নারী মুক্তির বর্ণাঢ্য মিছিল ও গ্রাম বাংলার দুর্দশাগ্রস্থ নারী সমাজ : সা কা ম আনিছুর রহমান খান কামাল

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১০ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে , ‘ জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করিবার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে ।’ ২৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে , ‘ (১ ) কেবল ধর্ম , গোষ্ঠী , বর্ণ , নারীÑপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না। (২) রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষরো সমান অধিকার লাভ করিবেন। (৩) কেবল ধর্ম , গোষ্ঠী , বর্ণ , নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা , বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না। (৪) নারী ও শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান Ñপ্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না। ’

উক্ত অনুচ্ছেদ সমূহের মর্মানুসারে বাংলার দুর্দশাগ্রস্থ নারী সমাজকে কার্যার্থে প্রতিকার দেবার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে আইন ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আদালত।
বিবাহে যৌতুক প্রদান বা গ্রহণ নিষিদ্ধ করার জন্য ‘ যৌতুক নিরোধ আইন , ১৯৮০ ’ ; পারিবারিক আদালত প্রতিষ্ঠা ও তৎসংশিষ্ট বিষয়াদি দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ‘ পারিবারিক আদালত সমূহ অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ ’ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনমূলক অপরাধসমূহ কঠোরভাবে দমনের উদ্দেশ্যে ‘ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন Ñ২০০০’ প্রণীত হয়েছে। এর আগেও ‘ নারী নির্যাতন ( নিবর্তক শাস্তি) অধ্যাদেশ ,১৯৮৩ ’ এবং ‘ নারী ও শিশু নির্যাতন ( বিশেষ বিধান ) আইন , ১৯৯৫ ’ প্রণীত হয়েছিল , যা পরবর্র্তীতে অভিজ্ঞতার আলোকে সমৃদ্ধ করে ‘ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন Ñ২০০০’ প্রণয়নের মাধ্যমে বিলুপ্ত করা হয়েছে।

দুস্থ ও দুর্দশাগ্রস্থ নারীগণ আইনের আশ্রয় লাভের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলে তাদেরকে আদালতের দারস্থ হতে হয়। সেক্ষেত্রে সব সময় প্রতিকার প্রার্থনা করা সহজসাধ্য হয়ে উঠে না। উকিল সাহেবদের মাধ্যমে মামলা দায়ের করতে গেলে যে খরচ বহন করতে হয় তা করার সামর্থ্য এই দুস্থ ও দুর্দশাগ্রস্থ নারীদের থাকেনা । এই অবস্থায় আইন আদালত থাকলেও সহজে তার সুফল পাবার সৌভাগ্য এইসব নারীদের হয়ে উঠেনা। তবে মোকদ্দমা দায়ের করতে পারলে বিচারকগণ অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথেই তা স্বল্পতম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করে থাকেন। পারিবারিক আদালতের ‘ জজ ’ দের কর্মতৎপরতা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু বিচারকের কাছে আরজি নিয়ে পৌছানোটাই সমস্যা। আর্থিকভাবে অসচ্ছল , সহায় সম্বলহীন এবং নানাবিধ আর্থসামাজিক কারণে বিচার প্রাপ্তিতে অসমর্থ বিচারপ্রার্থী জনগণকে প্রতিটি জেলায় ‘ জেলা জজ ’ এর নেতৃত্ব ও তত্ত্বাবধানে ‘ আইনগত সহায়তা প্রদান কমিটি ’র মাধ্যমে আইনগত সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ‘ আইনগত সহায়তা প্রদান আইন,২০০০’ প্রণীত ও প্রবর্তিত হয়েছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন বেÑসরকারী সংস্থা এই সব দুস্থ ও দুর্দশাগ্রস্থ নারীদেরকে প্রতিকার দেবার কর্মসূচী ঘোষণা করেছে। মূলতঃ শহর কেন্দ্রীক এইসব বেÑসরকারী সংস্থার কার্যক্রম দ্বারা গ্রাম বাংলার দুস্থ ও দুর্দশাগ্রস্থ নারী সমাজ খুব কমই উপকৃত হয়ে থাকে। বর্ণাঢ্য প্রচার প্রচারণার ব্যপকতার তুলনায় প্রকৃত কাজের পরিমাণ অনেক কম।

