শ্রমজীবী কর্মজীবী ও পেশাজীবী জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও মে দিবস: সা কা ম আনিছুর রহমান খান

মানুষের জানা মতে এই পৃথিবীতে যতগুলো সভ্যতা গড়ে উঠেছে তার প্রত্যকটির কারিগর ছিল শ্রমজীবী- কর্মজীবী ও পেশাজীবী জনগণ। কিন্তু সুফল প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তারাই থেকেছে বঞ্চিত , অবহেলিত ও অস্পৃশ্য। তাদেরকে যাপন করতে হয়েছে দুঃসহ জীবন। অভাব অনটন তাদের নিত্যসঙ্গী। বিনোদন ও বিশ্রামের সুযোগ তাদের জীবনে কদাচিতই ঘটে। সে কারণেই তারা যুগে যুগে বিদ্রোহ করেছে। জীবন দিয়েছে , জয়ী হয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৭৩ অব্দে ‘গ্লাডিয়েটর’ ও ক্রীতদাসদের সমন্বয়ে বাহিনী গঠন করে ‘স্পার্টাকাস’ বিদ্রোহ করেছিলেন রোমান রাজের বিরুদ্ধে এবং বিজয়ী হয়ে বহু ক্রীতদাসকে মুক্ত করেছিলেন। তার এই জয়যাত্রা অব্যাহত থাকে।
এর দু;বছর পর রোমান সেনাপতি ‘মারকুস ক্রেসুস’ এর নেতৃত্বাধীন রোমান বাহিনীর সাথে বীর বিক্রমে লড়াই করেও স্পার্টাকাসের নেতৃত্বাধীন বাহিনী পরাভ’ত হয়। স্পার্টাকাস বন্দী ও নিহত হন। স্পার্টাকাসের যুগোত্তর জয়ের শিরোভ’ষণ আজও প্রেরণা দেয় তাবৎ দুনিয়ার নির্যাতিত নিপীড়িত অধিকার বঞ্চিত শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী জনগণকে।

হযরত মুসা (দূ:) এর নেতৃত্বে অত্যাচারী ফেরাউনের বিরুদ্ধে বনি ইসরাইলগণ বিদ্রোহ করে মিশর থেকে ফিলিস্তিনে চলে গিয়েছিল। ‘বনি ইসরাইল’রা ছিল ফেরাউনের কর্মচারী। তারা তাদের পরিশ্রমের ন্যায্য মজুরী পেত না, দিনরাত্রি তাদের পরিশ্রম করতে হতো , তাই তাদেরকে যাপন করতে হতো মানবেতর জীবন। এই দুঃসহ জীবন থেকে মুক্তির জন্য হযরত মুসা (আঃ সাঃ) এঁর নেতৃতে তারা ফেরাউনের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং পরিস্থিতি বুঝে ফেরাউনের শাসনাধীন এলাকা ত্যাগ করে। পবিত্র কোর-আন শরীফে বলা হয়েছে এরা পথ পাড়ি দেবার সময় ‘দরিয়া’র মাঝে আল্লাহর অসীম কুদরতে পথ তৈরী হয়। ‘বনি ইসরাইল’দের বারটি গোত্র ছিল, ‘দরিয়া’র ভিতরে বারটি পথই তৈরী হয়েছিল। তাদের পিছু ধাওয়া করেছিল ফেরাউন।

‘বনি ইসরাইল’গণ ‘দরিয়া’ পাড় হয়ে গেলে ‘দরিয়া’র মাঝ থেকে জেগে ওঠা পথ গুলো আবার ডুবে যায়। পানিতে ডুবে মৃত্যু হয় ফেরাউনের। তার লাশ এখনও আছে, যা দেখে ঘটনার পাঁচ হাজারেরও অধিক বছর পরও আমরা অনুভব করি জালেম শাসকের পরিণতি কিরূপ হতে পারে। শুধু সে যুগেই নয়, সব যুগেই জালেম শাসকদের পতন, পরিণতি ও মৃত্যু একই ভাবে হয়েছে। ফেরাউনের আমলের উক্ত ঘটনার স্মৃতি আজও ধারণ করে আছে ‘আকাবা’ (গোলামমুক্তি) প্রণালী। কারণ ‘বনি ইসরাইলগণ’ এখানে পৌছেই ফেরাউনের দুঃশাসন থেকে মুক্তির আস্বাদ পেয়েছিল। সে কারণে, সেই থেকে এই নামকরণ। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) নির্দেশ দিয়েছেন,‘ শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার মজুরী পরিশোধ করে দাও।’ তিনি আরও বলেছেন ‘তোমাদের চাকর-বাকরদের দিনে বাহাত্তর বার ক্ষমা কর।’

