আমি, ‘৭২ এর জাসদের পূণর্গঠন চাই :আহমেদ ফজলুররহমান মূরাদ

“শ্রেণী সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে এদেশের উপযোগী বিজ্ঞানভিত্তিক একটি শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে – রাজনীতিতে সক্রিয় এবং নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীন নিষ্ক্রিয় নেতা-কর্মীদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, কর্মসংস্থান এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চার নিশ্চয়তা সহ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত, সুশৃঙ্খল ও সুসজ্জিত জাসদের এক বিরাট কর্মী বাহিনী চাই। কৃষি, শিল্প ও প্রযুক্তিগত উৎপাদন, বিপণন এবং ভোক্তার নীতি সংবলিত কর্মসূচি প্রণয়ন করে, সকল শ্রেণী-পেশায় ছায়া সরকার পদ্ধতিতে রাষ্ট্রের সকল স্তরে প্রতিযোগিতা মূলক অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে অসমাপ্ত জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম শেষ করতে চাই।”
মন্তব্যটি আমার নয় এটা করেছে আমার এক সহযোদ্ধা ছোট ভাই ।তবে আমি তার মন্তব্যের সাথে একমত । অবশ্য এই মন্তব্যে অনেকেই বিরূপ মনোভাব পোষণ করে মতামত দিচ্ছেন । এটা তাদের হতাশাপূর্ণ চিন্তার বহিঃপ্রকাশ । মাঝে মাঝে মনে হয় জাসদ যে ভাবে ৭২-৭৯ পর্যন্ত প্রথমে ছাত্র তরুন পরে আমজনতার সমর্থন পেয়েছিলো সে আবেগ আর নিষ্ঠাবান কর্মী সমর্থক দিয়ে গনতন্র, কল্যানমুখী সমাজ দেশ করা যেতো।কিন্তু বর্তমানে জটিল পরিস্হিতিতে মাঠে ময়দানে সেই রকম ত্যাগী,সাহসী রাজনীতিক কেউ কি মাঠে ময়দানে দেখেন? এদেরকে খুজে বের করতে হবে।সারাদেশে এখনো জাসদের হাজার হাজার পোড় খাওয়া নেতাকর্মী কেউ সক্রিয় আবার কেউ নিস্ক্রিয় হয়ে বসে আছে।কিন্তু তাদের কেউ চালচুরি,তেলচুরি,চিনিচুরি বা কোন দুর্নীতির আশ্রয় নেয় নাই।তাদেরকে খুজে সক্রিয় করা কি খুবই অসম্ভব?
প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের সফলতা – ব্যর্থতা থাকে, উত্থান -পতনও আছে। সেটা জাসদেরও আছে।এদলের আছে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস, জীবন দিয়ে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার অহংকার। বিপন্ন গনতন্ত্র পুনঃউদ্ধারে আপোষহীন লড়াইয়ের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে আপোষহীন লড়াইয়ে অকাতরে জীবন উৎসর্গ করার গৌরবদীপ্ত অহংকার। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও দলীয় সন্ত্রাস মোকাবিলা করার আপোষহীন লড়াইয়ের ইতিহাস। বিপন্ন মানবতার পাশে দাঁড়ানোর উজ্জ্বল চিত্র। অন্যায়ের সাথে আপোষ না করে হাসতে হাসতে ফাঁসির দড়িকে আলিঙ্গন করার সাহসী ও গৌরবময় ইতিহাস।
আমাদের দলীয় নেতাদের দ্বন্দ্ব সংঘাত, অপরিপক্কতা, বিশ্বাস, অবিশ্বাস অদূরদর্শিতা , আভ্যন্তরীন কলহ, দলভাঙ্গার কারণে,কিছু নেতার এদিক ওদিক দৌড়ানোর জন্য, আমরা সংগ্রামের ফসল ঘরে তুলতে পারিনি । এটা দলের জন্য যেমন কলংক, জাতির জন্য তেমনি দূর্ভাগ্যজনক। কারণ একটি আপোষহীন গনতান্ত্রিক শক্তির উত্থান বছরে বছরে হয়না,এটা হতে সময় লাগে, সেই শক্তি বা দল ভুল করলে, দল, জাতি ও দলের নেতাকর্মীদের মাসুল দিতে হয়। এবং আমরা সেটা দিচ্ছি!
আজকের তরুন যুবক ও ছাত্ররা আমাদের সংগ্রামের ইতিহাস ভুলতে বসেছে। এর কারণও আছে, যখন যারা ক্ষমতায় থাকে তারা সবসময়ই সম্পূর্ণ বিকৃত বা আংশিক বিকৃত ইতিহাস জাতির সামনে হাজির করে থাকে। কিনতু উনারা জানেন যে, ইতিহাস এর দেয়ালে শেওলা লাগে না , সত্য একদিন বেরিয়ে অাসবেই। এটাই ইতিহাসের অমোঘ বিধান! । তরুণ প্রজন্ম মনে করছে এই দলটির দেশ গঠনে, গনতান্ত্রিক সংগ্রামে,সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সংগ্রামে বা আমাদের জাতির অহংকার ও সবচেয়ে গৌরবের বিষয় মহান মুক্তিযুদ্ধে কোন অবদান নেই।বর্তমানে আওয়ামীলীগের তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করছে এবং আওয়ামীলীগ করুণা করে ঐক্যে রেখেছে। তাছাড়া সরকারি দল সেরকমই প্রচার করে থাকে!