তিলোত্তমা রাজধানীর রাজপথে নারী মুক্তির বর্ণাঢ্য মিছিল অবশ্যই দর্শকদের চোখ জুড়িয়ে দেয়, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিলাস বহুল হোটেলের ‘বলরুমে’ ইংরেজি ভাষায় লিখিত ব্যানার টাঙিয়ে অনুষ্ঠিত সেমিনার , সিম্পোজিয়ামের চলমান ছবি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষও অবলোকন করার সুযোগ পায়, ইলেকট্রনিক গণÑমাধ্যমের বদৌলতে। গ্রাম বাংলার দুর্দশাগ্রস্থ নারী সমাজের কাছে তা দুর্লভ রূপকথার কল্পÑকাহিনীর মতোই মনে হয়। তারা ভাবে যদি এইসব বক্তৃতাগুলো প্রকৃত পক্ষেই তাদের নাগালের মধ্যে প্রস্ফুটিত হয়ে বাস্তবে রূপ নিতো তাহলে তাদের জীবন কতো সুন্দর হতো ; কিন্তু সবই তো টেলিভিশনের পর্দায়, বাস্তবে এর কোন ছোঁয়া পাবার সুযোগ নাই। বাংলার গ্রাম গঞ্জে বসবাসকারী লক্ষ কোটি দুর্দশাগ্রস্থ নারীদের একজন হচ্ছেন হাওয়া খানম দোলন ; পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলাধীন পারÑফরিদপুর গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলমান পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। পরিণত বয়সে সে পারিবারিক ও সামাজিক সিদ্ধান্তে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় বিপত্নীক প্রকৌশলী আবু সরকারের সাথে। বিপত্নীক বর গ্রহণে আপত্তি করলেও আবু সরকারের পক্ষের অত্যধিক আগ্রহ আশ্বাস প্রতিশ্রুতির কারণে দোলন বিবাহে সম্মতি দেয়।

বিবাহের পর স্বামীর সাথে দোলন চলে যায় চট্টগামে, সেখানে ‘ … … ষ্টিল মিল ’এ সহকারী যন্ত্র প্রকৌশলী পদে আবু সরকার চাকুরী করে। পরলোকগত সতীনের গর্ভজাত দুই সন্তানকে মাতৃস্নেহে আপন করে নেয় দোলন। সুখেই কাটছিল তাদের দিন। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে দোলন নিজেও মাতৃত্ব অর্জন করে। বাংলার আর দশজন নারীর মতো সন্তান প্রসবকালে দোলন তাঁর পিত্রালয়ে যায়, ফুটফুটে এক পুত্র সন্তান নিয়ে ফিরে আসে স্বামীর গৃহে। দোলনের পিত্রালয়ে অবস্থানকালীন সময়ে তাঁর স্বামী গৃহে তাঁর তালাকপ্রাপ্তা ননদ আসে। এরপর আবু সরকারের মন মানসিকতায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে। যে গৃহ ছিল আদর সোহাগ প্রেম ও ভক্তিতে ভরা , সেই গৃহে কালো ছায়া আচ্ছন্ন করে সারা পরিবেশ। প্রতি পদক্ষেপেই দোলন আর তাঁর আর্থিক অবস্থাপন্ন ভাইদের প্রতি অহেতুক কটূক্তি করতে থাকে আবু সরকার; প্রতি পদে পদে স্বামী ও ননদের লাঞ্ছনা ও গঞ্জনায় বিষিয়ে ওঠে দোলনের জীবন। আবু সরকারের আচরণই বলে দেয় সে কি চায়। কিন্তু কিছুদিন পর পরই বিরাট অংকের টাকা শুধু বোনের বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য খরচ করা কি কোন ভাইয়ের পক্ষে সম্ভব ? টাকা না দিলেই যেখানে লাঞ্ছনা ও গঞ্জনার শিকার হতে হয় একজন নারীকে , সেখানে সম্মানজনক সুষ্ঠু প্রতিকার কোথায় ?

