দায়বদ্ধতা কার??আহমেদ ফজলুররহমান মূরাদ

“রাষ্ট্র ও তার সরকার অত্যন্ত সুকৌশলে, জনগণকে অন্ধকারে রেখে তাদের ‘মিশন’ অব্যাহত রাখে। আমরা বোকা জনগণ ঘুণাক্ষরেও টের পাই না, আমাদের অজান্তে কী ভয়ংকর, কী গর্হিত, কী নোংরা সব জনবিরোধী কর্মকাণ্ডই না চলছে।”
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক চালু হবার পরে নিত্যদিন সারাদেশব্যপী চলমান ঘটনাবলি নিমিষেই জনগনের দৃষ্টিতে চলে আসছে।আজকের বাংলাদেশ যে এক ভয়ংকর রুপ নিয়েছে সেটা দেশের জনগন সহজেই বুঝতে পারছে।সরকার বা রাষ্ট্রব্যবস্থা তাদের দলদাস প্রচার মিডিয়া,দলদাস চাটুকার সাংবাদিক কিংবা দলীয় ব্যক্তিবর্গ দিয়ে শত প্রচেষ্টা করলেও জনগনকে আর সত্য থেকে দূরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।সামাজিক অনাচার এমনি পর্যায় গিয়ে পৌছে গেছে যে সরকারদলীয় চেতনাসম্পন্ন একটি শ্রেনী নিজেরাও এর বিরুদ্ধে আজ সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছেন।।।
প্রতিদিন বাংলাদেশের ৫৪হাজার বর্গমাইল এলাকাজুড়ে যে সকল সামাজিক অনাচার যেমন ত্রাণের চালচুরি,রিলিফের টনকে টন চাল আত্মসাৎ, টিসিবির তেল,চিনি,ডাল,ছোলা গুদামজাত, কালোবাজারি, নদীতে শতশত টিসিবির সোয়াবিনের ভাসমান খালি বতল, ধর্ষন,খুন,হত্যা,নারী নির্যাতন, শিশু বলাৎকার,চাদাবাজী,সংখ্যালঘুর সম্পদ দখল,মাদক ঘুষ,দুর্নীতি, বাড়ি দখল এর সংবাদ জনগন প্রত্যক্ষ করছে তার সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গের একটি অংশ সরকারি দলের নেতাকর্মী, বা সরকারি দলের স্থানীয় নেতাদের মদদপুষ্ট। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এদের একটি অংশকে ধরতে পারলেও বৃহত্তর অংশই ধরা ছোয়ার বাইরে।
প্রতিটা ঘটনা সংঘটিত হবার পরে সরকার বা সরকারি দল তাদের দায় এড়াতে জড়িত নেতাকর্মীদের দল থেকে বহিস্কার করেন। আবার কেউ কেউ জড়িত ব্যক্তিবর্গকে হাইব্রিড বা বিরোধী দল থেকে অনুপ্রবেশকারি বলেও চালিয়ে দেবার চেষ্টা করেন।অর্থাৎ যত দোষ নন্দ ঘোষ এরুপ একটি প্রচেষ্টা থাকে।।আবার কোন কোন ক্ষেত্রে একটি দায়সারভাবে একটি তদন্ত কমিটি করে জনগনকে বুঝ দেবার চেষ্টা করেন।সরকারি দলের মন্ত্রীরা এসব চাল চোরদের রক্ষায় এখন বলার চেষ্টা করছেন এগুলি সবনাকি ষড়যন্ত্র সরকারকে হেয় করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের দলের জনপ্রতিনিধিদের পারিবারিক মান মর্যাদা বিবেচনা না করে তাদেরকে চালচোর সাব্যস্ত করে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়া হচ্ছে।আবার গতকাল এক মন্ত্রী বলে দিয়েছেন তাদের দলের কোন নেতাকর্মী জনপ্রতিনিধি চালচুরি,ত্রাণ চুরি করতেই পারে না দেশে দুএক জায়গায় যে চালচুরি হচ্ছে এগুলি করছে জাসদসহ বিরোধী দলের লোকেরা।চালচোর,তেল চোরদের পক্ষে এর থেকে বড় সাফাই আর কি হতে পারে।
এবার আশাযাক বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মরনঘাতক করোনাভাইরাস প্রসঙ্গে।বাংলাদেশ এখন শতভাগ করোনাভাইরাস ঝুকিতে চলে গেছে এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।এটা এখন সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।যদিও বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন শুরু থেকে এটা যথাযথ সরকারি পদক্ষেপ থাকলে আমাদের দেশে এটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব ছিল।সরকারও আমাদের নানা প্রস্তুতির আশারবানী শুনিয়েছেন কিন্তু আজকের বাস্তবতা বলে দিচ্ছে সবটাই ফাফা বেলুন।আমাদের প্রস্তুতি বলতে গেলে শুন্যের কোটায়।