ট্রান্সশিপমেন্টে আরও বন্দর রুট যুক্তের প্রস্তাব ভারতের

তৃতীয় দেশে রপ্তানির সুযোগ রেখে উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তি

পণ্য ট্রান্সশিপমেন্টের সুবিধায় আরও নতুন বন্দর ও রুট যুক্ত করতে ঢাকাকে অনুরোধ জানিয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তির (সিএসএ) আওতায় কক্সবাজার ও নারায়ণগঞ্জের বেসরকারি কনটেইনার টার্মিনাল সামিট অ্যালায়েন্স বন্দরকে (এসআইপিএল) ‘পোর্ট অব কল’ভুক্ত করার প্রস্তাব করেছে দেশটি। এ চুক্তির আওতায় ছয় হাজার গ্রস টনের চেয়ে বড় জাহাজ যাতে চলাচল করতে পারে, সেই পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধও করেছে। এছাড়া তৃতীয় দেশে পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে দুটি চুক্তি সংশোধনে আবারও প্রস্তাব দিয়েছে দিল্লি। ট্রান্সশিপমেন্ট পণ্যের ওপর আরোপিত ফি ও চার্জ পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছে। দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে এসব বিষয়গুলো এজেন্ডা হিসেবে রেখেছে দেশটি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এসব তথ্য জানিয়েছে।

কক্সবাজারকে পোর্ট অব কলভুক্ত করার প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহণ সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, সচিব পর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশের এজেন্ডায় এ বিষয়টি রয়েছে। ওই বৈঠকে আমরা কক্সবাজারের অবকাঠামোগত বিষয় তুলে ধরা হবে। এটি কতটুকু কাজে লাগবে, কী ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে সেটা বিবেচনায় রেখে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসতে হবে। তৃতীয় দেশে পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরিতে চুক্তি সংশোধনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা ভারতের প্রস্তাব। বৈঠকে কীভাবে উপস্থাপন করে এবং কী সুবিধা পাওয়া যাবে তা বিবেচনায় রেখে আলোচনা করা হবে।

সূত্র জানায়, দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় সচিব পর্যায়ের ওই বৈঠকে বাংলাদেশ পক্ষ থেকে নৌপথের যাত্রী, পর্যটক ও নাবিকদের ভারতের প্রবেশে অন অ্যারাইভাল ভিসা দেওয়ার প্রস্তাব করা হচ্ছে। দুই দেশের নাবিকদের পারস্পরিক প্রশিক্ষণ, বাংলাদেশি জাহাজ ভারতের অভ্যন্তরে চলাচল প্রক্রিয়া সহজ করাসহ ১১টি বিষয় এজেন্ডায় রেখেছে। আগামী ২০, ২১ ও ২২ অক্টোবর ভারতের রাজধানী দিল্লিতে মোট তিনটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেগুলো হচ্ছে-দুই দেশের নৌসচিব পর্যায়ের বৈঠক, ২১তম স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠক এবং দ্বিতীয় আন্তঃসরকার বৈঠক (আইজিসি)। সচিব পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন নৌপরিবহণ সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী। এর আগে ২০১৯ সালের ৪ ও ৫ ডিসেম্বর ঢাকায় এসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সূত্র আরও জানায়, ভারতীয় বন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশের পণ্য ইউরোপ, আমেরিকাসহ তৃতীয় কোনো দেশে আমদানি-রপ্তানির পথ খুলতে দীর্ঘদিনের প্রস্তাব ভারতের। ২০১৮ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সচিব পর্যায়ের বৈঠকেও এ বিষয়টি আলোচনা হয়েছিল। আবারও নতুন করে এ প্রস্তাব করেছে ভারত। বর্তমানে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর থেকে ফিডার জাহাজে সিঙ্গাপুর, শ্রীলংকার কলম্বো, মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং ও চীনের সাংহাই বন্দরে পণ্য যায়। সেখান থেকে মাদার ভেসেলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আমেরিকায় রপ্তানি হয়। ভারতের এজেন্ডায় তৃতীয় দেশে রপ্তানির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এতে উপকূলীয় জাহাজ চুক্তি এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথে-বাণিজ্য চুক্তি-‘প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড (পিআইডব্লিউটিটি)’ সংশোধন করার প্রয়োজন হবে। এটি হলে দুই দেশেই তাদের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে পণ্য রপ্তানি করার সুযোগ পাবে। বর্তমানে এ দুটি চুক্তির আওতায় শুধু বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার পণ্য পরিবহণ করা হয়।

