হাজার মাসের রজনীর চেয়েও মহিমান্বিত রজনী :সা কা ম আনিছুর রহমান খান কামাল

একদা হযরত মুহম্মদ (সাঃ আঃ) সাহাবীদের সামনে বনী ইসরাইলের এক দরবেশের উল্লেখ করেন। উক্ত দরবেশ হাজার মাস আল্লাহর এবাদত ও জেহাদ করে দৈহিক ও আধ্যাত্মিক শক্তিতে বিশেষ শক্তিমান হয়েছিলেন। আখেরী জমানার মানুষের আয়ু কম। তাদের পক্ষে হাজার মাস অর্থাৎ ৮৩ বৎসর ৪ মাস উপাসনা ও সৎকার্যে উক্ত দরবেশের সমকক্ষ হবার সুযোগ খুবই কম। এই কারণে সাহাবীগণ দুঃখ প্রকাশ করেন। এই অবস্থায় মহান আল্লাহতা’লা সুসংবাদ প্রদান করে বলেন,‘ হে রসুল, আমি তোমার ও তোমার অনুগামী বিশ্বাসীদিগের জন্য এমন এক মহিমান্বিত রজনী নির্ধারিত করে দিয়েছি , যা হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর। সেই এক রজনী উপাসনা করলেই তারা সহস্র মাসাধিক কালের উপাসনার পুন্য পাবে।’ এই সু-খবরটি মূলতঃ সুরা কদরের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে।

এই উপমহাদেশে এই ‘মহিমান্বিত রজনী’কে ‘শবে-কদর’ বলে অভিহিত করা হয়। ‘এই রজনীতে মানবের এক বৎসরের ভাগ্যের পরিমাপ, সমগ্র জীবজগতের জীবন , মৃত্যু ও জীবিকা নিরূপন এবং বিশ্বজগৎ পরিচালনের জন্য সৌরকর, বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাত প্রভৃতি বিষয় নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। ’ ‘শবে-বরাতে’র রজনী মধ্য শা’বান তারিখে নির্ধারিত আছে। কিন্তু শবে-কদরের রজনী নির্ধারিত করে বলে দেওয়া হয় নাই। এই রজনীকে খুঁজে নিতে হবে মুমিন-মুমিনাদেরকে।প্রাচীন আমলের তফসিরকারগণ নির্দেশ করেছেন যে,‘সমগ্র কোরান শবে-কদরেই ‘লওহে-মাহফুজ’ থেকে প্রথম আকাশের ‘বায়তুল-ইজ্জত’ নামক স্থানে অবতীর্ণ হয় এবং তথায় শবে-বরাতে এর পার্থিব অবতারণের পরিমাণাদি নিরূপিত হয়েছিল’। ‘হযরত মুসা (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ) সুদীর্ঘ চল্লিশ দিন প্রার্থনা-উপাসনায় অতিবাহিত করে দেহ-মন বিশুদ্ধ করবার পর ঐশীবাণী ও পবিত্র আত্মার অনুগ্রহ লাভ করেছিলেন। কিন্তু কোরান নাজিলের ব্যাপারে সঠিক মাস ও তারিখ জানা নাই। এই মহাগ্রন্থ সুদীর্ঘ তেইশ বৎসর ধরে ক্রমে ক্রমে অবতীর্ণ হয়েছে। তথাপি এটা সম্ভব যে রমজান মাসের শেষে অথবা ২৭ শে রমজান তারিখে অমানিশার গভীর অন্ধকারেই হযরত মুহাম্মদ (সাঃ আঃ ) এর প্রতি প্রথম প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়েছিল। কারণ আধ্যাত্মিক জগতের জোৎস্না পুলকিত যামিনী অপেক্ষা অন্ধকার নিশিতেই অধিকতর ঐশী অনুগ্রহ অবতীর্ণ হয়ে থাকে।’