দোলনকে ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে ফেব্রয়ারী তারিখে তাঁর পিত্রালয়ে পাঠিয়ে দেয় আবু সরকার। এরপর দু‘বছরেরও অধিক সময় চলে গেলেও স্বামীর সংসারে ফিরে যাবার সৌভাগ্য হয়নি দোলনের । মাঝে সালিশ দরবার হয়েছে , আবু সরকার কোন স্থির যৌক্তিক সিদ্ধান্তে উপনীত হয় নাই। চুনীর পরিবারের পক্ষ থেকে মোহরানার টাকা পরিশোধ করে খোরপোষের টাকা নিয়মিত প্রদানের জন্য বলা হয়, আবু সরকার তা ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে পরিশোধ করতে অঙ্গীকার করলেও তা অদ্যাবধি পরিশোধ করে নাই। আবু সরকারের এসব আচরণের বিষয় তাঁর কর্মস্থলের কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়, সমাধান করে দেবার মৌখিক আশ্বাস সুললিত কন্ঠে পাওয়া যায় , কিন্তু ঐ পর্যন্তই । সব শেষে দোলন শরণাপন্ন হয় ‘জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি’র ; তাঁরা দৃঢ়ভাবে আশ্বাস দেয় মোহরানা ও খোরপোষের টাকা আদায় করে দেবে। আবু সরকার আপোষে না দিলে তা আদায় করা হবে আদালতের মাধ্যমে। ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রয়ারী থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সমিতির পাবনার দপ্তরে নিয়মিত হাজির হতে থাকে দোলন । কিন্তু তারা মোহরানা ও খোরপোষের এক কপর্দকও আদায় করে দিতে পারে নাই। আশার বাণী ধ্বনিত হয় ‘ব্লাস্টো’র দফতর থেকে , আশান্বিত হয়ে দোলন ছুটে যায় সেখানে। ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর থেকে সেখানেই অনেক আশা নিয়ে ঘুরছে দোলন ।

এখন পর্যন্ত তাঁকে মোহরানা ও খোরপোষের এক পয়সাও আদায় করে দিতে পারেনি এই বেÑসরকারী সংস্থাও। নাবালক সন্তান সহ নিজের ভরণপোষণের জন্য দোলন তাঁর ভাইদের উপর নির্ভরশীল, সেখানে এইসব বে সরকারী সংস্থার দপ্তরে আশায় আশায় বৎসরাধিককাল ধরে হাজিরা দিয়ে চলেছে , এ জন্য রাহা খরচটাও ভাইদের কাছ থেকে নিতে হচ্ছে। কতদিনে সে প্রতিকার পাবে তার কোন জবাব না পেলেও তাকে বলা হয়েছে ,‘ বুঝেন তো , এটাও একটা ব্যবসা ’। এটা যদি ব্যবসা হয় তবে সেবার আওয়াজ দেওয়া হয় কেন ? এ প্রশ্নের কি জবাব দেবেন এই সব বেসরকারী সংস্থার কর্ণধারেরা। উপায়ন্তর না দেখে নিজ উদ্যোগে দোলন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১(গ) ধারায় প্রকৌশলী আবু সরকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে ফরিদপুর (পাবনা জেলা ) থানায়। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামলাটি গুরুত্বের সাথেই গ্রহণ করেন। তদন্ত করে আসামী প্রকৌশলী আবু সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগনামাও দাখিল করা হয়েছে । নারী শিশু মামলা নং ২২/২০০৯ ( জি , আর ৬৫/২০০৮) সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল আসামীকে খালাস দিয়েছে । এখন তা আপিল আদালতে বিচারাধীন। তদন্তের সময়ে দোলনের কোন অর্থ ব্যয় না হলেও এখন কি হবে তা নিয়ে তার চিন্তার শেষ নাই, পারিপার্শ্বিক অবস্থাই তাকে এভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করছে।

প্রাগুক্ত দোলন একা নয় , বাংলার অসংখ্য বেদনা পীড়িত , দুর্দশাগ্রস্থ , প্রতারিত নারী সমাজের সে প্রতিভূ মাত্র। নারী মুক্তির বর্ণাঢ্য মিছিল ও আপ্ত বাণী তাই গ্রাম বাংলার
দুর্দশাগ্রস্থ নারী সমাজের কাছে ফাঁকা বুলি তথা ফক্কিকার বলেই মনে হয়।

লেখকঃ সাবেক জেলা ও দায়রা জজ , বর্তমানে অ্যাডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট , হাইকোর্ট বিভাগ , ঢাকা । কার্যকরী সভাপতি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল , জে এস ডি ।