ইসরাইল চালায় ‘ডিপ স্টেট’, এখানে গণতন্ত্র নেই: নেতানিয়াহু

রাষ্ট্রের ভেতরে থাকা রাষ্ট্রই ইসরাইল পরিচালনা করে। সেখানে কোনো গণতন্ত্র নেই। নিজেদের প্রায়শই “মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতন্ত্র” দাবি করা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুই নিজ দেশ সম্পর্কে এমন দাবি করেছেন! ইসরাইলি পত্রিকা হারেৎজ লিখেছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নেতানিয়াহুর সঙ্গে যারাই সাক্ষাৎ করতে গেছেন, তারা রীতিমত তার কাছে থেকে নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা শুনে এসেছেন। এই বক্তৃতার সঙ্গে ইন্টারনেটের ষড়যন্ত্র তাত্বিকদের বক্তব্যের তেমন ফারাক নেই। তিনি বলেছেন, যদিও তিনি বারবার নির্বাচিত হয়েছেন, বাস্তবে “ডিপ স্টেট” ইসরাইল পরিচালনা করে। তার ভাষ্য, “এখানে কোনো গণতন্ত্র নেই। এটি মূলত আমলা ও আইনজীবী, বিচারকদের সরকার।”
হারেৎজের খবরে বলা হয়, দৃশ্যত নেতানিয়াহুর এমন বক্তব্যের পেছনে কাজ করছে তার বিরুদ্ধে চলমান বিচার প্রক্রিয়া। দুর্নীতির অভিযোগে চলা এই বিচারকে তিনি “হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্রে”র চেয়েও বিপজ্জনক আখ্যা দিয়েছেন।
তার মতে, সরকারি কৌঁসুলি ও বিচারকরা এক অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন। আর তা হলো, তাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা।
এক ব্যক্তিগত আলাপে তিনি বলেন, “তারা চায় আমি জেলে থাকি।” “তারা” বলতে তিনি এখানে ইসরাইলের সামগ্রিক সিস্টেমকে বুঝিয়েছেন। খবরে বলা হয়, এখনও তার এই দুর্নীতি মামলার শুনানি কোন বিচারক করবেন, তা ঠিক হয়নি। কিন্তু নেতানিয়াহুর মতে, সবচেয়ে “বামপন্থী” ও খুবই কঠোর বেঞ্চই তার বিচারের দায়িত্ব পাবে।
নির্বাচনের আগে কয়েকজন মন্ত্রী নেতানিয়াহুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন তার একসময়ের মিত্র ও জোটসঙ্গী ইসরায়েল বেইতেইনু দলের চেয়ারম্যান আভিগদর লিবারম্যান তাকে উৎখাতের চেষ্টা করেছিলেন। এ সময় নেতানিয়াহু বারবার অন্তরালের কিছু শক্তির প্রসঙ্গ তোলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “তাকে কেউ চাপ দিচ্ছে।”
তিনি এ-ও বলেছেন যে, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এমন তথ্যও আছে যা ব্যবহার করে লিবারম্যানের বিরুদ্ধেও ফৌজদারি তদন্ত শুরু করা যায়। কিন্তু লিবারম্যান যদি রাজনৈতিকভাবে নেতানিয়াহুকে ধ্বংস করার কাজ অব্যাহত রাখেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করা হবে না। নেতানিয়াহু এ সময় বলেন, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিবারম্যানের দলের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে একটি বৃহৎ দুর্নীতি মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়। ওই দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে লিবারম্যানের জড়িত থাকার বিষয়ে তথ্য আছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। কিন্তু নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে থাকার বিনিময়ে সেই তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে না।
তবে লিবারম্যান নিজে অবশ্য বলছেন ভিন্ন কথা। তার দাবি, তার দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে যেই তদন্ত হয়েছে, তার নেপথ্যে আছেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু।
তবে লিবারম্যানের দলের বিরুদ্ধে মামলা ও নেতানিয়াহুর একটি দুর্নীতি মামলা সম্পর্কে অবহিত আছেন, এমন একটি সূত্র জানিয়েছে, সাবমেরিন ক্রয় দুর্নীতি মামলায় নেতানিয়াহুর সাঙ্গোপাঙ্গরা জড়িত ছিলেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে নেতানিয়াহু জড়িত ছিলেন বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে ওই মামলায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়নি। ঠিক তেমনি, লিবারম্যানের ক্ষেত্রেও, তার সাঙ্গোপাঙ্গরা দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার অনেকাংশেই নির্ভর করছিল লিবারম্যানের ওপর। ছোট দল হলেও লিয়ারম্যানের দল ইসরাইলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনই কিংসমেকার। ওই সময় লিবারম্যানের দলের দাবি মেনে নিয়ে নেতানিয়াহু তাদেরকে দু’টি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন। এই মন্ত্রণালয় দু’টি হলো বিচার মন্ত্রণালয় ও জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয়। প্রথমটি সরকারি কৌঁসুলি বিভাগ ও দ্বিতীয়টি পুলিশকে নিয়ন্ত্রণ করে। দুই মন্ত্রণালয় ছাড়াও আইন শৃঙ্খলা ও বিচারিক বিষয়াদির দায়িত্বে থাকা পার্লামেন্টের আইন ও বিচার কমিটির চেয়ারম্যান পদ এবং বিচারিক নিয়োগ কমিটির সদস্যপদ বাগিয়ে নেয় লিবারম্যানের দল। ওই সময় লিবারম্যানের বিরুদ্ধে ঘুষগ্রহণের অভিযোগ উঠে। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় ওই মামলা থেমে যায়।
নেতানিয়াহু এখন ওই প্রসঙ্গ তুলছেন নতুন করে। খবরে বলা হয়, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আগে থেকেই দেশের বিচার ও আইন কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করেন তিনি। সেই প্রচারণারই অংশ তার নতুন এসব মন্তব্য।