‘নাবালক ও তাদের সম্পত্তি’: সা কা ম আনিছুর রহমান খান

বলা হয়ে থাকে পৃথিবীতে দ্বন্ধ সংঘাত সমূহের উৎপত্তি হয়েছে জমি ও জরু সংক্রান্ত বিরোধ থেকে। আদি কালের প্রথম বিরোধ হয় হযরত আদম (আঃ) এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের মধ্যে তাদেরই বোন পরমা সুন্দরী আকলিমাকে বিবাহ করা নিয়ে। এর পরিসমাপ্তি হয় ভ্রাতৃ হত্যার মাধ্যমে। এর পরই আসে সম্পদের মালিকানা নিয়ে বিরোধ। সম্পদ সংরক্ষণে মানুষ সচেষ্ট ও সচেতন থাকে। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা বিধানে গ্রহণ করা হয় বিশেষ ব্যবস্থা। মানুষ বুদ্ধিমত্তা, কৌশল ও শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে তার প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ ও উৎপন্ন করে। এ জন্য সমাজ প্রগতির এক পর্যায়ে তার হাতিয়ারের প্রয়োজন হয়। এই প্রয়োনীয়তা থেকেই সে তৈরী করে নেয় হাতিয়ার । জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান করার জন্যও হাতিয়ার প্রয়োগ করতে হয়। হাতিয়ারের দ্বারা প্রতিরক্ষা ব্যূহ রচনা করে মানুষ তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তা ব্যবহার করতে হয় স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করে। এর জন্য প্রয়োজন বুদ্ধিমত্তার। মানুষ জন্ম থেকেই বুদ্ধিমত্তা অর্জন করে না। বয়ঃবৃদ্ধির সাথে সাথে তার বুদ্ধির বিকাশ ঘটতে থাকে। একটি পর্যায়ে এসে সে নিজের ভাল মন্দ যথার্থভাবে বুঝতে সক্ষম হয়। এই সক্ষমতা অর্জনের পর্যায়ে এসে সে হয় সাবালক। সাবালকত্ব অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত সে থাকে নাবালক।

সাবালকত্ব ও নাবালকত্ব অর্জনের সীমারেখা মানুষের দৈহিক গঠনের বিবর্তনের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠে। এক্ষেত্রে জলবায়ু , খাদ্য , বংশধারা , অঞ্চল ভেদে ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। এই ভিন্নতার সমন্বয় করার জন্যই নাবালকত্ব ও সাবালকত্বের সীমারেখা আইনের মাধ্যমে বয়স নির্ধারণপূর্বক নির্দিষ্ট করা হয়েছে। উপমহাদেশে বিষয় সম্পত্তির ক্ষেত্রে এটা ১৮(আঠার) বৎসর। পুরুষের বিবাহের ক্ষেত্রে ২১ (একুশ) বৎসর। নাবালক সন্তানের শরীর ও সম্পদের হেফাজত করবেন তার অভিভাবক । পিতা ও পিতার অবর্তমানে দাদা নাবালকের ‘আইন সংগত’ অভিভাবক । পিতা ও দাদার অবর্তমানে যিনি নাবালকের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব পালন করেন তিনি ‘কার্যত’ (ফব ভধপঃড়) অভিভাবক। পিতা বা দাদা মৃত্যুবরণ করলে অথবা যুক্তিসংগত কারণে অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতে অক্ষম বা অপারগ হলে মা, চাচা , সৎ পিতা (মা পুনরায় বিবাহ করলে ) বা অন্য কেউ অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন। এসব ক্ষেত্রে আদালত অভিভাবক নির্ধারণপূর্বক নিয়োগ দেন। ‘কার্যত অভিভাবক’ তার পোষ্যদের শরীর ও সম্পদের দেখভাল ও হেফাজত করবেন এবং তাদের লালন-পালন করবেন, কিন্তু সম্পদ বিক্রয়, হস্তান্তর বা বন্ধকে আবদ্ধ করতে পারবেন না। যদি তা করেন তাহলে এতদসংক্রান্ত দলিল ‘সৃষ্টিলগ্ন থেকেই বাতিল’বলে গণ্য হবে। সাবালকত্ব অর্জন করে নাবালক এইরূপ হস্তান্তরকে অনুমোদন দিতে পারবে না ।