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী আন্তরিক এটা আমরা বিশ্বাস করতে চাই কিন্তু তাকে দিয়ে যা বলানো বা করানো হচ্ছে তার সবগুলি অন্তঃসারশূন্য। তার চারপাশ থেকে যারা পরামর্শ দিচ্ছে তারা তাকে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে। তাদের ব্যক্তিগত সুবিধায় হোক বা চাটুকারিতা প্রদর্শন করতে হোক প্রথম থেকেই তারা প্রধানমন্ত্রীকে ভুল পরামর্শ দিয়ে অন্ধকারে রেখেছেন।সেটা বিমানবন্দরের বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা থেকে শুরু করে অদ্যাবধি যতগুলি ঘটনা ঘটেছে সবগুলিতেই একই প্রমাণ বহন করে।আমাদের সরকার প্রথম থেকেই তার স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতারণার শিকার হয়েছেন।স্বাস্থ্য বিভাগ করোনাভাইরাস মোকাবেলায় যেসকল প্রস্তুতির কথা বলেছে সবটাই মিথ্যাচার। করোনা মোকাবিলায় চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় সুরক্ষা পিপিই,গ্লোবস,মাস্ক নিয়ে শুধু মিথ্যাচার নয় এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ নামে নিয়েছেন প্রতারণার আশ্রয়। হীন মুনাফার স্বার্থ বিবেচনায় মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় প্রস্তুত অতি নিম্নমানের মাস্কে এন-৯৫ লিখে চিকিৎসকদের সরবরাহ করেছেন যার ফলে আজকে অনেক চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরন করছেন। তাদের এই জঘন্য কাজ চিকিৎসকদের মনোবলে চীড় ধরিয়ে দিয়েছে।ইতিমধ্যে চিকিৎসকদের একটি অংশ আক্রান্ত হয়ে আইসোলিউসিন চলে গেছেন যার ফলে আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাই সংকটের মুখে।।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চারপাশ ঘিরে থাকা বড়বড় পরামর্শদাতা সুবিধাভোগীরা আজ বেসরকারি হাসপাতালের মালিক তারা কি তাদের হাসপাতালে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের কোন চিকিৎসা দিচ্ছেন নাকি সেগুলি ক্লোজড লেখে রেখে দিয়েছেন।চিকিৎসকদের সংগঠন বিএমএ স্বাচিপ সরকারের সুবিধাভোগী তারাও আজ নানাবিধ শর্তারোপ করছে।আজকে স্বাস্থ্য বিভাগ ও চিকিৎসক পারিষদ এর দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে দৃশ্যমান।সবকিছু বিবেচনা করলে একটি সমন্বয়হীন লেজেগোবরে অবস্থা। আজকে সারাদেশব্যপী করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার মুলকারন গার্মেন্টস কর্মীদের ঢাকায় ডেকে আনা তাদের বেতন দেবার জন্য সরকার পাচহাজার কোটিটাকা প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন তাহলে আজকে কেন গার্মেন্টস কর্মীরা রাস্তায় আন্দোলন করছে? আজকে রুবানা কোথায়? এই বিজিএমই সরকারের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। তারাও কেন প্রধানমন্ত্রীর কথা শুনছে না??
আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিজের দলের নেতৃবৃন্দ করোনাভাইরাস মোকাবেলা নিয়ে বড় বড় বুলি আওড়ালেও আজকে তাদের ভুমিকা কি? কোথায় অর্থমন্ত্রীর চীনের মতো হাসপাতাল? আর সেতুমন্ত্রীর করোনার থেকে শক্তিশালী দেহ।তারা কেন আজকে জনগনকে আশ্বস্ত করতে পারছেন না।কিভাবে গতকাল বিবাড়িয়াতে লক্ষ লোকের সমাবেশ হতে পারলো? আজকে আমরা বি বাড়িয়ার এক খেলাফত নেতার জানাযায় লক্ষ লোকের সমাবেশের নিন্দা করছি।কিন্তু কেউ কি চিন্তা করেছি এটা কেন হচ্ছে? সরকার এতোকরে জনগনকে ঘরে থাকতে বলছে তারপরও কেন জনগন মানছে না।কেউ কেউ বলতে পারেন নিম্ন আয়ের লোকেরা পেটের তাগিদে বের হচ্ছে।সেটা একটি কারন হতে পারে এর পাশাপাশি সরকারের সিদ্ধান্তহীনতাকেও বিচার করতে হবে।লকডাউন ইজ লকডাউন এর মাঝামাঝি কিছু নেই। আমাদের সরকার বলছে ঘরে থাকুন তাহলে গার্মেন্টস খোলা কেন? ব্যাংক খোলা কেন? প্রতিদিন সঞ্চয়পত্রের মুনাফা,পেনশন, ভাতা,নিতে হাজার হাজার গ্রাহক ব্যাংকে এসে সমাবেশ করছেন।কেন এতে কি করোনা ছড়াতে পারে না? আপনি এগুলি খোলা রাখবেন আর মসজিদে নামাজ পড়তে নিষেধ করবেন এটা জনগন মানবে কেন?একারণ আজকে বিবাড়িয়াতে লক্ষ লোকের সমাবেশ হচ্ছে এটাও বুঝতে হবে।
