লকডাউন উঠে গেছে, থেকে গেছে করোনা: সিলভিয়া পারভিন লেনি

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ছুটির নামে যে অঘোষিত লকডাউন চলছিলো তা উঠে গেলো। লকডাউন উঠে যাচ্ছে শুনলে যে কেউ ভাববে হয়ত ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এসে গেছে। হয়ত মনে হবে করোনাযুদ্ধ শেষ হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এখন বরং সংক্রমণের হার আরও বাড়ছে। করোনাভাইরাসের আক্রমণের পর আজ শনিবারে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যাও আড়াই হাজারের বেশি।
লকডাউনের সময় প্রায়ই আমরা কিছু দ্বিচারিতা দেখতে পেয়েছি। ছুটি ঘোষণার পর বাড়ি ফিরতে চাওয়া মানুষের ভিড় দেখে আমরা অবাক হয়েছি। কিন্তু এই বাড়ি ফেরা মানুষ যারা একেবারেই শ্রমিক শ্রেণীর তারা কি আর অতো বুঝেছিলো যে করোনাভাইরাসের ছুটি এটি, বাড়ি ফেরা যাবে না? সেরকম প্রচার-প্রচারণা বা যাকে আমরা পাবলিক কমিউনিকেশন বলে থাকি তা হয়নি। বাস-ট্রেন সবই চালু রাখা হলো- আর তারা যখন এই বাস ট্রেনে চড়ে বাড়ি যেতে চাইলো তখন সবাই রইরই করে উঠলো- দেখছেন শ্রমিকদের দোষ। কিন্তু লকডাউন মানে ত হওয়া উচিত ছিলো সব বন্ধ। ছুটি নয়।

দিন মজুর শ্রেণীর যারা ঢাকা শহরে থাকলো তারা পড়লো আরেক বিপদে। কাজ নেই, দৈনিক খাবার জোগাড় করবে কীভাবে? কিছুদিন যেতে না যেতেই এরাও সুযোগ খুঁজে খুঁজে গ্রামের পথ ধরল। আমরা খবরে দেখেছি গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ থেকে গার্মেন্টস শ্রমিকরা গ্রামে ফিরছেন। ফিরতে চাওয়া মানুষগুলোকে আমরা অনেক গালি দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতাটা কী ? যাদের এই শহরে অল্প বেতনের চাকরি, কেউ দিন আনে দিন খায়, যারা হাত পাততে পারে না। তারা এই শহরে কোথায় যাবে? তারা যদি মনে করে বাড়িতে গিয়ে, ঘরের চাল আর বাগানের শাক দিয়ে ভাত খেয়ে জীবন রক্ষা করবে তবে তাদের অপরাধ কোথায়?
আমরা প্রতিটি এলাকার সাংসদ, ব্যবসায়ী, সমাজকর্মী অনেক ত্রাণ বিতরণ করেছি সত্য। কিন্তু তা যে সব দরিদ্রকে আওতায় এনেছে তা হলফ করে বলতে পারিনা। যদি ১ শতাংশ শ্রমিকও এই ত্রাণ বিতরণের আওতার বাইরে এক সপ্তাহ থাকে তবে তাদের প্রাণ রক্ষা করাটা বেশ কঠিনই বটে। অথচ এক্ষেত্রে আমরা একটু ভেবেচিন্তে সমন্বয় করে কাজ করতে পারতাম। আমরা ভোটার তালিকা ধরে ধরে ১ মাসের খাবার দিয়ে বলতে পারতাম- ঘরে থাকুন। বাইরে বের হলে মরণ।

বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তির মালিকরা যখন তাদের কারখানা চালাতে শ্রমিকদের ঢাকায় ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন তখনই এই শ্রমিকদের এক মহাবিপদে ফেলেছিলেন। তখনই বুঝা গিয়েছিলো শ্রমিকরা ভিড় করে করোনা বাধালেও কারো কিছু যায় আসে না। লকডাউনেও যেসব গার্মেন্টস খোলা ছিলো সেগুলোর শ্রমিকরা বেতন যে খুব সময়মত পেয়েছেন বা বিশেষ অবস্থায় কাজ করায় বড় বোনাস পেয়েছেন তা ঘটেনি। তখন কি তাদের হাতে টাকা বা খাদ্যসামগ্রী দিয়ে বলা হয়েছিলো কিছুদিন পরিবারটা চালান ?

মালিকদের আহাজারি দেখে সরকার ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দিলো- সেটা কোন কোন খাতে ব্যয় করবেন মালিকরা? তাদের যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে শুধু তা পোষাতে? না কি এখান থেকে শ্রমিকরাও কিছু পেতে পারেন?