লালপুরের ইব্রাহীম মেম্বার আততায়ীর দ্বারা নিহত হন। বৃদ্ধা মা , যুবতী স্ত্রী এবং চারটি নাবালক ছেলে মেয়ে এই অবস্থায় অসহায় হয়ে যায়। ইব্রাহীম মেম্বারের স্ত্রী রুকসানা খাতুনের কাছে অবস্থাপন্ন বিভিন্ন সম্পন্ন ঘরের ছেলেদের কাছ থেকে বিবাহের প্রস্তাব আসতে থাকে। শাশুড়ী ও শিশু সন্তানদের কল্যাণ বিবেচনা করে রুকসানা এসব প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। বৃদ্ধা শাশুড়ীর সাথে পূর্ববৎ একান্নে বসবাস করে রুকসানা তার সন্তানদের লালন-পালন করতে থাকে। অভাব অনটন এবং বিভিন্ন সমস্যায় এই পরিবারটি প্রতিনিয়ত জর্জরিত হতে থাকে। গ্রামবাসীর কাছ থেকে সহযোগিতার চেয়ে অসহযোগিতাই তারা পেতে থাকে। ইব্রাহীমের জীবদ্দশায় তার বাড়িতে এসে গ্রামের অসহায় মানুষেরা সহায়তা পেয়েছে। আজ তার অবর্তমানে তার পরিবার পরিজন সেই গ্রামবাসীর কাছে করুণা ভিক্ষা করে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিফল মনোরথ হয়ে ফিরছে ঘরে। অর্থ সংকট প্রকট হওয়ায় উর্বরা দশ বিঘা জমি তারা বন্ধক রাখে। প্রথমে বিক্রয় কবালা সম্পাদন ও রেজিষ্ট্রি করে, এই কবালা রুকসানা তার নিজের এবং নাবালক-নাবালিকা সন্তানদের অভিভাবক হিসেবে তাদের পক্ষে সম্পাদন করে। তার সাথে ইব্রাহীমের মাতাও একই কবালায় সম্পদনকারী হিসেবে টিপসহি দেয়। পর পরই আর একটি ‘ফেরত প্রদান’এর চুক্তি দলিল রুকসানা, তার শাশুড়ী ও নাবালক-নাবালিকা সন্তানদের বরাবর সম্পাদন করে কবালা গ্রহীতা আতাউর রহমান।

এই দলিলে উল্লেখ করা হয় কবালার পণ বাবদ গৃহীত ৭,০০০/০০ (সাত হাজার) টাকা দুই বৎসরের মধ্যে রুকসানা তার শাশুড়ী ও সন্তানেরা গ্রহীতা আতাউর রহমান বরাবর ফেরত দিলে তাদের বরাবর উক্ত জমি বাবদ ফেরত কবালা আতাউর রহমান সম্পাদন ও রেজিষ্ট্রি করে দেবে। এরপর আতাউর রহমান উক্ত দশ বিঘা জমি ভোগদখল করতে থাকে। দুই বৎসর অতিবাহিত হয়ে যায়। রুকসানা ও তার শাশুড়ি উক্ত টাকা আতাউর রহমানকে ফেরত দিতে পারে নাই। আতাউর রহমান জানিয়ে দেয় যে জমির মালিকানা সে সম্পূর্ণভাবে অর্জন করেছে। এখন আর ‘ফেরত প্রদান’ চুক্তির কার্যকারিতা নাই। এভাবেই দিন যেতে থাকে। ইব্রাহীম মেম্বারের জ্যেষ্ঠপুত্র মোস্তাফিজুর রহমানের বয়স ইতিমধ্যে ১৮(আঠার) অতিক্রম করে। উক্ত কবালা বাতিল গণ্যে সম্পত্তির মালিকানা দাবী করে সে ‘মুন্সেফী আদালত’ নাটোরে মামলা দায়ের করে। উপজেলায় আদালত প্রতিষ্ঠিত হলে আর্থিক ও আঞ্চলিক এখতিয়ার বিবেচনায় মোকদ্দমাটি লালপুর উপজেলা মুন্সেফী আদালতে প্রেরিত হয়। বিজ্ঞ মুনসেফ উভয় পক্ষের সাক্ষ্য প্রমাণাদি বিবেচনা ও সওয়াল জবাব শুনানী অন্তে বাদী মোস্তাফিজ গং এর অনক’লে ডিক্রি প্রদান করেন।

বিজ্ঞ মুনসেফ তাঁর রায়ে উল্লেখ করেন যে কবালায় যা কিছুই লেখা থাক না কেন রুকসানা ও তার শাশুড়ীর অংশের জমি আতাউর রহমানের কাছে সাত বৎসরের জন্য খাই-খালাসী বন্ধক ছিল। উক্ত মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ায় উক্ত সম্পত্তি ভোগ দখলের অধিকার বাদী পক্ষের। নাবালক-নাবালিকাদের সম্পত্তি বিক্রয় করা বা বন্ধক রাখার অধিকার তাদের মাতা রুকসানার ছিলনা। তাই নাবালক-নাবালিকাদের পক্ষে তাদের মাতা কর্তৃক সম্পাদিত কবালার এতদসংক্রান্ত অংশ ‘সৃষ্টিলগ্ন’ থেকেই বাতিল। নালিশী সম্পত্তিতে বিবাদী আতাউর রহমান কোন ভাবেই কোনরূপ স্বত্ব , স্বার্থ , অধিকার অর্জন করে নাই। এই সম্পত্তিতে ইব্রাহীমের ওয়ারিশদের স্বত্ব বহাল আছে। এই ডিক্রির বলে ইব্রাহীম মেম্বারের ওয়ারিশেরা উক্ত সম্পত্তি ফিরে পায় । তাদের সংসারের অনটন অনেকাংশে দূর হয়। নাবালক-নাবালিকাদের সম্পত্তির মালিকানার নিরাপত্তা বিধান করা হয়েছে আইন ও তার যথার্থ প্রয়োগের মাধ্যমে।

