দিন আনে দিন খায় মজুররা দিশাহারা ,রাজধানীর ৪২ লাখ দিনমজুর রয়ে গেছে সরকারি সহায়তার বাইরে

রাজধানীর রায়েরবাজারের সাদেক খান সড়কে প্রতিদিন ভোরে দিনমজুরের হাট বসত। ঝুড়ি, কোদাল, শাবলসহ অন্য সরঞ্জাম নিয়ে হাটে ভিড় জমাতেন তাঁরা। মহাজনদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে কাজ ও মজুরি ঠিক করে চলে যেতেন কাজ করতে। দিন শেষে মজুরি নিয়ে বাজার করে বাসায় ফিরতেন। কিন্তু প্রতিদিনের এ চিত্র এখন আর দেখা যায় না।

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার পর রাজধানীর চেনা চেহারা অচেনা হয়ে গেছে। মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়ে জরুরি সেবা ছাড়া সব কিছুই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে দুর্দশায় পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ।

বিভিন্ন বেসরকারি হিসাবে, রাজধানীতে কমপক্ষে ৪২ লাখ দিনমজুর এখন তীব্র সংকটে আছেন খাদ্যের পর্যাপ্ত সহায়তার অভাবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ঘোষিত বরাদ্দ পাঁচ কোটির বেশি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ভাগ করলে মাথাপিছু মাত্র ১৫০ টাকা করে পড়ে, যা তাঁদের জীবনধারণের জন্য অপ্রতুল।

এ অবস্থায় আগামীকাল শুক্রবার মে দিবস পালিত হচ্ছে।

গাইবান্ধার ফুলছড়ির রোজিনা আক্তার স্বামী মারা যাওয়ার পর তিন বছর আগে দুই সন্তানকে নিয়ে চলে আসেন ঢাকায়। প্রতিবেশী এক নির্মাণ শ্রমিকের সঙ্গে কামরাঙ্গীর চরে বাসা নেন। প্রতিদিন ৩০০ টাকায় নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করছিলেন তিনি। প্রতিদিন ভোরে রায়েরবাজারের সাদেক খান সড়কের পাশে দিনমজুরের হাটে এলেই মিলে যেত কাজ। সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর হাটে এসে বসে থাকেন; কিন্তু কেউ কাজে নিতে আসে না। এখন বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার ত্রাণের ওপরই তাঁর ভরসা।

জানা যায়, করোনা সংক্রমণের ভয়ে বেশির ভাগ মানুষ কাজ বন্ধ রেখেছে। কাজ নেই তো দিনমজুরের খাবারও নেই। সে কারণে অনেকেই সরকারের নির্দেশনা উপেক্ষা করে গ্রামে ফিরে গেছেন। আবার কেউ কেউ ক্ষুধার জ্বালায় করোনার ভয় তুচ্ছ করে কাজের সন্ধানে প্রতিদিন হাটে আসেন; কিন্তু বেশির ভাগ দিনই শূন্য হাতেই ফিরতে হয়।

দুই সন্তানকে নিয়ে রায়েরবাজার পুলপাড়ের ছোট্ট টিনশেড ঘরে ভাড়া থাকেন দিনমজুর হাফিজুল। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, গত সপ্তাহে দুই দিন ছোট দুটি কাজ পেয়েছিলেন; কিন্তু তাতে এক দিনের খাবারও হয়নি। তাঁর স্ত্রী জেসমিন আক্তার অন্যের বাড়িতে ঠিকা কাজ করতেন। দুজনের আয়ে পাঁচজনের সংসার কষ্টেই চলত। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে দুজনই এখন কর্মহীন হয়ে পড়ায় প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি সংস্থা থেকে কিছু চাল-ডাল পাওয়াতে কয়েক দিন চলেছে। কিন্তু আগামী দিনগুলোর কথা ভেবে তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন।

রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের কাছেও বসত দিনমজুরের হাট। এখন আর সেখানে হাট বসে না। দিনের বেলায় টিসিবির ট্রাক এসে সেখানে খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি করে।

টাকা না থাকলে পণ্য কিনবেন কিভাবে—সেই প্রশ্ন করেন বসিলা চার রাস্তা মোড়ের বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া জাকির হোসেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে। আগে প্রতিদিন ভ্যানে করে মোহাম্মদপুর টাউন হলের পাশে একটি আসবাবের দোকানের মালামাল আনা-নেওয়া করতেন। দিন গেলে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় হতো। সেখান থেকে নিজের খরচ ও গ্রামের বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানদের জন্য টাকা পাঠাতেন। কিন্তু গত দুই সপ্তাহে কোনো টাকা পাঠাতে পারেননি। নিজের খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে কথা হয় ত্রাণের অপেক্ষায় থাকা দিনমজুর রহমত আলীর সঙ্গে। তাঁর স্ত্রী হাফিজা মানুষের বাসায় ঠিকা কাজ করতেন। তিনি নিজে মাটি কাটা, ইট-বালু পরিবহন, বাসাবাড়ি পরিষ্কারসহ অন্যান্য কাজ করতেন। এখন স্ত্রীকে নিয়ে রাস্তায় খাবার ও ত্রাণের অপেক্ষায় থাকেন। তিনি জানান, তাঁদের এখন কোনো কাজ নেই। কোনো আয় নেই। এভাবে চলতে থাকলে খাবার পাবেন কোথায়? খাবার কিনতে হলে টাকা দরকার। টাকার জন্য কাজ দরকার; কিন্তু কেউ তো এখন কাজ করাতে নেয় না। ফলে মানুষের কাছে হাত পাতা ছাড়া উপায় নেই।

