সেনা মোতায়েন নিয়ে উত্তেজনা: রাশিয়ায় বসবাসকারী ইউক্রেনীয়রা কী ভাবছেন

Share
বিজ্ঞাপন

লুহানস্ক থেকে কেন কিরভে এলেন, তা বর্ণনা করতে গিয়ে ইভান বলেন, ‘আমরা সন্তানদের নিয়ে লুহানস্কে শান্তিতে ছিলাম। তবে ২০১৪ সালে আমরা মর্টার হামলার কবলে পড়ি। যে ভবনটিতে থাকতাম, সেখান থেকে বের হতেই আমার মাথার ওপর দিয়ে মর্টার শেল উড়ে গেল। আমি আর আমার স্ত্রী বেসমেন্টে লুকিয়ে ছিলাম। রাত-দিন মর্টার শেল ছোড়া হতো। ১৯৭০-এর দশকে সেনাবাহিনীতে কাজ করার কারণে আমি অ্যাঙ্গোলায় ছিলাম। সেখানকার যুদ্ধ পরিস্থিতি দেখেছি। এখানেও তেমন কিছু ঘটবে, তা আমি কখনো কল্পনা করিনি।’
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রায়ই বলে থাকেন, রুশ, ইউক্রেনীয় ও বেলারুশের নাগরিকেরা একই। বিভক্ত এক জাতি তারা। তা ছাড়া এএমএ যোদ্ধা ফেদর ইমেলিয়ালেনকোর মতো অনেক রুশ নাগরিকই প্রকৃতপক্ষে ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত। লেখক নিকোলাই গোগলও ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত ছিলেন।
রাশিয়া ও ইউক্রেন এ দুই প্রতিবেশী দেশের ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতিও অনেক কাছাকাছি। যদিও তারা একই জাতি বলে বিবেচিত হওয়ার ধারণাটি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। রাশিয়া কিংবা পূর্ববর্তী সোভিয়েত শাসনের শত বছরের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, রাশিয়া ও ইউক্রেন একই সূত্রে গাঁথা বলার মতো নৈকট্য তাদের মধ্যে ছিল না।

ইউক্রেন সীমান্তে অবস্থানকারী রুশ সেনা

ইউক্রেন সীমান্তে অবস্থানকারী রুশ সেনা
ছবি: এএফপি ফাইল ছবি

১৯৩০-এর দশকে জোসেফ স্তালিনের কৃষিবিষয়ক নীতিমালার কারণে ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের রুটির ঝুড়ি’ হিসেবে পরিচিত ইউক্রেনের লাখো মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করেছিল। ১৯৯১ সালে ইউক্রেন স্বাধীন হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যকার বিবাদের কেন্দ্রবিন্দুই ছিল যন্ত্রণাদায়ক এ ইতিহাস।
২০১৪ সালের মার্চে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহীদের নিজেদের আয়োজিত এক গণভোটের মাধ্যমে কৃষ্ণ সাগরের তীরবর্তী ক্রিমিয়া রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়। ওই ভোটে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে বেশির ভাগ ভোট পড়ে। মস্কো বরাবরই বলে আসছে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের গঠনতন্ত্র মেনে নিয়েই রাশিয়ার সঙ্গে ক্রিমিয়া যুক্ত হয়। কিয়েভ থেকে নিজেদের অঞ্চলের বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসন দাবি করেছিলেন পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহীরা। তবে ইউক্রেনের কেন্দ্রীয় সরকার তাঁদের স্বীকৃতি দেয়নি। আর ইউক্রেন সরকারের এমন অবস্থাকেই পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য দায়ী মনে করেন ইউক্রেনীয় নাগরিক ইভান আলেক্সিভিচ।

আজভ সাগরের উপকূলবর্তী দনেৎস্ক অঞ্চলের মারিউপল শহরটি রুশপন্থীদের জন্য একটি আবেগের জায়গা। ২০১৪-১৫ সালে বিদ্রোহীদের বেশ কয়েকটি অগ্রসর প্রচেষ্টাকে থামিয়ে দিয়েছিল সরকারি বাহিনী। একসময় শহরটির বাসিন্দা ছিলেন ৩০ বছর বয়সী লিনা। বর্তমানে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে থাকেন এ তরুণী। তাঁর আশা, একদিন মাতৃভূমি ইউক্রেনে ফিরে যেতে পারবেন তিনি।
আল-জাজিরাকে লিনা বলেন, ‘আমার স্বামী কাজ করার জন্য আগেই এখানে এসেছিল। আর গোলাগুলি শুরু হওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে আমিও চলে আসি।’ লিনা জানান, তিনি যতটা আশা করেছিলেন, ততটা সহযোগিতা রুশ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাননি।
লিনা বলেন, ‘ছোট একটি বাচ্চাকে নিয়ে অ্যাপার্টমেন্ট খুঁজে বের করাটা খুব কঠিন কাজ ছিল। কাগজপত্র না থাকলে চাকরিও পাওয়া যায় না। কিছুই পাওয়া যায় না। আমার জন্য শিশুসন্তান লালনপালনের কাজটি কঠিন হয়ে পড়েছিল। কারণ, তার জন্য খাবার প্রয়োজন হতো, কাপড়চোপড় প্রয়োজন হতো। এমনকি দেশ ফিরে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলাম। তাদের অফিসে গিয়ে আমাকে অভিযোগ করতে হলো। তবে কাগজপত্র পাওয়ার পর সবকিছু অনেক সহজ হয়েছে।’

