ভার্চুয়াল বিচার ব্যবস্থার যুগে বাংলাদেশ যেভাবে চলবে বিচার কার্যক্রম

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগসহ সারা দেশের অধস্তন আদালতে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে অনলাইনে আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সোমবার সকাল থেকে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে আবেদন দাখিলের মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু হয়। দেশের বিচারাঙ্গনে এই প্রথম ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে বিচার কার্যক্রম শুরু হলো। করোনা পরিস্থিতির কারণে থমকে থাকা বিচার ব্যবস্থায় জরুরি গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো নিষ্পত্তি করতে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সোমবার দুপুর তিনটা পর্যন্ত বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেনের আদালতে তিনটি আবেদন দাখিল হয়েছে। অন্য দুটি বেঞ্চে এই সময় পর্যন্ত কোনো আবেদন দাখিল হয়নি বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির ভার্চুয়াল আদালতে জামিন আবেদন দাখিল করেছেন। তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমরাই প্রথম ভার্চুয়াল আদালতে দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক আবুল আসাদের জামিন আবেদন দাখিল করেছি।
মেসেজ দিয়ে আমাকে জানানো হয়েছে আবেদনটি দাখিল হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মামলার জামিনের শুনানি কবে হবে, তা জানানো হয়নি। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের স্পেশালিস্ট অফিসার ব্যারিস্টার মো. সাইফুর রহমান বলেন, আজ থেকে ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আদালত নিয়মিত টাইমে চলবে। তবে কয়টা মামলার আবেদন সমূহ ভার্চুয়াল আদালতে দাখিল হয়েছে, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য তিনি জানাননি। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা বলেন, করোনাকালে ভার্চুয়াল বিচার ব্যবস্থায় প্রবেশ করলো বাংলাদেশ। আর এ জন্য ফৌজদারি, দেওয়ানি এবং কোম্পানি, রিট ও অন্যান্য বিষয়ের আবেদন শুনানির জন্য তিনটি এজলাস স্থাপন করা হয়েছে। তিনি জানান, এইসব আদালতে শুনানির জন্য ইমেইলের মাধ্যমে আইনজীবীদের আবেদন করতে হবে। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এডভোকেট মমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, ভার্চুয়াল আদালতে আমাদের ২০-২৫ জন সরকার পক্ষের মামলা পরিচালনার জন্য তালিকা করা হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল নির্দেশক্রমে তারা মামলার শুনানিতে অংশগ্রহণ করবেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো মামলার শুনানির জন্য এটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকে নোটিশ আসেনি। কথা হয় সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, ভার্চুয়াল আদালতে দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক আবুল আসাদের জামিন ফাইলটি দাখিল করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ের আমাদের দাখিলকৃত আবেদনটির শুনানি শুরু হবে বলে আশা করছি। এর আগে, গত ৯ই মে আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ, ২০২০-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করেছেন প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ। এর ফলে খুলে যায় ভিডিও কনফারেন্সসহ ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার পথ। রোববার (১০ মে) প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারপতিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ফুলকোর্ট সভায় ভিডিও কনফারেন্সে মামলা শুনানির জন্য চেম্বার জজ ও হাইকোর্টের তিনটি ভার্চুয়াল বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে। এছাড়াও আপিল শুনানির জন্য পৃথক একটি বেঞ্চ নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভার্চুয়াল কোর্ট কীভাবে শুনানি গ্রহণ করবেন, আদেশ বা রায় দেবেন, আইনজীবীরা কোথায় আবেদন বা মামলা দাখিল করবেন, এসব বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট জারি করেছে ১৪ দফা প্র্যাকটিস নির্দেশনা। প্র্যাকটিস নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোন আবেদনটি জরুরি তা সংক্ষিপ্তভাবে এক পৃষ্ঠার মধ্যে লিখে সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চের বেঞ্চ অফিসারের ই-মেইলে পাঠাতে হবে আইনজীবীকে। বেঞ্চ অফিসার তা ই-মেইলের মাধ্যমেই বিচারপতির কাছে উপস্থাপন করবেন। অনুমতি পাওয়ার পর ই-মেইলেই আবেদন দাখিল করতে হবে। সেক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মানতে হবে। নিয়ম মেনে আবেদন করার পর তার কপি পাঠানো হবে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে। এরপর শুনানির সময় নির্ধারণ করে অনলাইন কার্যতালিকা প্রকাশ করা হবে। কার্যতালিকায় দেয়া সময় অনুযায়ী শুনানি হবে। মামলার গুরুত্ব অনুযায়ী শুনানির দিনক্ষণ নির্ধারণ করবেন বিচারক। মামলার আবেদন ও দাখিলকৃত নথির একটি প্রিন্ট কপি সংরক্ষণ করতে হবে। যেদিন শুনানি হবে সেদিন মামলার সকল পক্ষের আইনজীবীরা সশরীরে নয়, ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে ভার্চুয়াল শুনানিতে অংশ নিবেন। বিচারক ও আইনজীবীকে যথাযথ পোশাক পরিধান করতে হবে। শুনানির পর মামলার রায় বা আদেশের অনুলিপির স্ক্যান কপি ই-মেইলে পাবেন আইনজীবীরা। আদালত পরিচালনা করতে গিয়ে কোনো অসুবিধা হলে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করতে পারবেন।
তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধু ভার্চুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে আপিল বিভাগে বিচার কার্য পরিচালনার জন্য বিচারপতি মো. নুরুজ্জামান চেম্বার জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি আগামী ১৪ই এপ্রিল ও ২০শে এপ্রিল সাড়ে ১১টা থেকে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধু ভার্চুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে চেম্বার কোর্টের শুনানি গ্রহণ করবেন।
এছারা, হাইকোর্টের গঠিত তিনটি বেঞ্চে বিচারিক দায়িত্ব পালন করবেন-বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের একটি বেঞ্চ। এ বেঞ্চে খুব জরুরি সব প্রকার রিট ও দেওয়ানি মোশন এবং এ সংক্রান্ত আবেদনপত্র গ্রহণ ও শুনানি হবে। এই বেঞ্চের আবেদন সমূহ পাঠাতে হবে [email protected] ই-মেইলে প্রেরণ করতে হবে। বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেনের বেঞ্চে খুব জরুরি সব ধরনের ফৌজদারি মোশন ও এ সংক্রান্ত জামিনের আবেদনপত্র গ্রহণ ও শুনানি হবে। এই বেঞ্চের আবেদন সমূহ পাঠাতে হবে [email protected] ই-মেইলে প্রেরণ করতে হবে। এছাড়া বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের বেঞ্চে অন্যান্য মামলার শুনানির জন্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এই বেঞ্চে আবেদন সমূহ পাঠাতে হবে [email protected] ই-মেইলে। ইতোমধ্যে আইনজীবীরা আবেদন সমূহ প্রেরণ করার জন্য রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে এবং কেউ কেউ আবেদনপত্র প্রেরণ করা শুরু করেছে।