দিন যায় , স্মৃতি রয় ও মিষ্টির প্যাকেট :সা কা ম আনিছুর রহমান খান কামাল

দিন যায় , স্মৃতি রয় ও মিষ্টির প্যাকেট
(২)দ্বিতীয় কিস্তি:
আমি তখন ঝিনাইদহের জেলা ও দায়রা জজ । ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দের ২০ শে মার্চ তারিখে আমি এখানে যোগদান করি। বরগুনায় থকাকালে খবর পেয়েছিলাম ঝালকাঠির জেলা জজ , ডেপুটি কমিশনারসহ বিিভন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারী দফতরে চিঠি দিয়ে ভবনসমূহ বোমা মেরে উড়িয়ে দেবার হুমকি দেওয়া হয়েছে । তারা চিঠিতে বলেছিল তারা ‘তাগুতি’ শাসন উৎখাত করে আল্লাহর শাসন কায়েম করবে। খবরটা আমি গুরুত্ব দিয়েই বিবেচনায় নিয়েছিলাম । ঝিনাইদহ সন্ত্রাস-উপদ্রুত এলাকা বলে পরিচিত । সব কিছু বিবেচনা করে আমি নিরাপত্তার জন্য সম্ভব সব রকম ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। সরকারী একটি আলোচনা সভায় অংশ গ্রহণের জন্য আমি ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দের আগষ্ট মাসের ১৬ তারিখে ঢাকায় যাই । আমার স্ত্রী ও কন্যা আমার সাথে ঢাকায় যান। ছেলে উমরের ক্লাস ছিল বলে তাকে বাঙলোতে রেখে যাই। সে তখন ঝিনাইদহ সরকারী হাই স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র ।

ঢাকায় সেগুন বাগিচায় গণপূর্ত ভবনের হল রুমে ১৭ তারিখে পূর্বাহ্নে কর্মসূচী মোতাবেক সভা শুরু হলো। আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেরত মন্ত্রী মহোদয় এবং উর্ধতন কর্মকর্তাগণ উপন্থিত হলেন । সভাটি ছিল অঞ্চল ভিত্তিক , প্রস্তাবিত ‘এটর্নী সার্ভিস ’ নিয়ে আলোচনা ও মত বিনিময় করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। জেলা ও দায়রা জজগণসহ ডেপুটি কমিশনারগণ , পুলিশ সুপারগণ , আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাধারন সম্পাদকগণ , সরকারী কৌশুলীগণ , পাবলিক প্রসিকিউটরগণ প্রমুখ এই সভায় অংশ নেন। সভা শুরু হবার কিছু পর আমি প্রাকৃতিক প্রয়োজনে কক্ষ থেকে বের হলাম। আমার আগেই একই কারণে মেহেরপুরের জেলা ও দায়রা জজ জনাব আবদুল হামিদ বের হয়েছিলেন । মোবাইল ফোনে তিনি কারও সাথে কথা বলছিলেন । উনার কথা আমি যা শুনতে পেলাম তার মর্মার্থ হচ্ছে ‘আদালতে বোমা হামলা হয়েছে এবং উকিল সাহেবগণ চলে গেছেন’ । আমি উনাকে জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে , তিনি জানালেন মেহেরপুর জেলা জজ আদালত ভবনে বোমা হামলা হয়েছে এবং আতংকিত হয়ে বিচারপ্রার্থী জনগণ ও আইনজীবীগণ আদালত ভবন থেকে চলে গেছেন। তাঁর কাছে একের পর এক ফোন আসতে থাকে। কিছুক্ষণ পর তিনি জানালেন ঝিনাইদহ আদালত ভবনেও বোমা হামলা হয়েছে । আমাকে খোঁজ নিতে বললেন ।

এরই মধ্যে ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার জনাব আকরাম হোসেন সভাকক্ষ থেকে বের হয়ে এলেন। তিনি মোবাইলে কথা বলছিলেন , তিনি কাউকে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন ঝিনাইদহের আদালত ভবন , জেলাজজের বাঙলো এবং আমার পুত্রের নিরাপত্তার বিষয়েও তিনি কথা বলছিলেন । আমি উদ্বিগ্ন । এস পি সাহেব জানালেন ঝিনাইদহ আদালত ভবনেও বোমা হামলা হয়েছে তবে কেউ হতাহত হয়নি আদালত ভবন ও বাঙলোর নিরাপত্তা বিধান করা হয়েছে । আমার ছেলেকে স্কুল থেকে বাংলোতে পৌঁছে দিয়ে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে । এস পি সাহেব আমাকে নিরাপত্তার প্রশ্নে নিশ্চিন্ত থাকতে অনুরোধ করলেন। আমরা আবার সভা কক্ষে প্রবেশ করলাম। সভা শেষে আমরা যার যার গৃহে এবং পর দিন নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে আসলাম। চারিদিকে নিঃছিদ্র নিরাপত্তা । শৃংখলা বাহিনী নাগরিকদের সম্পদ সম্মান শরীরের এবং সরকারী গুরুত্বপূর্ণ ভবন দফতর সমূহের নিরাপত্তা বিধানে সদা তৎপর। জেলা ও দায়রা জজের বাংলোর চারদিকে নিরাপত্তা বেষ্টনি গড়ে তোলা হলো। দুই দিকে সর্বোচ্চ উচ্চতায় স্বচ্ছ এবং বহুদূর পর্যন্ত উজ্জ্বল আলো বিকিরণ করতে সক্ষম ‘লাইট’ লাগিয়ে দেওয়া হলো । সন্ধ্যার সাথে সাথে ঐ বাল্ব জ্বালানো হলে প্রায় গোটা মহল্লা আলোকিত হয়ে যেতো। মসজিদে যেতে হতো প্রহরী বেষ্টিত হয়ে । সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তা কর্মচারীগণ মুসল্লীর বেশে থাকতেন। ছদ্মবেশে ।

