বিদেশের মাটিতে বাঙালি শিশু বড় করা নিয়ে কানাডা প্রবাসীদের দুশ্চিন্তা

কথায় আছে, একটি শিশু গড়ে তুলতে একটি গ্রামের প্রয়োজন হয়! আর সেই গ্রামও হতে হয় তার বেড়ে ওঠার জন্য যথোপযুক্ত। অর্থাৎ আশেপাশের পরিবেশ, মানুষজন – সবকিছুই একটি শিশুর বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রাখে।

কিন্তু কেন এটি এতই গুরুত্বপূর্ণ? তার কারণ আর কিছুই নয়, একটি মানুষের বেড়ে ওঠার পেছনেই মূলত তার সবকিছু নির্ভর করে।

কিন্তু একটি শিশুকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রবাসী বাঙালিদের কাঠখড় যেন পোড়াতে হয় আরো বেশি। বাংলাদেশে একই জাতির মধ্যে রক্ষণশীল পরিবেশে গড়ে ওঠা বাবা-মা যখন উন্নত দেশগুলোর মতো উন্মুক্ত সমাজে বসত গড়েন, তখন তাদের সন্তানের টানাপড়েনও যেন কম নয়।

একদিকে এই উন্নত সমাজে সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা নিয়ে বেড়ে ওঠা, পাশাপাশি বাবা-মার স্বপ্ন তাদের মতোই আর একটি বাঙালি তৈরি করা।
অভিবাসনের লক্ষ্য কানাডা

অনেকে শুধু সন্তানের কথা ভেবেই উন্নত সকল দেশের মধ্যে কানাডাকেই বেছে নেন অভিবাসনের ক্ষেত্রে। কারণ আর কিছুই নয়, কানাডায় পরিবারকেন্দ্রিক সামাজিক কাঠামো, তুলনামূলক রক্ষণশীলতা এবং সুশৃঙ্খলতা – এসবই। আর এ নিয়েই কথা হলো টরন্টোর কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে।

টিডি ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের সলিউশন ডিজাইনার জাহিদ হোসেন ২০০০ সালে আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসে কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্স করতে আসেন। সেখানেই জন্ম হয় তার মেয়ের। নাইন-ইলেভেনের সৃষ্ট অনিশ্চয়তায় দু’বছর পর ইমিগ্রেশন নিয়ে পাড়ি জমান কানাডায়।
বছর আটেক আগে এখানে তার ছেলের জন্ম। কিন্তু ঢাকার পরিবেশে বড় হওয়া বাবা-মা তাদের সন্তানকে টরন্টোতে কী দর্শনে বড় করতে চেয়েছিলেন আর শেষপর্যন্ত কেমনটি হয়েছে, তা নিয়ে তিনি বলেন যে তিনি বড় হয়েছিলেন খুব সুশৃঙ্খল পরিবেশের মধ্য দিয়ে।

”আমারও শুরু থেকেই ইচ্ছা ছিল আমার সন্তানেরাও বড় হবে আমাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের মধ্য দিয়ে,” তিনি বলেন।

”আসলে ঢাকা শহরেও সেই আগের পরিবেশ নেই। সেই তুলনায় এখানে সন্তানদের বড় করার ক্ষেত্রে বরং কিছু সুবিধাই রয়েছে।

জাহিদ হোসেন বলেন, কানাডায় তার সন্তানের চলাফেরা, পরিবেশ, বন্ধু-বান্ধব সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এবং শুরু থেকেই সেটা তারা করেছেন।

”এমনকি তাদের বন্ধু-বান্ধবের পরিবারগুলোর সঙ্গেও আমরা পরিচিত। এদেশে সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা যায়,” তিনি বলেন।
মাইরের ওপর ওষুধ নাই’

তবে সুবিধার পাশাপাশি বাধাও যে কম নয়। কানাডা এমন একটি দেশ যেখানে শিশুদের অধিকার সবার আগে। বাংলাদেশে যত সহজে সন্তানকে শাসন করা যায়, এখানে তত সহজে তা করা যায় না।

বাংলাদেশে যেখানে বাবা-মায়েরা “মাইরের মধ্যে ভিটামিন আছে” বা ”মাইরের ওপর ওষুধ নাই” দর্শনে উদ্বুদ্ধ, এখানে তা প্রয়োগ করতে গেলে বাবা-মায়ের জেলে যাবার সম্ভাবনা শতভাগ!

