কেন সমাজতন্ত্র বিকল্প??

করোনা নিয়ন্ত্রণে অথবা নির্মূলিকরনে দক্ষিণপন্থী বুর্জোয়া শাসকদের অসহায়তা প্রমান করেছে সমাজতন্ত্রই মানুষের কাছে একমাত্র বিকল্প।সারাবিশ্বব্যাপী আজ করোনাভাইরাস এর আক্রান্ত হয়েছে উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্র আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে ধনিরাষ্টসমুহ। তারা আজকে করোনা নিয়ন্ত্রণে বা নির্মুলকরণে হিমসীম খাচ্ছে। এ পর্যন্ত সারাবিশ্বে ১৮ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষ আক্রান্ত এবং ১লক্ষ ১৪ হাজার লোক মৃত্যুবরণ করেছে।যারমধ্যে প্রায় ১২লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে উন্নত পুঁজিবাদী ৭টি দেশে। সে সব দেশে মৃত্যুর সংখ্যাও প্রায় ৯০ হাজার।

সমাজতান্ত্রিক দেশ গণচীনের উহান প্রদেশে প্রথম করোনাভাইরাস ধরা পড়লেও সেটা চীনের অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে নাই।বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীনে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ৮৮ হাজার মৃত্যুবরণ করেছে ৩০০০ হাজার জন।চীনের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র সাবেক সোভিয়েত ভুক্ত রাশিয়াতে আক্রান্ত মাত্র ১৫ হাজার মৃত্যু মাত্র ১৩০ জন।একইভাবে সাউথ কোরিয়াতে আক্রান্ত ১০ হাজার এবং মৃত্যু হয়েছে ২১৭ জনের।চীনের সীমান্তের দেশ ভিয়েতনামে আক্রান্ত মাত্র ২৬২ জন এখন কোন মৃত্যু ঘটে নাই।একই অবস্থা লাওস, কম্বোডিয়া ও নেপালের।এসব দেশ সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির কারনে এদের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন এসব দেশের জনগনকে করোনা থেকে রক্ষা করেছে।

এমনকি বিশ্বে করোনাভাইরাসে সবচেয়ে বেশী প্রায় সাড়ে পাচ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে ও প্রায় বাইশ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে যে উন্নত পুঁজিবাদী দেশ আমেরিকায় তার পার্শের রাষ্ট্র সমাজতান্ত্রিক কিউবায় আক্রান্ত ৬২০ জন মৃত্যু হয়েছে মাত্র ১৬ জনের।ভেনেজুয়েলায় আক্রান্ত ১৭৫ জন মৃত্যু হয়েছে মাত্র ৯ জনের।এল সালভেদর, ব্রুনাই, কম্বোডিয়তের আক্রান্ত ও মৃত্যু হার নগন্য।কিউবা বর্তমানে করোনাভাইরাস আক্রান্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের চিকিৎসা টীম দিয়ে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।। বিশ্বের ৩৭টি দেশে করোনায় চিকিৎসা দিয়ে সৃষ্টি করেছে মানবতার দৃষ্টান্ত। এদিকে চীন এ পর্যন্ত ৩৮৬ কোটি মাস্ক,৩কোটি ৭৫লক্ষ পিপিই,১৬ হাজার ভেন্টিলেটর ও ২৮ লক্ষের বেশি করোনাভাইরাস টেষ্টিং কীট বিশ্বের বিভিন্ন করোনা আক্রান্ত দেশে সরবরাহ করেছে।।এটাই একটি সমাজতান্ত্রিক দেশের মানবতাবাদের উদাহরণ।।

১৩০ কোটি জনসংখ্যার ভারতে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে সাড়ে আট হাজার মৃত্যু হয়েছে ২৭৩ জনের।বামপন্থি সরকার পরিচালিত কেরালা ভারতের ঘনবসতিপূর্ণ রাজ্য। এখানকার প্রচুর মানুষ বিদেশে থাকে। জনসংখ্যায় বয়স্কদের সংখ্যা বেশি। চীনে প্রচুর ছাত্রছাত্রী ছিল তাদের। আবার বছরে প্রায় ১০ লাখ পর্যটক আসে এখানে। করোনার অত্যধিক সংক্রমণের সব বড় শর্তই ছিল কেরালায়। কিন্তু কেরালার রাজ্য সরকার প্রথম থেকে অত্যধিক সতর্ক ছিল। বিমানবন্দরগুলোয় কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়। নয়টি দেশ থেকে আগত ব্যক্তিদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে যেতে হতো। ভারতের অন্যত্র এই নিয়ম করা হয় কেরালার দুই সপ্তাহ পরে।