সচিব পর্যায়ের বৈঠকে উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তির আওতায় কক্সবাজার ও নারায়ণগঞ্জের সামিট বন্দরকে পোর্ট অব কলভুক্ত করার প্রস্তাব এজেন্ডায় রেখেছে ভারত। এটি বাংলাদেশের এজেন্ডায়ও রয়েছে। ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত সচিব পর্যায়ের বৈঠকেও এ বিষয়টি আলোচনা হয়। তখন বিষয়টি সুরাহা হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য যুগান্তরকে জানান, কক্সবাজারের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে পোর্ট অব কল ঘোষণার বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ আলোচনা হয়েছে। এটি গভীর সমুদ্রবন্দর হওয়ায় চুক্তির আওতাধীন আরএসভি (রিভার-সি ভ্যাসেল) জাহাজ এ বন্দরে ব্যবহার করার বিষয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। এ বন্দরে শুধু সমুদ্রগামী জাহাজ চলাচল করার পক্ষে বাংলাদেশ। এছাড়া চুক্তির আওতায় সামিট বন্দরকে পোর্ট অব কল চেয়েছে দিল্লি। বর্তমানে আশুগঞ্জ বন্দর দিয়েই ট্রান্সশিপমেন্ট করে থাকে ভারত। সেখানে অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণকাজ চলছে। নিয়মিত ট্রান্সশিপমেন্ট শুরু না হওয়া পর্যন্ত ওই বন্দর ব্যবহার করতে দিতে চায় ঢাকা।

আরও জানা গেছে, বর্তমানে উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ১৬টি প্রতিষ্ঠানের জাহাজ চলাচল করে। ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি)’-এ উল্লেখিত নিয়ম মেনে এসব জাহাজের ধারণ ক্ষমতা ছয় হাজার গ্রসটন। বাংলাদেশ চায় বিদ্যমান এসওপি অনুযায়ী, এ আকারের জাহাজ উপকূলীয় ও অভ্যন্তরীণ নৌপথে চলাচল করুক।

২১তম স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠক : প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড (পিআইডব্লিউটিটি) আওতাধীন ২১তম স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠকে বাংলাদেশের ১০টি ও ভারতের ১২টি এজেন্ডা রয়েছে। এতে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব একেএম শামিমুল হক ছিদ্দিকী।

এ বৈঠকে পিআইডব্লিউটিটি চুক্তির আওতায় পানগাঁও কনটেইনার টার্মিনাল ও নারায়ণগঞ্জ বন্দরকে ট্রান্সশিপমেন্ট পয়েন্ট হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব করেছে ভারত। এজন্য চুক্তির ২৩.১ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রয়োজন হবে। এটি হলে ভারতের বিভিন্ন বন্দর থেকে নৌপথে পণ্য এসে এসব বন্দর থেকে সড়ক পথে দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে যেতে পারবে। এছাড়া চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত এবং ফেনী নদীতে দেশটির পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের সুযোগ চায় দেশটি। অপরদিকে বাংলাদেশি জাহাজের নাবিকদের ভারতের নৌপথে যেসব সমস্যায় পড়তে হয় সেগুলোর সমাধান এবং ঝড়ের সময়ে বাংলাদেশি জাহাজ নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা তুলবে ঢাকার প্রতিনিধি দল।

আন্তঃসরকার বৈঠক : দ্বিতীয় আন্তঃসরকার বৈঠকে বাংলাদেশ দুটি এবং ভারত চারটি এজেন্ডা রেখেছে। এ বৈঠকে নেতৃত্ব দেবেন নৌপরিবহণ সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী। এ বৈঠকে পণ্য পরিবহণে ট্রানজিট ফি, বন্দর চার্জ ও রোড চার্জ পুনর্বিবেচনার জন্য এজেন্ডায় রেখেছে ভারত। এ সংক্রান্ত একটি স্থায়ী রেট কার্যকর করতে অনুরোধ জানাবে দেশটি। অপরদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নির্ধারিত সময়ে বড় আকারের জাহাজে পণ্য পরিবহণ করতে ভারতকে অনুরোধ জানানো হবে।