অনেক দিনের জমানো মাটির ব্যাংকটি ভেঙে সেই টাকায় চাল-ডাল কিনছেন চায়ের দোকানের শ্রমিক আহম্মদ। ৩২ বছর বয়সী এই যুবক যেকোনো কাজ করতে রাজি। কিন্তু এখন দোকান বন্ধ থাকায় তাঁর কাজ নেই। প্রতিদিন সকালে পাইকারি বাজার থেকে এক ব্যবসায়ীর কাঁচামাল কাদিরাবাদ হাউজিংয়ে দিয়ে আসেন। এর বিনিময়ে যা পান তাতে প্রতিদিনের বাজার খরচ হয় না। তিনি বলেন, ‘এভাবে আর কয় দিন চলবে। সামনে শুধু অন্ধকার দেখছি। মনে হচ্ছে, মা-বউকে নিয়ে বাড়ি চলে যাই; কিন্তু সেটাও পারছি না। বাড়ি ফিরে ওদের খাওয়াব কী?’

বসিলা চার রাস্তার মোড়ে টেম্পোস্ট্যান্ডের লাইনম্যান আসলামের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা কয়েকজন মিলে টেম্পো, ইজি বাইকের সিরিয়াল ঠিক করতেন। বিনিময়ে প্রতিটি গাড়ি থেকে কিছু বকশিশ পেতেন। তাই দিয়ে ভালোই চলত। কিন্তু এখন কাজ বন্ধ। সেখানে আর গাড়ির ভিড় নেই। সে জন্য তাঁদের সিরিয়াল ঠিক করার কাজটিও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সামান্য কিছু গাড়ি চলে, কিন্তু তারা আর বকশিশ দিতে চায় না। তার পরও স্ট্যান্ডে আসেন আসলাম। দুরবস্থার কথা ভাবতে ভাবতেই দিন কাটছে তাঁর।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনা পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষেরা। বাইরে বের হওয়ার সুযোগ না থাকায় তাদের উপার্জনের পথ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ। দিনমজুর, রিকশা-ভ্যানচালক, বাসচালক, চালকের সহকারী, গৃহকর্মী—এমন সব নিম্ন আয়ের মানুষ প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করা নিয়ে মহাসংকটে পড়েছেন। সহায়তা মিললেও সেটা যথেষ্ট নয়।

উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের এক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি ছুটি বা সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার নির্দেশনার কারণে ৭২ শতাংশ মানুষ কাজ হারিয়েছেন বা তাঁদের কাজ কমে গেছে। মাত্র ৮ শতাংশ মানুষের কাজ থাকলেও এখনো তাঁরা বেতন পাননি। এর মধ্যে ৬২ শতাংশ দিনমজুরের আয় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ১৪ শতাংশ মানুষের ঘরে কোনো খাবারই নেই। ২৯ শতাংশের ঘরে আছে এক থেকে তিন দিনের খাবার। করোনাভাইরাসের স্বাস্থ্যগত দিকগুলো সম্পর্কে নিম্ন আয়ের মানুষের উপলব্ধি এবং এর অর্থনৈতিক সংকট সম্পর্কে ধারণা পেতে গত ৩১ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল ওই জরিপটি পরিচালিত হয়।

সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব বুলবুল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে একদিকে করোনা সংক্রমণের ভয়, অন্যদিকে অনাহারের আতঙ্ক দিনমজুরদের দিশাহারা করে ফেলছে। সাধারণ ছুটি ঘোষণার পরে দিনমজুরসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যে বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় প্রহসনের শামিল। কর্মহীনতার প্রায় এক মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও দিন এনে দিন খাওয়া মানুষদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত না হওয়া দুঃখজনক।’ দ্রুত ন্যূনতম খাদ্যের সংস্থান নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, করোনা মোকাবেলায় নগদ টাকা ও খাদ্য সহযোগিতা দুটিই জরুরি। তিনি বলেন, কর্মহীন ও আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া দরিদ্র মানুষের জন্য নগদ টাকাসহ অন্যান্য সহায়তা দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে প্রতি মাসে সরকারের খরচ হবে পাঁচ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা।
নিখিল ভদ্র,কালের কন্ঠ