কেরালার সরকার জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কাজটি আমলাতান্ত্রিকভাবে করেনি। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করা হয়। ‘সামাজিক দূরত্ব’ কথাটাও এড়িয়ে যায় তারা। সেখানে এটাকে বলা হয় ‘শারীরিক দূরত্ব, কিন্তু সামাজিক সংহতি’। স্লোগানের মধ্যেই তাদের আবেদনটা লুকানো ছিল। অনেকে বিস্মিত হবেন জেনে, করোনা নিয়ে কেরালায় সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে ২৬ জানুয়ারি। বহু দেশের বহু আগে।

কেরালায় প্রথম সংক্রমণের ১০০ দিন পেরিয়ে গেছে ইতিমধ্যে। সর্বশেষ ১২ এপ্রিল সেখানে করোনায় চিকিৎসাধীন ছিলেন ৩৪৬ জন। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে চলে গেছেন ১২৩ জন। আর মারা গেছেন মাত্র তিনজন। ৫ এপ্রিল থেকে হিসাব করে দেখা গেছে, সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা সেখানে সব সময় চার শর নিচেই থাকছে। অথচ বাকি ভারতে সংখ্যাটা ক্রমেই বাড়ছে এবং ১০ হাজার ছুঁই–ছুঁই করছে। সর্বশেষ তিন দিনে কেরালায় মাত্র ২৮টি কেস শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষকে তারা আইসোলেশনে রাখতে পেরেছে এবং সেটা যার যার বাড়িতে। ইতিমধ্যে ১০ হাজারের বেশি করোনা টেস্ট করেছে কেরালা। এই সংখ্যা প্রতি ১০ লাখে প্রায় ৩০০। ভারতে এই হার সর্বোচ্চ।এখানে বামপন্থি সরকার ক্ষমতায়।
উন্নয়নের ক্ষেত্রে কেরালার নেতৃবৃন্দ ‘প্রবৃদ্ধি’, ‘মাথাপিছু আয়’ ইত্যাদি সূচকের দিকে ছোটেননি। নাগরিকদের ছলনায় মুগ্ধ করার চিন্তাতাড়িত ছিলেন না তাঁরা; বরং চেষ্টা করা হয়েছে জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর। এই চেষ্টাটা এমনভাবে করা হয়েছে যেন পুরো জনপদে সবার জীবনযাত্রার মান বাড়ে। আশপাশের রাজ্য ও দেশগুলোতে যেমন কিছু ঝলমলে শহর, শপিং মল বা ইট-সিমেন্টের বড় অবকাঠামোকে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়, কেরালা তা করেনি। তারা জোর দিয়েছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বিশেষভাবে রাজনৈতিক সচেতনতার ওপর।

ভিয়েতনাম কেন সফল।
=================

বিশ্বজুড়ে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভিয়েতনাম একটি মডেল রাষ্ট্র হিসাবে উঠে এসেছে। তারা প্রোএ্যাকটিভ পদ্ধতি অবলম্বন করে করোনাকে পরাজিত করেছে। চীনের পাশে একটি ছোট দেশ ভিয়েতনাম। চীন থেকে প্রায় ১০ ভাগ ছোট এবং এর জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ৯ কোটি । ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট পার্টি দ্বারা পরিচালিত একটি দেশ। এর সীমানাও চীনের সাথে একইভাবে উন্মুক্ত, যেমন ভারতের নেপালের সাথে। উভয় দেশের মানুষের আসা-যাওয়াও ভারত ও নেপালের মতো একইভাবে।

গোটা ভিয়েতনামে মোট ১০০০ ভেন্টিলেটরও নেই , চীনের মতো তাদের স্বাস্থ্যসেবার সুবিধাও খুব উচ্চ স্তরের নয় । ভিয়েতনামে প্রতি ১০,০০০ জন লোকের জন্য মাত্র ৮ জন ডাক্তার।৯ ই এপ্রিল পর্যন্ত, ভিয়েতনামে একজনও করোনায় মারা যায়নি এবং প্রায় ৩০০ জন আক্রান্ত হয়েছেন ।এমনটা নয় যে ভিয়েতনাম চীনের মতো তার রোগীদের সংখ্যা আড়াল করতে পারে কারণ ফেসবুকের মতো সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে কোনও বিধিনিষেধ নেই সেখানে।

