মালয়েশিয়ায় রাজনীতির নতুন খেলা

মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ড্রামা নতুন করে প্রকাশ্যে আসছে। ড. মাহাথির মোহাম্মদ ক্ষমতা হারানোর পর অনেকেই মনে করেছিলেন স্থিতিশীলতা আসবে রাজনৈতিক অঙ্গনে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে খেলা শেষ হয় নি। অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। মাহাথির মোহাম্মদের পাকাতান হারাপান (পিএইচ) সরকারেরর পতনের পর দেশবাসীর দৃষ্টি পড়েছে করোনা মহামারি মোকাবিলায়। কিন্তু সেখান থেকে নতুন করে আবার শুরু হচ্ছে। সোমবার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মুহিদ্দিন ইয়াসিন নেতৃত্বাধীন পেরিকাতান ন্যাশনাল (পিএন) সরকারের অধীনে প্রথম একদিনের পার্লামেন্ট অধিবেশন বসছে। মার্চে অনানুষ্ঠানিকভাবে পিএন জোট ক্ষমতায় আসে।
জবাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ মে মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রথম তুরুপের তাসটি চেলে দেন। তাতে প্রধানমন্ত্রী মুহিদ্দিনের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোটের প্রস্তাব করেন তিনি। তার এই আবেদন গ্রহণ করেন পার্লামেন্টের স্পিকার। কিন্তু দৃশ্যত রাজার উদ্বোধনী বক্তব্যের জন্য সীমিত আকারে একদিনের অধিবেশন বসছে সোমবার। তাই মাহাথিরের ওই প্রস্তাব দৃশ্যত আটকে দিয়েছে সরকার। পার্লামেন্ট অধিবেশন সীমিত করা হয়েছে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে। এ খবর দিয়েছে চ্যানেল নিউজ এশিয়া।

আবার কানকথা ছড়িয়ে পড়েছে যে, নিজের দল পার্টি প্রিবুমি বারসাতু মালয়েশিয়া (বারসাতু)-এর চেয়ারম্যান ড. মাহাথির মোহাম্মদ এবং দলের ডেপুটি প্রেসিডেন্ট মাহাথির মোহাম্মদের ছেলে মুখরিজ মাহাথিরকে বহিষ্কার করতে পারে দল। তবে এ বিষয়ে নিরপেক্ষ কোনো মাধ্যম থেকে কিছু নিশ্চিত হওয়া যায় নি। নতুন করে ক্ষমতার লড়াই যখন আবার শুরু হয়েছে তখন জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন কিছু রাজনৈতিক হেভিওয়েট ব্যক্তি। তারা হলেন, ড. মাহাথির মোহাম্মদ, মুহিদ্দিন ইয়াসিন, পার্টি কেদিলান রাকায়েতের (পিকেআর) আনোয়ার ইব্রাহিম ও ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের (ইউএমএনও) আহমদ জাহিদ হামিদি। বলা হচ্ছে তারা ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনা ভাইরাস মহামারিতে চমৎকার পারফরমেন্স করেছেন প্রধানমন্ত্রী মুহিদ্দিন ইয়াসিন। তা সত্ত্বেও তাকে প্রমাণ করতে হবে যে, পার্লামেন্টে তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। যদি না পারেন তাহলে নির্বাচন ছাড়া ‘পিছনের দরজা দিয়ে এসে সরকার গঠনের’ জন্য তিনি বড় রকম হোঁচট খেতে পারেন।
অন্যদিকে ড. মাহাথির মোহাম্মদ তার ক্ষমতায় থাকাকালীন সুবিধাগুলো হারিয়েছেন। এর ফলে তিনি পদত্যাগ করেছেন প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে। আর এর মধ্য দিয়ে পিএইচের প্রশাসন ভেঙে পড়েছে। বর্তমান যে পরিস্থিতি তা আনোয়ার ইব্রাহিমের জন্য অনুজ¦ল। তিনি বার বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কাছাকাছি যেয়েও পারেন নি। এখন দেখার বিষয় বারসাতু দলের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় প্রশাসনে খুব সামান্য ভূমিকা নিয়ে সমর্থন দিতে এগিয়ে আসে কিনা ইউএমএনও। এ অবস্থায় ইউএমএনও দলের পার্লামেন্ট সদস্য ও সাবেক উপমন্ত্রী নুর জাজলান মোহাম্মদ বলেছেন, অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তার উত্তম সমাধান হলো একটি যথাযথ জাতীয় নির্বাচন। ঠিক ্এই মুহূর্তে সোমবার মহামান্য রাজার ভাষণের ওপর যথাযথ বিতর্ক হওয়া উচিত নয়। কারণ, উদ্বেগ রয়েছে যে, ওই ভাষণ পার্লামেন্ট অনুমোদন নাও করতে পারে। ওই ভাষণ হলো ২০২০ সালের জন্য সরকারের মৌলিক এজেন্ডা। সমস্যাটা আরো জটিল হবে আরো পরে, যখন ২০২১ সালের বাজেট আসবে। যদি বাজেট পাস করাতে ব্যর্থ হয় সরকার, তাহলে তার অর্থ হবে তারা আস্থা ভোটে হেরে গেছে। তাই কঠোর লড়াইয়ের মাধ্যমে একটি যথাযথ নির্বাচন হতে পারে উত্তম সমাধান।