আইনে সুস্পষ্ট বিধান থাকলেও নাবালক-নাবালিকাদের সম্পত্তি উপরের আলোচনা মতে ‘বাতিল’ দলিলের দ্বারা হস্তান্তরের মাধ্যমে বেহাত হয়ে যাচ্ছে। প্রভাবশালী ও অর্থশালী ব্যক্তিগণ দুর্নীতিপরায়ন সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের সাথে যোগসাজসে এই কাজ করে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই এইসব নাবালক-নাবালিকাগণ সাবালক হবার পর তাদের ‘কার্যত অভিভাবক’ (যেমন মা, চাচা, সৎ পিতা প্রমুখ) কর্তৃক আদালতের অনুমতি ব্যতিরেকে হস্তান্তরিত সম্পত্তি উদ্ধার করতে গলদঘর্ম হয়। এ থেকে অনেক সামাজিক সংকট ও বিরোধের সৃষ্টি হচ্ছে। আদালতে বাড়ছে মামলার সংখ্যা। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সচেতনতা , সতর্কতা ও আন্তরিকতার সাথে কর্তব্যপালন করা উচিত, বাস্তব ক্ষেত্রে এর অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।

সাব-রেজিষ্টারগণ দলিল নিবন্ধনের সময়, সহকারী কমিশনার (ভ’মি) ঐরূপ দলিলের ভিত্তিতে নাম জারীর আদেশ দেবার সময়, স্থানীয় সংস্থা সমূহ ( পৌর সভা, সিটি কপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ইত্যাদি) স্থাপনা তৈরীর ‘প্লান’ অনুমোদন করার সময়, ব্যাংক সমূহ এইরূপ দলিল জমা রেখে ঋণ প্রস্তাব উপস্থাপন ও মঞ্জুর করার সময় এ বিষয়ে খেয়াল রাখলে নাবালক-নাবালিকার সম্পত্তি বেহাত হওয়া থেকে রেহাই পাবে। মনে রাখতে হবে ‘সৃষ্টি লগ্ন’ থেকেই যে দলিল বাতিল তা কোন অবস্থাতেই ‘নিবন্ধিত’ হতে পারেনা। এইরূপ দলিলের ভিত্তিতে দলিলের তফসিলে বর্ণিত সম্পত্তিতে গ্রহীতার কোন স্বত্ব, স্বার্থ , অধিকার অর্জিত হয়না । এইরূপ বাতিল দলিলের ভিত্তিতে নামজারী করা, ‘প্লান’ অনুমোদন করা , ঋণ প্রস্তাব উপস্থাপন ও মঞ্জুর করা যায় না। বাংলােেশ এইরূপ ঘটনা অহরহ ঘটছে, এই কারণে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে কলহ বিবাদের সৃষ্টি হচ্ছে । এসব কলহ বিবাদ খুন খারাবি পর্যন্ত কোন কোন ক্ষেত্রে গড়াচ্ছে। দেওয়ানী ও ফৌজদারী আদালতে বাড়ছে মামলার সংখ্যা। এসব মামলা নিষ্পত্তির পর্যায়ে ক’ট তর্কের অবতারনা করে ‘টাউট’ শ্রেণীর লোকেরা কৌশলে বিবাদমান জনগণের সম্পদ নিজেদের কব্জায় নিচ্ছে। বিনষ্ট হচ্ছে শান্তি শৃংখলা, যার রেশ চলছে বংশ পরম্পরায়। আইনের এই দিকটির প্রয়োগ নিশ্চিত করে সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহি সংক্রান্ত বিধান কার্যকর করতে হবে। এভাবেই নাবালক-নাবালিকাদের সম্পত্তি যথার্থভাবে হেফাজত করতে হবে।
লেখক ঃ সাবেক জেলা ও দায়রা জজ। বর্তমানে অ্যাডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট হাইকোর্ট বিভাগ , ঢাকা । কার্যকরী সভাপতি ও সদস্য , স্থায়ী কমিটি , জাতীয়
সমাজতান্ত্রিক দল , জে এস ডি ।