উৎপাদন বন্ধের ২৮৬ দিনেও গোলাপগঞ্জের আরপিজিসিএল প্ল্যান্ট চালুর উদ্যোগ নেই

সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় জ¦ালানি তেল পেট্রোল ও ডিজেল এবং এলপি গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কৈলাশটিলা এলপিজি প্ল্যান্ট (আরপিজিসিএল প্ল্যান্ট)-এর উৎপাদন বন্ধের ২৮৬ দিন অতিবাহিত হতে চলেছে। ফলে রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকারের একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন থেকে উৎপাদন বন্ধ থাকায় উদ্বিগ্ন স্থানীয় সচেতন মহল। ‘গোলাপগঞ্জ প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা কমিটি’ এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেছে। তারা অবিলম্বে প্রতিষ্ঠানটি চালু করার দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এদিকে, প্ল্যান্ট চালু করার একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে আরপিজিসিএল ও পেট্রোবাংলা সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র।

জানা যায়, ১৯৯৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সময় গোলাপগঞ্জ উপজেলা সদরের টিকবাড়ি এলাকায় জ¦ালানি তেল পেট্রোল, ডিজেল এবং এলপি গ্যাস উৎপাদনকারী ‘কৈলাশটিলা এলপিজি প্ল্যান্ট’ স্থাপন করা হয়। গোলাপঞ্জের দাড়িপাতনস্থ ‘কৈলাশটিলা এমএসটিই গ্যাস ফিল্ড’র খনি থেকে উত্তোলিত মূল্যবান এনজিএল (ন্যাচারাল গ্যাস লিকুইড) কাজে লাগাতে পেট্রোবাংলার অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আরপিজিসিএল (রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিঃ) প্ল্যান্টটি স্থাপন করে। গোলাপগঞ্জ কৈলাশটিলা এমএসটিই গ্যাসফিল্ডের খনি থেকে উত্তোলিত এনজিএল (ন্যাচারাল গ্যাস লিকুইড) থেকে পেট্রোল ও এলপি গ্যাস এবং খনিজ গ্যাসের উপজাত কনডেনসেট থেকে পেট্রোল ও ডিজেল উৎপাদন করে কৈলাশটিলা এলপিজি প্ল্যান্ট (আরপিজিসিএল প্ল্যান্ট)। প্রতিষ্ঠানটি পেট্রোল ও ডিজেল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন-বিপিসি কে এবং এলপি গ্যাস পাশেই স্থাপিত ‘এলপি গ্যাস বটলিং কারখানা’য় সরবরাহ করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আরপিজিসিএল প্ল্যান্ট দৈনিক ১ লক্ষ লিটার পেট্রোল উৎপাদন করে থাকে। এছাড়া, দৈনিক ২০/২৫ হাজার লিটার ডিজেল এবং ১৫/১৭ মেট্রিক টন এলপি গ্যাস উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানটি। পেট্রোল, ডিজেল ও এলপি গ্যাস উৎপাদন থেকে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আয় ৪০ থেকে ৪৫ কোটি টাকা। কিন্তু, গত ৯ মাসের অধিক সময় থেকে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। তারা জানায়, বিপিসি একটি নির্দিষ্ট মানের নিচে পেট্রোল ক্রয় করবে না-মর্মে জানিয়ে দিলে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে, আরপিজিসিএল প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আরপিজিসিএল এর উৎপাদিত এলপি গ্যাসের উপর নির্ভর করে স্থাপিত ‘এলপি গ্যাস বটলিং কারখানা’র উৎপাদনও বন্ধ রয়েছে। একই কারণে গোলাপগঞ্জের দাড়িপাতনস্থ কৈলাশটিলা এমএসটিই গ্যাসফিল্ড প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ এনজিএল পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এনজিএল সংরক্ষণের কোন ব্যবস্থা না থাকায় একে সরাসরি প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্টে পাঠাতে হয়, অন্যথায় পুড়িয়ে ফেলতে হয়। গোলাপগঞ্জের দাড়িপাতনস্থ কৈলাশটিলা এমএসটিই গ্যাসফিল্ড প্রতিদিন ৫৭ হাজার লিটার এনজিএল সরাসরি আরপিজিসিএল প্ল্যান্টকে দিয়েছে। আরপিজিসিএল প্ল্যান্ট ‘এনজিএল’ থেকে উৎপাদন করে পেট্রোল ও এলপি গ্যাস। এখন আরপিজিসিএল প্ল্যান্ট বন্ধ থাকায় গ্যাসফিল্ড ‘এনজিএল’ পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিচ্ছে। প্রতিদিন বাজার মূল্যে প্রায় ২০ লক্ষ টাকার এনজিএল পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।

