আতংকিত জনপদ , বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক জীবন:সা কা ম আনিছুর রহমান খান কামাল

কেউ চিন্তাও করে নাই এরূপ বিপর্যয় আসবে৤ অদূরদর্শী রাজণ্যদের আচরণ ও উক্তিতে ছিল প্রচন্ড দাম্ভিকতা বরাই করে ‘…. কেউ ঠেকাতে পারবে না৤ ‘ বলে যে কথা বলা হচ্ছিল তার রেশ মিলিয়ে গেল আকস্মিকভাবে ৤ যা ছিল অপ্রত্যাশিত ৤ এরূপ দেমাগী ভাষণ এর আগেও জনগণ শুনেছে ৤ ‘ ঐ আকাশের চাঁদ সূর্য যতদিন থাকবে আমরা ততদিন ক্ষমতায় আছি ‘ ৤ ইতিহাস সাক্ষী এসব কথা উচ্চারিত হবার পর এক সপ্তাহও অতিবাহিত হয়নি৤ ঐসব রাজণ্যদের রাজাসন বিলীন হয়ে গেছে ৤ পবিত্র কোর আন শরীফে বলা হয়েছে , ‘….তিনিই গ্রন্থানুগামীদিগের অন্তর্গত অবিশ্বাসীদিগকে সমবেত হইবার অগ্রেই তাহাদের গৃহ সমূহ হইতে বহিষ্কার করিয়া ছিলেন৤ তোমরা ধারণাও কর নাই যে তাহারা বহিষ্কৃত হইবে৤ আর তাহারাও ধারণা করিয়া ছিল যে তাহাদের দূর্গগুলি তাহাদিগকে আল্লাহ হইতে রক্ষা করিবে৤ কিন্তু আল্লাহর আজাব তাহাদের উপর এমন স্থান হইতে আসিয়া পৌছিল যা তাহাদের ধারণায়ও ছিল না৤ আর তাহাদের অন্তর সমূহে আল্লাহ ভয় জাগাইয়া দিলেন ৤ ফলে তাহারা নিজেদের ঘর সমূহ বিনষ্ট করিতেছিল স্বয়ং নিজেদের হাতেও এবং মুমিনদের হাতেও ৤ অতএব হে জ্ঞানীগণ উপদেশ গ্রহণ কর৤ ‘ [ সূরা হাশর , আয়াত ২ ]৤

তদ্রুপই করনা ভাইরাস [ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষায় ‘চীনা ভাইরাস‘] এর আকস্মিক প্রাদুর্ভাব আমাদের দেশে সব কিছুই উলট পালট করে দিল৤ বিশ্বব্যাপী এই সংক্রামক ভাইরাস মৃত্যুর মিছিল সৃষ্টি করলো ৤ শক্তি অর্থ প্রভাব প্রতিপত্তিশালী দেশগুলোও এই সংক্রমণের কাছে নিদারুন অসহায় ৤ এর কোন প্রতিষেধক কোন দেশেই নাই৤ মৃত্যু পরোয়ানার কাছে অসহায় আত্মসমর্পন ব্যতীত কোন উপায় কারোই নাই৤ ইতালির প্রধানমন্ত্রী বললেন এখন ফয়সালা আসবে আকাশ হতে৤ বাংলাদেশের জনগণও মহান আল্লাহর দরবারে প্রতিকার প্রার্থনা করছে ৤ দোয়া দরুদ পড়ছে ৤ কালজিরা ,লবঙ্গ , রসুন, থানকুনির পাতা , চা এর মধ্যে প্রতিষেধক খুঁজছে ৤ এক শিশু জন্মের পর বলেছে আদা , লং , গোল মরিচ ও কালো জিরা দিয়ে চা বানিয়ে খেলে এই রোগের উপশম হবে , এ কথা বলার পরই আঁতুর ঘরের শিশুটা ইন্তেকাল করেছে মর্মে রটনার পর কেউ কেউ এভাবে চা পান করছে ৤ তবে কেউ কেউ বলছে এটা স্রেফ গুজব৤ কেউ বলছেন ফুটন্ত পানি থেকে উদগীরিত বাষ্প নাকে মুখে নিলে উক্ত ভাইরাস কার্যকারিতা হারায় ৤ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সরকার মুহূর্তে মুহূর্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পরিবর্তন করছে ৤ অফিস আদালত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারী ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে ৤ পরবর্তীতে তার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ৤

