সর্বজনীন পেনশন স্কিম :সর্বোচ্চ ৮০ বছর পর্যন্ত সুবিধা

Share

আপনি প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ৫শ টাকা জমা করবেন সরকারের সার্বজনীন পেনশন স্কিমে। বয়স ৬০ পার হলেই সরকার আপনাকে প্রতিমাসে পেনশন দেবে ৩২ হাজার টাকা। যদি জমানো অর্থের অঙ্ক এক হাজার টাকা হয় সেক্ষেত্রে সুবিধার অঙ্ক হবে ৬৪ হাজার টাকা। এটি শুরু করা যাবে ১৮ বছর থেকে।

একজন নাগরিক এ সুবিধা পাবেন জীবিত অবস্থায় ৮০ বছর পর্যন্ত। এ স্কিমে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বয়সভেদে আর্থিক সুবিধার অঙ্কও কম-বেশি হবে। সুবিধাগুলো রেখে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আইন প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে অর্থ বিভাগ। এ বিষয় নিয়ে অর্থমন্ত্রী আজ ব্রিফ করতে পারেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বজনীন পেনশন স্কিমের জন্য জরুরিভিত্তিতে আইন প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়কে। গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা সংক্রান্ত কৌশলপত্র উপস্থাপনকালে এ নির্দেশনা দেন তিনি। এ কৌশলপত্রের ওপর বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান যুগান্তরকে বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আগ্রহী। এ স্কিম চালানোর মতো আর্থিক সক্ষমতা আমাদের আছে। প্রথমে ব্যক্তিপর্যায়ে বা স্বেচ্ছায় যারা এ স্কিমে আসতে চাইবেন তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পরে এটি সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা হবে। এ জন্য সবাই যাতে অংশ নিতে পারেন সে লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়ন করতে বলেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এরপর বিস্তারিত বিধিবিধানে নিয়ে আসা হবে। তিনি আরও বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিম পরিচালনার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাইরে একটি পৃথক কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে।

এদিকে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. আইনুল ইসলাম মঙ্গলবার এ বিষয়ে এক বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি এতে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের ষাটোর্ধ্ব সব নাগরিককে পেনশন সুবিধার আওতায় আনার নির্দেশ একটি যুগান্তকারী ও মহৎ উদ্যোগ। অর্থনীতি সমিতি ২০২০-২১ অর্থবছরে ‘প্রাক-বাজেট আলোচনা’য় ‘সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা’ চালুর প্রস্তাব পেশ করে। সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় ‘প্রবীণ নীড়’ গড়ে তোলা সময়ের দাবি। এ স্কিম শুরু হলে জনগণের জীবনমানের উন্নয়নে লক্ষণীয় অগ্রগতি ঘটবে।

সর্বজনীন পেনশন সংক্রান্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের কৌশলপত্রে হিসাব করে দেখানো হয়েছে বেসরকারি পর্যায়ে সব নাগরিক এ স্কিমে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন। সেক্ষেত্রে সুবিধাভোগীর জাতীয় পরিচয়পত্র থাকতে হবে। এই পরিচয়পত্রের নম্বর দিয়ে পৃথক একটি অ্যাকাউন্ট (হিসাব) খোলা হবে। যেখানে পেনশন পাওয়ার আগের দিন পর্যন্ত টাকা জমা দিতে হবে। সাধারণ হিসাবে দেখা গেছে, সর্বজনীন পেনশন স্কিমে একজন মানুষ তার সক্ষমতা অনুযায়ী প্রতি মাসে ৫শ, ১০০০, ১৫০০, ২০০০, ২৫০০, ৩০০০, ৩৫০০ ও ৪০০০ টাকা অ্যাকাউন্টে জমা করতে পারবেন। ১৮ বছর বয়সের একজন নাগরিক যে কোনো অঙ্কের টাকা জমা রাখতে পারবেন।

আর পেনশন স্কিমে ১৮ বছর থেকে যুক্ত হয়ে তার ৬০ বছর, অর্থাৎ ৪২ বছর পর্যন্ত অর্থ জমা করতে হবে। ওই হিসাবে ৫শ টাকা জমার বিপরীতে ৬০ বছর পর পেনশন পাওয়া যাবে ৩২ হাজার টাকা। মাসে ১ হাজার টাকা জমার বিপরীতে ৬৪ হাজার টাকা, ১৫শ টাকার বিপরীতে ৯৬ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। একইভাবে ২ হাজার টাকা জমার বিপরীতে ১ লাখ ২৮ হাজার, ২৫শ টাকার বিপরীতে ১ লাখ ৬০ হাজার, ৩ হাজারের বিপরীতে ১ লাখ ৯২ হাজার, ৩৫শর বিপরীতে ২ লাখ ২৪ হাজার এবং ৪ হাজারের বিপরীতে ২ লাখ ৫৬ হাজার টাকা পাওয়া যাবে।

এ সুবিধা দেওয়া হবে জীবিতকালীন ৬০ থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, দেশের নাগরিকের গড় আয়ু হিসাব ধরে বেঁচে থাকার বয়স সর্বোচ্চ ৮০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া এ স্কিমের শুরুর পর স্বেচ্ছায় যারা যুক্ত হতে চান তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। যেসব করপোরেট বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের পেনশন দিচ্ছেন তাদের জোর করা হবে না। তবে ২০৩০ সাল থেকে সবার জন্য এটি বাধ্যতামূলক হবে।

অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, এ স্কিমে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে শুরুতে সরকার কিছুটা ভর্তুকি দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে। তবে উচ্চবিত্তদের জন্য কোনো ভর্ভুকি দেওয়া হবে না। এছাড়া এ স্কিমে যুক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার জমানো অর্থের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাবেন। চাইলে তিনি জমানো অর্থের অর্ধেক ঋণ নিতে পারবেন। তবে সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশনের সঙ্গে এ পেনশন সাংঘর্ষিক হবে না।

বিবিএসের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট শ্রমশক্তির সংখ্যা ৫ কোটি ৮৭ লাখ। এর মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী ৫ শতাংশ। বেসরকারি খাতে নিয়োজিত আছে ১০ শতাংশ। এ ১৫ শতাংশ মিলে প্রাতিষ্ঠানিক খাত। বাকি ৮৫ ভাগই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের, যাদের কোনো নিয়োগপত্র নেই। তারও এ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হবেন। বর্তমানে ১১ লাখ সরকারি চাকরিজীবী মাসিক পেনশন পান। এজন্য বছরে সরকারের খরচ হয় প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা।

সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের ঘোষণা অনুযায়ী সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা প্রবর্তনের অঙ্গীকার রয়েছে। পাশাপাশি দেশে গড় আয়ু ও প্রবীণের সংখ্যা বাড়ায় সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিও বাড়ছে। ফলে সর্বজনীন পেনশন সুবিধা প্রয়োজনীয়তার আলোকেই চালু করা হচ্ছে। অবশ্য চলতি মাসে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের জাতীয় বাজেটে সে দেশের জনগণের জন্য সর্বজনীন পেনশন স্কিম বাস্তবায়নে একটি বরাদ্দ দিয়েছে। উন্নত দেশ হিসাবে নেদারল্যান্ডসসহ অনেক দেশে এটি কার্যকর রয়েছে।

Leave A Reply