তাই জাহিদ হোসেন তার সন্তানদের সব সময়ই কোন কিছু বোঝাতে যুক্তির আশ্রয় নিয়েছেন। অভিবাসনের প্রথম প্রজন্মকে সবসময়ই এদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে অনেক কষ্ট করতে হয়। অবাক ব্যাপার দ্বিতীয় প্রজন্মও এর থেকে ব্যতিক্রম নয়।

“আমার মেয়েকে যখন নতুন এলাকায় এসে বর্তমান স্কুলে ভর্তি করানো হলো, তখন এই নতুন পরিবেশে এসে সে বুলিংয়ের শিকার হলো। তার ক্লাসে বেশিরভাগই শেতাঙ্গ। তারা সহজে একজন বাদামী শিশুকে মেনে নিতে পারেনি,” জাহিদ হোসেন বলেন।

”এ নিয়ে আমাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। তবে এটা আমাদের সবার জন্যই একটি শিক্ষণীয় বিষয় ছিল।”
কানাডায় বাঙালি সংস্কৃতি

জাহিদ হোসেন সন্তানদের সঙ্গে বাড়িতে কখনো বাংলা ছাড়া অন্য কোন ভাষায় কথা বলেন না। বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে ছোটবেলা থেকেই তাদের শিখিয়েছেন ক্লাসিক্যাল নাচ, গান। এমনকি নিজেদের সামাজিকতার পরিসরও তৈরি করেছেন সন্তানদের কথা মাথায় রেখে।

কানাডার পরিবেশে সন্তানদের বড় করা নিয়ে বলতে গিয়ে স্কুল শিক্ষিকা আমারা কবির বিষয়টিকে তুলনা করেন সালাদ ডিশের সঙ্গে – বিভিন্ন রকম সবজি অথবা ফল, যা মিশিয়েই সালাদ বানানো হোক না কেন, সবকিছুকে আলাদাভাবে ঠিকই চেনা যায়।

কানাডার সমাজও তেমনি। এখানে নিজের সংস্কৃতিকে নিয়েই মূলধারার সমাজের সঙ্গে বেড়ে উঠা সম্ভব।

স্বামীর সঙ্গে ১৯৯৯ সনে সুইডেন যাওয়া, সেখান থেকে কানাডায় চলে এলেও বলা যায় আমারা কবির একাই তার দু’সন্তানকে বড় করেছেন। স্বামী বেশিরভাগ সময় কাজের সূত্রে বাংলাদেশেই থাকেন।

”আমি চাইনি অতটা কঠিন হতে। সন্তানদের বন্ধু হয়ে তাদের স্বাধীনতা দিয়েই বড় করেছি। যখন যা প্রয়োজন হয়েছে বুঝিয়ে বলেছি। স্থানীয় শিল্পকলার পাশাপাশি তাদের পরিচিত করেছি বাঙালি শিল্পচর্চার সঙ্গে,” আমারা কবির বলেন।
এখানে সন্তানদের বড় করার ক্ষেত্রে অনেক অভিভাবকের একটি বড় দুশ্চিন্তা হলো ভিন্ন সংস্কৃতির কারো সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া। আমারা কবির মনে করেন এক্ষেত্রে সন্তানদের মাঝে দেশীয় সংস্কৃতির শেকড় শক্তভাবে তৈরি হলে বিয়ের ক্ষেত্রে ভয় কম থাকে।

তখন তারা নিজেরাই বুঝতে পারে দুটি পরিবারের একত্র হওয়া বা জীবন কাটানোর জন্য সাংস্কৃতিক মিল হওয়াটা কতটা জরুরী।
‘ধর্ম এক হতে হবে’
সন্তানদের বিয়ের বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন টরন্টো ডিসট্রিক্ট স্কুল বোর্ডের আর্লি চাইল্ডহুড এডুকেটর সোফিয়া লায়লা। এখানকার সমাজে স্বাবলম্বী হয়ে যাতে বিয়ে করার ইচ্ছা চলে না যায়, তাই তার দু’মেয়ে বিশের কোঠায় পা দেয়া মাত্রই তিনি মেয়েদের সঙ্গে বিয়ের বিষয়ে কথা বলা শুরু করেন।

এখানে বাঙালি ছেলের অপ্রতুলতা থাকায় মেয়েদের তিনি অনুমতিও দিয়ে দেন যে তারা যেন অন্য সংস্কৃতির মাঝেও পছন্দের মানুষকে খুঁজে নিতে দ্বিধা বোধ না করে। শুধু একটাই শর্ত, ধর্ম এক হতে হবে।