ধর্মীয় নেতাগণ আহ্বান জানাচ্ছেন নিজ নিজ গৃহে ধর্মীয় অনুষ্টানাদি সম্পন্ন করতে৤ মসজিদ মন্দির গির্জা প্যাগোডাসহ উপাসনালয় সমূহে সমবেত হতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে ৤ সবাইকে নিজ নিজ গৃহে অবস্থান করতে বলা হয়েছে ৤ নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হতে নিষেধ করা হয়েছে ৤ সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে ৤ বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করার জন্য সেনাবাহিনীকে নিয়োজিত করা হয়েছে৤ রাস্তাঘাট প্রায় জনশূণ্য ৤ দীর্ঘদিনের ছুটি পেয়ে অনেকেই কর্মস্থল ত্যাগ করে মফস্বলে গ্রামাঞ্চলে আদি ঘর বাড়িতে যাচ্ছে ৤ জল স্থল ও অন্তরীক্ষে দেশের অভ্যন্তরে যান বাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে ৤ ইংল্যান্ড ও মানচেষ্টার ব্যতীত আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলও স্থগিত করা হয়েছে৤ পরবর্তী ঘোষণায় ইংল্যান্ড ও মানচেষ্টার এর সাথেও বিমান যোগাযোগ স্থগিত করা হয়েছে৤ খেটে খাওয়া মানুষ বেকার৤ তাঁদের রুটি রুজির পথ বন্ধ হয়ে গেছে ৤ সরকার গরিবদের জন্য খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করেছে ৤ কিন্তু এখানেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে ৤ শিবচরে ৬৮ বস্তা ত্রাণের চাউল আত্মসাতের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে তা উদ্ধার ও জব্দ করেছে এবং অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে মর্মে খবরে প্রকাশ৤ আশাশুনি, সুনামগঞ্জ , সারিয়াকান্দি ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে একইরূপ খবর একের পর আরেক আসছে৤ ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে দুর্ভিক্ষের সময় লংগর খানার জন্য বরাদ্দকৃত খাদ্য সামগ্রী আত্মসাতের অভিযোগ ঐ সময়ের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল৤ দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের জমা জমা ভিটা মাটি নাম মাত্র মূল্যে রেজিষ্ট্রি করে নেবার ঘটনাও ঘটেছে৤ তাই ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ১লা এপ্রিল থেকে একই বছরের ৩১ শে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে হস্তান্তরিত জমি জমা ফেরৎ দেবার বিধান করে ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ শে এপ্রিল তারিখে ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ নং অধ্যাদেশ [ দি অ্যালিয়েনেশন অব ল্যান্ড ( ডিসট্রেসড সারকামসটেনসেস ) ( রেস্টোরেশন ) অরডিন্যান্স , ১৯৭৬ ] জারি করা হয়েছিল ৤

এসব দুঃখজনক অভিজ্ঞতা আমাদের আছে ৤ আজকে জনস্বার্থেই যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করতে হয়েছে৤ মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে ‘করোনা‘ ভাইরাস সনাক্তকরণ ‘কীট‘ নাই৤ ডাক্তার ও সেবিকাদের প্রয়োজনীয় পোষাক নাই ৤ রোগীদের রাখা ও পরিচর্যা করার উপকরণ ও পরিবেশ নাই৤ জনগণকে এই রোগ সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য কার্যকরী কোন উদ্যোগও নাই৤ যা হচ্ছে সবই বাগাড়ম্বর ও দায়সারা গোছের৤ বিভিন্ন গণমাধ্যমে জনগণ তাদের অভাব অভিযোগ ও অসহায়ত্বের কথা প্রকাশ করছে ৤ সব কিছু পর্যাপ্ত মজুত আছে বলার পরও জানা যাচ্ছে ‘ভেন্টিলেটর‘ আছে মাত্র ৫০০ ( পাঁচ শত ) ( মার্চ মাসের হিসাব মতে ) ৤ ঘন বসতিপূর্ণ প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশে মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে জনগণকে সুরক্ষা দিতে এটা কখনো পর্যাপ্ত হতে পারে না৤ এ সমস্যা জনগণের ৤ জাতীয়ভাবেই এর মুকাবিলা করতে হবে৤ দলীয় একক ব্যবস্থায় এককেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণে এটা সম্ভব নয়৤ ইতিমধ্যেই জনগণের মধ্যে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছে৤ এই দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য একে কাঠামোগত রূপ দিয়ে কাজ করা দরকার ৤ ঢাকা থেকে মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে কার্যক্রম চালানো এখন কার্যত সম্ভব নয়৤ ‘ভিডিও কনফারেন্স‘ করে দুর্যোগ মুকাবিলা করার জন্য সমস্যা জেনে প্রতিবিধান দেওয়ার কার্যত কোন উপায় নাই ৤ এ অবস্থায় বিকেন্দ্রীকরণের কোন বিকল্প নাই৤ পার ফরিদপুর , নন্দলালপুর , ফিলিপনগর , কপিলমুনি , বাবুলচারা , চিনাধুকুরিয়া, নিদ্রা সখিনা , খাস কাউলিয়া , নিশানবাড়িয়া, শ্যামসুন্দরপুর , কমলাবাড়ি প্রভৃতি গ্রামের কোন অসুস্থ দিনমজুর বা কৃষকের পক্ষে রোগ সনাক্তকরণ ও চিকিৎসার জন্য ঢাকা যাবার সামর্থ নাই৤ রোগ আক্রান্ত হলে তাকে নির্ঘাত ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যূবরণ করতে হবে ৤ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা , সিভিল সার্জন অসহায় হয়ে এই করুণ পরিণতি শুধু দেখবেন, কারণ তাদের কাছে জরুরী ঔষধ ও উপকরণ নাই , আর সিদ্ধান্ত নেবার জন্য তাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে ঢাকার নির্দেশনার জন্য ৤ সে জন্যই জরুরী ভিত্তিতে মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা সমূহ জেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাবর ‘ডেলিগেট‘ করতে হবে৤ দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রত্যেক বৃহত্তর জেলাকে নিয়ে প্রদেশ গঠন করে , প্রাদেশিক আইন সভা , প্রাদেশিক সরকার গঠন করতে হবে৤

