মার্কিন ডলার কি বিপদে পড়ছে, সিএনএন বিশ্লেষণ

Share

সি এন এন বিশ্লেষন,প্রতিবেদন:

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী থাকতে পারে, কিন্তু ডলার তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এখন, প্রায় ৮০ বছরের ডলারের আধিপত্যের পরে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক রিজার্ভ কারেন্সি স্ট্যাটাস হারানোর বিপদে পড়তে পারে। বিশ্বব্যাপী মুদ্রার রিজার্ভের ১২.৮ ট্রিলিয়নের প্রায় ৬০ শতাংশ বর্তমানে ডলারে ধারণ করা হয়েছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অন্যান্য দেশের তুলনায় অত্যধিক সুবিধা প্রদান করে। এরফলে ডলার দ্বারা সমর্থিত মার্কিন সরকারের ঋণ খুবই আকর্ষণীয়, সুদের হার কম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব মুদ্রায় অন্যান্য দেশ থেকে ধার নিতে পারে। আমেরিকান ব্যবসাগুলি রূপান্তর ফি প্রদান না করেই ডলারে আন্তর্জাতিক লেনদেন করতে পারে। যা অন্যদেশের মুদ্রাগুলো পারে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, চরম পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলিতে ডলারের অ্যাক্সেস বন্ধ করে দিতে পারে, তাদের অর্থনীতিকে বিচ্ছিন্ন এবং নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে। তাই রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন এই শক্তিকে ‘গণ ধ্বংসের অর্থনৈতিক অস্ত্র’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার উপর এই অস্ত্রের বিস্ফোরণ ঘটায় যখন দেশটি ইউক্রেন আক্রমণ করে, দেশটির ৬৩০ বিলিয়ন মূল্যের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আটক করে এবং এতে রুশ মুদ্রা রুবলের মূল্য ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। এটি আমেরিকাকে মার্কিন সেনাদের যুদ্ধে না জড়িয়ে রাশিয়াকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা এনে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক শক্তির সাথে মহান দায়িত্ব না থাকলে বা যখন গণবিধ্বংসী অস্ত্র, এমনকি ডলার হিসেবে অর্থনৈতিক অস্ত্র দেশটি অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে, তখন মানুষ ভয় পেয়ে যায়। রাশিয়ার মতো একই পরিণতি থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য, অন্যান্য দেশ তাদের বিনিয়োগকে মার্কিন ডলার থেকে দূরে রেখে অন্যান্য মুদ্রায় বৈচিত্র আনে। এরফলে ডলারের একচেটিয়া আধিপত্য বেশ কিছুটা খর্ব হতে শুরু করে। ব্যাংক অফ আমেরিকার বিশ্লেষক মাইকেল হার্টনেট বলেছেন, বিভিন্ন দেশের মার্কিন ডলারে লেনদেন না করে নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন ডলারকে অস্ত্রোপচার করার সামিল এবং এটি ডলারকে অবজ্ঞার দিকে নিয়ে যেতে পারে। বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় রিজার্ভ মুদ্রা হিসাবে আমেরিকার ভূমিকাকে হ্রাস পেতে পারে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের একটি নতুন গবেষণা পত্রে দেখা গেছে যে আন্তর্জাতিক রিজার্ভের ডলারের ভাগ গত দুই দশক ধরে হ্রাস পাচ্ছে, একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং সন্ত্রাসবিরোধী নিষেধাজ্ঞা শুরু করেছে। রিজার্ভের এক চতুর্থাংশ ডলার থেকে চীনা ইউয়ানে স্থানান্তরিত হয়েছে এবং বাকি তিন চতুর্থাংশ ছোট দেশের মুদ্রায় স্থানান্তরিত হয়েছে। এভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো চীন, রাশিয়া, ইরান, ভেনেজুয়েলা, কিউবা সহ যেসব দেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে তারা ডলারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিবর্তনে বিকল্প একটি পথ তৈরির চেষ্টা করছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত বৃহস্পতিবার হুমকি দিয়েছেন যে দেশগুলি গ্যাস কিনতে রুবলে পাওনা পরিশোধ করবে না সেসব দেশে গ্যাস রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া হবে। এজন্যে রুশ ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার প্রায় ৪০ শতাংশ গ্যাস এবং ৩০ শতাংশ তেল রাশিয়া থেকে পায় কোন সহজ বিকল্প ছাড়াই। ইতিমধ্যে স্পেন ও ফ্রান্স রুবলে গ্যাসের দাম পরিশোধে রাশিয়ার কাছে অঙ্গীকার করেছে।

এদিকে সৌদি আরব চীনের কাছে তেল বিক্রির জন্য ডলারের পরিবর্তে ইউয়ান গ্রহণে রাজি হয়েছে। আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থায় তাই প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি রাজা ডলার সিংহাসনচ্যুত হতে চলেছে?

গত দুই বছর আন্তর্জাতিক অর্থনীতির বিভিন্ন গতি প্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেই অত্যাধিক সুযোগ-সুবিধা হারানোর শঙ্কা খুবই কম। চীন বছরের পর বছর ধরে ইউয়ানকে ডলারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক লেনদেনে স্থাপ করে দিতে চাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী লেনদেনের মাত্র ৩ শতাংশ ইউয়ানে পরিচালিত হয়, আর এক্ষেত্রে ডলারের অবদান ৪০ শতাংশ। ডলারের আধিপত্য নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের বাকিদের কাছে মোটামুটি আকর্ষণীয়। মার্কিন ইক্যুইটি বাজার বিশ্বের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে তরল স্টক মার্কেট, এবং বিদেশী পুঁজি হিসেবে দেশে দেশে প্রবাহিত হচ্ছে। ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী ডলারে বৈদেশিক-প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের প্রবাহ ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে আনুমানিক ১.৬৫ ট্রিলিয়ন হয়েছে, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ ১১৪ শতাংশ বেড়ে ৩২৩ বিলিয়ন হয়েছে। ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি, ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ এবং ফেডারেল রিজার্ভের হার-বৃদ্ধির পরিকল্পনার গতি বৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনন্য চ্যালেঞ্জের একটি সিরিজ তৈরি করেছে। এই চ্যালেঞ্জগুলি দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। তবে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন বিশ্বজুড়ে বাজারকে হতবাক করেছে। এছাড়া পণ্যসামগ্রী, এমনকি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ইস্যু রয়েছেই।

Leave A Reply