করোনায় ক্ষমতার রাজনীতি

করোনা মহামারিতে মরছে মানুষ। এই ফাঁকে বিশে^র বিভিন্ন দেশে করোনাকে ব্যবহার করে ভিন্ন মতাবলম্বীদের দমন করা হচ্ছে। ক্ষমতাকে করা হচ্ছে আরো বলিষ্ঠ। কিছু দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা সুযোগ নিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দেয়ার অভিযোগে কয়েক শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তুরস্কে। ফেক নিউজ বা ভুয়া খবর বলে বিবেচিত হলেই রাশিয়া জেলে পাঠানোর হুমকি দিয়েছে। পোল্যান্ডে গণতন্ত্র বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর হাঙ্গেরির তো কথাই নেই।

হাঙ্গেরি
হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানকে শক্তিধর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তিনি ক্ষমতাকে আরো কুক্ষিগত করার জন্য করোনা ভাইরাস সংকটকে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে দেশের ভিতরে এবং বাইরে। অভিযোগ, তিনি লোকজনকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে এই সঙ্কটকে ব্যবহার করছেন ক্ষমতা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে। প্রথমত, তার ‘ফিডেজ’ সরকার গত ১১ই মার্চ স্টেট অব ডেঞ্জার ঘোষণা করে। এর মধ্য দিয়ে করোনা মহামারির বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় পেয়েছেন। পার্লামেন্টে তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তার ওপর ভর করে তারা দেশের সেই স্টেট অব ডেঞ্জার অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্ধিত করে। ফলে ডিক্রি জারির মাধ্যমে যতদিন প্রয়োজন সরকার তার ক্ষমতাকে প্রদর্শন করার সুযোগ আছে। যখন এই বিপদ কেটে যাবে তখন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার মালিকও তার সরকার। কিন্তু সমালোচনকরা এর মধ্য দিয়ে অন্য জিনিস দেখতে পাচ্ছেন। তারা দেখছেন, এর মধ্য দিয়ে হাঙ্গেরির গণতন্ত্রকে শেষ করে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু আইনমন্ত্রী বলেছেন, জরুরি অবস্থা শেষ হয়ে যাওয়ার পর এই ‘কর্তৃত্ববাদী আইন’ শেষ হয়ে যাবে। এই আইনটি প্রয়োজনীয় ও যথার্থ ছিল।
এটা কি গণতন্ত্রের শেষ ধাপ? এ প্রশ্নে সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর জোলতান জেনতে সতর্ক করেছেন। বলেছেন, এই মহামারিকে খুব সহজে সরকার তার ক্ষমতা রক্ষণাবেক্ষণে ব্যবহার করতে পারবে। স্টেট অব ডেঞ্জার কখন তুলে নেয়া হবে তারও এক্সক্লুসিভ ক্ষমতা আছে এই সরকারের। তিনি আরো বলেছেন, এক্ষেত্রে সরকারকে নিয়ন্ত্রণের সব ক্ষমতা দিয়ে প্রকৃতপক্ষে ‘আত্মহত্যা করেছে’ পার্লামেন্ট।
ভিক্টর ওরবানের ফিডেজ দলের রয়েছে পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা। জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তারা সব উপনির্বাচন ও গণভোট স্থগিত করেছে। সাংবিধানিক আদালতে প্রধানমন্ত্রী ওরবানের প্রিয়জনে ভরা। তার পাশে রয়েছে ‘স্বাধীন বিচারবিভাগ’।

তুরস্ক
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান এমনিতেই অসীম ক্ষমতার মালিক। ফলে ক্ষমতা বাড়ানো বা করোনা মহামারিকে ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ব্যবহারের কোনো প্রয়োজনীয়তাই নেই তার। অন্তত মানবাধিকার বিষয়ক কর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গি তা-ই। মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তুরস্ক শাখার পরিচালক এমা সিনক্লেয়ার-ওয়েব বলেছেন, এরইমধ্যে এমন কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা রয়েছে যাতে তাদের আর ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, সামাজিক যাগাযোগ মাধ্যমগুলোর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির প্রস্তাবনার মধ্য দিয়ে বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে।
এমন সঙ্কটের সময় সরকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোভিড-১৯ নিয়ে উস্কানিমুলক পোস্ট দেয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কয়েক শত মানুষকে। খুব কম সংখ্যক ডাক্তারই তাদের নিজেদের অবস্থা নিয়ে কথা বলার সাহস দেখান। টার্কিশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের আলি চারকেজোগলু বলেন, এদেশে সত্য লুকানো এবং বানোয়াট তথ্য সৃষ্টি দুর্ভাগ্যজনকভাবে একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। এভাবেই শাসন করা হচ্ছে। এভাবেই ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যবহার করা হয়েছে গত ২০টি বছর।
মুক্ত মত প্রকাশের পক্ষের আইনজীবী হারেম সোনমেহ করোনা ভাইরাস মহামারির সময়ে সরকারের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এই মহামারির মধ্যে সমাজ এবং বিরোধীরা দুর্বল থাকে। সবারই এখন একটি এজেন্ডা। তাহলো ভাইরাস। বেঁচে থাকাই সবার কাছে এখন অগ্রাধিকারে। কিন্তু এই পরিস্থিতির অপব্যবহার সরকার করতে পারে এমন গুরুত্বর উদ্বেগ রয়েছে।

