বিশ্বরাজনীতি যাবে কোন দেশের দখলে?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ইউরোপীয় শক্তির তুলনায় পিছিয়ে ছিল আমেরিকার সামরিক শক্তি। পরবর্তী সময়ে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে শিল্পায়নের উদ্যোগ ও বিকাশ ঘটায় আমেরিকা। ফলে ইউরোপ মহাদেশে শ্রমজীবী মানুষের আগমন ও বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিল্প শক্তিধরে পরিণত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে বিশ্বরাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সমরে যুক্ত বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক দাঙ্গার উদয় হয়, আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় আমেরিকা। বিশ্বরাজনীতিতে একক পরাশক্তি হিসেবে অত্মপ্রকাশ করে এর মধ্য দিয়ে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চিত্রটা পালটে যায়। বিশ্বরাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে আরেক পরাশক্তি হিসেবে যোগ হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। স্নায়ুযুদ্ধে দুই পরাশক্তি পরোক্ষভাবে অস্ত্র প্রতিযোগিতা, স্পেস রেস, প্রক্সিযুদ্ধ এবং প্রচার-প্রচারে মুখোমুখি অবস্থানে আসে।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নকে হটিয়ে আমেরিকা স্নায়ুযুদ্ধের অবসানে বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে টিকে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল কমিউনিজমের বিস্তার বন্ধ করা, একক পরাশক্তি ধরে রাখা।

আসন্ন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহলে পুনরায় স্নায়ুযুদ্ধের উত্থান ঘটে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী নোভেল করোনা ভাইরাসকে ঘিরে। মহামারি ভাইরাস কোভিড-১৯ পরিস্থিতির পূর্বেই চীন-আমেরিকা রেষারেষি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে বাণিজ্যযুদ্ধকে কেন্দ্র করে, চীনা পণ্যের ওপর শুল্কারোপের মাধ্যমে। তাইওয়ানকে দখলে নিতে চায় বেইজিং। তাইওয়ান ও চীনের মাঝে নাক গলালে ছেড়ে কথা বলবে না আমেরিকাকে, হুঁশিয়ারি চীনের।

১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের সূত্রপাত ভোকালাম অঞ্চল। আমেরিকার মতো মহাশক্তিধর রাষ্ট্রের সাহায্য পেয়েও ভারত ’৬২-এর যুদ্ধে কেন পরাজিত হলো, তা নিয়েও আছে অনেক জল্পনা-কল্পনা। কমিউনিস্ট রাষ্ট্র চীন যখন ভারতের ওপর হামলা চালায়, চীনের বিরুদ্ধে এগিয়ে আসে আমেরিকা। আমেরিকাকে রুখে দিতে অন্য কমিউনিস্ট রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবাতে ক্ষেপণাস্ত্র পাঠায়। এমতাবস্থায় বিশ্বরাজনৈতিক মহল আশঙ্কা করেছিল পারমাণবিক যুদ্ধের। আশঙ্কার সমাপ্তি ঘটে।

করোনা-পরবর্তী বিশ্বরাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একক পরাশক্তি হিসেবে গুনবে কি না, এ নিয়ে পালটাপালটি মন্তব্য করছে আন্তর্জাতিক মহল। করোনা মোকাবিলায় ওয়াশিংটনের দুর্বলতার ছাপ ফুটে উঠেছে বিশ্ব রাজনৈতিক মহলে। ওয়াশিংটনকে পরাশক্তি বললেও একক পরাশক্তি বলা যায় না গত দুই দশকের প্রেক্ষাপটে।

চীন, রাশিয়ার মতো শক্তিশালী দেশগুলো অনবরত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে ওয়াশিংটনকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর গঠিত রাশিয়ায় দুর্বল নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে আগ্রাসী ভাব না হলেও যুক্তরাষ্ট্রকে এখন টেক্কা দিচ্ছে মস্কো। বেইজিং বিশ্ব অর্থনীতিতে অনেক এগিয়ে গেছে, পেছনে ফেলেছে ওয়াশিংটনকে। উত্তর কোরিয়া আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বৈরীভাবাপন্ন, অন্যদিকে মিত্রদেশ চীন। বিশ্বের অন্যতম পারমাণবিক শক্তিধর উত্তর কোরিয়া যুদ্ধের হুমকিতে ভয় পায় না আমেরিকার।

২০১৮ সালের বৈঠকে মীমাংসায় চলে আসে ট্রাম্প প্রশাসন আর উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। প্রাণঘাতী ভাইরাসের ছোবলে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে, ঠেকাতে টালটামাল অবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের। অর্থনীতির শক্ত কাঠামো দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে পড়ছে, সুবিধা নিচ্ছে চীন।

আমেরিকায় পুনরুত্থান হচ্ছে ২০০৭ সালের অর্থনৈতিক সংকট। যুক্তরাজ্য বিশ্বরাজনীতি থেকে ছিটকে পড়েছে বহু আগেই। ওয়াশিংটন একদিকে হিমশিম খাচ্ছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে, অন্যদিকে ছক কষছে চীনের বিরুদ্ধে। ‘ফাইভ আইস’ নামে গোয়েন্দা জোট গঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও কানাডার সমন্বয়ে।

সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের (SMH) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের উহান শহরের ‘উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি’ (WIV) ল্যাব থেকে ভাইরাস গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণের খোঁজে গোয়েন্দা জোট।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্প বলেন, ‘মনে রাখবেন, চীনের কিন্তু ভাইরাস ছড়ানোর ইতিহাস রয়েছে।’ চীনা সরকার অভিযোগ ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আধিপত্য বিস্তারে। ওয়াশিংটন আধিপত্য ধরে রাখতে যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে চীনকে। এ যেন বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে পালটাপালটি হামলায় রূপ নিচ্ছে দুই দেশের স্নায়ুযুদ্ধ।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন যুদ্ধ পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে আমেরিকার বিপক্ষে দাঁড়াবে রাশিয়া, ইরাক ও উত্তর কোরিয়ার মতো শক্তিশালী দেশগুলো। বোঝাই যাচ্ছে, ক্ষীণ সম্ভবনা নিয়েই ঘুরপাক খাবে বিশ্বের রাজনীতিবিদদের গোলটেবিলে, চীনের অর্থনৈতিক কাঠামো বাধা হয়ে দাঁড়াবে যুদ্ধের পরিকল্পনায়।

অন্যদিকে, চীনের কর্মকাণ্ড একক পরাশক্তির দিকেই যেন ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংকটাপন্ন দেশগুলোতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বন্ধুত্বসুলভ আচরণ ও আধিপত্য বিস্তার, যা বিশ্বরাজনীতিতে একক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের মহামন্ত্র। ওয়াশিংটন আধিপত্য ধরে রাখতে কী কৌশলগত পদক্ষেপ অবলম্বন করে, শুধু দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব।
লেখক :অজিত মনি দাস
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়