লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবে টেনে এনে রাজনীতি ঢুকানো কাম্য নয়

Share

গত কয়েক মাস যাবত বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদের র্ন্বিাচন। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জমে ওঠেছে গ্রামগঞ্জের মানুষের মধ্যে প্রাণ চাঞ্চল্য। দিন রাত নির্বাচনী প্রচারণায় বিভিন্ন দলে প্রার্থীরা সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে হাত মেলাচ্ছন, বুক মেলাচ্ছেন, মিষ্টি মিষ্টি কথা আর তার সাথে এলাকার উন্নয়নে বিভিন্ন ধরণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন ভোট পাওয়ার আশায়। চলছে দিনে রাতে মাইক দিয়ে প্রচারণা অর্থাৎ গ্রামাঞ্চলের মানুষগুলো এখন নির্বাচন নিয়েই মাতোয়ারা। এলাকাবাসীও জানে ভোটে জয়লাভ করার পর ?অনেক প্রার্থীকে যে আর দেখা যাবেনা পরবর্তী নির্বাচনের আগে। তাদের সাথে দেখা করতে গেলেও লাগবে অনুমতি। বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় এই যে একটা আমেজ সৃষ্টি হয় তা সত্যিই আনন্দদায়ক। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এসব খবর পড়ে আমার মনের মধ্যে বড় আফসোস জাগে, আহারে এ সময় দেশে থাকলে তো বেশ আনন্দ করতে পারতাম।

এবার যখন প্রেস ক্লাব সদস্যদের বাছাই পর্ব শুরু হয় তখন রাজনীতিতে নেতৃস্থানীয় পদে জড়িত থাকার কারণে কয়েকজন সাংবাদিকের প্রেস ক্লাবের সদস্য পদ বাতিল করে দেয়া হয়। বহু বছর যাবৎ এই কয়েকজন সাংবাদিক প্রেস ক্লাবের সদস্য হিসেবে সুনামের সাথেই প্রেসক্লাবের প্রতিনিধিত্ব করে আসছিলেন। প্রেস ক্লাবের যাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকেই তারা সদস্যপদ গ্রহণ করেন। এরই মধ্যে বিভিন্ন সময়ে পালাবদল করে দু’টি এলায়েন্সের নেতৃস্থানীয় সাংবাদিকরা প্রেস ক্লাব চালিয়ে গেছেন। কিন্তু বাংলাদেশী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পদে জড়িত থাকলে প্রেস ক্লাবের সদস্য পদে রাখা হবে না – এমন কোন কথাবার্তা বলা  বা কোনরূপ হুঁশিয়ারী দেয়ার কথা অতীতের ক্লাব নেতৃবৃন্দ কখনো করেননি। কিন্তু এবার ক্লাবের নেতৃবৃন্দ রাজনীতির উচ্চ পদে থাকা সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলতে শুরু করলে, বিক্ষোভে ফেটে পড়েন শতাধিক সদস্য। এ নিয়ে স্বাক্ষর অভিযান, প্রতিবাদ সমাবেশ প্রেস কনফারেন্স অনেক কিছুই হয়েছে।। প্রেস ক্লাবের বর্তমান নেতৃবৃন্দ অবশ্য তাদের প্রতিবাদের উত্তর দিয়েছেন প্রেস ক্লাবের অনলাইনে, সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপে। তাদের বক্তব্যে তারা বলেছেন, আমরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তা সম্পূর্ণই ক্লাবের সংবিধান মোতাবেক। অন্যদিকে বিক্ষুব্ধ সদস্যদের দাবিটাও সত্য। সুতরাং আমার মতে, ক্লাব নেতৃবন্দকে দোষারোপ করার কোন উপায় নেই, কারণ, তারা সংবিধান  লংঘন করেননি। তবে সাধারণ সদস্যদের মধ্যে এ নিয়ে বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তাদের মতে, নির্বাচনতো অনেক আগেই হওয়ার কথা ছিলো কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি যার ফলে তারা আরও অতিরিক্ত এক বছরের উপর দায়িত্ব পালন করেছেন। এটা সবাই মেনে নিয়েছেন ক্লাবকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করার স্বার্থে। এই বিপদকালীন সময় অতিবাহিত করার পর পরই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রাক্কালে যদিও তারা সংবিধান মোতাবেক কাজ করেছেন তারপরও অন্তত: এই সময়ে এ ধরণের সিদ্ধান্ত নেয়াটা ঠিক হয়নি। ক্লাবের সদস্যরা মনে করেন, রাজনীতি করার করার অধিকার সবারই আছে। সুতরাং প্রেস ক্লাবের কার্যক্রমের বাইরে যদি কেউ রাজনীতি করে তাতে করে তা কোন অবস্থাতেই প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষের মাথা ব্যথার কারণ হতে পারেনা। অনেক সদস্যই বলছেন, বাংলাদেশ সহ বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশের সংবাদ পত্রগুলোই কনো না কোন রাজনৈতিক দল বা আদর্শের সমর্থক। কেউ যদি তার দলের পক্ষে থেকে রাজনীতির পাশাপশি সাংবাদিকতাও করেন তাতে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। বৃটেনেও মূলধারার প্রিন্টিং পত্রিকা, অনলাইন পত্রিকা বা টেলিভিশনগুলো কোন না কোন পার্টির সাপোর্টার। এসব কারণেই অনেক সদস্যের মধ্যে ক্ষোভ দেখা গেছে। এই সদস্যপদ নিয়ে সৃষ্ট বাক বিতন্ডা দেখে বাংলাদেশের নির্বাচনী আমেজটাই আমি উপভোগ করলাম।

