প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি গা করছে না প্রশাসন :করোনার দুর্যোগে থামছে না চাল চুরি

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমণে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় দরিদ্র মানুষকে সহায়তার জন্য বরাদ্দ করা সরকারি চাল চুরির ঘটনা থামছেই না।

সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ও ভিজিডি’র চাল আত্মসাতের ঘটনা ঘটছে প্রায় প্রতিদিনই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার এ ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও তা যেন গা করছেন না প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা।

‘ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম পেলে আমি কাউকেই ছাড়ব না, কেউ চুরি করলে প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে তাত্ক্ষণিক বিচারের ব্যবস্থা করা হবে, দরকার হলে দ্রুত বিচার আইনে মামলা হবে’— সাবধান করে প্রধানমন্ত্রী এমন কথা বললেও সেটিকে পরোয়া করছেন না প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এবং কতিপয় জনপ্রতিনিধি।

করোনা ভাইরাসের প্রকোপের এই কঠিন দুর্যোগের সময়েও কমবেশি প্রায় সারাদেশে কতিপয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ মিলেমিশে গরিবের চাল আত্মসাত্ করছে।

অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, তারাও দলীয় ও সরকার প্রধানের হুঁশিয়ারিবার্তা আমলে নিচ্ছেন না।

সরকারি ত্রাণের চাল লুটপাটের ঘটনা সব সরকারের আমলেই কম-বেশি ঘটলেও করোনা ভাইরাসের প্রকোপের মহামারির মধ্যে গত কয়েক দিনের চাল চুরির ঘটনা অতীতের চিত্রকেও যেন হার মানাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সাবধানবার্তাকে তুড়ি মেরে চাল চুরি করেই যাচ্ছে কতিপয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের লোকজনের সম্মিলিত চক্র।

গত কয়েক দিনে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি চাল চুরির ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থানীয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব চুরির ঘটনায় স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের কতিপয় জনপ্রতিনিধির সঙ্গে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও জড়িত। ফলে চুরির চালও উদ্ধার হচ্ছে না। আবার চুরির ঘটনা ঘটলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গৃহীত হচ্ছে না। চুরি ধরা পড়লেও কোথাও কোথাও প্রশাসনের সঙ্গে জনপ্রনিধিদের আপসরফার ঘটনাও ঘটছে।

অবশ্য, ত্রাণ বিতরণে অনিয়মের জন্য বুধবার পর্যন্ত ইউনিয়ন পরিষদের ৯ জন চেয়ারম্যান এবং ১২ জন সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিক জনপ্রতিনিধিকে গ্রেফতার করে মামলা দিয়েছে।

বুধবার রাতেও বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূরে আলমের মালিকানাধীন একটি ঘর থেকে করোনাকালে জেলেদের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১৮৪ বস্তা চাল উদ্ধার করেছে র‌্যাব।

সরকার প্রধানের হুঁশিয়ারির মধ্যেই শনিবার রাত থেকে রবিবার দুপুর পর্যন্ত দেশের আট জেলা থেকে ২৫ হাজার ৮০০ কেজি (প্রায় ২৬ টন) চাল উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব ঘটনায় আটক করা হয়েছে ১৮ জনকে, যাদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের।

এর আগে ৮ এপ্রিল থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ দিনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ১ লাখ ২১ হাজার ২৫৭ কেজি (১২১ টনের বেশি) সরকারি চাল উদ্ধার করে। এরমধ্যে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ১০ টাকা কেজি দরে খোলাবাজারে বিক্রি কর্মসূচির (ওএমএস) এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চালও রয়েছে।

গত ১২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে বিভিন্ন জেলার কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলার সময় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের বিষয় কয়েকটি খবর এসেছে। আমরা সাধ্যমতো সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি। সেই সহায়তায় যারা অনিয়ম-দুর্নীতি করার চেষ্টা করবে তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে তাত্ক্ষণিকভাবে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে তাদের বিচার করা হবে, দরকার হলে দ্রুত বিচার আইনে বিচার করা হবে।’

বুধবারও গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে অনুদান গ্রহণকালে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘গরিবের জন্য আমরা যেটা দেব সেটা কেউ কোনো রকম অপব্যবহার করবে, এটা আমরা বরদাস্ত করব না। সেটা আমার দলেরই হোক বা অন্য দলেরই হোক আমরা এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি, নেব।’

প্রধানমন্ত্রীর এমন কঠোর হুঁশিয়ারির মধ্যেও প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও চাল চুরির ঘটনা ঘটছে। পর্যবেক্ষক মহলের মতে, প্রধানমন্ত্রীর সতর্কবার্তার সঙ্গে বাস্তবচিত্রের যে বৈপরীত্য তাতে এটা পরিষ্কার যে, প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারিকে মাঠ প্রশাসন যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর বার্তা আমলে নিয়ে প্রশাসন সতর্ক থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নিলে চাল চুরির এসব ঘটনা ঘটত না।

চাল চুরির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার আইনে বিচার করা সম্ভব কি না, এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গতকাল বৃহস্পতিবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘অবশ্যই সম্ভব। যে কোনো জনগুরুত্বপূর্ণ মামলারই দ্রুত বিচার আইনে বিচার করা যায়। বিশেষ ক্ষমতা আইন-২০০০ এর সেকশন ২৫ অনুযায়ী এসব মামলার বিচার করা যাবে। এই আইনটি করাই তো হয়েছে জনগুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর বিচারের জন্য। সে ক্ষেত্রে ১৩৫ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান রয়েছে।’

ইত্তেফাক/জেডএইচ