বঙ্গবন্ধু ও বাঙালী জনগণের স্বাধীনতার সংগ্রাম: সা কা ম আনিছুর রহমান খান কামাল

দীর্ঘ একশত নব্বই বৎসর পর এই অখন্ড বাংলাসহ এই উপমহাদেশ থেকে ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটে৤ আত্মপ্রকাশ করে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান৤ ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তান শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও গ্রহণের মাধ্যমে নিজেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র বলে ঘোষণা করে ৤ ১৯৫৮ খিষ্টাব্দের ৭ই অক্টোবর তারিখে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সামরিক শাসন জারি করেন ৤ তাকে বিদায় করে দিয়ে প্রধান সেনাপতি জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তানের শাসন ভার গ্রহণ করেন ৤ বাতিল করা হয় শাসনতন্ত্র ৤ ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে শাসনতন্ত্র নতুনভাবে প্রণয়ন ও গ্রহণ করা হয় ৤ চালু করা হয় ‘বুনিয়াদী গণতন্ত্র’ ৤ গোটা পাকিস্তানে গণতন্ত্র বিপন্ন হয় ৤ বাংলার মানুষ হয় অধিকারহারা ৤ আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এই শাসনতান্ত্রিক সংকট থেকে উত্তরণ এবং বাংলার মানুষের ন্যায়সংগত অধিকার আদায়ের জন্য ৬-দফা দাবীনামা উত্থাপন করেন।

এই দাবীনামা ছিল নিম্নরূপ ; (১) দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো হইবে ফেডারেল শাসন ভিত্তিক রাষ্ট্রসংঘ এবং আইন পরিষদের ক্ষমতা হইবে সার্বভৌম ৤ (২) ফেডারেল সরকারের ক্ষমতা দেশরক্ষা , বৈদেশিক নীতি ও মুদ্রা , এই কয়টি বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকিবে ৤ অপরাপর সকল বিষয়ে অঙ্গরাষ্ট্রগুলির ক্ষমতা হইবে নিরঙ্কুশ ৤ (৩) দুই অঞ্চলের একই মুদ্রা থাকিবে ৤ এই ব্যবস্থায় মুদ্রা কেন্দ্রের হাতে থাকিবে৤ কিন্তু এই অবস্থায় শাসনতন্ত্রে এমন সুনির্দিষ্ট বিধান থাকিতে হইবে যাহাতে পূর্ব পাকিস্তানের মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হইতে না পারে ৤ এই বিধানে পাকিস্তানে একটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থাকিবে, দুই অঞ্চলে দুইটি পৃথক রিজার্ভ ব্যাংক থাকিবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক অর্থনীতি প্রবর্তন করিতে হইবে ৤ (৪) সকল প্রকার ট্যাক্স খাজনা কর ধার্য ও আদায়ের সকল ক্ষমতা থাকিবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে ৤ ফেডারেল সরকারের কোন কর ধার্য করিবার ক্ষমতা থাকিবেনা ৤ আঞ্চলিক সরকারের আদায়ী রেভিনিউর নির্ধারিত অংশ আদায়ের সাথে সাথে ফেডারেল তহবিলে জমা হইবে ৤ এই মর্মে রিজার্ভ ব্যাংক সমূহের উপর পরীক্ষামূলক বিধান শাসনতন্ত্রে থাকিবে ৤ (৪) ফেডারেশনের প্রতিটি রাষ্ট্রের বর্হিবাণিজ্যের পৃথক হিসাব রক্ষা করিতে হইবে এবং বর্হিবাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত মুদ্রা অঙ্গরাজ্যগুলির এখতিয়ারাধীন থাকিবে ৤ ফেডারেল সরকারের প্রয়োজনীয় বিদেশী মুদ্রা অঙ্গরাষ্ট্রগুলি সমানভাবে অথবা শাসনতন্ত্রের নির্ধারিত হার অনুযায়ী প্রদান করিবে ৤ দেশজাত দ্রব্যাদি বিনা শুল্কে অঙ্গ রাষ্ট্রগুলির মধ্যে আমদানী রফতানী করিবার অধিকার অঙ্গরাষ্ট্রগুলির হাতে ন্যস্ত করিয়া শাসনতন্ত্রে বিধান করিতে হইবে ৤ (৫) পূর্ব পাকিস্তানকে মিলিশিয়া বা প্যারা-মিলিটারী রক্ষী বাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হইবে ৤ পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্র কারখানা নির্মাণ , নৌ বাহিনীর সদর দফতর স্থাপন করিতে হইবে৤