দিল্লীতে দাসত্বের বিরুদ্ধে ইলতুৎমিশের নেতৃত্বে দাস-দাসীরা বিদ্রোহ করেছিল। তারা ক্ষমতা দখল করে ‘সালতানাত’ কায়েম করেছিল। দিল্লীর মসনদে বসেছিলেন ইলতুৎমিশ। তার ওফাতের পর তারই কন্যা সুলতানা রাজিয়া বিজয়ীর বেশে দিল্লীর মসনদে আরোহন করে ছিলেন। তাঁর সুশাসন ও বীরত্ব গাঁথা ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে। যুগ যুগ ধরে শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী জনগণ শোষিত ও বঞ্চিত হয়েছে এবং তারা অমিত বিক্রমে এই শোষন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে অত্যাচারী স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। চ’ড়ান্তভাবে বিজয়ী হয়েছে। এই ধারা চলতে চলতেই তাদের ভিতর থেকেই উদ্ভব হয়েছে নব্য শোষকের। ডাক এসেছে নতুন সংগ্রামের। আবার লড়াই , আবার বিজয়। এভাবেই এগিয়ে চলেছে সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারা।

ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের যুগে শ্রমিক শোষণ অমানবিক পর্যায়ে পৌছে যায়। একজন শ্রমিক দিনে আঠার ঘন্টা পরিশ্রম করে মজুরী পেত ‘আঠার স্যু’ ( তাদের দেশের তৎকালীন মুদ্রায়)। এই মজুরীতে শ্রমিকদের জীবন যাপনের ন্যূনতম চাহিদাও মিটতো না। মালিকেরা ছিল অনৈতিক চরিত্রের অধিকারী। শ্রমিকদের স্ত্রী ও যুবতী কন্যাগণকেও মালিকের লালসা পূরণে বাধ্য করা হতো। ফরাসী লেখক জ্যাঁ জ্যাঁক রুশো বলেছেন ‘ মানুষ স্বাধীন ভাবেই জন্ম গ্রহণ করেছিল কিন্তু জীবনের সকল ক্ষেত্রেই সে শৃংখলাবদ্ধ’ শ্রমিক শোষনের উদ্ভব ও কারণ খুঁজে তার প্রতিকারের পথ দেখালেন মহামনিষী কার্ল মার্কস ও তাঁর সহযোগী ফ্রেডারিক এঙ্গেলস। তাদের কথা শুনে আঁতকে উঠলো ধনিক বণিক মালিক শ্রেনী। ‘ ইউরোপ ভ’ত দেখছে, কমিউনিজমের ভ’ত……’ এই কথাগুলি দিয়েই তারা শুরু করলেন তাদের যৌথ উদ্যোগে লিখিত ‘ কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ নামক বইটি। বিভিন্ন লেখার মধ্য দিয়ে তারা মালিক শ্রেণীর নৈতিকতার মুখোশ খুলে দিলেন। মার্কস বললেনঃ এই ধনিকগণ শ্রমিকদের ‘শ্রমঘন্টা’ শোষণ তাদের স্ত্রী কন্যাদের স্ফ’র্তির উপাদান বানিয়েই সন্তুষ্ট নয়, পরস্পরের স্ত্রীকে ভাগিয়ে নেওয়াতেই তাদের পরম আনন্দ।’ ‘মুনাফার চরিত্রই এটা , এর প্রভাবেই পুঁজিপতি মালিক ধনিক বণিকেরা তাদের জীবন থেকে মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিক চরিত্র হারিয়ে ফেলে। স্বভাবতই মার্কস ও এঙ্গেলস এইসব ধনিক শ্রেণীর রোষানলে পড়লেন। মহামনিষী কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডারিক এঙ্গেলস বললেন ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ পুরোপুরি মালিক শ্রেণী আত্মসাৎ করাতেই সমাজ ধনী ও গরিবে বিভক্ত হয়েছে। ‘উদ্বৃত্ত মূল্যে’ শ্রমিক শ্রেণীরও অংশ রয়েছে। ফ্রেডারিক এঙ্গেলস বললেন ‘আমরা চাই মজুরী প্রথার অবসান।’ প্রত্যেক উৎপাদিত দ্রব্যে ও পণ্যে শ্রমিক শ্রেণীর অংশ রয়েছে। কার্ল মার্কস তার ‘থিসিস অন ফয়েরবাখ ’ বইতে বললেন,‘ আজ পর্যন্ত দার্শনিকেরা এই পৃথিবীকে নানাভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছে, কিন্তু আজকে আমাদের কাজ হচ্ছে এর পরিবর্তন সাধন করা।’ ( প্রাগুক্ত তথ্য সূত্র ‘ মার্কস এঙ্গেলস রচনা সংকলন’)। এসব তত্ত্ব ও তথ্যে আলোকিত হয়ে জেগে উঠলো শ্রমিক সমাজ। তারা বিদ্রোহ করলো। আওয়াজ তুললো ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায় সংগত’।