আসুন জেনে নিই ভিয়েতনাম কীভাবে এটা সম্ভব করেছে । সেখানে সবার আগে স্কুলগুলোকে বন্ধ করে দিয়েছে জুন পর্যন্ত ।। ১লা ফেব্রুয়ারি থেকেই চীনে আসা-যাওয়া করা সমস্ত ফ্লাইট নিষিদ্ধ করেছিলো সরকার। সড়কপথ তো তখন থেকেই বন্ধ ছিল, যখন জানুয়ারীতে চীনের উহান শহরে ২৭ টি ফ্লু-এর মতো কেস দেখা গিয়েছিলো । ১৩ ই ফেব্রুয়ারি থেকে সমস্ত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। দেশের সেই অংশটি পুরোপুরি লকডাউন করে দিয়েছিলো যেখানে উহান থেকে আসা শ্রমিকেরা থাকতো । সারা দেশে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। শারীরিক দূরত্বের (physical distancing) নিয়মগুলো কঠোরভাবে মেনে চলা সুনিশ্চিত করা হয়েছিলো ।জানুয়ারির মধ্যে, বিদেশ থেকে আসা সমস্ত লোককে খুঁজে বের করে quarantine করা হয়েছিলো । এই সমস্ত পদক্ষেপেরই ফল এটা যে তাদের দেশ লকডাউন ছাড়াই অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে ।

এ দেশের একজন ভিয়েতনামের একটি ইউরোপীয় রাসায়নিক কারখানার ম্যানেজার , তিনি বলেছেন যে তার কারখানায় খুব জোর কদমে কাজ চলছে , পার্থক্য কেবল চাহিদা কম হওয়াতে প্রোডাকসান কম হচ্ছে । ভিয়েতনামে উচ্চ-স্তরের স্বাস্থ্য প্রযুক্তি কেবলমাত্র বড় শহরগুলোতে আছে।জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা আশ্চর্যজনক । ছোট – ছোট গ্রামগুলিতেও স্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে,তারাই বাঁচিয়েছে মানুষকে ।এখানে উল্লেখ্য ভিয়েতনাম একটি সমাজতান্ত্রিক দেশ।

আমাদের মতো পুঁজিবাদী বুর্জোয়া রাষ্ট্র কাঠামোতে স্বাস্থ্য সেবার সাথে যুক্ত মানুষগুলো চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ক্রয়ের ক্ষেত্রে লুট- মহা লুট করেছে। জনস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্য সেবা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মনোনিবেশ না করে, কে কত টাকা চুরি করতে পারবে-লুট করতে পারবে- কত দুর্নীতি করতে পারবে সেই প্রতিযোগিতায় মত্ত ছিল। সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সকল মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র যথাযথভাবে সেই দায়িত্ব পালন করেছে। স্বাস্থ্য সেবা- চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা চমৎকারভাবে গড়ে তোলার কারণেই আজকে চীন, রাশিয়া, কিউবা, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, নেপাল সহ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলি চিকিৎসাসেবায় উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। আজকে প্রমানিত করোনাভাইরাসের ন্যায় কোনো স্বাস্থ্যঝুকিতে বাচতে সমাজতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোই একমাত্র বিকল্প।।

বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের মতো করোনা পরবর্তী সময়ে একটি মানবিক ও শান্তির পৃথিবীর ডাক দেয়া হবে৷ সে ডাক কে দিবে বা পরবর্তী পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ কারা নেবে এখনি বলা যাচ্ছে না৷ তবে এটা ঠিক ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্বের কাঠামোগত ওলট–পালট ঘটতে চলেছে। মোটকথা ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজমে বিশ্ব মোড়ল আমেরিকা মুখ থুবড়ে পড়বে, করোনা পরবর্তীতে নতুন পরাশক্তির উথথান ঘটবে। আজকে আমাদের চিন্তা করতে হবে মুক্ত বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে অবাধে বিচরণের পথ ধরে ভাইরাসটি যে ভয়াবহ অসুস্থতা এনেছে তা মানুষকে তাদের দেশ, শহর ও ঘরে বন্দি করে ফেলেছে। কিন্তু পুঁজির প্রবাহের ব্যতিক্রম, এই ভাইরাস মুনাফা নয় বরং বিস্তৃতি লাভের চেষ্টা করে গেছে। ফলে কিছুটা বেখেয়ালে হলেও পুঁজি প্রবাহের গতিমুখ উল্টে দিয়েছে। এটি ইমিগ্রেশন নিয়ন্ত্রণ, বায়োমেট্রিক্স, ডিজিটাল নজরদারি এবং অন্যান্য সমস্ত ধরণের তথ্য বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ার বিরাট রাষ্ট্রযজ্ঞকে চোখের পলকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে। নিষ্ঠুর চপেটাঘাত করেছে । এ যেন এক নির্মম বিদ্রুপ! সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা মহাপরাক্রমশালী দেশগুলোর পুঁজির ইঞ্জিন সশব্দে থমকে গেছে। সম্ভবত ক্ষণিকের জন্য কিন্তু এই ইঞ্জিনের কলকব্জাগুলোকে পরখ করে দেখার জন্য তা যথেষ্ট সময়। এরপর আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি ধুঁকতে থাকা এই ইঞ্জিন মেরামত করব নাকি নতুন ইঞ্জিনের খোঁজ করব।।

আহমেদ ফজলুর রহমান, সাবেক ছাত্র নেতা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।