এই দাবীনামা উত্থাপিত হবার সাথে সাথে সারা পাকিস্তানে শোরগোল পড়ে যায় ৤ পক্ষে বিপক্ষে মতামত প্রকাশিত প্রচারিত হতে থাকে৤ সূচিত হয় পাকিস্তানের রাজনৈতিক ধারা পরিবর্তনের কার্যক্রম৤ পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায্য অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিতকারী পশ্চিমা শোষক গোষ্ঠিার কাছ থেকে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলকারী কায়েমী স্বার্থবাদীগণ এই ৬ দফা দাবীর বিরোধীতা করতে শুরু করে৤ খোদ নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অধিকাংশ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এই দাবীর বিরোধীতা করে৤ মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ , আবদুস সালাম খান , আতাউর রহমান খান , শাহ আজিজুর রহমান দৃঢ়তার সাথে এই দাবীর বিরোধীতা করেন৤ এম এ আজিজ এই দাবীর প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন জ্ঞাপন করেন৤ বাংলার স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে আন্দোলনরত গোপন সংগঠন ‘নিউ ক্লিয়াস‘ এই দাবীর প্রতি শর্তহীন সমর্থন জানায় ৤ এই ‘নিউক্লিয়াস‘ এর নেতা সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক , কাজী আরেফ আহমেদ এবং তাদের নেতৃত্বের প্রতি আস্থাবান পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগ ৬-দফা দাবী আদায়ের আন্দোলনে শেখ মুজিবের প্রতি সক্রিয় সমর্থন জ্ঞাপন করেন৤ ইনাদের সাথে বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রশ্নে বেগম মুজিবেরও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল ৤

তারপরও আওয়ামী লীগ সাংগাঠনিকভাবে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে যায় ৤ এক অংশ ৬-দফা পন্থি আওয়ামী লীগ এবং অপর অংশ পি ডি এম ( পাকিস্তান ডেমোক্রাটিক মুভমেন্ট ) পন্থী আওয়ামী লীগ নামে সাংগাঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে৤ ৬ দফা পন্থি নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে শেখ মুজিবুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক পদে এ এইচ এম কামরুজ্জামান দায়িত্ব প্রাপ্ত হন এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে শেখ মুজিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক পদে তাজ উদ্দিন আহমেদ দায়িত্ব প্রাপ্ত হন৤ এম এ আজিজ সাহেবের পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতায় চট্টগ্রামের লালদীঘী ময়দানের আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় শেখ মুজিব বাঁচার দাবী ৬ দফার উপর বক্তৃতা করেন৤ এই দাবী আদায়ে জনগণের সমর্থন চান৤ এর পর পাবনা যশোর ফরিদপুর এবং বিভিন্ন জেলায় একই রূপ জনসভা করেন৤ শাসক মহল ও কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠির অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে৤ বিভিন্ন স্থানে জনসভার পর এই মহান নেতাকে গ্রেফতার করা হয় ৤ দায়রা জজ জামিন দিলে মুক্তিলাভ করেন , আবার গ্রেফতার হন৤ এই ভাবে চলতে থাকে ৬-দফা দাবী আদায়ের আন্দোলন ৤