ওদিকে ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া সাবাহ-এর ড. লি কুওক তিউং বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী ২৫০০০ কোটি রিঙ্গিতের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। এ ঘোষণায় ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। এখন পর্যন্ত তার প্রশাসন গ্রহণযোগ্য। তাদের ক্ষমতার মেয়াদ মাত্র অল্প কয়েকদিনের। এ অবস্থায় সোমবারের পার্লামেন্ট অধিবেশনে বিরোধী পক্ষকে আগামী জুলাইয়ের অধিবেশনের ফাঁদে ফেলতে পারেন মুহিদ্দিন ইয়াসিন।
তবে ইউনিভার্সিটি সেইন্স মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর ড. আহমেদ ফাউজি আবদুল হামিদ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী যে পিছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন সেই ধারণাটাকে অতিক্রম করতে হবে তাকে। ফেব্রুয়ারিতে পিএইচ সরকার থেকে বারসাতুকে বের করে আনায় নেতৃত্ব দেন মুহিদ্দিন। তিনিই সাবেক ক্ষমতাসীন জোটের সঙ্গে হাত মেলান ক্ষমতা দখলের জন্য। ড. ফাউজি বলেন, একদিক থেকে দেখলে, এই সরকার ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে নি। আইনগতভাবে তার পার্লামেন্টের নি¤œকক্ষে এমপিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখানো উচিত। তার উচিত পার্লামেন্টের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে জবাবদিহি করা। ড. ফাউজি আরো বলেন, মুহিদ্দিন ইয়াসিন নেতৃত্বাধীন সরকার পার্লামেন্ট অধিবেশনের মেয়াদ সীমিত করে একদিনে আনার মধ্য দিয়ে তাদের বৈধতার প্রশ্নকে আরো জটিল করে তুলছে। ড. ফাউজির ভাষায়, আমরা আধুনিক সময়ে এবং বহু গণতন্ত্রের মধ্যে বসবাস করছি। সর্বশেষ বৃটেন যখন অনলাইনে পার্লামেন্ট অধিবেশন করতে পারে তাহলে আমাদের সমস্যা কোথায়? আমাদের এখানে কেন ওই পথে স্বচ্ছতা দেখানো হবে না?
রাজনৈতিক ভাষ্যকার ওহ ই সান বলেন, অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করতে মুহিদ্দিন রাজনীতির অন্য পাশ থেকে এমিপদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। তাদেরকে দলছুটে প্রলুব্ধ করতে পারেন।