আ ফ ম মাহাবুবুল হকের সাথে কয়েক ঘন্টা,একটি স্মৃতি চারন:নেতা বাবুল

স্বাধীনতা পূর্ববর্তীকালে বাংলাদেশের অনেক নেতার ভাষন সামনা সামনি শোনার আমার ভাগ্যে জুটেছিল সবুর খান, ফকা চৌধুরী , শেখ মুজিবর রহমান, আসম আবদুর রব , আবদুর রাজ্জাক সহ বেশ কয়েকজন তখনকার জাতীয় ও ছাত্র নেতা অন্যতম। স্বধীনতা পরবর্তীকালে অনেক নেতার বক্তব্য সামনা সামনি শুনেছি , যাদের বক্তিতা বা ভাষন আমাকে আন্দোলিত করেছে, তার মধ্যে শ্রী বিধান কৃষ্ণ সেন, আবদুর রাজ্জাক, রায়হান ফেরদোৌস মধূ, মাহফুজুল হক মাধু চাচা, মোস্তাফিজুর রহমান এমপি, আফম মাহবুবুল হক ও সাম্প্রতিক সময়ে আবদুল মালেক রতন অন্যতম। , বংগবন্ধু বা আসম আবদুর রবের মত গরম কন্ঠ আর চড়া সুরের বক্তিতা এরা কেউ দেয়নি, দিত না, অত্যান্ত সাবলীয় ভাষায় যুক্তি দিয়ে এ কয়জন বক্তব্য দিতেন , আর শ্রোতারা সন্মোহিত হয়ে শুনতো চেয়ার চেড়ে কম শ্রোতাকে আমি উঠতে দেখেছি।

দেড় ঘন্টা একটানা বক্তব্য দিলেও কোন শ্রোতা বিরক্ত বোধ করতে দেখিনি , বাংলা দেশের রাজনীতিতে এমন একটি নক্ষত্রের নাম আ ফ ম মাহবুবুল হক। স্বাধীনতা লাভের পর তার সম্পর্কে জানা থাকলেও সরাসরি আমার সাথে কথা বলা হয়নি, দূর থেকে দেখলেও কথা বলিনি, আমরা কিছু লোক রাজনীতির শুরু থেকে এখন পর্যন্ত পদ পদবী র জন্য বা বড় দলীয় নেতা হোক আর এমপি, মন্ত্রী হোক কারো সাথে শরীর লাগিয়ে চবি তোলা, নেতাদের সাথে সাথে ঘুর ঘুর করায় অভ্যস্ত আগেও চিলাম না, এখনও নাই । নিজ দলীয় নেতা, এমনকি বর্তমান সময়ের ক্ষমতায় থাকা এমপি, মন্ত্রী, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান , উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের কাছে সামাজিক কাজে যাওয়া আসা করতে হয়, করিও। কিন্তুু ছবি তোলা, নিনা কারনে আশ পাশে ঘুর ঘুর করায় অভ্যস্ত নয়।

ঠিক সময় টা আমার মনে পড়ছে না, সারাদেশে একযোগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন , আ ফ ম মাহবুবুল হক চাটখিল আসন থেকে জাসদ দলীয় এমপি প্রার্থী। জয়াগ বাজারে তার নির্বাচনী সভা হবে , সব আসনেই প্রতিদিন ৪/৫ টি সভা হচ্ছে , আমাকে জয়াগ বাজারের সভায় বক্তব্য রাখার জন্য জেলা কমিটি থেকে বলা হয়েছিলো , মঞ্চে সবাকে সঞ্চালক ডেকে তুললেন , সৌভাগ্য ক্রমে আফম মাহবুবুল হকের পাশেই আমার আসন হলো, অপর পাশ্বে মাষ্টার আবুল কাশেম পাঠওয়ারী ( এক সময়ের নোয়াখালী জেলা জেএসডির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি) আমাকে ভালভাবে চেনে ও জানে, তিনিই আফম মাহবুবুল হকের কাছে চোট গলায় আমার ১৯৭৪—৭৫ সাল ও তৎপরবর্তীকালেররাজনৈতিক কর্মকান্ডের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরলেন, ২/৩ জন স্হানীয় নেতার বক্তব্যের পর আমি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিলাম, আমার রাজনৈতিক জীবনে আফম মাহবুবুল হকের সাথে এক মঞ্চে এটি প্রথম ও শেষ বক্তৃতা দেওয়া। আমি প্রায় ১২/১৩ মিনিট বক্তব্যের পর তার পাশে গিয়া বসলাম । নীছু স্বরে আমার বক্তিতার প্রশংসা করলেন, আবার ১৯৭৪/৭৫ কর্মকান্ড সম্পর্কে মোস্তাফিজ এমপি তে শুনছেন বলেও জানালেন, তবে আজকেই আমাকে চিনছেন বলে জানালেন।

