খাদ্যসঙ্কটে পড়বে প্রায় ৭ কোটি মানুষ

করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শ্রমিক শ্রেণী। দেশের প্রায় সাত কোটি মানুষ খাদ্যসঙ্কটে পড়বে বলে নাগরিক সমাজ আশঙ্কা করছে। তারা বলছেন, সম্ভাব্য এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় দেশের অর্থনীতিতে উন্নয়নের চেয়ে মানবিক প্রয়োজনের দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের আপৎকালীন বাজেটে কৃষি খাতের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া প্রয়োজন; যাতে ক্ষুধার্ত মানুষ খাবারের অধিকার থেকে বঞ্চিত না থাকে। এ ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে তথ্যের অবাধ ও সঠিক প্রবাহ এবং সামাজিক সংহতি রক্ষায় রাষ্ট্রের খেয়াল রাখা জরুরি। এ কাজে স্বেচ্ছাসেবকদেরও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের মধ্যে যুক্ত করা প্রয়োজন। সরকার যেসব আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সেগুলো পুরোপুরি প্রণোদনা নয়।

‘কোভিড-১৯ সঙ্কট : বাংলাদেশের আর্থ-রাজনৈতিক প্রেক্ষিত’ শীর্ষক এক অনলাইন ডায়লগে গত মঙ্গলবার বক্তারা এসব কথা বলেন। আলাপ নামের একটি ফোরাম আয়োজিত এই ডায়লগে বক্তব্য রাখেন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও নাগরিক সংগঠন নাবিকের আহ্বায়ক ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাউথ এশিয়া রিসার্চার সুলতান মোহাম্মদ জাকারিয়া, প্রকৌশলী ও টেকসই উন্নয়ন অ্যাক্টিভিস্ট ফাইজ আহমেদ তাইয়্যেব, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গবেষক আলতাফ পারভেজ, জাতিসঙ্ঘের ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্টে কর্মরত গালিব ইবনে আনোয়ারুল আজিম, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মো: শহিদুল ইসলাম, গ্রিন ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক আহসান হাবীব, সাংবাদিক ও অধিকার কর্মী শাহেরীন আরাফাত, মানবাধিকার কর্মী সুবর্ণা ধর প্রমুখ। ডায়লগ সঞ্চালনায় ছিলেন লেখক ও গবেষক জাকারিয়া পলাশ।

ফাইজ আহমেদ তাইয়্যেব বলেন, এখন পর্যন্ত সরকার যেসব আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সেগুলো পুরোপুরি প্রণোদনা নয়। এগুলো মূলত সহজ শর্তে দেয়া ঋণ প্যাকেজ। পরিস্থিতি মোকাবেলায় এমন পরিকল্পনা নেয়া উচিত যেন, শ্রমিক ও কৃষকরা গ্রামে অবস্থান করে। শ্রমিকরা গ্রামে না থেকে কর্মসংস্থানের খোঁজে শহরে চলে আসলে কৃষিতে সঙ্কট সৃষ্টি হবে। রাজস্ব আয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে করোনা পরিস্থিতির কারণে রাজস্ব আয় কমে যাবে। এরপর নতুন অর্থবছরে সরকারকে আপৎকালীন বাজেট দিতে হবে। সে সময়ও সরকারকে রাজস্বের চেয়ে নাগরিকদের প্রয়োজনের দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, করের বোঝা যাতে বৃদ্ধি না পায় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। ঋণ প্যাকেজ সম্পর্কে তিনি আরো বলেন, খেলাপি সংস্কৃতি ও ব্যাংক মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে এসব প্যাকেজ বেহাত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, এডিপি কাটছাঁট করে, শ্রমিকদের জন্য প্রণোদনা দিতে হবে। অর্থনীতিকে মানবকল্যাণমুখী অবস্থায় নেয়া দরকার। প্রবৃদ্ধি যে কর্মহীন করেছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা দরকার।