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রহঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, একবার রাসুলুল্লাহ (সাঃ আঃ) রমজানের প্রথম দশক এ’তেকাফ করলেন, অতঃপর মধ্যম দশক করলেন একটি তুর্কী তাবুতে । এ সময় একবার মাথা বের করে বললেন, আমি এ রাতের তালাশ করতে গিয়ে প্রথম দশকে এ’তেকাফ করেছি, অতঃপর মধ্যম দশকেও এ’তেকাফ করেছি । অতঃপর স্বপ্নে আমার কাছে কেউ এসে বলল , এটা শেষ দশকে। অতএব , যে ব্যক্তি আমার সাথে প্রথম দশকে এ’তেকাফ করেছে , সে যেন শেষ দশকেও এ’তেকাফ করে। নিশ্চয়ই তা আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছিল , কিন্তু পরে তা আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে মনে পড়ে আমি ঐ রাতে ফজরে নিজেকে পানি আর কাদার মধ্যে সিজদা করতে দেখেছি। অতএব তোমরা তা শেষ দশক রাতের মধ্যেই তালাশ করবে এবং বেজোড় রাত্রেই তালাশ করবে। আবু সাঈদ বলেন , সে রাতেই আকাশ বারি বর্ষণ করল, মসজিদ তখন ছাপড়া ছিল , অতএব ছাদ থেকে পানি পড়ল। তখন আমার এ দুটি চক্ষু রাসুলুল্লাহ (সাঃ আঃ)-কে দেখল তাঁর কপালে পানি ও কাদার দাগ লেগেছে, আর তা ছিল একুশ তারিখের সকাল। (বুখারী ও মুসলিম)। তবে আবদুল্লাহ ইবনে উনাইসের বর্ণনায় তেইশ তারিখের সকালের কথা বলা হয়েছে। (মুসলিম)। (মেশকাত শরীফ ঃ হাদিস নং ঃ ১৯৮৬) ।
তাবেয়ী যির ইবনে হুবাইশ (রহঃ) বলেন, একবার আমি হযরত উবাই ইবনে কা’বকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার ভাই হযরত আবদুল্লøাহ ইবনে মাসউদ বলেন, যে সারা বছর ইবাদতে রাত জাগরণ করে , সে অবশ্যই শবে কদর লাভ করবে। হযরত উবাই বলেন , আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন! তিনি এর দ্বারা বুঝাতে চেয়েছেন, যে যাতে লোক এর উপর ভরসা করে বসে না থাকে। অন্যথায় তিনি নিশ্চয় জানেন , যে তা রমযানে এবং রমযানের শেষ রাতেই এবং তা সাতাশের রাতেই। অতঃপর হযরত উবাই দৃঢ়ভাবে শপথ করে বললেন, তা নিশ্চয়ই ২৭ তারিখ রাতেই। তিনি বলেন , আমি বললাম , হে আবু মুনযির ! আপনি কোন সূত্রে তা বলেন ? তিনি বললেন , রাসুলুল্লাহ (সাঃ আঃ) আমাদেরকে যে আলামত বা নিদর্শন বলে দিয়েছেন সে সূত্রে। তিনি বলে দিয়েছেন, কদরের রাতের পর সকালে সূর্য উঠবে অথচ তার কিরণ থাকবে না। (মুসলিম)। (মেশকাত শরীফ ঃ হাদিস নং ঃ ১৯৮৭) ।

হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেন, আমি শুনেছি , রাসুলুল্লাহ (সাঃ আঃ) বলেছেন, তাকে অর্থাৎ শবে কদরকে তালাশ করবে রমযানের নয় রাত বাকি থাকতে, অথবা সাত রাত বাকি থাকতে, অথবা পাঁচ রাত বাকি থাকতে অথবা তিন রাত বাকি থাকতে অথবা শেষ রাতে। অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ শে রাতে)। (তিরমিযী)। (মেশকাত শরীফ ঃ হাদিস নং:১৯৯১) ।

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন , রাসুলুল্লাহ (সাঃ আঃ) বলেছেন, তোমরা শবে কদর তালাশ করবে রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে। (বুখারী)।(মেশকাত শরীফ ঃ হাদিস ন:১৯৮৩)।