ওই খাতের নেতৃত্বস্থানীয় এক ব্যবসায়ীর ছেলে ঈদের সময় ফেরিঘাটে মানুষের ঢল দেখিয়ে ছবি প্রকাশ করে বলেছেন- এইবার কী বলবেন? সব দোষ কি মালিকদের? এখানে বলে রাখি অনলাইনে এসব ছবির বেশিরভাগই গত বছরের ছবি বলে আমাকে অনেকেই নিশ্চিত করেছেন। যাইহোক, তিনি প্রশ্ন করেছেন সব দোষ কি গার্মেন্টস মালিকদের। আমি বলব, না, আপনাদের সব দোষ নয়। আপনাদের দোষ ৬০ ভাগ ধরতে পারি। কারণ যে দেশে শ্রমের মূল্য নগণ্য, একবেলা কাজ না করলে খাবার আসে না, সেই দেশ করোনা মোকাবেলা করা শুধু কঠিন না, প্রায় অসম্ভব। তাই সব দোষ আপনাদের নয় অবশ্যই।

আমি সরকার মানে বুঝি আমার প্রিয় মানুষ জননেত্রী শেখ হাসিনাকে। করোনা মোকাবিলায় তিনি কি কোথায়ও কোন ক্ষেত্রে কার্পণ্য দেখিয়েছেন? কোনো কমতি রেখেছেন ? আমরা যারা শুরু থেকেই পরিস্থিতি দেখে আসছি ও ভুক্তভোগী, আমরা দেখছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চেষ্টার কোন কমতি নেই। কিন্তু বাকিরা কৌশলে তাদের দায়িত্ব পালনে অদক্ষতা, দুর্বলতা, অসততার দায় আস্তে-ধীরে চাপিয়ে দিলেন এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষের অপর। এই খেটে খাওয়া মানুষরাই কিন্তু শেখ হাসিনার জনগণ।

আমাদের আশেপাশের ভাই-বোন বন্ধুবান্ধব-সহকর্মী এই এলিট শ্রেণীর মানুষরা কি ঘরে থেকেছেন? তারা কতটুকু স্বাস্থ্যবিধি মেনেছেন? ঢাকায় এলিট শ্রেণির অনেক সুপারশপ খোলা ছিলো। এগুলো খোলা রাখা হয়েছে এই কারণে যে, এইসব এলিট ভোক্তা শ্রেণী যাতে কষ্ট না পান। তাহলে ঐ শ্রমিকদের দোষ দেব কেন ? তাদেরও ত পেট আছে। তাদেরও ত তিনবেলা না হোক একবেলা খেতে হয়।

তাই আমরা শুরু থেকেই বলে এসেছি- শুধু ছুটি ঘোষণা বা লকডাউন করলেই হবে না তা বাস্তবায়ন করতে হলে অন্য বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু ঘোষণা দিলেই লকডাউন হয়ে যাবে না। ছুটি দিয়ে রেল-বাস খোলা রাখলে মানুষ গ্রামমুখী হবেই। ঢাকায় কারো দুবেলা অন্নসংস্থান না হলে সে ঢাকা ছাড়তে চাইবেই।

এখন যেহেতু লকডাউন উঠেই যাচ্ছে তাহলে এখন আর লকডাউন বাস্তবায়নে কি হলো আর কি হলো না সেই আলোচনাই অবশ্য বৃথা। কিন্তু আমাদের এটা খুব জরুরিভিত্তিতেই মাথায় রাখা দরকার সংক্রমণ কমছে না বরং বাড়ছে। লকডাউন খোলার পর থেকে যে নতুন সংক্রমণ হবে তা আগের চেয়ে আরও বেশি হবে আমার ধারণা। এরকম হয়ত কিছু দিন যাবে। যেহেতু লকডাউন উঠেই যাচ্ছে সেহেতু এই সময় সরকারের নির্দেশিত ১৩ দফা স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে পালন করা ছাড়া অন্য কোন বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু এই ১৩ দফা যে খুব কঠোরভাবে মানা হচ্ছে তা নিশ্চিত করতে হবে।

লকডাউন দিয়েও লকডাউন বাস্তবায়ন করা যায়নি সমন্বয়ের অভাবে। লকডাউন উঠিয়ে ১৩ দফা যে স্বাস্থ্যবিধি দেওয়া হয়েছে সেটা যেন আগের মত সমন্বয়ের অভাবে ব্যর্থ হয়ে না যায়। এবার দেখার পালা লকডাউন বাস্তবায়নের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ১৩ দফা স্বাস্থ্যবিধি পালন বাস্তবায়ন কতটুকু করা যাচ্ছে।

লেখক: পরিচালক, রেডিও ঢোল