একদিন ভোরে আমার বাঙলো সংলগ্ন জামে মসজিদের ইমাম সাহেব এবং কয়েকজন মুসুল্লী আমার সাথে দেখা করতে আসলেন । ঐ দিন ছিল শুক্রবার । তাঁদের হাতে একটা বই । সাত সকালে তাদের মতো আলেম উলামার আগমন দেখে আমি খুবই প্রীত হলাম । কিন্তু তাদের সবার মুখ মলিন । তারা জানালেন আমাকে নিয়ে তাঁরা চিন্তিত । বইটি কে বা কারা ফজরের নামাজের সময় মসজিদে রেখে গেছে, এতে তাগুগি বিচার ও শাসন উৎখাত করা কেন প্রয়োজন এবং এজন্য মুসলমানদের কি করনীয় তা লেখা আছে । আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে যারা তাগুতি আইনে বিচার করছে তাদেরকে ‘কতল’ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। উনারা জানালেন আমাকেই এরা মূল লক্ষ্য হিসাবে নির্ধারণ করেছে । তাই আমাকে সাবধানতা অবলম্বন করতে তাঁরা সবিনয় অনুরোধ করলেন। আমি তাঁদেরকে বিষয়টা পুলিশ সুপারকে জানানোর অনুরোধ করলাম। সাথে সাথে আমি নিজেও বিষয়টি পুলিশ সুপার জনাব আকরাম হোসেন সাহেবকে টেলিফোনে জানালাম । তিনি ঐ দিন আমাকে মসজিদে যাবার আগে উনার কাছ থেকে পরিস্থিতি জেনে তারপর মসজিদে জুম্মার নামাজে যাবার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বললেন। একই সময়ে আরেকটি টেলিফোনে ডেপুটি কমিশনার জনাব নুরুল করিম মজুমদারের কন্ঠস্বর ভেসে আসলো । তিনি বললেন ‘ কাউকে মসজিদে যেতে নিষেধ করা যায় না , তবে আমি আজ জুম্মার নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে যাব না।’ কথা স্পষ্ট । উনি আরো বললেন গোয়েন্দারা বলছে ‘জে এম বি ’ এর সদস্যগণ ঝিনাইদহ শহরে পৌঁেছ গেছে এবং অবস্থান নিয়ে ফেলেছে । যে কোন সময় তারা তাদের পরিকল্পনা মতো নাশকতা চালাতে পারে।

উনারা কথায় স্পষ্ট বোঝা গেল উনি আমাকে মসজিদে না যাবার জন্য অনুরোধ করছেন। এর পরপরই এস পি সাহেব আবার টেলিফোন করে আমাকে জানালেন নিরাপত্তা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া হলেও বলা যায় না ওরা কি করে ফেলে । তাই তিনিও সবিনয়ে আমাকে নিজ বাঙলোতে নামাজ আদায় করতে অনুরোধ করলেন । নিরাপত্তার প্রশ্ন তাই আমি সেদিন আর জুম্মার নামাজ পড়তে মসজিদে গেলাম না। আমার শয়ন কক্ষের পশ্চিমের জানালা দিয়ে মসজিদ দেখা যেত এবং নামাজের জামাতও দেখা যেত । আমি পর্দা সরিয়ে নিজ কক্ষ থেকেই জুম্মার জামাতে শরিক হলাম। কিছুদিন পর পুলিশ সুপার সাহেব ‘পুলিশ লাইন জামে মসজিদ’ এ বিচারকদের জুম্মার নামাজ পড়ার ব্যবস্থা করেন। চৌকস প্রহরী দল নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরী করে বিচারকদের বহনকারী গাড়িটি মসজিদে নিয়ে যেত এবং নামাজ শেষে ফিরিয়ে আনতো। এভাবেই চলছিল দিন। চারিদিকে নিঃছদ্র নিরাপত্তা বলয় । সেই সাথে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নির্দেশনা মেনে চলতে হতো। জনগণকে এবং নিরাপত্তা প্রহরীদেরকে । আমাদের জন্য সাবধানতা অবলম্বনের বিষয়েও পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। আমার বাঙলোর নিরাপত্তা প্রহরীদের সংখ্যাও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পুলিশেরা ভবনের চারদিকে পালাক্রমে ঘুরে ঘুরে পাহারা দিত। এরই মধ্যে একদিন বাসার সামনের রাস্তায় বাই-সাইকেলে করে দুজন যুবক বড় এবং সুদৃশ্য একটি মিষ্টির প্যাকেট তড়িঘড়ি করে টহলরত পুলিশদের একজনের হাতে দিয়ে বললো ডাক্তার সাহেবের ছেলে হয়েছে ; এরপর আর কোন কথা না বলে তারা মুহূর্তে উধাও হয়ে গেলো ।