মাগরিবের নামাজের পর তিনি বক্তিতা শুরু করলেন, ঐদিন এ মাগরিবের সময় বদল কোট তার পরবর্তী নির্বাচনী সভা ছিল, লড়কে লেংগে পাকিস্তান সৃষ্টি করবো বলে পাকিস্তান সৃষ্টি করবো বলে পাকিস্তান সৃষ্টি করলাম ……. বলে বক্তৃতা দেওয়া শুরু করলেন, টানা দেড় ঘন্টা বক্তব্য দিলেন , পাকিস্তান সৃষ্ট থেকে বাংলাদেশ কারন , কি চাইলাম? কি পেলাম ? কেন পেলাম না সবই বললেন, জয়াগ বাজার ইদগাঁও মাঠে শ পাঁছেক মানুষ দিয়ে যে সভা শুরু সেখানে হাজার দেশেক মানুষ জমা হয়ে একাগ্র মনে তার ভাষন শেষ পর্ষন্ত শুনলেন। আমি নিজেই বিমোহিত এমন প্রান্জল ভাষার বক্তব্যে , অথচ জাতির এ বীরকে মরতে হলো কানাডাতে ! তার শেষ আসন হলো কানাডার মাটিতে ! যে দেশের জন্য ১৯৭১ এ জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করলেন, ১৯৭৬ সালে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারগারে সামরিক স্বৈর শাসক জিয়া কতৃক কর্নেল তাহেরের ফাঁসীর প্রতিবাদ করায় পাগলা ঘন্টি বাজিয়ে বেধড়ক ভাবে জেল পুলিশের নির্যাতনে অর্ধমৃত করা হলো, সেই জাতীয় বীরকে আবার ঢাকার রাস্তায় নগ্ন ভাবে হামলা করা হলো, অর্ধ মৃত করে রাস্তায় ফেলে রেখে গেল ! অথচ খু্ঁজে পায়নি আসামী, বিচার হয়নি এদেশে ! চিকিৎসা হয়নি এদেশে !

একজন জাতীয় বীরকে চিরনিদ্রায় শায়িত হতো হলো কানাডা নামে ভীন দেশে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই দিই, কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা ঘোষনার দোহাই দিয়ে ক্ষমতা রক্ষা ও পাওয়ার নেশায় বূ্ঁদ হয়ে আছি। অথচ যাদের শ্রমে ঘামে, পরিকল্পনায় এ স্বাধীন বাংলাদেশ তাদের নামটি একটিবার উচ্ছারন করিনা । নূতন প্রজন্মের কাচে সত্য লুকানোর জন্য ভাড়াটিয়া বুদ্ধিজীবি দিয়া ইতিহাস তৈরি করে চলছি, যেন ইংরেজ বেনিয়াদের মত নবাব সিরাজের অন্ধকূপ হত্যাকান্ডের ইতিহাস গিলাচ্ছি আজকের তরুন সমাজকে ! ইতিহাস থেকে কোন বীরকে স্হায়ী ভাবে মুঁছে ফেলা যায়নি, সাময়িক ক্ষমতার জোরে কিছুকাল অন্ধকারে রাখা যায় ! অতীত ইতিহাস তাই দেখিয়ে দিয়াছে। লাল সালাম হে কমরেড ।