লন্ডনে করোনায় ১ মাসে ৪৩ জন ও যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ দিনে করোনায় ৮৬ বাংলাদেশির মৃত্যু

যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বেড়েই চলেছে মৃতের সংখ্যা। দেশটিতে ৮ মার্চ থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ৪৩ জন বাংলাদেশিই মারা গেছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পরিবারিক সূত্রে আরও ৩ প্রবাসী বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

গতকাল রাতে প্রবাসীদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়ে যাদের তথ্য পাওয়া গেছে- বিশ্বনাথের গোলাম রাব্বানী, বিয়ানীবাজারের আফছার উদ্দিন এবং শরিয়তপুর জেলার মোকসেদুল আলম বাদল।

জানা গেছে, যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামের স্পাকর হিলে বসবাসকারী গোলাম রাব্বানী বুধবার বার্মিংহামের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। তিনি স্ত্রী, ৪ মেয়ে ও ১ পুত্র সন্তান রেখেগেছেন। তার দেশের বাড়ি সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের গোয়াহরি গ্রামে। তিনি কমিউনিটির ওয়ার্কসহ অসহায় মানুষদের কল্যাণে কাজ গেছেন।

পূর্ব লন্ডনের বাসিন্দা আফছার উদ্দিন ৮ এপ্রিল বুধবার রাত ৯টা ৩০টায় সময় লন্ডনের একটি হাসপাতালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর । তার দেশের বাড়ি সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার মোল্লাপুর গ্রামে। এই মৃত্যুর খবর ফেসবুকে নিশ্চিত করেছেন মরহুমের শ্যালক যুক্তরাজ্য যুবদল নেতা সৈয়দ লায়েক মোস্তফা।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মৃত্যুবরণ করেছেন অল ইউরোপিয়ান বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন-ইউকের (আয়েবা) সহ-সভাপতি মোকসেদুল আলম বাদল। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে ভুগছিলেন। মরহুম মোকসেদুল আলম বাদল লুইশামের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।মরহুমের গ্রামের বাড়ি শরিয়তপুর জেলার নড়িয়া থানার কান্দারগাঁও গ্রামে।

তিনি দীর্ঘদিন নেদারল্যান্ডসে বসবাস করেছেন এবং বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ছিলেন। এদিক মরহুমের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন আয়েবা নেতারা। এক শোকবার্তায় নেতারা মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোক-সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

এদিকে যুক্তরাজ্যে করোনার প্রকোপ প্রতিদিনই বাড়ছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশটিতে মৃত্যুর মিছিলে সামিল হয়েছেন আরও অন্তত ৮৯১ জন। এ নিয়ে দেশটিতে মোট মৃতের সংখ্যা প্রায় আট হাজার ছুঁয়েছে। এর আগে, গত বুধবার দেশটিতে রেকর্ড ৯৩৮ প্রাণহানি হয়েছিল, তার আগের দিন (মঙ্গলবার) মারা গেছিল ৮৫৪ জন।

সব মিলিয়ে সেখানে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৯৮৮ জন। বুধবার শুধু ইংল্যান্ডেই মারা গেছেন ৭৬৫ জন, স্কটল্যান্ডে ৮১, ওয়েলস ৪১ ও নর্দান আয়ারল্যান্ডে ৪ জন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্যে ভিন্নতা লক্ষ্য করা গেলেও এ পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত হয়েছেন ৬২ হাজার জনেরও বেশি।

এদের মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন অন্তত ৩৫১ জন। এদিকে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তার অবস্থার ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দেশটির সংস্কৃতি মন্ত্রী অলিভার ডোডেন।
জানা গেছে, নর্থ ব্রঙ্কস সেন্টাল হাসপাতালে সোমবার সকালে মারা যান ব্রঙ্কসের বাসিন্দা চিকিৎসক ও মুক্তিযোদ্ধা (পারিবারিক আপত্তির ফলে নাম প্রকাশ করা গেল না)। ৬৭ বছরের এই চিকিৎসক ছিলেন নিউইয়র্ক সিটি স্বাস্থ্য বিভাগের মহামারি রোগ বিশেষজ্ঞ।

এদিকে এই মহামারির সঙ্গে লড়াই করে এদিন ভোরে এলমহাস্ট্র হাসপাতালে মারা যান বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যকরী সদস্য ও যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক। জেএফকে টার্মিনাল ৫-এর এয়ারওয়ে কর্মরত জ্যামাইকার বাসিন্দা মারা গেছেন জ্যামাইকা হাসপাতালে। তার বড় ভাই ম্যানহাটনের মাউন্ট সিনাই হাসপাতালে আইসিইউতে রয়েছেন।

দুপুরে মারা যান ব্রঙ্কসের বাসিন্দা কুষ্টিয়া জেলা সমিতির উপদেষ্টা । ভোরে ওজন পার্কে মারা যান ৭৭ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি। ব্রুকলিনে মারা যান বেগমগঞ্জ ওয়েল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। ষাটোর্ধ্ব আরও একজন মারা গেছেন ব্রুকলিনে। এদিন দুপুরে মিশিগানের হ্যামট্রামিক সিটিতে করোনায় আক্রান্ত এক প্রবীণ বাংলাদেশি নারী (৭৩) মারা যান।

নিউইয়র্কে করোনায় আক্রান্ত বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন চিকিৎসকও রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ২৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৩০ হাজারের বেশি।

দেশটিতে করোনায় মোট মৃতের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৮৭১ জনে। যুক্তরাষ্ট্রে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৪ জন। আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৯ হাজার ৬৭১ জন। ওয়ার্ল্ডওমিটার ওয়েবসাইট এই তথ্য জানিয়েছে।

কোভিড-১৯ সংক্রমণরোধে কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে বাড়িতেই দিন কাটাতে হচ্ছে ৯০ শতাংশের অধিক মার্কিনিদের। তবে হোয়াইট হাউসের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ‘বাড়িতে থাকা (স্টে অ্যাট হোম)’ নীতি পুরোপুরিভাবে অনুসরণ করা হলেও এক থেকে প্রায় আড়াই লাখ (২ লাখ ৪০ হাজার) আমেরিকান মারা যাবে করোনায়।

দেশটিতে করোনা সবচেয়ে বেশি নিধনযজ্ঞ চালাচ্ছে নিউইয়র্কে। সেখানে এ পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৩১ হাজার ৯১৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন, যা সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রের এক-তৃতীয়াংশ। মারা গেছে ৪ হাজার ৭৫৮ জন, যা সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক।

এদিকে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে নিউইয়র্কে। সেখানে এ পর্যন্ত মারা গেছে ৪ হাজার ৭৫৮ জন এবং আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৯১৬ জন। এদের মধ্যে ৯৫ জন বাংলাদেশিও রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে করোনাভাইরাস সংক্রমিত কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত অশীতিপর এক নারীর মৃত্যু হয়েছে।

স্থানীয় সময় শুক্রবার নিউইয়র্ক সিটি হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। নিউইয়র্কে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এটিই প্রথম মৃত্যু। তবে গোটা যুক্তরাষ্ট্রে এই ভাইরাসে ৫১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া দেশটিতে করোনা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২ হাজার ৩৪০ জন। এরই প্রেক্ষিতে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এ ছাড়াও নিউইয়র্কে লকডাউনের সময়সীমা আগামী ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে জরিমানার পরিমাণও। সামাজিক দূরত্ব না মানলে এক হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত জরিমানার নিয়ম চালু করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো জানিয়েছেন, অঙ্গরাজ্যটিতে মৃত্যুহার এবং আক্রান্তের সংখ্যা টানা দ্বিতীয়দিনের মতো কমেছে। তার আশা, হয়তো ইতোমধ্যেই সর্বোচ্চ ভয়াবহ পরিস্থিতি পার করে এসেছে নিউইয়র্ক।

উল্লেখ্য, গত ১৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে প্রথম করোনাভাইরাস সংক্রমিত কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়ে অশীতিপর এক নারীর মৃত্যু হয়। নিউইয়র্ক সিটি হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। নিউইয়র্কে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এটিই প্রথম মৃত্যু।

গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীনের উহানে প্রথম শনাক্ত হওয়া করোনাভাইরাস এখন বৈশ্বিক মহামারি। এতে বিশ্বজুড়ে আক্রান্তের সংখ্যা এখন পর্যন্ত প্রায় সোয়া ১৫ লাখ। মারা গেছেন সাড়ে ৮৮ হাজারের বেশি মানুষ। তবে তিন লাখ ৩০ হাজারের বেশি রোগী ইতোমধ্যে সুস্থ হয়েছেন।

এমআরএম/এমএস