সবশেষে তাঁকে সদলে কারাবরণ করতে হয় ৤ সেই সাথে তাকে প্রধান আসামী করা হয় তথাকথিত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র‘ মামলার ৤ এই মামলাটি তখন মিথ্যা বানোয়াট বলে প্রচার করে জনমত তৈরী করা হয়েছিল ৤ তবে বর্তমানে বলা হচ্ছে এটা ছিল একটি সত্য মামলা ৤ ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে বঙ্গবন্ধু পাবনা শহরে সফরে যান ৤ ‘রিজার্ভ ক্যাম্প‘ (বর্তমানে আবদুর রাজ্জাক উকিল সাহেবের বাস ভবন) এ সন্ধ্যায় ছাত্র যুব নেতাদের সাথে মিলিত হন ৤ সেখানে তাঁকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ‘এ বিষয়ে তোমরা পরে জানতে পারবে‘ বলে তোফায়েল আহমেদের দিকে অঙ্গুলি হেলন করেছিলেন ৤ তোফায়েল আহমেদ এই সময় বলেছিলেন; ‘স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা যেতে হয়েছিল‘৤ উক্ত মামলার অন্যতম আসামী কর্নেল শওকত ( সাবেক ডেপুটি স্পীকার) ‘আগরতলা মামলা সত্য মামলা‘ নামে একটি বই লিখেছেন ৤ আ স ম আবদুর রবও ইদানিং এক সভায় বলেছেন; ‘আগরতলা মামলা আসলে সত্য মামলা‘ সময়ের প্রয়োজনে তখন আমরা একে মিথ্যা মামলা বলে প্রচার করেছিলাম’৤

এই মামলায় আর যাঁরা আসামী ছিলেন তাঁরা হচ্ছেনঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান, সাবেক এল এস সুলতান উদ্দিন আহমেদ, এল এস সি ডি আই নূর মোহাম্মদ, আহমেদ ফজলুর রহমান (সি এস পি), ফ্লাইট সার্জেন্ট মাহফুজ উল্লাহ, কর্পোরাল আবদুস সামাদ, সাবেক হাবিলদার দলিল উদ্দিন, রুহুল কুদ্দুস (সি এস পি), ফ্লাইট সার্জেন্ট মোঃ ফজলুল হক, ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী, বিধান কৃষ্ণ সেন, সুবেদার আবদুর রাজ্জাক , সাবেক ক্লার্ক মুজিবুর রহমান, সাবেক ফ্লাইট সার্জেন্ট মোঃ আবদুর রাজ্জাক, সার্জেন্ট জহুরুল হক, এ বি খুরশিদ, খান মোহাম্মদ সামছুর রহমান (সি এস পি), এ কে এম সামছুল হক, হাবিলদার আজিজুল হক, মাহফুজুল বারি, সার্জেন্ট সামছুল হক, সামছুল আলম, ক্যাপ্টেন মোঃ আবদুল মোতালেব, ক্যাপ্টেন এ শওকত আলী মিয়া, ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদা, ক্যাপ্টেন এম নুরুজ্জামান, সার্জেন্ট আবদুল জলিল, মাহবুব উদ্দিন চৌধুরী, লে. এম রহমান, সাবেক সুবেদার তাজুল ইসলাম, আলী রেজা, ক্যাপ্টেন খুরশিদ উদ্দিন আহমেদ এবং লে. আবদুর রউফ ৤ এই আসামীদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন ইংল্যান্ডের রানীর আইন উপদেষ্টা টমাস ইউলিয়াম, ড.আলীম আল রাজী, আবদুস সালাম খান, আতাউর রহমান খান, জহিরউদ্দিন, আমিনুল হক, জুলমত আলী খান,আমীরুল ইসলাম, জুলফিকার আলী ভূট্টো, শাহেদ সোহরাওয়ার্দী, বদরুল হায়দার চৌধুরী প্রমুখ আইনজীবীগণ ৤

‘পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও’ শিরোনামে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা সংবাদ-নিবন্ধ ছাপে ৤ পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হয় , হরণ করা হয় জনগণের বাক-ব্যক্তি-খবরের কাগজের স্বাধীনতা ৤ বাংলার মানুষ প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠে৤ এই প্রতিবাদের ভাষা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে৤ গণঅভ্যূত্থানের মাধ্যমে পতন হয় আইয়ুর খানের দশকব্যাপী শাসনের৤ গণ দাবীর প্রতি নতি স্বীকার করে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ‘ প্রত্যাহার করে শেখ মুজিব সহ উক্ত সকল আসামীকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় আইইযুব খানের সরকার৤ বীরের বেশে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি৤ ছাত্র জনতা তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু‘ খেতাবে ভূষিত করে বরণ করে নেয় ৤

লেখকঃ সাবেক জেলা ও দায়রা জজ ৤ বর্তমানে অ্যাডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট হাইকোর্ট বিভাগ , ঢাকা ৤ কার্যকরী সভাপতি এবং সদস্য স্থায়ী কমিটি , জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল , জে এস ডি ৤