ইউরোপ থেকে অভাবের তাড়নায় বিপুল জনগোষ্ঠি পাড়ি জমায় আমেরিকাতে। তাদের সাথে সাথে ইউরোপের এই শ্রমিক শোষনসহ সামাজিক আনাচারও সেখানকার জীবনের অংশ হয়ে যায়। সেই সাথে মহামনীষী কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলসএর চিন্তাধারাও শোষিত বঞ্চিত শ্রমিকদের সাথে সাথে আমেরিকা অভিবাসীদের মুক্তির পথ দেখাতে শুরু করে। মার্কিন শ্রমিকগণ তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে লিপ্ত হয়। এই আন্দোলন চলতে থাকে। ১৮৮৬ সালের মে মাসে শিকাগো শহরের হে মার্কেট নামক স্থানে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের উপর গুলি বর্ষণ করা হয়। নিহত ও আহত হয় অনেক শ্রমিক। এতে আন্দোলন অবদমিত হয়নি বরং তা লাভ করে প্রবল গতি। আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে তা ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়ে। প্রবল আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিজয়ী হয় শ্রমিকেরা। নির্ধারিত হয় দিনের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে আট ঘন্টা কাজ, আট ঘন্টা বিনোদন ও আট ঘন্টা বিশ্রাম করবে শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী মানুষ। আন্তর্জাতিকভাবে তা স্বীকৃতি লাভ করে।

জাতিসংঘের অন্তর্ভূক্ত ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থা’ (ILO)এর নীতি সকল দেশই আজ মেনে চলে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। অফিস আদালতের সময়সূচীতে কর্মের সময় ৮ঘন্টা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাকিস্তান আমলেও সময়সূচী এটাই ছিল, তবে মে দিবস আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন করা হতো না। স্বাধীনতা উত্তরকাল থেকে বাংলাদেশে ‘মে দিবস’ এ সরকারী ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে এই দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে। এখানে দুঃখের সাথে বলতে হয় মে দিবসের মূলনীতি বাংলাদেশে যথাযথভাবে অনুসৃত হচ্ছে না। বাংলাদেশে সরকারী, আধা-সরকারী, স্বায়ত্বশাসিত, আধা-স্বায়ত্বশাসিত ও বে-সরকারী প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা রয়েছে। বে-সরকারী প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় সরকারী ছুটির দিনগুলোতে সাধারণ ছুটি পালন করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় এটা বাস্তবায়ন করা হয় না। সরকারী ছুটির দিনগুলোতেও এসব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কর্মকর্তা কর্মচারীদের কাজ করতে হয়। এভাবে তারা সাপ্তাহিক ছুটি থেকে বঞ্চিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় কর্মদিবসে ৮(আট) ঘন্টার বেশী সময় কর্মকর্তা কর্মচারীদের কাজ করতে হয়। যার ফলে এসব প্রতিষ্ঠান সংস্থায় কর্মরত ব্যক্তিগণ বিনোদন ও বিশ্রামের খুব কমই সুযোগ পান।

‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থা’র নীতিমালা মতে ছুটি ও সময়সূচী সংক্রান্ত বিষয় বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের। এ বিষয়ে সরকার যথাযথ তদারকি করলে মে দিবসের এই নীতিমালার সুফল সকল নাগরিক ভোগ করতে পারবে। কোন কোন সময় আবার সরকারী উর্ধতন কোন কোন কর্মকর্তার কারণেও বে-সরকারী প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ সরকারী ছুটি ভোগ করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। যেমন রাজধানীতে অবস্থানকারী কোন উর্ধতন কর্মকর্তা তার দাপ্তরিক কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট মফস্বল মহানগর বা শহরে অবস্থিত কোন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থায় ছুটির দিনে বেদাফতরিক সফর এ যান। এর ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ ঐ দিনের ছুটি আর ভোগ করতে পারেন না। আর ঐ দিন যদি শুক্রবার হয় তাহলে তো তারা জুম্মার নামাজটাও ঠিকমতো পড়তে পারেন না , এখানে মনে রাখা দরকার শুক্রবার শুধু কর্ম সংশ্লিষ্ট সাপ্তাহিক ছুটি নয়। এর সাথে ধর্মেরও যোগ আছে , কারণ এই দিনে ইসলাম ধর্মাবলম্বীগণ দুপুরে একজামাতে মসজিদে মিলিত হয়ে জুম্মার নামাজ আদায় করে এবং এর আগে খোতবা শুনে। খোতবায় ধর্মীয় ও রাষ্ঠ্রীয় শাসন বিষয়ে ইমাম সাহেবের ভাষণ শ্রবণ করে। এর সবকিছুই ধর্মীয়ভাবে বাধ্যতামূলক। এসব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা এরূপ আমলাদের দাওয়াত দেয় সেরেফ তোষামোদের জন্য। আমলারাও এসব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় সফর করে বিলাস বহুল যানবাহনে ভ্রমন , আদর-আপ্যায়ন উপভোগ ও উপঢৌকনাদি প্রাপ্ত হয়ে ধন্য হন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার অসহায় কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ ব্যক্তিগত, ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে হন দুর্দশার শিকার। রাজধানীতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বসবাসকারী এই সব বিবেক-বিবেচনাহীন আমলাদের নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব তো সরকারের।

