দক্ষিণ-এশিয়া মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিপীড়নকে যুক্তরাষ্ট্রের “গণহত্যা” ঘোষণার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা

Share

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘদিনের সহিংসতাকে বাইডেন প্রশাসনের আনুষ্ঠানিকভাবে “গণহত্যা” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন বাংলাদেশের আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। প্রায় পাঁচ বছর আগে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য (বর্তমানে রাখাইন রাজ্য) থেকে নিপীড়নের শিকার হয়ে তারা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন।

মঙ্গলবার (২২ মার্চ) কক্সবাজারের উখিয়ার কয়েকটি আশ্রয়শিবিরে রাখাইনে নিপীড়নের শিকার কয়েকজন নারী, পুরুষের সঙ্গে কথা বলেন ভয়েস অফ আমেরিকার এই প্রতিবেদক।

যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী ও রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর জন্য একটি মাইলফলক উল্লেখ করে কয়েকজন শরণার্থী নারী–পুরুষ ভয়েস অফ আমেরিকার এই প্রতিবেদককে বলেন, “দ্য হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) রোহিঙ্গা গণহত্যার যে মামলা চলমান, যুক্তরাষ্ট্রের এই স্বীকৃতি বা ঘোষণার পর তা আরও জোরদার হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের অন্য রাষ্ট্রেরও এগিয়ে আসা উচিত, গণহত্যার বিষয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে। তাতে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা মর্যাদার সঙ্গে নিজভুমে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ পাবেন এবং তাদের নাগরিক সুযোগ সুবিধাও নিশ্চিত হবে।” তারা মনে করেন, গণহত্যার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে স্বীকৃতি, সেটা তাদের প্রাণের দাবি।

সোমবার (২১ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন ওয়াশিংটনের ইউএস হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়ামে বক্তব্য রাখাত সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সহিংসতাকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে ঘোষণা দেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণায় খুশি রোহিঙ্গা শরণার্থীরা

উখিয়া বালুখালী তিনটি আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প ৮, ৯ ও ১০) লম্বাশিয়া, জামশিয়া ও কুতুপালং ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে, বাইডেন প্রশাসনের ঘোষণা নিয়ে শরণার্থীদের মধ্যে বেশ আলোচনা চলছে।

মঙ্গলবার দুপুরে বালুখালীর ক্যাম্পের একটি দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন কয়েকজন রোহিঙ্গা শরণার্থী। তাদের একজন কলিম উল্লাহ (৫৫) বলেন, “মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নিধন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার এই প্রথম আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে মিয়ানমারকে অভিযুক্ত করল। আমরা ন্যায় বিচার চাই। আমরা (রোহিঙ্গা) নাগরিকত্ব ফিরে পেতে চাই। রাখাইন রাজ্যে স্বাধীনভাবে বসবাসের সুযোগ চাই।”

বালুখালী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১০) শরণার্থী খায়রুল ইসলাম (৪২) বললেন, “গণহত্যার জন্য মিয়ানমারের বিচার হওয়া উচিত। মিয়ানমারকে নতজানু করতে অর্থনৈতিক অবরোধ দরকার। নইলে মিয়ানমার কারও কথা আমলে নেবে না। অতীতেও নেয়নি।” তিনি আরও বলেন, “রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে ঘোষণা, তা আমরা শরণার্থীরা শতভাগ সমর্থন করছি। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও জনগণকে ধন্যবাদ জানাই রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।”

মঙ্গলবার বিকেলে এই প্রতিবেদক ক্যাম্প ত্যাগের সময় কথা বলেন আবদুল গফুরের (৪৫) সঙ্গে। তিনি বললেন, “রোহিঙ্গা নিধনের বিষয়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে ঘোষণা দিয়েছে, রোহিঙ্গা জাতি তা আজীবন মনে রাখবে।”

তিনিসহ আরও কয়েকজন জানালেন, করোনা মহামারির কারণে ক্যাম্পসমূহে সভাসমাবেশ, লোকসমাগম নিষিদ্ধ। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে তারা কোনো কর্মসূচি আয়োজন করতে পারছেন না।

শরণার্থীরা বললেন সেই নিপীড়নের কথা

আশ্রয়শিবিরে যে কয়েকজন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত রোহিঙ্গা আছেন, তাদের একজন খায়রুল ইসলাম। তিনি ক্যাম্পের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গা শিশু-কিশোরদের পাঠদান করান। পাশাপাশি পল্লীচিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন।

দুপুরে বালুখালী আশ্রয়শিবিরে (ক্যাম্প-৮ পশ্চিম) কথা হয় ইয়াছির আরাফাতের সঙ্গে। তার বাড়ি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ফকিরাবাজারে। রাখাইনে রোহিঙ্গা শিশুদের স্কুল–কলেজে পড়াশোনার সুযোগ নেই। ইয়াছির তার আসল নাম লুকিয়ে “মং চে নাই” নামে স্কুলে ভর্তি হয়ে ২০১৬ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর কলেজে ভর্তি হলেও পড়ালেখার সুযোগ পাননি। পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর উখিয়ার আশ্রয়শিবির থেকে যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্সে অনলাইনে পাঠ নিচ্ছেন। ইয়াছির আরাফাত ভয়েস অফ আমেরিকার এই প্রতিবেদককে বলেন, “পড়াশোনা করে রোহিঙ্গা শিশু-কিশোরেরাও মানুষ হতে চায়। কিন্তু মিয়ানমার সরকার সে অধিকার দিচ্ছে না। শিক্ষার সুযোগ থেকে রোহিঙ্গাদের বঞ্চিত রাখা হচ্ছে।” ২০১৭ সালের ২৫ অগাস্টে নিজগ্রাম ফকিরাজারে নিধনযজ্ঞ, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, গুলি চালিয়ে রোহিঙ্গাদের হত্যার ঘটনা নিজ চোখে দেখার কথা বর্ণনা করে ইয়াছির আরাফাত বলেন, “ঘটনার পাঁচ বছরেও এই ক্ষত মন থেকে মুছে ফেলতে পারছি না। আমাদের এমন কী অপরাধ ছিল যে, এভাবে গণহত্যা চালিয়ে পুরো একটি জাতিকে নির্মুল করা হবে?”

