নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ঋণ তহবিল গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করবে

করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, কৃষক ও প্রান্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, এই তহবিলের টাকা গ্রামে সঞ্চালিত হলে তা গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সক্ষম হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, যারা প্রকৃত অর্থেই নিম্ন আয়ের মানুষ এবং করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত, তারাই যেন এই তহবিল থেকে ঋণ সুবিধা পায়।

অর্থনীতিবিদরা আরও বলছেন, এই ঋণ বিতরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত বেসরকারি সংস্থা (এনজিও), সুনির্দিষ্টভাবে বললে মাইক্রোফিন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারের কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের এই তহবিল থেকে প্রাপ্ত ঋণে ৯ শতাংশ সুদ নির্ধারণকেও তারা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। গ্রামীণ অর্থনীতির পাশাপাশি এই তহবিল দেশের এনজিও খাতেও গতি আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. আতিউর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, বিভিন্ন মাইক্রোফিন্যান্স প্রতিষ্ঠান ২৪ শতাংশ পর্যন্ত সুদে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ করে থাকে। সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন হাজার কোটি টাকার ঋণ তহবিলে সুদের হার ধরা হয়েছে ৯ শতাংশ। ফলে তুলনামূলকভাবে গ্রামীণ জনগণের জন্য এই সুদহার অনেক কম। এই ঋণ বিতরণের মাধ্যমে গ্রামে-গঞ্জে টাকার বিস্তার ঘটানো সম্ভব হবে। আর টাকার সরবরাহ বাড়লে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। এই মুহূর্তে সেটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই তহবিল থেকে এনজিওগুলো খুব বেশি মুনাফা না করতে পারলেও তা তাদের কার্যক্রম চাঙ্গা করবে বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক এই গর্ভনর। তিনি বলেন, এই তহবিল থেকে পাওয়া অর্থে এনজিওগুলোকে সুদ দিতে হবে সাড়ে ৩ শতাংশ। আর তারা সুদ নেবে ৯ শতাংশ। অর্থাৎ মাঝখানে তারা সাড়ে ৫ শতাংশ সুদ পাবে। বাস্তবে এই ঋণ মাঠে গিয়ে দিতে হয় বলে খরচও বেশি পড়ে। তাই টাকার অঙ্কে এই তহবিল থেকে এনজিওগুলো খুব বেশি লাভবান হবে না। তবে বর্তমানে যেহেতু তাদের আড়াই লাখ কর্মী মাঠে বসে রয়েছে, তাই এই ঋণ বিতরণের মাধ্যমে তারা চাঙ্গা হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম অবশ্য মনে করছেন, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ৯ শতাংশ সুদই অনেক বেশি। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, এই ফান্ড থেকে ঋণ নিয়ে নিম্ন আয়ের গ্রাহকরা কিভাবে ৯ শতাংশ হারে সুদ পরিশোধ করবে? আবার তারা যে ঋণ নেবে, সেই ঋণের আসল টাকা এবং সুদই বা কিভাবে পরিশোধ করবেন? এরকম ক্ষেত্রে ঋণে না গিয়ে সরাসরি প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের জন্য অনুদান দেওয়া উচিত বলে মত দেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক সাবেক গর্ভনর ড. সালেউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ ব্যাংকের এই তহবিল গঠনের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তহবিলের আকার আরও বেশি হওয়া দরকার ছিল বলে মনে করছেন তিনি।

সালেউদ্দিন আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, নিম্ন আয়ের লোকজনের জন্য পুনঃঅর্থায়ন তহবিলে ৩ হাজার কোটি টাকা যথেষ্ট নয়। আমি মনে করি এটা কমপক্ষে সাত থেকে আট হাজার কোটি টাকার একটা ফান্ড হতে পারত।