২০১৪ সালে লড়াই ছড়িয়ে পড়ার পর মারিউপল ছাড়েন লিনা।

ইউক্রেনের চলমান পরিস্থিতির জন্য কাকে দায়ী করবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে লিনা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র শতভাগ দায়ী। অবশ্যই এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।’

তবে আলেক্সিভিচ এ ক্ষেত্রে ইউক্রেনের ভুল দেখতে পাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের আশঙ্কা আমি উড়িয়ে দিতে পারছি না, যদিও এ ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে। আমি মনে করি না ইউক্রেন যেভাবে বলছে, তা (যুদ্ধ হলে) করে দেখাতে পারবে। তারা জানে, ন্যাটো তাদের জন্য সেনা পাঠাবে না। আমি মনে করি না ন্যাটো কিংবা হোয়াইট হাউসের সহযোগিতা ছাড়া বড় ধরনের অভিযান তারা (ইউক্রেন) চালাতে পারবে।’

যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষের প্রতি আলেক্সিভিচ ও লিনার অনুভূতিটা ক্ষোভের হলেও, ইউক্রেনে বসবাসকারী অনেক রুশ ভাষী মানুষ ও জাতিগত রুশদের অনেকেই এখনো কিয়েভের পক্ষেই অবস্থান ব্যক্ত করেন। আর যাঁরা কিয়েভপন্থীদের সমর্থন জানান, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে থাকে রুশ কর্তৃপক্ষ। যেমন ২০১৪ সালে ইউক্রেনের চলচ্চিত্র পরিচালক ওলেগ সেনৎসভকে ক্রিমিয়ায় গ্রেপ্তার করা হয়। সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় তাঁকে।
এ কারণে নিজ দেশের প্রতি মস্কোর নীতিমালার বিরোধিতাকে নীরবে বুকে চেপে রেখে ঠিক কতজন ইউক্রেনীয় নাগরিক রাশিয়ায় বসবাস করছেন, তা বলা কঠিন।

মস্কোতে বসবাসকারী ইউক্রেনীয় কমিউনিটির সাবেক নেতা ভিক্টর হিরঝভ বলেন, ‘অনেকগুলো ইউক্রেনীয় কমিউনিটি গ্রুপ সক্রিয় থাকলেও, তারা সাধারণত রাজনীতিতে জড়ায় না। আপনি যদি ইউক্রেনের পতাকা হাতে নিয়ে বাইরে মিছিল করেন, তবে আপনাকে কোথাও গুম করে দেওয়া হতে পারে।’

হিরঝভ আরও বলেন, ‘যেকোনো আন্দোলন চাকরি হারানোর ঝুঁকিও তৈরি করে। আপনাকে চাপ দেবে তারা। বলবে, না থামলে কর্মজীবন শেষ হয়ে যাবে। লোকজন তাতে ভয় পায়। নিজেদের ভাবনা নিজেদের মধ্যেই রেখে দেয় তারা।’

ক্রিমিয়ার ককতেবেলের বাসিন্দা আন্দ্রেই জাইচিকভ। ৩৪ বয়সী এ তরুণ ইউক্রেনীয় অবস্থানের প্রতি কিছুটা সহানুভূতি প্রকাশ করলেও, সরাসরি কোনো পক্ষ নিতে রাজি নন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙে পড়ার পর ইউক্রেনীয় নাগরিক হিসেবে পরিচিতি পান জাইচিকভ। আর ২০১৪ সালে নিজের জন্মশহরকে রুশ ফেডারেশনের অংশ হতে দেখেন তিনি।

আল-জাজিরাকে জাইচিকভ বলেন, ‘ক্রিমিয়ার বাসিন্দা হিসেবে ২০১৪ সালের ঘটনায় আমার ওপর কোনো প্রভাব পড়েনি। আমার চারপাশের সবকিছু পাল্টে গেছে। আইন, মুদ্রা, সমাজব্যবস্থা-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট নীতিমালা পাল্টে গেল। এসব জিনিস পাল্টে গেলেও আমার চারপাশের মানুষগুলো একই রকম থাকল। তাদের মানসিকতা একই ছিল। এমনকি আগের কিছু কর্মকর্তাকেও ক্ষমতায় থাকতে দেখা গেছে। শুধু তাঁদের টুপিগুলো পাল্টে গিয়েছিল।’

তবে জাইচিকভের দাবি, তিনি যে রুশ শাসনাধীন ক্রিমিয়ার সবকিছু পছন্দ করেন, তা নয়। তিনি মনে করেন, সবকিছু খারাপ নয়। এমন কোনো পরিস্থিতি নেই যে অঞ্চলটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হবে।

ইউক্রেনের নেতৃত্বের জায়গায় থাকলে বর্তমান পরিস্থিতিতে কী করতেন, এমন প্রশ্নের জবাবে জাইচিকভ জানান, তিনি স্বীকার করতেন ক্রিমিয়া আর তাদের হাতে নেই। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে মনোযোগী হতেন তিনি।

Leave A Reply