প্রহরীরা সন্দেহ করলো , তারা প্যাকেটটি নিরাপদ একটি জায়গায় রেখে আমাকে খবর দিলো । ডাক্তারদের মধ্যে কে আমাকে মিষ্টি পাঠাবে আমি বুঝতে পারলাম না। সিভিল সার্জন সাহেবকে ফোন করলাম। তিনিও জানেন না কোন ডাক্তার সহেবের পুত্র সন্তান হয়েছে কি না। সন্দেহ ঘনীভূত হলো । তিনি খোঁজ খবর নিলেন; কিন্তু না; ঝিনাইদহে কর্মরত কোন ডাক্তারের সন্তান লাভের ঘটনা ঘটে নাই । সবাই ধরে নিলো এটা নিশ্চয়ই ‘জে এম বি’ এর কাজ। পুলিশের বিশেষ টীম এসে প্যাকেটটি নিয়ে পরীক্ষা করলো। তারা প্যাকেটে কোন বিস্ফোরক পায়নি। তাতে মিষ্টি ছিল । এভাবে মিথ্যা বয়ানে অজ্ঞাতনামা যুবকদের মিষ্টির প্যাকেট দেবার কারণ কি ? জেলা প্রশাসক , পুলিশ সুপার এবং সংশ্লিষ্টরা উদ্বিগ্ন । এটা কোন ইংগিত । জে এম বি এর লোকেরা যে কোন সময় হয়তো কোন অঘটন ঘটাবে। এরই মধ্যে এন ডি সি মুজিবুল ফেরদৌসের কাছে একটা টেলিফোন আসলো, ডাঃ সাহিনের টেলিফোন । তিনি ঝিনাইদহে কর্মরত ছিলেন , বৎসর দুয়েক আগে তিনি নাটোরে বদলী হয়ে গেছেন। ঝিনাইদহে কর্মরত থাকা অবস্থায় তাদের মধ্যে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। ডাঃ সাহিনের স্ত্রী কোটচাঁদপুরে একটি কলেজে অধ্যাপনা করতেন। স্বামী বদলী হলেও তিনি চাকুরীর জন্য ঝিনাইদহে রয়ে গেছেন। তিনি ঐদিন একটি পুত্র সন্তানের মা হয়েছেন। এই খবর পেয়ে ‘এন ডি সি ’ সাহেব মিষ্টির প্যাকেটের সূত্র পেলেন । এই সূত্র ধরে তিনি এগিয়ে গেলেন।

জানা গেল ডাঃ সাহিন সাহেবের সহকর্মী ডাঃ আফরোজা বেগম । ডাঃ আফরোজা বেগম ছিলেন ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার শাহরয়িার সাহবেরে স্ত্রী। ডাঃ সাহিনের মিসেস তার পুত্র সন্তান জন্মের খবর দিতে এই মিষ্টির প্যাকেট তার কলেজের দুজন ছাত্রকে দিয়ে পাঠিয়েছেন। জেলা ও দায়রা জজের বাঙলোর লাগা উত্তর দিকে পুলিশ সুপারের বাঙলো । তারা ভুল করে মিষ্টির প্যাকেট এভাবে দিয়ে গেছে। নিশ্চিত হওয়া গেলো। ছাত্র দুজন এসে মাফ চেয়ে মিষ্টির প্যাকেট ফেরত নিয়ে গেলো । তাদেরকে এজন্য ডি সি সাহেব ও এস পি সাহেবের কাছে তিরষ্কৃত হতে হয়েছে। পুলিশও বকা-ঝকা করতে ছাড়ে নাই। দীর্ঘ কয়েক ঘন্টার উদ্বেগের অবসান হলো । ঘটনাটি আমাদের কাছে বিরক্তকর বোধ হলেও , কৌতুকপ্রদও হয়েছিল।

লেখক: সাবেক জেলা ও দায়রা জজ। বর্তমানে অ্যাডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট হাইকোর্ট বিভাগ , ঢাকা । কার্যকরী সভাপতি ও সদস্য , স্থায়ী কমিটি , জাতীয়
সমাজতান্ত্রিক দল , জে এস ডি ।