সেন্টমার্টিন ধ্বংসের পথে

Share
প্রতিদিন ১ হাজার ২৫০ পর্যটক যেতে পারবেন। রাতযাপন করা যাবে না * বিলুপ্তির পথে ডলফিন, মাছ, প্রবাল, সরীসৃপ, উদ্ভিদ, পাখি, বাদুড়সহ নানা প্রজাতি।
দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন ধ্বংসের পথে। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটক ও অপরিকল্পিত স্থাপনা এর অন্যতম কারণ। প্রতিদিন ৮-১০ হাজার পর্যটক এই দ্বীপে আসেন। তাদের কেন্দ্র করে দ্বীপের চারপাশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে স্থাপনা তৈরির হিড়িক পড়েছে। পাশাপাশি পর্যটকদের অসচেতনতা সেখানকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য এখন মারাত্মক হুমকির মুখে। ফলে প্রবাল, শৈবাল, সামুদ্রিক কাছিম, লাল কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুকসহ নানা জলজ প্রাণী এবং জীববৈচিত্র্য এখন বিলুপ্তির পথে।

দ্বীপের এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশ নিয়ে কাজ করা কক্সবাজারের একাধিক সংগঠনের দায়িত্বশীলরা।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি ও চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি    আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, দ্বীপের পরিবেশ ও প্রতিবেশ ফিরিয়ে আনতে     অন্তত এক বছর দ্বীপে বসবাসকারী লোকজন ছাড়া পর্যটকদের যাতায়ত      বন্ধ করা দরকার। অথবা দ্বীপের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করে শতভাগ           মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পর্যটকদের যাতায়াত নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া      প্রবাল, শৈবাল, সামুদ্রিক কাছিম, লাল কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুকসহ নানা         জলজপ্রাণী এবং জীববৈচিত্র্য ফেরানো সম্ভব হবে না।

কক্সবাজারের প্রবীণ সাংবাদিক মমতাজ উদ্দিন বাহারী বলেন, পর্যটকদের কাছে ‘দক্ষিণের স্বর্গ’ নামে পরিচিত প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন। বিগত কয়েক বছর এই দ্বীপে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়েছে পর্যটকদের আনাগোনা। পাশাপাশি অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে স্থাপনা। এতে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটেছে।

সূত্র জানায়, সেন্টমার্টিন এখন পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা। তাই সেখানে পর্যটন নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। এটি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির কাছে পাঠানো হবে। এ বিষয়ে একটি সফটওয়্যারও তৈরি করা হয়েছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপের পর্যটকদের গমনাগমন নিয়ন্ত্রণপূর্বক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেখানে প্রতিদিন ১ হাজার ২৫০ পর্যটক যেতে পারবে। তবে সেখানে রাতযাপন করা যাবে না। ১ হাজার ২৫০ পর্যটক সেন্টমার্টিনে যাতায়াতের ব্যাপারে পর্যটকের সংখ্যা সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক সার্ভিসেস সংস্থার মাধ্যমে অ্যাসেসমেন্ট করা হয়েছিল। তারা প্রতিদিন এক হাজার পর্যটকের ধারণক্ষমতার বিষয়টি উল্লেখ করেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষ সেন্টমার্টিন দ্বীপে বিভিন্ন পথে যাতায়াত করেন। পাশাপাশি রাতযাপন করেন। ফলে অপরিকল্পিতভাবে একের পর এক রিসোর্ট, হোটেল, রেস্তোরাঁসহ নানা স্থাপনা গড়ে উঠছে। এতে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, যত্রতত্র প্লাস্টিকের বর্জ্য, পাথর তোলা, সৈকতের বালি অপসারণ ক্রমাগত বেড়েই চলছে। দ্বীপের ভূগর্ভস্থ সুপেয় মিঠা পানির স্তরও নিচে নেমে গেছে। ফলে কিছু কিছু নলকূপে আসছে লবণাক্ত পানিও। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ১৪টি বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও মানছেন না পর্যটকরা। পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, পর্যটকের সংখ্যা দৈনিক এক হাজার থেকে বারোশ পর্যন্ত সীমিত রাখা গেলে হয়তো ভারসাম্য ধরে রাখা সম্ভব। সৈকতে জনকোলাহল, পানিতে অতিরিক্ত দূষণের কারণে বহু উদ্ভিদ ও প্রাণী এরই মধ্যে বিলীন হয়েছে।

সবচেয়ে হুমকির মুখে কাছিম। কারণ এই দ্বীপ সামুদ্রিক কাছিমের প্রজনন ক্ষেত্র। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাংগঠনিক সম্পাদক এইচএম নজরুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এককালে এই দ্বীপে ২৩৪ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, পাঁচ প্রজাতির ডলফিন, চার প্রজাতির উভচর প্রাণী, ২৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ১২০ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৬৮ প্রজাতির প্রবাল, ১৫১ প্রজাতির শৈবাল, ১৯১ প্রজাতির মোলাস্ট বা কড়িজাতীয় প্রাণী, ৪০ প্রজাতির কাঁকড়া, ১৭৫ প্রজাতির উদ্ভিদ, দুই প্রজাতির বাদুড়সহ নানা প্রজাতির প্রাণীর বসবাস ছিল।

এসব প্রজাতির অনেকই বিলুপ্তির পথে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ জানান, দু-একজন জাহাজ মালিকের লোভের কারণে দ্বীপের জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হতে দেওয়া যায় না। প্রবীণ সাংবাদিক ফজলুল কাদের চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাসে লিখেছেন, দ্বীপগামী জাহাজের বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় পরিবেশ বিপন্ন। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১৯৯৯ সালে সেন্টমার্টিনকে পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে সরকার। দুই দশক পার হলেও বিপর্যয় রোধ করা যায়নি।

Leave A Reply