প্রসঙ্গত আমি বলতে চাই, সংবিধানের যে ধারায় কয়েকজন সাংবাদিকের সদস্য পদ বাতিল করে প্রেস ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টি করা হয়েছে, সেই ধারাটি বাতিল করা প্রয়োজন। কারণ যেহেতু প্রেস ক্লাব একটি চ্যারিটি সংগঠন, এই সংগঠনের মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের সবারই কর্তব্য। দীর্ঘ দিন ধরে পরিচালিত এই সংগঠন কোনদিন কোন রকম প্রশ্নের সম্মুখীন হয়নি, এবার হয়েছে। আগামী ৩০শে জানুয়ারী ২০২২ সালের নির্বাচনে যারাই নির্বাচিত হোন না কেন, তাদেরকে এ ব্যাপারটি নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার দরকার আছে বলে আমি মনে করি, প্রেস ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে একতা বজায় রাখার স্বার্থে।  এই ঘটনা শান্ত হওয়ার পর এখন নির্বাচনে যারা অংশ গ্রহণ করছেন তারা সবাই প্রাণ চাঞ্চল্যে মেতে ওঠেছেন। প্রতিদিনই উভয় পক্ষের প্রার্থীদের কাছ থেকে প্রচুর ফোন রিসিভ করছি। কাজের সময় ফোন ধরতে না পারলেও পরে আবার ফোন করছি, তাদের সাথে কথাবার্তার মাধ্যমে কুশল বিনিময় করছি। তাদের সাথে কথা বলে আমি খুবই আনন্দ উপভোগ করছি।  এই আনন্দ উপভোগ করার আরও একটা কারণ আছে, তা হচ্ছে নির্বাচন শেষ হয়ে গেলে আগামী দু’বছর পর আবার নির্বাচনের আগে মনে হবে আমাদের কথা অর্থাৎ এমন ভাব ভালোবাসা পেতে আমাদেরকে  আবারও দুই বা তারচেয়ে বেশি বছর অপেক্ষা করতে হবে!

২০২২ সালের এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন দু’টো দল। একটি হচ্ছে, সাত্তার – মোসলেহ – সালেহ এ্যালায়েন্স এবং অন্যটি হচ্ছে এমাদ – তাইছির – মুরাদ এ্যালায়েন্স। এ দু’টো গ্রুপেই রয়েছেন কর্মঠ এবং ঝানু ঝানু সাংবাদিক। অনেকেরই রয়েছে অতীত এবং বর্তমানে ক্লাব পরিচালনায় দক্ষতা।

এই দুই পরিষদে যারা প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট পদে মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার বনাম মোহাম্মদ এমদাদুল হক চৌধুরী, জেনারেল সেক্রেটারী পদে মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বনাব তাইছির মাহমুদ, ট্রেজারার পদে সালেহ আহমেদ বনাম আব্দুল কাদির চৌধুরী মুরাদ, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে শেখ মোজাম্মেল হোসেন (কামাল) বনাম ব্যারিষ্টার তারেক চৌধুরী, ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে আনিসুর রহমান আনিস বনাম রহমত আলী, এসিস্ট্যান্ট জেনারেল সেক্রেটারী পদে সায়েম চৌধুরী বনাম ইব্রাহিম খলিল, এসিস্ট্যান্ট ট্রেজারার পদে মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম বনাম পলি রহমান, অর্গেনাইজিং এন্ড ট্রেনিং সেক্রেটারী পদে মোহাম্মদ আমরান আহমেদ বনাম রোপী আমিন, মিডিয়া এন্ড আইটি সেক্রেটারী আব্দুল হান্নান বনাম আব্দুল কাইয়ুম, ইভেন্টস এন্ড ফ্যাসিলিটিজ সেক্রেটারী জুয়েল দাশ, মোহাম্মদ রেজাউল করিম মৃধা, এক্সিকিউটিভ মেম্বার – আহাদ চৌধুরী বাবু নাজমুল হোসেইন, সারওয়ার হোসনে শাহনাজ সুলতানা, শেবুল চৌধুরী আনোয়ার শাহজাহান, এম খন্দকার তালুকদার শাহদিুর রহমান সুহেল, এম হারুন – উর- রশিদ, মোহাম্মদ আজিজুল হক কয়েস।  এছাড়া এবারের নির্বাচনে তিন জন প্রার্র্থী হয়েছে স্বতন্ত্রভাবে। এরা হচ্ছেন এসিট্যান্ট ট্রেজারার পদে আমিনুল এহসান তানিম, এবং নির্বাহী সদস্য পদে জি আর সুহেল এবং রুমান বক্ত চৌধুরী।

এই নির্বাচনে বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট এবং সেক্রেটারী পদ ছাড়াও বেশ কয়েকটি পদে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে তা নিশ্চিত। আমার মনে একক ভাবে কেউ বিজয়ের মালা পরতে পারবেন না। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সদস্য পদের ঝামেলার কারণে এমাদ – তাইসির- মুরাদ পরিষদ কিছুটা নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারেন।

আমার মতে যা হবার হয়ে গেছে, এ ঘটনাকে আর না টেনে অন্তত: নির্বাচনটা সুন্দর ভাবে অনুষ্ঠিত হোক এবং যার যে পদের অভিজ্ঞতা আছে তাদেরকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা হোক, প্রেস ক্লাবের একজন সাধারণ সদস্য হিসেবে সবার কাছে আমার এই প্রত্যাশা। আমাদের অনেক প্রেস ক্লাব সদস্য করোনা সহ বিভিন্ন ধরণের রোগে আক্রান্ত আছেন, তাদের জন্য দোয়া করি মহান আল্লাহ পাক যেন তাদের দ্রুত সুস্থতা দান করেন। আমীন।

কার্ডিফ (ওয়েলস্), ২১ জানুয়ারী ২০২২

Leave A Reply