এই মহিমান্বিত রজনীতে হযরত জিবরীল (আঃ) ও অন্যান্য ফেরেশতাগণ আল্লাহতা’লার আদেশে দলে দলে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন । তাঁরা প্রভাত পর্যন্ত আল্লাহর নির্দেশিত সকল কার্যাদি সম্পাদন করেন এবং বিশ্বাসী নর-নারীদের গৃহে গমনপূর্বক তাদের প্রত্যেককে আল্লাহর তরফ থেকে সালাম ও শান্তিবাণী জ্ঞাপন করেন। তবে মদ্যপায়ী , শূকর-মাংসভোজী, শরিকের ন্যায্য পাওনা লুন্ঠন ও অনুরূপ অন্যান্য কার্যাদির মাধ্যমে আত্মীয়-স্বজনদের সাথে অসদ্ব্যবহারকারী নর-নারীরাই এই সালাম ও শান্তিবাণী থেকে বঞ্চিত হয়। এই পবিত্র রজনীতে ঝড়-ঝঞ্ঝা , বজ্রপাত ও ভুমিকম্প প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিপদ থেকে আল্লাহ-তা’লা পৃথিবীকে মুক্ত রাখেন। এই রাতে পৃথিবীতে কোন অশান্তিকর ঘটনা ঘটে না। বরং এই রজনীর প্রভাত পর্যন্ত সমগ্র জগৎ ব্যাপি এক অনাবিল শান্তি ও ¯িœগ্ধতা বিরাজ করে। এই মহিমান্বিত রজনীকে আল্লাহপাক মুমিনদের জন্য গোপন রেখেছেন। তাঁদেরকেই সন্ধান করে এই রাত্রিকে খুঁজে নিতে হবে।

রমজান মাসের শেষ দশকের বে-জোড় রত্রি সমূহে এই রাত্রির সন্ধান পাওয়া যাবে বলে বিশ্বাস করা হয়। অভিজ্ঞতার আলোকে ২৭ শে রমজানের রাত্রিকেই ‘শবে-কদর’ বলে পালিত হয়। বাংলাদেশে এই দিনটিতে যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় উদযাপন করা হয়। ছাব্বিশে রমজানের ইফতারীর পর থেকেই মুসলমানগণ মসজিদে গমন করেন এবং সারারাত ধরে ইবাদত-বন্দেগী করেন। মুসলমান রমনীগণ নিজ নিজ বাড়িতেই একইভাবে রাত্রি জেগে ইবাদত-বন্দেগী করেন। বরিশালের ‘গুঠিয়া বায়তুল আমান জামে মসজিদে’ , ঝিনাইদহের ‘সার্কিট-হাউস মসজিদ’সহ দেশের যে সকল মসজিদে মহিলাদের নামাজে অংশগ্রহণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে, সে সব মসজিদে মুমিনাগণও পর্দা মেনে মুমিনদের সাথে ইবাদত-বন্দেগীতে শরীক হন। এই রজনীতেই তারাবীহতে কোরান পাঠ পূর্ন করা হয় এবং বিশেষ মোনাজাত করা হয়, সকল মুমিন-মুমিনা এতে শরিক হন। ছাব্বিশে রমজান অপরাহ্ন হতেই অফিস-আদালতে ছুটির আমেজ শুরু হয়। এই মহিমান্বিত রজনীতে ইবাদতে অংশগ্রহণের সুযোগ চেয়ে আদালতে কোন কোন আসামীর জামিন আবেদনও করা হয়। ২৭শে রমজান দিনে সরকারী ছুটি পালিত হয়।