রোহিঙ্গা জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মিয়ানমারে গণহত্যার বিষয়ে জনমত গঠনে দেড় শতাধিক শিক্ষিত রোহিঙ্গা তরুণ–যুবক মিলে গঠন করেছেন “গ্লোবাল রোহিঙ্গা স্টুডেন্ট ইউনিয়ন”। ইয়াছির আরাফাত এই সংগঠনের সদস্য।

মনির উল্লাহ (৬২) ভয়েস অফ আমেরিকার এই প্রতিবেদককে বলেন, “আমরা জন্মসূত্রে বার্মার (মিয়ানমার) নাগরিক। কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষকে বাস্তুহারা করতে নিধনযজ্ঞ চালিয়েছিল।” ২০১৭ সালের ২৯ অগাস্ট রাতে মিয়ানমারের সেনারা রাখাইন রাজ্যে মনির উল্লাহর বসতবাড়িটি আগুনে জ্বালিয়ে দেয়। তার প্রতিবেশি আরও ১০-১২ জনের বসতিও সেনারা জ্বালিয়ে দিয়েছিল। এলোপাথাড়ি গুলিতে মারা গেছে তার এক ছেলেসহ গ্রামের অন্তত ১২ জন রোহিঙ্গা। এরপর প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গা ঢলের সঙ্গে তিনি স্ত্রী ও পাঁচ ছেলেমেয়ে নিয়ে বাংলাদেশ পালিয়ে আসেন। বালুখালী পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে আছেন টানা প্রায় পাঁচ বছর। কিন্তু মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার লক্ষণ দেখতে পাচ্ছেন না তিনি।

বালুখালী আশ্রয়শিবিরের একটি কেন্দ্রে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন নিপীড়নের শিকার কয়েকজন রোহিঙ্গা নারী। তাদের একজন খতিজা বেগম (৩৫)। মিয়ানমারের সেনারা তার চোখের সামনে রোহিঙ্গা পল্লীতে আগুন দিয়ে ২০-২৫টি ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিল। তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা মেয়েদের ধরে নিয়ে ধর্ষণ করেছে। গর্ভবতী মেয়েরাও রেহায় পায়নি। প্রতিবাদ করায় কয়েকজন মেয়েকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের পর গুলি করে হত্যা করেছে।”

রোহিঙ্গা তরুণী নুর হাবিবা (১৮)। তিনি জানান, এক রাতে তার এক ভাইকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেছিল রাখাইন রাজ্যের মগ সম্প্রদায়ের উগ্রবাদী যুবকেরা।

এই মগ যুবকদের হাতে অসংখ্য রোহিঙ্গা মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাদের অনেকে উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে অমানবিক জীবন কাটাচ্ছেন।

নূর হাবিবা বলেন, “আমরা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের

বিচার চাই”।

রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কথা বলতেন মুহিবুল্লাহ

রোহিঙ্গা নেতারা জানালেন, আগে শরণার্থীদের অধিকার নিয়ে কথা বলতেন “আরকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস”-এর (এআরএসপিএইচ) চেয়ারম্যান মুহিবুল্লাহ।

২০১৯ সালের ১৭ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে ১৭ দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদলের একজন হয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডনান্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করে আলোচনায় এসেছিলেন এই নেতা। তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে মুহিবুল্লাহ বলেছিলেন, “আমরা (রোহিঙ্গারা) দ্রুত মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই। এ বিষয়ে আমরা (রোহিঙ্গা) যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাই।”

এর কিছুদিন পর অর্থাৎ ২০১৯ সালে ২৫ অগাস্ট উখিয়ার কুতুপালং শিবিরের ফুটবল মাঠে রোহিঙ্গা গণহত্যা বিরোধী মহাসমাবেশে মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের নাগরিত্ব প্রদান, নিরাপত্তা, রাখাইনে ফেলে আসা জন্মভিটা ফেরতসহ সাতদফা পুরণ না হলে কোনো রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যাবেন না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তার এই দাবিতে এখনো অনড় অবস্থানে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা।

কিন্তু ২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে সশস্ত্র বন্দুকধারীরা গুলি করে হত্যা করে রোহিঙ্গাদের শীর্ষ এই নেতাকে। মুহিবুল্লাহর পরিবার এ হত্যার জন্য মিয়ানমারের সশস্ত্রগোষ্ঠী ‘আরাকান স্যালভেশন আর্মি’ (আরসা)–কে দায়ী করে আসছে। রোহিঙ্গা শিবিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ পযন্ত মুহিবুল্লাহ হত্যায় জড়িত আরসার ছয়জনসহ ১৫ জন সন্দেহভাজন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে ২৫ অগাস্টের পর থেকে সহিংসতার মুখে কয়েক মাসে বাংলাদেশ পালিয়ে আসেন ৮ লাখ রোহিঙ্গা। এর আগে কয়েক দফায় আসেন আরও কয়েক লাখ। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১১ লাখ।

রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা চলছে। দ্য হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ২০১৯ সালে মামলাটির প্রাথমিক শুনানি শুরু হয়। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের নভেম্বরে আইসিজেতে মামলাটি করে আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গণধর্ষণ, হত্যা এবং বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

Leave A Reply