এদিকে, গোলাপগঞ্জে এক সাথে তিনটি প্রতিষ্ঠান আরপিজিসিএল প্ল্যান্ট, এলপি গ্যাস বটলিং কারখানাসহ ও কৈলাশটিলা এমএসটিই গ্যাস ফিল্ডের এনজিএল পুড়ানোর বিষয়ে উদ্বেগ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয় জনসাধারণ। সরকারের দুটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং অন্য প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন মূল্যবান খনিজ সম্পদ ধ্বংস করে দিচ্ছে, এটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না উল্লেখ করে গোলাপগঞ্জ পৌর যুবলীগের আহবায়ক ও ‘গোলাপগঞ্জ প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা কমিটি’র অন্যতম সদস্য আলতাফ হোসেন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। অথচ রাষ্ট্রের এতো বড় ক্ষতির ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ কী করছেন; সেটা বোধগম্য নয়। উৎপাদন বন্ধের পর ৯ মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, কিন্তু বন্ধ হওয়ার ৯ মাস পূর্বে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন ছিল। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলের জবাবদিহি করা উচিত। তিনি প্রধানমন্ত্রীর নিকট তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত বিষয় খুঁজে বের করার এবং দ্রুত প্রতিষ্ঠান চালুর ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান।

‘গোলাপগঞ্জে শিল্পকারখানা বলতে গ্যাসফিল্ড এবং আরপিজিসিএল প্ল্যান্ট ও এলপি গ্যাস বটলিং কারখানা’- এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে গোলাপগঞ্জে শিল্পকারখানা বলতে আর কিছুই থাকবে না। নব্বইয়ের সাইপাম সিমিটার গণআন্দোলনের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানগুলো গোলাপগঞ্জে স্থাপিত হয়েছে। এখন এগুলো সরিয়ে নেয়া বা বন্ধ করে দেয়া, কোনটিই যুক্তিযুক্ত নয়। প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত চালু করা এবং গোলাপগঞ্জে তেল ও গ্যাস ভিত্তিক নতুন নতুন শিল্প স্থাপনের দাবি জানান নব্বই দশকের সাইপাম সিমিটার আন্দোলনের অন্যতম নেতা তৎকালীন ঢাকাদক্ষিণ ডিগ্রি কলেজ জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি ও বর্তমানে বাংলাদেশ জাসদ এর গোলাপগঞ্জ উপজেলা সাধারণ সম্পাদক তাজ উদ্দিন।

গোলাপগঞ্জের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক সয়েফ আহমদ চৌধুরী বলেন, লাভজনক সম্পূর্ণ সচল প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ হয়ে আছে। অথচ কারো কোন ভ্রক্ষেপ আছে বলে মনে হয় না। ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান হলে আবেদন-নিবেদন বা উচ্চ আদালতে প্রার্থনাসহ কত কিছুই-না করা হতো। ‘গোলাপগঞ্জ প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা কমিটি’র স্মারকলিপি প্রদানের পর প্রতিষ্ঠান চালুর একটি প্রস্তাব আরপিজিসিএল মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে শুনেছি। এখন দ্রুত প্রতিষ্ঠান দুটি চালু হলে দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গল। কৈলাশটিলা এমএসটিই গ্যাসফিল্ডে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ এনজিএল পুড়ানোয় বায়ু দূষণসহ পরিবেশের ক্ষতির ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

এ ব্যাপারে আরপিজিসিএল (রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অফিসে ফোন করা হলে তিনি মিটিং-এ আছেন জানিয়ে মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) এর সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরে মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী খালেদা বেগমের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, নানা বাধ্যবাধকতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি চালু করার জন্য ইতোমধ্যে একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। উৎপাদিত পেট্রোল ‘লাইট কনডেনসেট’ হিসেবে যদি কোন প্রতিষ্ঠানকে দেয়া যায়-তবে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

৯ মাসের অধিক সময় থেকে পেট্রোবাংলার অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আরপিজিসিএল এর প্ল্যান্ট বন্ধ হওয়ায় এমএসটিই গ্যাসফিল্ডে প্রতিদিন এনজিএল পুড়িয়ে ধ্বংস এবং এই কারণে আরো একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ, এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন এন্ড মাইনস) প্রকৌশলী আলী মো. আল মামুন বলেন, এ ব্যাপারে আলোচনা চলছে। প্রতিষ্ঠান চালু করার জন্য আরপিজিসিএল এর প্রস্তাব নিয়ে মন্ত্রণালয় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে।