স্বদেশ তুমি বাচবে তো??আহমেদ ফজলুররহমান মূরাদ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে এসেছে মহামারী করোনা ভাইরাস। দেশে দেশে চলছে লকডাউন, ঘরে বন্দি মানুষ। তারপরেও প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে হু হু করে। এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় সাড়ে ১৬ লাখেরও বেশি মানুষ। মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় লাখ পার হয়েছে। কার্যকর কোন ওষুধ নেই, নেই কোন প্রতিষেধক।
বিশ্বের সকল উন্নত দেশ আজকে করনার কাছে নতি স্বীকার করেছে।ইউরোপ আমেরিকার ধনি দেশসমুহে চলেছে মৃত্যুর মিছিল।সেখানে মানুষ হারিয়ে ফেলেছে বেচে থাকার সকল আশা।চারিদিকে চলছে হাহাকার,বাচার আকুতি।সেসব দেশের রাষ্ট্রনায়করা কোন দিশা খুজে না পেয়ে চেয়ে আছেন আকাশের পানে।থমকে গেছে বিশ্বায়ন আসছে মহামন্দার হাতছানি।ধারণা করা হচ্ছে ১৯৩০ সালের মহামনান্তর থেকেও ভয়ানক হতে পারে পরিণতি।
পশ্চিমা বিশ্বের মতো নাহলেও দক্ষিণ পুর্ব এশিয়াতেও করোনা এগিয়ে আসছে।ইতিমধ্যে তা অনেক দেশকেই আক্রান্ত করে ফেলেছে। ক্রমেই বাড়ছে এর ভয়াবহতা, বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। এশিয়ার চীনের উহান প্রদেশ থেকে এর উৎপত্তি হলেও সারাচীনকে আক্রান্ত করতে পারেনি।চীনের পার্শ্ববর্তি তাইওয়ান, হংকং,ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, এমনকি রাশিয়াসহ সাবেক সোভিয়েতভুক্ত দেশগুলিও করোনাভাইরাসকে মোটামুটি নিয়ন্ত্রণ করতে রাখতে পেরেছে।এটাও একটি সফলতা। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিউবা আমেরিকার পাশাপাশি হলেও শুধুমাত্র উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার কারনে তারাও মোটামুটি নিরাপদ।।
সার্কভুক্ত দক্ষিণ এশিয়াও আজ ক্রমেই করোনার কাছে নতি স্বীকার করতে শুরু করেছে।ইতিমধ্যে স্বার্কভুক্ত বৃহত্তর দেশ ভারতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে শুরু করেছে।পাকিস্তানেও আক্রান্ত ও মৃত্যু নেহায়েত কম নয়।আমাদের ১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশেও এর ভয়াবহ রুপ নিতে শুরু করেছে।ইতিমধ্যে চারশতাধিক আক্রান্ত হয়েছে। মৃতুও হয়েছে সাতাশজন।দেশে চলছে অলিখিত লকডাউন।
আমাদের দেশে জরিপে বলছে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও ঘরে থাকার পরামর্শ মানতে গিয়ে কমে গেছে নিম্নআয়ের মানুষের আয়। এই পরিস্থিতিতে চরম দারিদ্র্যের হার আগের তুলনায় বেড়ে গেছে ৬০ শতাংশ। এছাড়া ১৪ ভাগ মানুষের ঘরে কোনো খাবারই নেই। করোনাভাইরাস প্রতিরোধের পদক্ষেপের ফলে নিম্নআয়ের মানুষ জীবিকার দিক থেকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর ফলে ৮৯ শতাংশ চরম দরিদ্রে পরিণত হয়েছেন অর্থাৎ দারিদ্র্যরেখার নিম্নসীমার নিচে নেমে গেছেন। করোনাভাইরাসের পূর্বে আয়ের ভিত্তিতে ২৪ শতাংশ ছিলেন দারিদ্র্যরেখার নিম্নসীমার নিচে এবং ৩৫ শতাংশ ছিলেন দারিদ্র্যরেখার ঊর্ধ্বসীমার নিচে। এতে বোঝা যায় চরম দারিদ্র্য আগের তুলনায় বর্তমানে ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
করোনা মহামারির আগে গড় আয় ছিল ১৪ হাজার ৫৯৯ টাকা। যাদের মধ্যে ৯৩ শতাংশ জানিয়েছেন, এই করোনা প্রাদুর্ভাবের পর তাদের আয় কমেছে। মার্চ ২০২০-এ এসে তাদের গড় আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৪২ টাকায়, অর্থাৎ তাদের পারিবারিক আয় ৭৫ শতাংশের মতো কমে এসেছে। চট্টগ্রাম (৮৪ শতাংশ), রংপুর (৮১ শতাংশ) এবং সিলেট বিভাগের (৮০ শতাংশ) মানুষের আয় কমেছে সবচেয়ে বেশি। সরকারি ছুটি বা সামাজিক দূরত্বের কারণে ৭২ শতাংশ মানুষ কাজ হারিয়েছেন অথবা তাদের কাজ কমে গেছে। ৮ শতাংশ মানুষের কাজ থাকলেও এখনো বেতন পাননি। কৃষিকাজে সম্পৃক্তদের (৬৫ শতাংশ) তুলনায় অ-কৃষিখাতের দিনমজুর বেশি (৭৭ শতাংশ) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ৫১ শতাংশ রিকশাচালক, ৫৮ শতাংশ কারখানা শ্রমিক, ৬২ শতাংশ দিনমজুর, ৬৬ শতাংশ হোটেল বা রেস্তোরাঁকর্মী জানান, চলতি মাসে তাদের আয় নেমে এসেছে শূন্যের কোঠায়। ১৪ শতাংশ মানুষের ঘরে কোনো খাবারই নেই। ২৯ শতাংশের ঘরে আছে ১ থেকে ৩ দিনের খাবার।
করোনাভাইরাস দুর্যোগে বাংলাদেশে লকডাউনের মধ্যে কর্মহীন মানুষ এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে খাদ্য সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে দুনীতি, অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা এখনও থামানো যায়নি।হতদরিদ্রদের জন্য ১০টাকা কেজি দরে যে চাল দেয়া হচ্ছে, কিন্তু বেশ কয়েকটি এলাকায় সেই চাল নিয়ে দুর্নীতির দায়ে ক্ষমতাসীন দলের ইউনিয়ন পর্যায়ের কয়েকজন নেতার জেল জরিমানা হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার বস্তা ত্রাণের চাল আত্মসাৎ বা চুরির খবর পত্রিকায় উঠে আসছে। এখন লকডাউনের কারণে কর্মহীন এবং দরিদ্র প্রতিটি পরিবারের তালিকা করে বিশেষ ত্রাণ হিসাবে ১০ কেজি করে চাল ঘরে ঘরে বিতরণের কার্যক্রমের কথা বলছে সরকার। কিন্তু অনেক মানুষ কোন সাহায্যই পাচ্ছেন না।চারিদিকে শুরু হয়েছে ভয়াবহ হাহাকার।ত্রাণের দাবিতে হাজারো মানুষ আজকে রাস্তায় বেরিয়ে এসে করছে বিক্ষোভ। অজানা-অনিশ্চয়তার খাদে তলিয়ে যাচ্ছে অর্থনীতি শেষ কোথায় জানা নেই। কিন্তু সত্যিই যদি করোনাভাইরাস-যুদ্ধে জয়ী হয় মানবজাতি, তার পরেও কি স্বস্তি দেবে অর্থনীতি? নাকি করোনা নামক সাপের থেকে মুক্তি পেয়ে দুর্ভিক্ষের বাঘের মুখে গিয়ে পড়ব?
বিশ্ব অর্থনীতির আকাশে তাই ঘন কালো মেঘ। কালবৈশাখীর মতো ক্ষণিকের ঝড় নয়, সাইক্লোনের পূর্বাভাস। লন্ডভন্ড হওয়ার ইঙ্গিত। আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার ঝড়ে দেউলিয়া হয়ে যাবে বহু সংস্থা। সবচেয়ে বেশি লোকসানের মুখে পড়বে বিমান পরিবহণ ও পর্যটন ক্ষেত্র। ছোট ও মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে বয়ে আনবে ভয়াবহ আর্থিক সঙ্কট। বড় শিল্পপতিরা তবু তিন-চার মাস কর্মীদের মাইনে ও অন্যান্য খরচ দিয়েও পরে পুষিয়ে নিতে পারবেন, কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কি টিকে থাকতে পারবে? উদ্বেগের আরও বড় কারণ, এই ছোট শিল্পক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি অসংগঠিত শ্রমিক। আবার সারা বিশ্বের মধ্যে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকের হার সবচেয়ে বেশি। বিরাট অংশ দিনমজুর। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সঙ্গে যুঝতে হবে এই দিন আনা, দিন খাওয়া মানুষগুলোকেই।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলেছে, ২০০৮ সালের মন্দার চেয়েও খারাপ পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি। ছাপিয়ে যেতে পারে ১৯৩০ সালের ‘দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন’ বা মহামন্দাকেও। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন-এর একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে কোটি কোটি মানুষ চলে যেতে পারেন দারিদ্রসীমার নীচে। শুধু তাই নয়, কত দিনে এই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা যাবে, তারও কোনও দিক্‌নির্দেশ নেই। আসলে এখনও বুঝেই ওঠা যায়নি, এটাই কি ডুবন্ত অর্থনীতির তলদেশ, নাকি মন্দার স্রোত সবে শুরু হয়েছে? স্বদেশ তুমি বাচবে তো??