির কথা বলেছিলাম। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। আমরা যখন নিজেদের দেশেই করোনার কিট উৎপাদনের কথা বললাম, আমাদের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এখন টিআইবি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি ও অনিয়মের যে তথ্য হাজির করেছে তা বিশ্ব্বাসযোগ্য বলেই মনে হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যদি সত্যিকারভাবে এই অভিযোগের তদন্ত করতে চায় এবং দোষীদের বিচার করতে চায়, তবে আমি বলবো, স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় অতীতে যা করেছে তার ক্ষতিপূরণ হওয়ার নয়, তবুও একটা দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে।

ফরহাদ মজহার

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিন্তক

ফরহাদ মজহার।
ফরহাদ মজহার।

রাষ্ট্রের সব জায়গাতে যে রকম অনিয়ম ও দুর্নীতি চলে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের এই দুর্নীতি তারই একটি ধারবাহিকতা। এটি আলাদা কোনো নতুন ঘটনা নয়। টিআইবি যে রিপোর্টটি প্রকাশ করেছে তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে করোনা মহামারীর কালে যে অনিয়ম ও জন অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছিল, তারই প্রতিফলন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণলায়ের আর কোনো নৈতিক ভিত থাকত পারে না।

ড. আসিফ নজরুল
অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ড. আসিফ নজরুল।
ড. আসিফ নজরুল।

টিআইবি যেভাবে রিসার্চ করে একটি গবেষণা ফল প্রকাশ করে তা অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ। এখন করোনার সময়ে স্বাস্থ্যখাতে যে বড় ধরনের একটি অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে তা পরিস্কার। আমরা দেখেছি কীভাবে সাংবাদিক রোজিনাকে হেনস্থা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনিয়মের বিরুদ্ধে নিউজ করায় রোজিনা ইসলামকে কারাগারে রাখা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। টিআইবি প্রত্যিকটি অনিয়ম ও দুর্নীতি আলাদা আলাদাভাবে দেখিয়েছে। এখন এটা কেবল স্বাস্থ্যখাতের অনিয়ম সামনে এসেছে বলেই আমরা যেন মনে না করি, আর সবকিছু ঠিক আছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আলাদা কোনো বিভাগ নয় এই দেশের প্রচলিত আইন-কানুনের বাইরে গিয়ে। তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এভাবে অনিয়ম বা দুর্নীতি হলে তা অন্যান্য ক্ষেত্রেও রয়েছে বলে বলা যায়। সুশাসন ও গণতন্ত্র নিশ্চিত করা গেলে কোনো রাষ্ট্রে এইভাবে মহামারীর মতো ঘটনার সময়ে অনিয়ম হতে পারে না । এখন টিআইবি যেভাবে তাদের গবেষণা উপস্থাপন করেছে, তাতে করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অবশ্য কর্তব্য হয়ে পড়েছে এইসব অভিযোগের সত্যতা বা ব্যর্থতা পালনে।

ডা. আব্দুন নূর তুষার
চিকিৎসক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব

ডা. আব্দুন নূর তুষার।
ডা. আব্দুন নূর তুষার।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত নিয়ে দেশের আর দশটা মানুষের যে মনোভাব, আমারও একই। করোনা মহামারীর সময়ে এই খাতের দুর্নীতি আমাদের সামনে নতুনভাবে হাজির হয়েছে। এখন টিআইবি যে বিশাল অংকের দুর্নীতির কথা বলেছে তা টাকার পরিমাণে বেশি হলেও অবাক হওয়ার মতো নয়। অবাক হওয়ার মতো নয়, এ জন্য বলছি যে- স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কেবল এই করোনার সময়েই দুর্নীতি করেছে তা নয়। এর আগেও হয়েছে। করোনার সময়ে করোনা পরীক্ষা, টিকা ক্রয় থেকে শুরু করে নানা ধরনের দুর্নীতি হয়েছে। করোনার ভ্যাকসিন কেনার টাকায় অনিয়ম করা হয়নি বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল। আবার টিকার খরচ নিয়েও বক্তব্য দিয়েছিল। পরে আমাদের মতো আরও অনেকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এইসব হিসাব করে দেখেছেন, প্রায় প্রত্যেকটি খাতে দুর্নীতি রয়েছে। এখন টিআইবি যেহেতু একটি রিপোর্ট হাজির করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে তাই এই খাতের সবার উচিৎ টিআইবির রিপোর্টকে ভুল প্রমাণ করা।

রোজিনা ইসলাম

সাংবাদিক

রোজিনা ইসলাম।
রোজিনা ইসলাম।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি নিয়ে আমি রিপোর্ট করেছিলাম সেটি ছিল নিয়োগ সংক্রান্ত ঘটনা। আমার সেই রিপোর্টেই নিউজের স্বপক্ষে তথ্য-প্রমাণ ছিল। এরপরে নানা কিছু হলো। আমাকে জেলে যেতে হল। এখনও সেই মামলা চলছে। যেহেতু মামলাটি চলমান, তাই এই বিষয়ে আমি আর কোনো কথা বলতে চাই না।

সূত্র:ভয়েচ অব আমেরিকা

Leave A Reply