আলতাফ পারভেজ বলেন, আমরা সবাই দেশের সমস্যাগুলো জানি। এ নিয়ে আলোচনা করে মন খারাপ করার চেয়ে এখন সামনে আগানো দরকার। বিরাট তরুণ সমাজ এখন কিছু একটা করতে চায়। দেশে সক্ষমতার সঙ্কট আছে। কিন্তু আমাদের হেরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা সচেতন হইনি। উল্টো আতঙ্কিত হয়েছি। ফলে একটা গণঅসুস্থতা সৃষ্টি হয়েছে। করোনা রোগীকে ঘৃণা করা শুরু হয়েছে। মৃত ব্যক্তিকে দাফন না দেয়ার ঘটনা ঘটছে। এগুলো সচেতনতা নয়, এগুলো আতঙ্ক। এগুলো আমাদের সমাজ ভেঙে দিচ্ছে। করোনার মতো সমাজ ভেঙে পড়াও বিপজ্জনক। এখন জরুরি ভিত্তিতে প্রশাসনিক উদ্যোগ যেমন করোনা মোকাবেলায় হওয়া উচিত, তেমনি অর্থনৈতিক সব উদ্যোগ কৃষি কেন্দ্রিক হওয়া দরকার। এ জন্য শ্রমিক ও কৃষককে নগদ সহায়তা দিতে হবে। সামনের বোরো মৌসুমে স্বাস্থ্য বিধি মেনে যাতে ধান উত্তোলন করা যায় সে জন্য বিপুল সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবী দরকার। এ কাজে তরুণদের সম্পৃক্তির উদ্যোগ নেয়া দরকার।

গালিব ইবনে আনোয়ারুল আজিম বলেন, আমরা দেখতে পেয়েছি অর্থনীতির স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে। ব্যাপক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। কিন্তু দেখা গেল বড় করপোরেশনগুলোও পরিস্থিতি মোকাবেলায় এক মাসের জন্যও শ্রমিকদের বেতন চালিয়ে নিতে পারছে না। তাহলে তাদের আর্থিক স্বাস্থ্যের কী হলো। এ ছাড়া আগামীতে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ থেকে আমাদের বিপুল সংখ্যক অভিবাসী দেশে ফিরে আসবে। সেই পরিস্থিতি মোকবেলার জন্যও সতর্ক হতে হবে। তিনি বলেন, এসএমই ও কৃষি ক্ষেত্রে এই ঋণ বাস্তবে মানুষের হাতে পৌঁছাতে এক বছরেরও বেশি সময় লাগবে। তা ছাড়া ব্যাংকগুলো তাদের ব্যয় বাড়ার কারণে এসএমই খাতে স্বল্প সুদে ঋণ দিতে চাইবে না। এ জন্য ভর্তুকি বেশি লাগলেও ক্ষুদ্রঋণ চ্যানেলগুলো ব্যবহার করলে মাঠ পর্যায়ে দ্রুত এই ঋণের সুবিধা পৌঁছাতে পারে।

সুলতান মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, কোভিড সঙ্কট মানবাধিকার পরিস্থিতিকে নতুন করে আমাদের সামনে এনেছে। প্রথমত স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিতদের ঝুঁকি যত বেশি, সে তুলনায় প্রস্তুতি খুবই সীমিত। এ বিষয়ে আমরা দুই মাস সময় পেয়েছি, কিন্তু সে বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে গাফিলতি ছিল। অথচ আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী নিরাপদ কর্মপরিবেশ স্বাস্থ্য খাতের কর্মীদের মৌলিক অধিকার। আমরা এটা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছি। বিশেষ পরিস্থিতির কারণে দেশে লকডাউন করা হয়েছে। সে অধিকার সরকারের আছে। এখন ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবারও দিতে হবে। একটা লোককে ক্ষুধার মধ্যে রেখে লকডাউনে বাধ্য করার সুযোগ নেই।

ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট। এটা দ্রুত নিরসন না করা গেলে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এ জন্য সরকারের হাতে আইনি কাঠামো রয়েছে। কাকতালীয়ভাবে ২০১৮ সালে রোগ নিরাময় আইন করা হয়েছিল। কিন্তু সে আইনের সুফল সরকার নিতে পারছে না। এখন জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিষদকে দ্রুত সক্রিয় করা দরকার। সেই সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবীদের তালিকাভুক্ত করা দরকার; যাতে তারা সরকারের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলায় ভূমিকা রাখতে পারে।

মো: শহিদুল ইসলাম বলেন, সামাজিক দূরত্বের নামে সমাজ যেভাবে ভেঙে পড়েছে সেটা কাম্য নয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাষ্ট্রগুলো আরেকটি রাষ্ট্র আক্রমণ করতে পারে এই আশঙ্কায় যে পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে, তার সামান্য অংশও যদি দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ করতো তাহলে এই অবস্থা হতো না।