জনস্বার্থেই ‘সিভিল কোর্ট এ্যাক্ট ‘ সংশোধন করে জেলা জজদের আর্থিক এখতিয়ার পাঁচ কোটি টাকা নির্ধারণ করে আইন পাশ করা হয়েছে [ দি সিভিল কোর্টস ( এমেন্ডমেন্ট ) অ্যাক্ট ২০১৬ , ( ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের তের নং আইন ) ]৤ কিন্তু তা এখনো কার্যকর করা হয়নি৤ আইন প্রণয়ন , সংশোধন ও রদ রহিত করার একমাত্র এখতিয়ার জাতীয় সংসদের ৤ মহামান্য রাষ্ট্রপতির সম্মতি পেলে তা বৈধ আইন হিসেবে কার্যকরী করার দায়িত্ব সরকারের৤ অন্য সকলেই ( ক্ষেত্র মোতাবেক ) সংবিধান ও আইনের রক্ষণ , সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান শপথ নিয়েছেন৤ এই আইন জনস্বার্থেই আজ বাস্তবায়ন করা জরুরী ৤ জাতীয় এই দুর্যোগে বিচারের জন্য ঢাকা যাওয়া খুবই কষ্টকর , ঝুকিপূর্ণ ও ব্যয় বহুল ৤ উক্ত সংশোধনী বাস্তবায়ন করা হলে জনগণ নিজ এলাকায় অবস্থান করেই বিচার পেতে পারবে৤ রাজধানীর উপরও চাপ কমবে৤

করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছেন৤ এই ঘোষনার সাথে সাথেই অধিকাংশ রাজধানীবাসী ঢাকা ছেড়ে মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলে তাদের নিজ নিজ আদি ঘর বাড়িতে গিয়ে বসবাস করছেন ৤ পোষাক শ্রমিকদের কাজে যোগ দেবার নির্দেশ দেবার পর , কারখানা খুলে না দিয়ে বন্ধ রাখা হয়েছে ৤ যানবাহন না থাকায় তারা হেঁটে হেঁটে ঢাকা এসেছে ৤ কারখানার ফটকে গিয়ে তা বন্ধ দেখে তারা দিশেহারা অবস্থায় পড়েছে৤ কারখানা মালিকেরা দুঃখ প্রকাশ করেই খালাস , এই সব শ্রমিকদের ব্যাপারে আর কিছুই তারা করছেন না৤ তারা যুক্তিসংগত কারণেই বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছে৤ আবার মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে ঢাকা ফেরত শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী জনগণের আগমণে এই সব অঞ্চলে পরিবেশ ও অর্থনীতিতে পরিবর্তন এসেছে ৤ কোন কোন ক্ষেত্রে সামাজিক পারিবারিক ও বৈষয়িক জীবনে নানা রকম সংকট সৃষ্টি হয়েছে ৤ মফস্বল ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রচ্ছন্ন বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে৤ এটাকে সুস্থ ধারায় নিতে গেলে প্রাগুক্ত মতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা জনস্বার্থেই প্রয়োজন৤ তাহলেই এই সংকট মুকাবিলা করা সহজ হবে এবং ক্ষয় ক্ষতি এড়িয়ে দেশকে সম্বৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে৤