এরপরও আমাদের দেশে জুয়া ( লটারী, র‌্যাফেল ড্র, হাউজি, কাচ্চু, তিন তাস ইত্যাদি নামে) ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কারো কারো মাঝে প্রচলিত হয়েছে। এদের কেউ কেউ মাদক ও গণিকায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। কতিপয় অসৎ রাজনীতিবিদ, অনৈতিক চরিত্রের আইন-কর্মকর্তা ও অর্থলোলুপ আমলার পারস্পরিক যোগসাজসে সারা দেশে এই অনৈসলামিক আচার-আচরণ ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছ্ তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। প্রচার মাধ্যমে প্রায়নগ্ন বা অর্ধনগ্ন নারীদের নিয়ে পণ্যের বিজ্ঞাপন-চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। কোন কোন প্রচার মাধ্যমে ঘোষক-ঘোষিকাগণ দর্শক-শ্রোতাদের প্রতি সৌজন্যমূলক সালাম না দিয়েই অনুষ্ঠান শুরুর ঘোষণা, সঞ্চালনা বা সমাপ্তি ঘোষণা করছেন। এদের কারো কারো পোষাক পরিচ্ছদও ধর্মীয় ও নৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত আপত্তিকর। সরকারী দফতরের প্রায় প্রতিটি রন্ধ্রে প্রকাশ্যে চলছে ঘুষের লেনদেন। অপ্রতিরোধ্য গতিতে চলছে দুর্নীতি।

বর্তমানে করোনার কারণে গরিব অসহায় নিঃস্ব মানুষের মধ্যে বিতরণের জন্য ত্রাণ সামত্রী তছরূপের ঘটনা ব্যাপকভাবে সারা দেশেই ঘটছে , কেউ কেউ আবার নিজ উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ করতে যেয়ে ঝোলার গায়ে নিজের নাম পদবী ছবি উত্তকীর্ণ করে দিচ্ছে : সংযুক্ত তহবিল থেকে যে সকল ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে তাতেই এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে , এর সবই মহিমান্বিত রজনীর চেতনার পরিপন্থি। সুরা বাকারায় বর্ণিত নির্দেশনা ত্রাণ বিতরণকারী ব্যক্তি ও সরকারী কর্মকর্তাগণ এক্ষেত্রে অনুসরণ করতে নারাজ হলেও নিজেদেরকে মুসুল্লী বলে পরিচিত করতে কথা ও পোষাকে অত্যন্ত সতর্ক ও কেতা দুরস্থ । তবে মহান আল্লাহর নির্দোশত পথ অনুসরণ করে গোপনে ত্রাণ বিতরণকারী মুমিন মুমিনার সংখ্যাও অনেক। এর পাশাপাশি আবার মসজিদে মুসুল্লির সংখ্যা বাড়ছে, সোমত্থ মেয়েদের মাঝে পোষাক হিসাবে হিজাব জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তারপরও মুসলমান নর-নারীর মধ্যে প্রাগুক্ত মতে জুয়ার প্রচলন, মাদক ও গণিকার প্রতি আসক্তি, নগ্নপনা, অনৈতিক জীবন-যাপন জনগণের জন্য উদ্বেগের কারণ। সীমান্ত পথে ¯্রােতের বেগে আসছে ফেনসিডিল, ইয়াবা জাতীয় মাদক । হাল আমলে শুরু হয়েছে ‘কোকেন’ এর আনাগোনা। যা নৈতিকতা, মেধা ও সর্বোপরি জীবন বিধ্বংসী। দেশের যুবক-যুবতীগণ এই সব মাদকের ছোবলে পর্যুদস্ত। এই পরিস্থিতির অবসানের মাধ্যমেই মহিমান্বিত রজনীর সওগাতের সৌরভ আমাদের জীবনকে করবে আলোকিত, বর্ণাঢ্য ও পূত-পবিত্র। যা হবে আমাদের ইহকাল ও পরকালের দুর্লভ পাথেয়।
লেখক ঃ সাবেক জেলা ও দায়রা জজ। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ‘ডিসিপ্লিনারী
প্যানেলে’র সাবেক সদস্য। বর্তমানে সদস্য , বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতি
( পরিচিতি নং ঃ ৫৮৯৪ ) । কার্যকরী সভাপতি এবং সদস্য স্থায়ী কমিটি , জাতীয়
সমাজতান্ত্রিক দল , জে এস ডি , জাতীয় কার্যকরী পরিষদ ।