,”জাতি আজ মহা দুর্যোগে। এ দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারের চরম অব্যবস্থাপনা জাতিকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ মহাদুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সকল মত ও পথ ভুলে গিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। কালক্ষেপন না করে অবিলম্বে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা এবং করোনার ব্যাপক বিস্তার রোধে কাযর্কর ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। এটা মূলতঃ স্বাস্থ্য তথা জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়, এর যথাযথ ব্যবস্থাপনায় তাই জনস্বাস্থ্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভূক্ত করে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত জনশক্তির সকল পেশাজীবী সংগঠন ও ব্যক্তিত্ব সমন্বয়ে জাতীয় পর্যায়ে ‘করোনা ব্যবস্থাপনা কমিটি‘ গঠন করা আশু প্রয়োজন। এতে দেশের বাইরে অবস্থানকারী বাংলাদেশী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদেরও অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। এই কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ব্যবস্থা গ্রহন করবে। আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ে অনুরূপ কমিটি গঠন করতে হবে।”
আজকে বিরোধীদলের নেতৃবৃন্দ এমনকি সরকারের অংশীদার ১৪দলের নেতৃবৃন্দ বারবার সরকারকে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছেন। সরকার সেদিকে নুন্যতম কর্ণপাত করছেন না।তারা তাদের আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন ও নিজের দলীয় নেতাকর্মী দিয়ে এজাতীয় সংকট মোকাবেলা করতে চাইছেন।সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা ত্রাণ বিতরনের নামে সারাদেশব্যপী যে চালচুরির লুটপাটতন্ত্র কায়েম করেছেন সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।আর কেউ কেউ হুমকি ধমকি দিচ্ছেন এভাবে হুমকি ধমকি দিয়ে কি মহাপ্রলয় রুখা যাবে? এরজন্য চাই সমন্বিত উদ্যোগ যা এই কতৃত্ববাদী সরকারের কাছে আশাকরা বৃথা।।
আমরা সাধারণ জনগণ চিৎকার করছি, ফেসবুকে লিখছি,সমালোচনা করছি।সরকার হয়তো আমাদেরকে বুঝ দেবার জন্য কিছু দৃশ্যগত পদক্ষেপ এর কথা বলছেন।কিন্তু সরকার কি আমাদের কাছে দায়বদ্ধ আমরা কি ভোট দিয়ে এ সরকার বসিয়েছি।এ সরকার যারা বানিয়েছে সরকার তাদের এবং সরকার তাদের কাছেই দায়বদ্ধ। ফলে আমাদেরকে করোনায় মরন হবার কারনে তাদের কাছে কিছু আশা করা দুরাশার নামান্তর।। তারপরেও আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে এই মহামারি থেকে মুক্তি পেতে আমাদেরকেই স্বীয় ক্ষমতায় রুখে দাড়াতে হবে। সেই চেষ্টা আমাদেরকেই করতে হবে।।সরকার নয় আমরাই আমাদের নিজেদের রক্ষায় দায়বদ্ধ।।ঘরে থাকুন নিজের বাচা নিজে বাচুন অপরকে বাচতে সহায়তা করুন।।
অবশেষে ছোটভাই সহযোদ্ধা ফারুক হাসানের কবিতা দিয়ে শেষ করলাম।
“আবার আমাদের দেখা হবে ”
—————————————————
আবার আমাদের দেখা হবে,
জিবন এবং মৃত্যুর এই যুদ্ধ শেষে
আবার আমাদের দেখা হবে।।
যুদ্ধ এবং হিংসার দেবতারা পরাজিত হবে,
পূর্ব-পশ্চিম থেকে ধেয়ে আসা মৃত্যুর মিসাইল
ফিরে যাবে ক্লান্ত, অবসন্ন হ’য়ে, তারপর
আবার আমাদের দেখা হবে।।
এই প্রগাঢ় নিস্তব্ধতা, ঘরবন্দী হাহাকার শেষে,
শিশুদের কোলাহলে ভরা ভালোবাসার নতুন পৃথিবীতে
মৃত্যুর বিনিময়ে কিনে নেওয়া নতুন জীবনে
আবার আমাদের দেখা হবে।।