শেষ পর্যন্ত তার বড় মেয়ে বিয়ে করছেন একটি লেবানিজ ছেলেকে।
‘বিয়ে তো আসলে শুধু দু’টি মানুষের মধ্যে নয়, দু’টি পরিবারের মধ্যেও। আমরা দুই সংস্কৃতির দু’টি পরিবার কীভাবে এক হবো, তা নিয়ে শুরুতে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। যদিও তাদের ব্যবহারে পরে তা পুরোপুরিই কেটে যায়,” বলছিলেন সোফিয়া লায়লা।

মেয়েদের বড় করা নিয়ে তিনি আরো বলেন, ”কানাডায় আমাকে শেখানোর কেউ ছিল না। তাই আমি স্কুলে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতাম শুধু শেখার জন্য কীভাবে শিশুদের সঠিকভাবে গড়ে তোলা যায়।”
”আমি বলব সময় আর মনোযোগ – এই দুটো দেয়াটাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন,” তিনি বলেন।

ভিন্ন দু’টি সংস্কৃতির মাঝেও যে আমাদের শিশুরা বেড়ে উঠছে, তাদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশ থেকে বিবাহিত বা অবিবাহিত অনেকেই এখানে এসে ভিন্ন সংস্কৃতিতে বিয়ে করছেন। তারাও চেষ্টা করে থাকেন যেন তাদের সন্তানেরা বাঙালি সংস্কৃতিকে বহন করে।
তেমনি একজন সারাহ রাজকুমার।
তিন সংস্কৃতির মাঝে

পেশায় মানসিকতা ও ব্যবসায়িক প্রশিক্ষক সারাহ’র পনের-বছর বয়সী একমাত্র সন্তান বড় হয়েছে তিন সংস্কৃতির মাঝে – বাঙালি মা, গায়ানিজ বাবা আর নিজের দেশ কানাডার সংস্কৃতিতে।

”আমি সব সময়ই আমার মেয়ের বেড়ে উঠার ব্যাপারে সচেতন ছিলাম। আমি বাংলাদেশে বড় হলেও সেখানকার সমাজে আমার মেয়েকে আমি কখনোই বড় করতে চাইব না। বরং এখানে যেকোনো শিশুকে একটি পূর্ণাঙ্গ এবং স্বর্নিভরভাবে গড়ে তোলা সম্ভব,” বলেন সারাহ রাজকুমার।

তিনি বলেন, তার মেয়ে বাংলায় সুন্দর কথা বলতে পারে। শিশুরা তাদের বাবা-মা’কে দেখেই শিখে।

”বাংলা ভাষা, শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি আমার ভালোবাসা দেখেই সে আমার শেকড়কে ভালবাসতে শিখেছে।”
সারাহ বলেন, ”ধর্মের বিষয়েও আমি তাকে ইসলাম ও খ্রিস্টীয় দুই ধর্মের সঙ্গেই পরিচিত করেছি। আমি চাই তার ধর্ম সে নিজেই বেছে নিক।

”সবচেয়ে বড় কথা, আমরা নিজেদের কোন কিছুই আমাদের শিশুদের উপর চাপিয়ে দিতে পারি না, তা উচিতও নয়। শুধু চেষ্টাই করতে পারি যেন সবকিছুর মধ্য থেকেই আমাদের শিশুরা স্বাধীনভাবে এই সমাজে বেড়ে উঠতে শেখে, লড়তে শেখে,” তিনি বলেন।

একটি শিশুর ব্যক্তিত্ব তার জীবনের প্রথম পাঁচ বছরেই তৈরি হয়। স্বাভাবিকভাবেই বাবা-মা’র সংস্কৃতির প্রভাব তার মধ্যে পড়বেই। তবে এই ভিন্ন সংস্কৃতির দেশে যেখানে তাকে টিকে থাকতে হবে, সেখানে তার মাঝে পুরোপুরি বাঙালিয়ানা খুঁজতে যাওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত, সেটি প্রশ্ন সাপেক্ষ।

সর্বোপরি, একটি শিশু তার বাবা-মা’য়ের জন্য একটি ভিন্ন প্রজন্মের মানুষ। সে ভিন্নতা নিয়ে বড় হবে, এটাই স্বাভাবিক।
নওরীণ সুলতানা লেখক, টরোন্টো ,সূত্র:বি বি সি বাংলা