আমার নাবিক জীবনের ভ্রমন কাহিনী:নেতা বাবুল

আমার নাবিক জীবনের ভ্রমন কাহিনীর আজকে সৌদি আরবের জাজান / জিজান বিষয়ে লেখার আরেক পর্ব — জিজান হাসপাতাল থেকে হেঁটেই রওয়ানা দিলাম, রথও দেখবো, আবার কলাও খাবো! কিন্তুু প্রচন্ড গরম, আমরা জাহাজে এসি রুমে থাকি, ইন্জিন রুমে ৪/৬ ব্লোয়ার থাকে, গরম লাগে না। চেষ্টা করছিলাম সূর্যের আলো বাঁচিয়ে দোকান গুলোর ছা্য়ার চলতে, কিছু দূর যাবার পর আমার ডাকনাম বাবুল ভাই বলে একজন ডাকতে শুরু করলো, কিরে বাবা হাশরের মাঠে আবদুল্লা র বাপেরে তো কে চিনলো, সে রাস্তার ওপাট থেকে হাত নাড়ছে, আর ডাকছে, ইশারায় এপাশে এসতে বললাম, এলো আমি চিনতে পারলাম না বললাম, সে পরিচয় দিলো ১৯৭৬ সালের ২১ শে জুলাই সামরিক জান্তা কতৃক কর্ণেল আবু তাহের বীরোত্তমের ফাঁসীর দিন আমাদের বিভোক্ষ মিছিলের প্রস্তুুতির সময় আমার ইউনিয়নের মির আলী পুর বাজারে পুলিশী হামলা ও পাল্টা হামলার দিন সে আমাদের সাথে ছিল এবং মেজর নামে খ্যাত সুলতান ( পরবর্তীকালে আমিশা পাড়ার চেয়ারম্যান) সহ আমরা কয়েকজন তাদের বাড়ী বটগ্রাম গিয়া আশ্রয় নিয়াছিলাম।

রাজনৈতিক জীবনে সারা দেশের হাজার হাজার নেতা কর্মীরা সাথে পরিচয় ছিল সুতারাং তাকে বললাম চেনা চেনা লাগছিলো । সে জানালো জিজান বলদিয়া ( পৌরসভা) চাকুরী করে। তিন বছর যাবত, বেতন ৩০০সৌদী রিয়াল মানে তখনকার বাংলাদেশী ৩০০০/ টাকা। আমি বললাম এত কমে কিভাবে চলো ? সে জানালো ৬টি কৈই মাছ কিনে একমাস তরকারী রান্না করে! আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম মনে হলো ! বললাম ৬ টা মাছ দিয়ে একমাস কিভাবে সম্ভব, সে বললো আলু ও সবজি দিয়া তরকারি রান্না শুরু করে, পরে মাছ দুটা দেয়, তারপর রান্না শেষ হলে আবার মাছ দুটা তুলে ফ্রিজে রাখে, আমি বিস্মিত হলাম, আবার দুঃখও পেলাম, প্রবাসী জীবন যে কত কঠিন, দেশে থাকা স্বজনরা এটা অনুভব করে না, এটা পাঠাও, ওটা পাঠাও, টাকা পাঠাও, কত আবদার । সে চা খেতে বললো আমি বললাম আমি খাওয়াবো, তোমার এত কম বেতন। সে চা দোকান খুজতেছিলো, হঠাৎ একটা আজব দোকান দেখে তাকে দাঁড় করালাম, দেখলাম একটা দোকানে অনেকগুলো হুক্কা লম্বা পাইপওয়ালা বেতের ১২/১৪ টা চেয়ার, সামনে চোট টি টেবিল, হুক্কার নল গুলো চেয়ারের হাতলে আটকানো, কয়েকজন আরব্যকে দেখলাম হুক্কা টানছে আর মাঝে মাঝে টেবিলের উপর রাখা একটা গামলা থেকে একটা গোটা মুখে পুরাচ্ছে, জিজ্ঞাসা করলাম কিরে ভাই আরব্য মুসলমানের দেশ হুক্কা, তামাক তো ইসলামে হারাম !

এ বললো হারাম হলেও আরব্যরা এসব পাত্তা দেয় না, আরও খারাপ হারাম মদও লুকিয়ে চুকিয়ে খায়। সামনে এগুলে একটা চা দোকান পেলাম, সোলেমানী চা, আমি এমন চা য়ের নাম প্রথম শুনলাম। চা আর বিস্কুটের অর্ডার দিলো, আসার পর দেখলাম সোলেমানী চা ! মানে আমাদের দেশে যেটাকে লাল চা বা রং চা বলে সেটাই সোলেমানী চা, বড় কাপ, আধা লিটারের কম হবে না, মজাই লাগলো, তার রাস্তার ঝাড়ু দেবার কাজ চলছিলো, সে ফোরম্যান কে বলেই এসেছিলো, তাই যাবার তাড়া, তাকে বিদায় দিয়া আমি এগুতে লাগলাম, একটি ঘড়ি দোকান দেখে ভিতরে ঢুকলাম, ১৩/১৪ বছর বয়সী আরব্য জোব্বা হইচ্ছা ( মাথার কালো রিং) লাগানো , ঢুকে সালাম দিলাম, সে আড় চোখে একবার দেখে, তার শো কেইছে ঘড়ি সাজানো নিয়া ব্যাস্ত ! আমাকে একজন বলেছিলো আরব্যদের “রফিক তাল ” বলে ডাকতে হয়, দুই তিনবার ডাকলাম ঘড়ির দাম জিজ্ঞাসা করবো, ব্যাটা কি বুঝলো, ভিতর থেকে এসে আমাকে মিসকীন, গাওয়াদ আর কত কি বলতে বলতে ঠেলে দোকান থেকে বের করে দিলো,।

আমি হতভম্ব মিসকীন বুঝলাম, আর আমিও বাহিরে দাঁড়িয়ে বাংলায় দুচার টা ওয়াজ করলাম। আমার স্মরণে পড়ে গেল ১৯৬৫ ৬৬ সালের দিকে দেখতাম , সৌদী আরব থেকে আওলাদে রসুল বলে আমাদের দেশে আরব্যরা এসে বাড়ী বাড়ী গিয়া চাউল টাকা পয়সা নিত, আবার হজ্বের আগে সৌদি থেকে মোয়াল্লেম এসে হজ্বে যাওয়ায় লোক খুঁজতো , তারা কমিশন পাওয়ার জন্য, আমার স্মরন আছে আমাদের শহর চৌমুহনী তে এক জায়গায় এমন একজন মোয়াল্লেম বাংলায় সাইন বোর্ডে নবীর আওলাদ লিখে আবদুল মালেক মিরদাদ নামীয় এক আরব্য হজ্ব মৌসুমে হাজীদের নিয়া যেত, সফিনা আরব নামক একটি জাহাজে করে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বাঙালী হজ্বগামী লোকজন কে জেদ্দা নিয়া যেত, সে আরব্যরা তৈল খনি পাওয়ার কারনে আমাকে মিসকীন বলে গালি দিলো ! ( চলবে)