আমার নাবিক জীবনের কাহিনী:নেতা বাবুল

ইদ উপলক্ষ্যে আমি আমার নাবিক জীবনের স্মৃতি চারন মূলক ভ্রমন কাহিনী বন্দ রেখেছিলাম, আজ আমি সৌদি আরব সম্পর্কে লিখবো। সৌদি আরবের তিনটি নৌ বন্দরে যাওয়ার সুযোগ ঘটলেও জেদ্দা , ইয়াম্বুতে নামবার পাশ আমরা কেউই পাইনি। তবে বন্দরে কর্মরত অনেক বাঙালির সাথে কথা বার্তা হয়। শুধু জিজান বা জাজান নামক বন্দরে নামবার ও দেখার, কথা বলার সুযোগ ঘটে। সালটা ১৯৮২ হবে। আমরা ভারতে কান্ডলা বন্দর ( মহাত্মা গান্ধীর জন্মস্হান, গান্ধীধাম) থেকে সৌদি আরবের জন্য বাসমতি চাউল ও ডিজেল চালিত পানির পাম্প নিয়া জিজান পৌছি। এ বন্দর শহরটির মালিকানা ছিল ইয়ামেনের , ইয়ামেনের বাদশা আর্থিক সন্কঁটে পড়লে ১৯ শতকের শুরুর দিকে এ শহরটি সৌদি বাদশাহর কাছে বন্দক দিয়া অর্থ হাওলাত নেয়।

২০০০ সালের পর ঋন পরিশোধ করলেও সৌদি রাজপরিবার ইয়ামেনকে জিজান / জাজান আর ফিরিয়ে দেয়নি ! জাজানের মূল বাসিন্দারা ইয়ামেনী হলেও গত একশত বৎসরের বেশী সময় যাবত সৌদি আরবের স্হায়ী বাসিন্দারা এখানে আবাস গড়ে তোলে। এখন ইয়ামেনীরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে। আরব সাগর পাড়ের এ শহরটি তে যখন যাই (১৯৮২)তখন নূতন নূতন আবাসন গড়ে উঠতে দেখেছি, একবারে বন্দর থেকে নিকটবর্তী শহর । প্রথম দিনই বাহিরে যাবার পাশ পেয়ে গেলেও গেলাম না, আমার তখন প্রচন্ড কাশি, পরদিন ডাক্তারের কাছে যাবার জন্য কেপ্টেনকে আগে রিপোর্ট করেছি ,
গত কাল আমি আমার ভ্রমন কাহিনীতে সৌদি আরবের দখলকৃত জাজান/ জিজান সম্পর্কে কিছু লিখেছিলাম , আজ কিছুটা লিখার চেষ্টা করবো। আমি বরাবরই সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করি, দেখা যায় কিছু লোক আমার লিখাকে ভিন্ন দৃষ্টিতে বিবেচনা করে উদ্ভট মন্তব্য করে ! এরা কেউ ওখানে না গিয়াও/ না দেখেও আমাদের এদেশে বসে মিথ্যাচার করে ।