তিনি আরও বলেন, পুনঃঅর্থায়ন তহবিলে ব্যাংকগুলো কী পরিমাণ অর্থায়ন করবে, সেটা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বলে দেওয়া উচিত। পাশাপাশি ব্যাংকগুলো যাদের কাছে ঋণ বিতরণের অর্থ দেবে, তাদেরও ভালোভাবে বলে দিতে হবে যেন প্রকৃত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এই ঋণ সুবিধা পায়।

সালেউদ্দিন আহমেদ বলেন, এই ঋণ সুবিধার আওতায় গলির চায়ের দোকান, পান দোকান, কৃষক, রিকশাচালকদের মতো ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আবার ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি কাগজপত্র না চেয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যানসহ জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে শনাক্ত করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যাদের পরিচয়পত্র থাকবে, তাদের পরিচয়পত্র দিয়ে ঋণ দিতে হবে। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে খুব বেশি কড়াকড়ি করা যাবে না। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) মাধ্যমে সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিয়ে ঋণ বিতরণ করার প্রস্তাব একটি ভালো প্রস্তাব। এতে করে এমআরএ‘র অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে, ভালোভাবে ঋণ বিতরণ করা যাবে।

সালেউদ্দিন আরো বলেন, কোনো এলাকায় এমআরএ সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান না থাকলে পাশের জেলা বা উপজেলার প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরাই যেন ঋণ সুবিধা পায়।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর সারাবাংলাকে বলেন, বাংলাদেশে সর্বোচ্চ সুদে ঋণ নেন নিম্ন আয়ের মানুষেরা। বিভিন্ন মাইক্রোফিন্যান্স প্রতিষ্ঠান থেকে তারা ২৫/২৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে থাকেন। অনেক সময় মাইক্রোক্রেডিটে থেকে ঋণ না পেলে ১ হাজার টাকায় মাসে ১০০ টাকা পর্যন্ত সুদে অর্থশালী ও সমিতির কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছেন। এতে সুদের পরিমাণ দাঁড়ায় বছরে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে ৯ শতাংশ সুদ তাদের জন্য অনেক সাশ্রয়ী হবে।

তিনি বলেন, এটা সরকারের অনেক ভালো উদ্যোগ। তবে খেয়াল রাখতে হবে, প্রকৃত নিম্ন আয়ের লোকজন যেন এই ঋণ সুবিধা পায়। অনেক সময় দেখা যায় ভালো ও অবস্থাসম্পন্ন মানুষ ঋণ নিয়ে নেয়। সরকারের উচিত হবে এনজিওগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি রাখা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সারাবাংলাকে বলেন, এমআরএ‘র মনিটরিং ও অপারেশনাল কস্ট বেশি হওয়ায় তারা স্বাভাবিক সময়েও ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল থেকে ৯ শতাংশ সুদ ঋণ দেওয়াকে আমি যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করছি।

তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় কথা হলো— এই ঋণ এনজিও খাতের জন্যও প্রয়োজন ছিল। কেননা এনজিও‘র কৃষি ও শিল্পভিত্তিক ঋণের ওপর বাংলাদেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী নির্ভরশীল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিলের এই ঋণ গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে। পাশাপাশি এনজিওগুলোকে কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনবে।

গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, নিম্ন আয়ের লোকজন এতদিন প্রণোদনার আওতায় ছিলেন না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই তহবিল তাদের জন্যও প্রণোদনা হয়ে এলো।

এর আগে, সোমবার (২০ এপ্রিল) করোনাভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, কৃষক ও প্রান্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য তিন হাজার কোটি টাকার নিজস্ব তহবিল গঠনের ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এই স্কিমের আওতায় তফসিলি ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ১ শতাংশ সুদ নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্যদিকে ক্ষুদ্রঋণ (মাইক্রোফিন্যান্স) প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ নেবে অর্থায়নকারী বিভিন্ন ব্যাংক। আর গ্রাহক পর্যায়ের ঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ নেবে মাইক্রোফিন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলো।

সারাবাংলা/জিএস/টিআর