রাশিয়া
জানুয়ারিতে ক্রেমলিন মনে করেছে তাদের সব ছক কষা হয়ে গেছে। তারা রাশিয়ার সংবিধান সংশোধন করবে। এর মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনকে আরো দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা অনুমোদন দেয়া হবে। এরপরই তারা এই পরিবর্তনের পক্ষে রাশিয়ানদের সমর্থন আদায়ে ২২শে এপ্রিল জাতীয় ভোট দেবে। সাংবিধানিক সংশোধন না বলে সমালোচকরা একে ‘সাংবিধানিক অভ্যুত্থান’ বলে আখ্যায়িত করছেন। কিন্তু সেই সাংবিধানিক অভ্যুত্থান ইতিমধ্যে ঘটে গিয়েছে প্রায়। যদিও কোভিড-১৯ সবকিছুকে থমকে দিয়েছে, তাই প্রেসিডেন্ট পুতিনকে ওই নির্বাচন স্থগিত করতে হয়েছে। সর্বোপরি এই নির্বাচন যখন দেয়া হয়েছে সেই ২২শে এপ্রিল কাকতালীয়ভাবে এই মহামারির ভিতরে পড়েছে। এ অবস্থার মধ্যে কি করে তিনি জনগণকে ভোট দিতে যেতে বলবেন! তাই ভোট স্থগিত করেছেন। এখন ক্রেমলিনের সমস্যা হলো, এই ভোট কখন হবে নাকি হবে না। তবে সংবিধান পরিবর্তন রাশিয়ানদের মনের ভিতর গেঁথে আছে।
অন্যদিকে করোনা ভাইরাস লকডাউন সেখানকার অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বলা হয়েছে, দুই বছরের মন্দা সৃষ্টি হবে। লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারাবে। এক্ষেত্রে রাশিয়ানদের একটি প্রবণতা আছে। তা হলো তারা নিত্যদিনের যে সমস্যা তার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে দায়ী না করে দায়ী করে স্থানীয় কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তাদের। কিন্তু ইতিহাস বলে যে, যখনই সেখানে ব্যক্তিগত পর্যায়ে মারাত্মক আর্থিক মন্দা দেখা দিয়েছে, তখনই এই ক্ষোভ গিয়ে পড়েছে দেশটির নেতার ওপর। সম্ভবত এ কারণেই ক্রেমলিনের নেতা সম্প্রতি করোনা ভাইরাস নিয়ে লড়াই করতে ক্ষমতা দিয়েছেন আঞ্চলিক সরকারগুলোকে। ফলে এখন দায়টা তাদের কাঁধে পড়বে।
রাষ্ট্রীয় মিডিয়া সহ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সমর্থকরা যুক্তি দেখাবেন যে, জাতীয় সঙ্কট মোকাবিলায় রাশিয়ায় প্রয়োজন এযাবতকালের শক্তিশালী, স্থিতিশীল নেতৃত্ব। অন্য ভাষায় বলা যায়, প্রেসিডেন্ট পুতিনের মেয়াদ বাড়ানো উচিত। তবে ক্রেমলিনের সমালোচকরা এরই মধ্যে করোনা ভাইরাস মহামারিকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে ক্ষমতাকে আরো পোক্ত করার অভিযোগ তুলেছেন। করোনা ভাইরাস নিয়ে কেউ যদি ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেয় তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি অনুমোদন করেছে পার্লামেন্ট। এই শাস্তির মধ্যে রয়েছে ২৫ হাজার ডলার জরিমানা অথবা ৫ বছরের জেল। কোয়ারেন্টিন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সার্ভিলেন্স পদ্ধতি নিয়ে রয়েছে উদ্বেগ। লকডাউনের অর্থ হলো বিরোধীরাও কোনো প্রতিবাদ বিক্ষোভ করতে পারবেন না। করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধে এখন বড় সমাবেশ নিষিদ্ধ রয়েছে।