আজকের এই উপলব্ধি থেকে আমাদের অনেকের অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে। মহামতি লেনিন বলে গেছেন “ভুল ও পরাজয় ছাড়া কক্ষনো শিক্ষা সম্পুর্ণ হয় না”।আমাদেরকেও এ উপলব্ধি থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগুতে হবে।কোন বুর্জোয়া রাজনৈতিকদলের লেজুড়বৃত্তি ও, আপোষকামীতা, বামবিচ্যুতি বা সুবিধাবাদের নামান্তর। আমাদের এখান থেকে মুক্ত হতে হবে।তবেই আমরা আমাদের রাজনৈতিক আদর্শিক ধারায় ফিরতে পারবো।।
মনে রাখতে হবে জাসদের সৃষ্টি সময়ের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা এবং প্রয়োজনীয়তায়। গদবাধা কিছু কথা তড়বড় করে বলে গেলেই সব সত্য বলা হয়ে যায় না। উপমহাদেশের সব রাজনৈতিক দলেরই অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহনই দল, জনগন, রাষ্ট্র, সরকারের নিজের চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছ। জাসদের ভুল আছে, সেই সাথে আছে সংগ্রাম এবং সাহসের সাথে বৈরী শাসনের বিরুদ্ধে নির্ভিক জিবনদানের হিরন্ময় ইতিহাস। ৭৪-৭৫ পর্যন্ত ও পরবর্তীতে সবাই ক্ষমতার দালালী করেছে, এখনও দালালের কমতি নাই। জাসদের মতো একটি আগুনঝরা সময়ের রাজনৈতিক দলের চুড়ান্ত মুল্যায়ন বোদ্ধা রাজনৈতিক বিশ্লেষকগন একদিন নির্মোহ দৃষ্টিতে অবশ্যই করবেন। তাই বলে কি আমাদের কিছুই আর করনীয় নেই? আমরা কি সবাই হাত পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকবো?
আজকে দেশে হচ্ছে কি? আর কি আমাদের দেখতে হবে? লুটেরাগোষ্টি আজকে দেশটা গিলে ফেলেছে।তাদের অপরাধে আজ মানুষের জীবন বিপন্ন। জালিয়াত চক্র আজকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গায় হানা দিয়েছে। কতটা ভয়ঙ্কর হলে প্রধানমন্ত্রীর নথি জালিয়াতি করতে পারে ছাত্রলীগের নেতা। চাল চোর,তেল চোর,চিনি চোরের ইতিহাস নাই বা বললাম। ইতিহাসে এই প্রথম চুরির অপরাধে প্রায় ৫৪ জন চেয়ারম্যান ও, ৮৭ জনমেম্বার বরখাস্ত।এরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছেন এর বাইরে রয়ে গেছে অগনিত হাজারো ঘটনা। টিসিবির তেল চুরি করে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি গ্রেফতার হয়। নষ্টরাজনীতির জমানায় অজানা থাকে কত ভয়ংকর ঘটনা।কত বাটপার প্রতারক বহাল তবিয়তে বাস করে, দাপটে হাটে সমাজে।কত ভয়াবহ দুর্নীতি করে অঢেল অর্থ সম্পদ বানিয়ে কতজন পার পায়। সমাজ দাবড়িয়ে বেড়ায়।অনেকে তাদের পিছনে হাটে।সমীহ করে! সমর্থনও করে! ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশ একটি নিবর্তনমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে যেখানে প্রচলিত ক্ষমতাবান ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর প্রাধান্য একচ্ছত্র হবে।। রাজনৈতিক ভাবাদর্শ চর্চা বন্ধ হয়ে গেলে ক্ষমতাসীন দল বা যে কোন সামাজিক শক্তি কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ফলে রাষ্ট্র হয়ে পড়ে গতিহারা।—।
জনগনের কণ্ঠ আজকে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।আমরা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে এ দেশ কি এই অবস্থা দেখার জন্য স্বাধীন করেছিলাম।চারিদিক এক অজানা ভয়ের আতংক। কেউ সত্য উচ্চারণ করতেও সাহস করছে না।।এর থেকে মুক্তির কি কোন পথ নেই? যাদেরকে সিপাহশালার বানিয়েছিলাম তারাও এখন সবাই এক একটা ভাড়।তাদেরকেও আর জনগন বিশ্বাস করে না।আপোষকামীতা,লেজুড়বৃত্তি আর সুবিধাবাদ তাদের কিনে নিয়েছে।।আমি এটা মানতে পারছি না।আমি তাই মুক্তির পথ খুঁজতে চেষ্টা করছি।।আমি আপনাদের সবাইকে নিয়ে নুতন প্রজন্মের সমন্বয়ে লড়াই করতে চাই।। আমি ১৯৭১ এ জানতাম একটি গুলি লাগলেই আমার মৃত্যু হবে।তারপরও কি আমি যুদ্ধ ছেড়ে পালিয়েছি?? আমার স্বাধীন করা দেশ আমার প্রতিবাদ চলবেই।। আমি মনে করছি এমনি হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধার হাতে গড়া দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল প্রতিবাদ না করে চুপ থাকতে পারে না।তাদেরকে আবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে ৭২এর চেতনায় ঘুরে দাঁড়াতেই হবে।এটা এখন সময়ের দাবি।।