স্বাধীনতা উত্তরকাল থেকে বাংলাদেশে মে দিবস পালন হয় বেশ ঘটা করে। প্রচার মাধ্যমে ‘জন হেনরিখ…..’ কে স্মরণ করে গান পরিবেশন করা হয়। তবে সব কিছুই আনুষ্ঠানিক। গান পরিবেশনের জন্য ‘সম্মানী’ নির্ধারিত করে প্রদান নিশ্চিত করলেই তবে শিল্পী গান গাইতে প্রচার মাধ্যমে আসেন। আলোচনা অনুষ্ঠানগুলো মে দিবস সম্পর্কে আলোচনা করে এই দিবসের চেতনা বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। এসব বক্তৃতা ও গান শুনে তুমুল করতালি আর জয়ধ্বনি দিয়ে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তোলে । লাল পট্টি মাথায় পরে শ্রমিকেরা বিভিন্ন দাবী দাওয়া সম্বলিত কেতন উড়িয়ে রাজপথে মিছিল করে। সভা সমাবেশে সমবেত হয়। মালিক পক্ষ এসব অনুষ্ঠানে যোগদানকারী শ্রমিকদের মাঝে ঠোঙায় করে মাথাপিছু একটি নিমকি ও একটি জিলিপি বিতরণ করে , তবে নিজেদের ও প্রধান এবং বিশেষ অতিথি মন্ডলীর জন্য থাকে গোশত পরাটাসহ দধি ও মিষ্টি, সেই সাথে থাকে দুপুরে বিলাসী ভোজের ব্যবস্থা। এভাবেই উৎযাপিত হয় মে দিবস। পরদিন মালিক আর কর্তৃপক্ষ আবার সেই পুরাতন চেহারা নিয়েই আবির্ভূত হন। এদেশে মে দিবস পালিত হয় , মালিক মজুদদারের শ্রেনী চরিত্রের বদল হয়না। শ্রেণী বৈষম্যের মূল কারণ মালিক কর্তৃক উদ্বৃত্ত মূল্যের পুরো অংশই করায়ত্ব করণ। এই পদ্ধতির পরিবর্তন হয় না। শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী জনগণের সন্তানদের জন্য উন্নতমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নাই। তাদের চিকিৎসার জন্য সম্বৃদ্ধ হাসপাতাল নাই। মফস্বলের শহর বন্দরগুলোতে এই অবস্থা হলেও , রাজধানী ঢাকা মহানগরী ও চট্টগ্রাম মহানগরীর অবস্থা ভিন্ন্। সেখানে মালিক মহাজন, বণিক , উচ্চপদস্থ আমলা , পদায়নে বিশেষ আনুকুল্যপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ প্রকৌশলী ও ডাক্তার, বড় ব্যবসায়ীদের সন্তানদের জন্য রয়েছে উন্নতমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তাদের চিকিৎসার জন্য রয়েছে সর্বাধুনিক হাসপাতাল। এতেও যদি না আরোগ্য না হয় তাহলে বিদেশে নিয়ে যাবার জন্য রয়েছে ‘এয়ার অ্যামবুলেন্স’। সন্তানদের শিক্ষার সুবিধা করে দেবার জন্য রয়েছে ‘বিশেষ বৃত্তি’র ব্যবস্থা। শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী জনগণও মে দিবসের চেতনার আলোকে এসব সুযোগ সুবিধা জীবনের সব ক্ষেত্রে পেতে হকদার। তাদের তা দেবার প্রশ্ন আসলেই মিষ্টি মিষ্টি করে আইনগত পদ্ধতিগত অনেক রকম বাধা ও জটিলতার কথা বলে থামিয়ে দেবার চেষ্টা করা হয়। না থামলে তো পুলিশ আছেই।

মে দিবসে অনেক কথাই বলা হয়ে থাকে। কিছুদিন পরেই আসছে রমজান মাস ও ঈদুল ফিতর। তখনই দেখা যাবে অনেক কর্মজীবী পেশাজীবী শ্রমজীবী তাদের বকেয়া বেতনের দাবীতে আন্দোলন করছে আর পুলিশের লাঠিপেটা খাচ্ছে। মে দিবসের মাহাত্ম নিয়ে বক্তৃতাকারী রথী মহারথীগণ তখন থাকেন নির্বিকার। ‘জন হেনরিখ’…এর গান গেয়ে আসর মাতানো গায়কদের গলা দিয়ে আর সুর বের হয় না। শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী জনগণ এ অবস্থা কি আর বেশী দিন চলতে দিবে। কাউকে একদিন বা দুদিন বোকা বানিয়ে রাখা যায়, কিন্তু চিরদিন নয়। বাংলার শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী জনগণকেও তাই চিরদিন তাঁদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন রকম অজুহাত ও নীতি কথা বলে বোকা বানিয়ে রাখা যাবে না।

সেকালের ইউরোপের সমাজ চিত্রের সাথে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক , সামাজিক ও ব্যক্তিগত নৈতিক অবস্থার গুণগত সাদৃশ্য রয়েছে বলে কেউ কেউ ধারণা পোষণ করে থাকেন। এ থেকে উত্তরণের জন্য দেশের শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী জনগণকে সচেতনতার সাথে আপোষহীন সংগ্রামে ব্রতী হতে হবে ।

