রমজানের সেই দিনগুলি: সা কা ম আনিছুর রহমান খান কামাল

সবে বরাতের দিনটা আমরা পালন করতাম ভাব গম্ভীর উৎসব মুখর পরিবেশে। তখন থেকেই শুরু হতো রমজানের আবাহনী । রমজানের চাঁদ আজ দেখা যাবে এই খবর আমাদেরকে আনন্দে উদ্বেলিত করতো। সবাই দল বেঁধে চাঁদ দেখতে যেতাম। কখনো জি সি আই স্কুলের মাঠে , কখনো ফৌজদারী কোর্টের মাঠে , কখনো ক্ষুদে জামগাছের নিকটে বাঁধের উপরে। রূপালী সুক্ষ্ম চাঁদ দেখতে পেয়েই চাঁদকে আসসালামু আলাইকুম বলে সালাম জানাতাম , সেই সাথে আমরা আনন্দে চিৎকার করতাম। যে দেখতে পায় নাই তাকে দেখাতাম আঙ্গুল দিয়ে । আঙ্গুল উচিয়ে দেখাবারও ভঙ্গি ছিল আলাদা, চাঁদের সাথে বেয়াদবী হয় এরূপ ভঙ্গি কখনোই করতাম না। কেউ ভুল করলে শুধরিয়ে দিতাম।

সবচেয়ে মজা হতো জি সি আই স্কুলের মাঠে চাঁদ দেখতে গেলে। চুকু ভাই আগে থেকেই বোম তৈরী করে প্রস্তুত থাকতেন, চাঁদ দেখা যাবার সাথেই ঐ বোম ফোটাতেন। সারা পাড়ার মানুষ বোমের শব্দ শুনে নিশ্চিত হতো যে চাঁদ দেখা গেছে। এই বোমকে বলা হতো ‘গাঁটে’ । মোটা গ্লাসের আকৃতির লোহার পাত্র, যার নীচের অংশ ছিল সুচালো,যাতে তা মাটিতে পোঁতা যায়। উপরের অংশ ছিল গ্লাসের মতো ফাঁকা, নীচে ছিল দুটো আনুলম্বিক ছিদ্র। ঐ পাত্রে আনুপাতিক হারে শুকনো মাটি ও বারুদ ভরে শিলিয়ে তপ্ত রোদে শুকানো হতো। নির্দিষ্ট সময়ে মাঠে ফাঁকা জায়গায় এই তিনটি বোম পোতা হতো, তারপর ম্যাচের কাঠি বা পিন দিয়ে প্রত্যেক বোমের ফুটোগুলো খুচিয়ে বারুদগুলো একটু আলগা করা হতো। এর বাইরে বারুদ দিয়ে লাইন করে তা নিরাপদ দূরত্ব পর্যন্ত নিয়ে আসা হতো। লাইনের শেষ মাথায় চুকু ভাই ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে আগুন দিতেন । বারুদ জ্বলতে জ্বলতে বোমের কাছে চলে যেতো, তারপর ফুটো দিয়ে আগুন প্রবেশ করতো বোমে। সঙ্গে সঙ্গে বিকট শব্দে বোম একের পর আর একটা ফুটতো। আমরা আনন্দে লাফিয়ে উঠতাম। রমজান মাসে ইফতারীর সময়েও চুকু ভাই এভাবে বোম ফোটাতেন, সবাই এই বোমের শব্দ শুনেই ইফতার করতেন। একই সময়ে আবার কালেকটরেট ভবন থেকে বাজানো হতো সাইরেন। ভোর রাতে সেহেরীর সময়ও সাইরেন বাজানো হতো।