পোল্যান্ড
প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কি পোল্যান্ড সরকার জনগণের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছে? করোনা মহামারির মধ্যে মে মাসে এই দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এর মধ্য দিয়ে সরকার ভয়াবহতাকে কুচপরওয়া না করে নির্বাচনকে সামনে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে এতে জনজীবন বিপন্ন হতে পারে। সরকারের মিত্র প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেজ দুদা দেখতে পেয়েছেন করোনা মহামারির মধ্যে জনমত জরিপে তার জনপ্রিয়তা বেশ বেড়েছে। ফলে তার বিজয় নিশ্চিত। ক্ষমতাসীন ল’ অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি যুক্তি দেখাচ্ছে, নির্বাচন করতে সাংবিধানিকভাবে বাধ্য সরকার। এক্ষেত্রে লকডাউনের মধ্যে শুধু পোস্টাল ভোট হলো সবচেয়ে নিরাপদ সমাধান। এটাই তাদের সবচেয়ে পছন্দসই বিকল্প। কিন্তু সেখানে প্রেসিডেন্ট দুদাকে আরো দুই বছর পর্যন্ত, যতক্ষণ তিনি আবার নির্বাচিত না হন, ততক্ষণ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে অনুমতি দেয়ার জন্য একটি প্রস্তাবকে সমর্থন করছে ক্ষমতাসীন দল। তবে বিরোধীরা বলছেন, পোস্টাল ভোট একই সঙ্গে ভোটার, পোস্টাল কর্মী ও নির্বাচনী স্টাফদের ঝুঁকিতে ফেলবে। তবে এভাবে নির্বাচন করা নিয়ে এরই মধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পোল্যান্ডের নিজস্ব নির্বাচন কমিশন।
বিরোধীরা বলছেন, নির্বাচন করার জন্য অপেক্ষা করার জন্য আইনের ফাঁকফোকর আছে। জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণার মাধ্যমে নির্বাচনকে স্থগিত করতে বলছেন তারা। এ সময়ে ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নিতে হবে ৯০ দিনের জন্য।
যদি মে মাসে নির্বাচন হয়ই, তাহলে তা সুষ্ঠু হবে না বলে দাবি করছে মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো। তারা বলছে, প্রার্থীদের প্রচারণা বন্ধ হয়ে আছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনরা সরকারকে সহায়তা করে এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাত করে ব্যাপক মিডিয়া কভারেজ পাচ্ছেন। এ অবস্থায় নির্বাচন যদি স্থগিত করা হয়, তাহলে পোল্যান্ড একটি মন্দার মধ্যে পড়তে পারে এবং একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট দুদার পুনঃনির্বাচিচত হওয়ার সুযোগ শেষ হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে যদি বিরোধী দলীয় কোন প্রার্থী বিজয়ী হন, তাহলে নতুন প্রেসিডেন্টের ভেটো দেয়ার ক্ষমতা, সরকারের সক্ষমতাকে আগামী সাড়ে তিন বছর পর্যন্ত বিঘœ সৃষ্টি করতে পারে। হেলসিংকি ফাউন্ডেশন ফর হিউম্যান রাইটস ইন ওয়ারস-এর আইনজীবী মালগোরজাতা জুলেখা বলেন, এটা হলো সংকট থেকে সুবিধা নেয়া এবং ক্ষমতায় থাকার সবচেয়ে বড় পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ।

ওদিকে আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। সমালোচকরা অভিযোগ করছেন এই নির্বাচনে জয়ের জন্য করোনা মহামারিতে চীনা কার্ড ছুড়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এই ভাইরাসের জন্য তিনি চীনকে দায়ী করছেন। এরই মধ্যে তার দেশের গোয়েন্দারা মাঠে নেমে পড়েছে। তারা তন্ন তন্ন করে অনুসন্ধান করছেন উহানের ল্যাবরেটরি থেকে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছিল কিনা আর তা নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন করেছিলেন কিনা চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। যদি এমনটা করে থাকেন তারা তাহলে ‘চীনকে কঠোর পরিণতি ভোগের’ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। অভিযোগ আছে, এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে অন যে কোনো দেশের তুলনায় খুব বেশি সক্ষমতা দেখিয়েছে চীন। এক্ষেত্রে অনেকটা পিছিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্য দিয়ে বিশে^র এক নম্বর শক্তিধর হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের যে অবস্থান আছে, তা টলিয়ে দিয়েছে চীন। ভাইরাস সংক্রমণ, নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতি সব দিক দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি সক্ষমতা দেখিয়েছে চীন। অর্থাৎ এখানে দুই দেশে ক্ষমতার লড়াই দেখছেন সমালোচকরা। অন্যদিকে নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। সেই নির্বাচনে ট্রাম্প চায়না ইস্যুকে ব্যবহার করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
মোহাম্মদ আবুল হোসেন
বিশ্বজমিন