কারো যদি আমার লেখা ভুল বা মিথ্যা হয় তিনি সাবলীল মার্জিত ভাষায় প্রতিবাদ করুন। আমি জবাব দিব। গত কালকের পরের অংশ — সকাল নয়টায় জাহাজের ক্যাপ্টেন আমাকে তার অফিসে ডেকে পাঠায়। তিনি ( গ্রীসের নাগরিক) বলেন স্হানীয় আরব্য এজেন্ট রা ধোঁকাবাজ, তাদের মাধ্যমে তোমাকে হাসপাতাল বা ডাক্তারের নিকট পাঠালে বিরাট অন্কেঁর বিল করবে , তার থেকে তুমি নিজে হাসপাতাল যাও। আমি যতটুকু খবর নিয়াছি বিদেশীদের জন্য ভাল চিকিৎসা রয়েছে। ফ্রী ঔষধ তারা দিবে। প্রয়োজন হলে বাহির থেকে কিনে নিও। আমি ২০০ ডলার দিলাম। আমি পাশ নিয়া বেরিয়ে পড়লাম, পোর্ট থেকে হেঁটে চললাম, ডাবল ওয়ে রোড, মাঝখানে খেঁজুর গাছ, একটা লোক দেখলাম গাছের গোড়ায় পাইপ দিয়া পানি সেচ করছে। আর আমাদের দেশে ভিন্ন চিত্র । একবার গাছ রোপন করলে গাছটা মরা বা কাটার আগে আর পানি সেচ দিতে হয় না। পোর্ট রোড পেরিয়ে মূল রোডে এলাম , কোন দিকে হাসপাতাল সেটা চিন্তা করতেছিলাম, সামনে দেখলাম ৪/৫ জন লোক লুংগি পরা কোমরে গামছা পেচানো কি যেন খোঁড়াখুঁড়ি করছে। তাদের দিকে এগিয়ে গেলাম। শুনলাম সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছে, তারা টেলিফোনে বা বিদ্যুৎতের ক্যাবল বাহির করছে। লম্বা করে সালাম দিলাম , উত্তর দিয়া নিজেদের ভাষায় জানতে চাইলো আমি কি বলদিয়ার লোক ? আমিতো হ্যাঁ করে রইলাম। বললাম আরবী বুঝি না, আমি জাহাজের লোক, আমি হাসপাতাল যেতে চাই, আমাকে একটা টেক্সী দরদাম করে দিন। পাশ দিয়া অনেক টেক্সী যাচ্ছে। একজন কে দাঁড় করিয়ে আরবীতে কথা বললো, দশ ডলার ভাড়া। খুচরা ডলার লাগবে। ক্যাপ্টেন আমাকে ১০/২০ ডলারের নোটই দিয়াছে সুতারাং সমস্যা নাই। ড্রাইভার ওয়ামেনী স্হানীয় বাসিন্দা , ইংরেজি জানে না। আমাকে হাসপাতাল গেইটে নামিয়ে দিলো। আমার কাছে মনে হলো ২ কিলোমিটার এর বেশী হবে না।

হাসপাতালের রিসেপশানে গেলাম, পাশ দেখালাম। মিশরীয় এটেডেন্ট বললো দশ দিনার ফী দিতে হবে। বললাম, আমার কাছে ডলার , বললো সমস্যা নাই তারা আমাকে রিয়াল ফেরত দিবে। ফী দিয়া ভিতরে গেলাম একটা রুমে একজন মিশরীয় ডাক্তার ছিল। সে সব কিছু শুনে লিখলো, জানলো আমি ভারতীয় ( সাধারনতঃ ভারত উপমহাদেশের সব দেশ গুলোর লোককে ভারতীয় বলে সম্বোধন করা হয়) এবার আমাকে একটা রুম নম্বর বলে সেখানে যেতে বললো, গেলাম ভারতীয় ডাক্তার হিন্দিতে জিজ্ঞেস করলো কোন দেশের, বাংলাদেশ বললাম। প্রাথমিক চেক আপ করে অন্য একটা রুমে পাঠিয়ে দিলো এক্সরে করতে, বলে দিলো শেষ হলে ফিল্মটা নিয়া তার কাছে আবার আসতে, ১০ মিনিটে তাহা শেষ করে এলাম, বললো মেজর কোন সমস্যা নেই, ফুসফুসে কফ জমছে, ওষুধ লিখে দিয়া একটা রুম নম্বর লিখে দিলো সেখানে ফ্রী ঔষধ দিবে। যথারিতি ঔষধ নিয়া হাসপাতালের বাহিরে এলাম। ভাবলাম সামান্য পথ ১০ রিয়াল নিয়া গেল। হেঁটেই যাব, রাস্তাটাও একবারে সোজা পোর্ট পর্যন্ত, তাছাড়া আমি যতই আগে যাই না কেন, জাহাজে পৌছলেই ডিডিটি করতে হবে, তার থেকে ঘুরে ফিরে আরব্য জীবন যাত্রা বুঝি, বলা বাহুল্য জায়গাটা মূলতঃ ইয়ামেনের বলে ইয়ামেনী কালো লোকের সংখ্যা (তখন) বেশী মনে হলো। সাদা চামড়ার লোকও কম নয়। হাঁটতে শুরু করলাম। সামনের দিকে ( চলবে)