এশার আজানের পর পরই আব্বা কাকা ও পাড়ার অন্যান্যরা কাচারী মসজিদে যেতেন তারাবীহর নামাজ পড়তে। নামাজ শেষে গভীর রাত্রিতে তারা ফিরতেন খোশগল্প করতে করতে। আমরা ছোটরা যেতাম শবে কদরের রাত্রিতে। সে রাতের তারাবীহর নামাজে গোটা মসজিদ ভরে যেতো। হাফেজ মুহম্মদের ইদ্রিসের সুললিত কন্ঠের কোর-আন তেলাওয়াত ও ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে তাঁর ওয়াজ নসিহত সকলে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতো, সেই সাথে তা অনুশীলন ও অনুসরণ করতো।

সেহেরীর সময়ে অন্ধ ভিক্ষুক ‘গোলাই’ তার ‘চোঙা’ ফুকিয়ে ডাক দিয়ে যেতো , কখনো গাইতো ‘জঙ্গনামা’ থেকে গজল। কারবালার স্মৃতি বিজড়িত সেই গজল সকলকে নিয়ে যেতো সেই সুদূর অতীতে । ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সবাই স্মরণ করতো শহীদ হযরত ইমাম হোসাইন ও তাঁর সঙ্গীদের, সেই সাখে ঘৃণা নিক্ষেপ করতো জালেম খুনী শাসকদের প্রতি। ‘ওঠ সেহেরী খানেওয়ালা’ ডাক শুনে সকলে জেগে উঠতো। রান্না সম্পন্ন করে সেহেরী খেতো সবাই। আমাদের বাড়িতে সেহেরীতে দুধ-ভাত ছিল রোজাদারদের জন্য আবশ্যিক খাবার।

আমরা প্রথম সাতাশে ও শেষ রোজা করতে পারলেই ধন্য মনে করতাম। তবে প্রতিদিন ইফতারীতে শামিল হওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। সারাদিন ভিজিয়ে রাখার পর ছোলা ভাজা হতো মরিচ পেঁয়াজ তেল লবন হলুদসহ মসলাদি দিয়ে। চিড়্ াভেজে তা আবার মরিচ পেয়াজ লবন ও সরিষার তেল দিয়ে মাখানো হতো। বেসন দিয়ে ভাজা হতো বেগুনী। এগুলো সমান ভাবে ভাগ করা হতো । সাথে থাকতো গোল করে কাটা আদা ও লবন। সেই সাথে থাকতো শরবত। এই শরবত প্রস্তুত করা হতো চিনি বা কুসুরের গুড় অথবা মিশরি দিয়ে , কখনো বা পাকা বেল দিয়ে। ইফতারীর আবশ্যিক উপাদান ছিল খোরমা, এগুলো জাঁতি দিয়ে কেটে ভিতরের বীচি বের করে পরিবেশন করা হতো। আব্বা নিজ হাতে এসব ইফতারী তৈরী ও পরিবেশন করতেন, তাঁকে সহায়তা করতেন মা। ছোট কাকাও এতে শামিল হতেন। ওজু করে পাক ছাপ হয়ে পাজামা পাঞ্জাবী পড়ে টুপি মাথায় দিয়ে ইফতারী করতে বসতে হতো। বোনেরাও একইভাবে আব্রু সম্মত পোষাক পড়ে মাথায় ওড়না জড়িয়ে সামিল হতেন ইফতার মাহফিলে । রমজান মাসে এটাই ছিল স্বাভাবিক চিত্র। এভাবে অপেক্ষায় থাকতাম উৎসব মুখর পবিত্র ঈদের।

কালের আবর্তনে রমজান আসে আবার যায় । মনে করিয়ে দেয় সেদিনের সেই মোহনীয় স্মৃতি। সেদিনের শিশুরা আজ মাতা পিতা হয়েছেন, কেউ হয়েছেন দাদা দাদী, নানা নানী। সেদিনের অধিকাংশ ময়মুরুব্বীগণ প্রয়াত। কিন্তু তাদের স্মৃতি ও শিক্ষা আমাদের হৃদয়ে চির জাগরুক।
মোবারক হো মাহে রমজান।
লেখকঃ সাবেক জেলা ও দায়রা জজ।
aniskamal44@yahoo.com