মহামতি ফ্রেডারিখ এঙ্গেলসএর ভাষায় বলতে হয় ‘ আমরা চাই মজুরী প্রথার অবসান’। কবি বলেছেন,‘ কেউ নয় সাহেব বিবি, নয় কেউ গোলাম ভাই, বলো বখশিশ চাই না মালিক, হিসাবের পাওনা চাই।’

মে দিবসের চেতনার প্রকৃত অর্থে বাস্তবায়নের জন্য আজ শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী জনগণের দাবীঃ
ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ-পাকিস্তানী শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ; শ্রম-কর্ম-পেশার জনগণের ‘অধিকার’ , ‘ক্ষমতা’ ও ‘কর্তৃত্ব’ প্রতিষ্ঠা; সুশাসন ও দেশ পরিচালনায় অংশীদারিত্বের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ। এই দাবী সমূহ পূরণের লক্ষ্যে # ৯টি প্রদেশ , ‘প্রাদেশিক সরকার’ ও ‘প্রাদেশিক পরিষদ’ গঠন করতে হবে। # ‘দুই কক্ষ’ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট ও ‘ফেডারেল সরকার’ গঠন করতে হবে । # ‘স্ব-শাসিত উপজেলা’ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে । প্রতি উপজেলা ও পৌরসভায় ‘শিল্পাঞ্চল ’ গড়ে তুলতে হবে। # সিটি কর্পোরেশন সমূহে ‘মেট্টোপলিটন সরকার’ গঠন করতে হবে। # উপ-আঞ্চলিক ‘অর্থনৈতিক জোট’ , মেগা সী-পোর্ট ও ‘কানেকটিভিটি’ স্থাপন করতে হবে। # ঘুষ, দুর্নীতি, অপরাজনীতি , খুন , গুম, সন্ত্রাস , অপহরণ, টেন্ডারবাজী, দখলবাজী বন্ধ করতে হবে। # মিছিল , মিটিং ও জনসভা করার গণতান্ত্রিক অধিকার দিতে হবে।# পার্লামেন্টের ‘উচ্চকক্ষ’ থেকে গঠিত হবে নির্দলীয় ‘নির্বাচনকালীন সরকার’।

রাজনীতি যেহেতু উৎপাদন ও বন্টনের বিজ্ঞান , আর উৎপাদন ও বন্টনের ক্ষেত্রে নিয়ামক ভ’মিকা পালন করে শ্রমজীবী কর্মজীবী ও পেশাজীবী জনগণ তাই মে দিবসের চেতনা বাস্তবায়ন করতে রাজনীতির প্রসঙ্গ আসবেই। তাই উক্ত রাজনৈতিক কর্মসূচী বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই আসবে শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী জনগণের মুক্তি। এজন্য তাদেরকে আপোষহীন সংগ্রাম করতে হবে। মালিক-মজুর ভাই ভাই বলে মে দিবসে কেতন উড়িয়ে গগণ বিদারী আওয়াজ তোলা হয় বটে কিন্তু খাবারের থালায় মজুরদের সাথে মালিকেরা ভ্রাতৃসুলভ আচরণ করে না। মজুরদের কত কম মজুরী দেওয়া যায় মালিকেরা সেই চেষ্টায় সদা তৎপর। ‘নিম্নতম মজুরী বোর্ড’ এ তাদের এই তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। সাম্প্রতিককালে নৌ-শ্রমিকদের আন্দোলনে মালিকদের আচরণ এর জলন্ত উদাহরণ। উৎপাদন ও বন্টন ক্ষেত্রে বৈষ্যমের অবসান ঘটিয়ে ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদনের সকল উৎসকে সামাজিক মালিকানায় নিয়ে আসতে হবে। সেই মহান লক্ষ্য সামনে নিয়েই এগিয়ে যাক মে দিবসের কাফেলা।

মহান মে দিবস অমর হোক।

লেখক : সাবেক জেলা ও দায়রা জজ । বর্তমানে অ্যাডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট হাইকোর্ট বিভাগ , ঢাকা এবং কার্যকরী সভাপতি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল , জে এস ডি , কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ।