অবহেলিত স্বাস্থ্যখাত কীভাবে করোনা মোকাবেলা করবে?

পদ্মা সেতুর স্প্যান সংখ্যা ৪১। এখন পর্যন্ত বসেছে ২৭টি। এতে সেতুর ৪০৫০ মিটার অংশ দৃশ্যমান হয়েছে। শুধু এ পর্যন্তই নয়, পরবর্তী স্প্যানটি যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা তা দেশের সব মিডিয়ার মাধ্যমে জেনে যাব। আমি ঠিক জানি না পৃথিবীর আর কোনো সেতুর পদ্মা সেতুর মতো ‘সৌভাগ্য’ হয়েছে কিনা।

প্রতিটি স্প্যান যুক্ত হওয়া এবং তাতে সেতুর দৈর্ঘ্য কতটুকু দাঁড়াল সেই খবর দেশের সবক’টি পত্রিকা ছাপে এবং টিভি চ্যানেলগুলো দেখায়। সেই ধারাবাহিকতায় ২৮ মার্চ টিভির খবরের সবটুকুজুড়ে যখন বিশ্বব্যাপী করোনার সংবাদ, তখনও স্ক্রলে হঠাৎ করে দেখা যায় পদ্মা সেতুর ২৭তম স্প্যান স্থাপনের খবর এবং তাতে এ সেতুর কত মিটার দৃশ্যমান হল জানা যায় সেটিও।

যৌক্তিকভাবেই অনুমান করা যায়, পদ্মা সেতুর প্রতিটি স্প্যান যুক্ত হওয়ার খবর প্রচারের জন্য গণমাধ্যমের ওপর নির্দেশনা আছে। সরকার পদ্মা সেতুকে তার খুব বড় বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহার করে। সরকার বলতে চায় নিজস্ব অর্থায়নে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি লাগছে এমন একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন তারা করছে। প্রাথমিকভাবে প্রাক্কলিত ব্যয়ের আড়াই গুণে ঠেকেছে পদ্মা সেতুর ব্যয়, অর্থাৎ এর মধ্যে দুর্নীতির খুব বড় সন্দেহ আছে; কিন্তু তবুও সরকার বলতে পারছে নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় একটা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তাই এ সেতুকে সরকারের অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক বড় প্রতীক করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে।

২৬ মার্চ দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিক সংবাদ প্রকাশ করে জানায় ঢাকার বাইরে আর কোনো জেলায় শ্বাস-প্রশ্বাসের কৃত্রিম যন্ত্র ভেন্টিলেটর নেই এবং ঢাকায়ও যা আছে সেটি একেবারেই নগণ্য। এর তিন দিন পর যুগান্তর রিপোর্ট প্রকাশ করে ‘আইসিইউর প্রস্তুতি নেই চট্টগ্রামে’ শিরোনামে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী একটি দেশে হাসপাতালের রোগীদের জন্য যতগুলো বেড আছে তার কমপক্ষে ১০ শতাংশ আইসিইউ বেড থাকা উচিত। সেটি না থাকলে ন্যূনতম ৪ শতাংশ বেড থাকতেই হবে। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে বেডের সংখ্যা ৩১ হাজার ২০০।

তাহলে স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে আইসিইউ বেড থাকার কথা ৩ হাজার ২০০। আর ন্যূনতম হিসাবটাও যদি ধরা হয়, সেক্ষেত্রে এটি হওয়া উচিত ১ হাজার ২৫০। অথচ দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে এ কয়েকদিন আগেও বেড ছিল ২২১, অর্থাৎ একেবারে ন্যূনতম প্রয়োজনেরও মাত্র ১৭ শতাংশ। এদের অনেকগুলোতেই আবার ভেন্টিলেটর নেই। ভেন্টিলেটরসহ আইসিইউ তুলনামূলক দামি ইকুইপমেন্ট হলেও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সামর্থ্যরে কাছে কিছুই নয়, তবুও এটি একটু সরিয়ে রাখা যাক।

৮ মার্চ ‘অফিসিয়ালি’ করোনার অস্তিত্ব ঘোষণা করার পর এ লেখা যখন লিখছি তখন তিন সপ্তাহের বেশি সময় কেটে গেছে; কিন্তু আজও পত্রিকায় রিপোর্ট আসছে ডাক্তারদের সুরক্ষা পোশাক পিপিই নিয়ে সংকটের কথা।

৩০ মার্চ পর্যন্ত ৩ লাখের বেশি পিপিই বিতরণের পর স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্টকে চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার পিপিই মজুদ ছিল। জানানো হয়েছে আরও ১০ লাখ পিপিই সংগ্রহের পদক্ষেপ চলছে। সব লক্ষণ বলছে করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়ে গেছে, এমনকি আইইডিসিআর স্বীকার করছে সীমিত পর্যায়ে এটি হচ্ছে। অর্থাৎ এখন বহু রোগী হাসপাতালে যাবে জ্বর-কাশি-শ্বাসকষ্ট ছাড়া অন্য রোগ নিয়েও যাদের শরীরে এ ভাইরাস আছে। সেই ক্ষেত্রে সব ডাক্তার এবং স্বাস্থ্যকর্মীকে এখন পিপিই পরেই তাদের চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। এখন পিপিইর যে পরিস্থিতি তাতে পর্যাপ্ত সংখ্যার আশপাশেও নেই। এ পরিপ্রেক্ষিতেই কিছুদিন আগে স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রজ্ঞাপন জারি করে বলেছিল পিপিই ছাড়াও সন্দেহভাজন করোনা রোগীকে প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা দিতে ডাক্তাররা বাধ্য থাকবে।

এ পিপিই না পেয়েও অন্তত দুটি মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা প্রতিবাদ করেছেন, এমনকি রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন ডাক্তাররা ধর্মঘটে গিয়েছিলেন। কানাডাফেরত এক মেয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা নিতে গিয়ে করোনা সন্দেহ হওয়ায় ওয়ার্ডে কী দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড ঘটে গিয়েছিল সেটিও পত্রিকায় এসেছে, যার মাশুল দিয়েছিল মেয়েটি জীবন দিয়ে। আজ ডাক্তারদের যথেষ্ট পরিমাণ প্রটেকশন না থাকার কারণে অন্যান্য অনেক রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা পাচ্ছেন না। একটার পর একটা হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসা না পেয়ে রোগীর মৃত্যুর খবর প্রতিদিন পত্রিকায় পাওয়া যায়। আর যাদের মৃত্যু হয় না তাদেরও হয়রানির খবর প্রতিনিয়তই জানা যায়।

‘সংক্রমণ ঝুঁকি এড়ানোর জন্য প্রতিরোধ কর্মসূচি হিসেবে হাসপাতালে কর্মরত এবং সেবা কাজের সঙ্গে জড়িত সবার মাস্ক ব্যবহার করা প্রয়োজন। সম্পদের স্বল্পতার জন্য হাসপাতাল থেকে সবাইকে মাস্ক সরবরাহ করা যাচ্ছে না। সংক্রমণ ঝুঁকি এড়াতে সবাইকে নিজ উদ্যোগে মাস্ক ব্যবহারের অনুরোধ করা হল।’ ২১ মার্চ স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ডাক্তার এবং অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি পরিচালকের দেয়া একটি নোটিশের শেষ অংশ এটি। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার কারণে প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে সেটি পরবর্তী সময়ে প্রত্যাহার করা হয়। শুধু তাই নয়, প্রত্যাহার করা হয় পরিচালককেও। হ্যাঁ, চিকিৎসাসেবাদানকারী সবাইকে পর্যাপ্ত মাস্ক দেয়ার সামর্থ্যও নেই এ রাষ্ট্রের।

করোনা মোকাবেলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে টেস্ট করা। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে শুধু লকডাউনই যথেষ্ট নয়, করোনা মোকাবেলায় লকডাউনে থাকা মানুষদের মধ্য থেকে সন্দেহভাজনদের প্রচুর টেস্ট করতে হবে। বাংলাদেশে করোনা অফিসিয়ালি ঘোষণা করার আগে প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়ার পরও আইইডিসিআরের বাইরে টেস্ট করার সেন্টার আর কয়েকটি বাড়ানো হল মাত্র ২-৩ দিন আগে। এখন হন্তদন্ত হয়ে কিছু কিট সংগ্রহ করা হয়েছে, অথচ ১৭ মার্চ আমরা জানতে পেরেছিলাম দেশে করোনা পরীক্ষার কিট ছিল ১৭৩২টি, যার মধ্যে আবার ২০০টির বেশি ব্যবহƒত হয়ে গিয়েছিল। মিরপুরের টোলারবাগে করোনায় মৃত ব্যক্তির টেস্ট করা হয়নি শুধু কিটের অপর্যাপ্ততার কারণ দেখিয়ে।

করোনা দেশে তার থাবা বিস্তার করার পর এ দেশের মানুষ ভীষণ অবাক হয়ে দেখে প্রচণ্ড রকম উচ্চস্বরে উন্নয়নের প্রোপাগান্ডা চালানো সরকারটি হঠাৎই ‘গরিব’ হয়ে গেল। তারা এটা নেই ওটা নেই করতে করতে দেখা গেল অতি তুচ্ছ মাস্কও নেই যথেষ্ট।

স্বাভাবিকভাবে দেশের স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের পরিমাণ অত্যন্ত অপ্রতুল; কিন্তু একটা বৈশ্বিক মহামারী আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে দেখার পরও এ খাতে আমাদের ন্যূনতম বিনিয়োগ করতেও সরকারের প্রচণ্ড রকম দ্বিধা করছে। জনগণের কাছে এটি এক চরম হতাশাজনক বার্তা দেয়।

করোনা চীনের উহানে প্রথম দেখা দেয়, এরপর অবিশ্বাস্যভাবে সেটা চীনের আর কোথাও না ছড়িয়ে (এটি নিয়ে অনেক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আছে) চলে যায় কোরিয়া-সিঙ্গাপুরে; এরপর সেটি ইউরোপের ইতালি-স্পেন এবং অন্যান্য দেশ হয়ে আমেরিকায়। স্পেন-ইতালি থেকে করোনার মূলকেন্দ্র সরে এখন আমেরিকায়। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশটি করোনার আক্রমণে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দুদিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা এক লাখের কমে সীমাবদ্ধ রাখতে পারলে তিনি খুশি হবেন। করোনার সামনে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশটির বিপর্যস্ত হয়ে পড়া আরেকটা বার্তা দেয়, মানুষের স্বাস্থ্যসেবা বেসরকারি খাতে থাকাটা শেষ পর্যন্ত জনগণের জন্য চরম বিপর্যয়ের হয়ে ওঠে। জনগণের স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের হাতে থাকায় ইংল্যান্ড কিংবা জার্মানি করোনার বিরুদ্ধে অনেক ভালো যুদ্ধ করছে।

না, আমি উন্নত দেশের উদাহরণ দিয়ে সেটার সঙ্গে বাংলাদেশকে তুলনা করতে বলছি না, বরং আমি দিতে চাই আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কেরালা রাজ্যের উদাহরণ। ভারতের কেরালা অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটা মডেল হিসেবে বেশ আলোচিত।

আয়ের দিক থেকে ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা কেরালা শিক্ষা, চিকিৎসা এবং সার্বিক মানব উন্নয়ন সূচকে ভারতের সবচেয়ে উঁচুতে থাকা প্রদেশ। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ‘কেরালা মডেল’ তৈরি করা নিয়ে কাজ করেছেন এবং এর পক্ষে অনেক কথা বলেছেন। এ কেরালায় করোনা ম্যানেজমেন্টে অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়ে আবারও বিশ্বের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে।

কেরালা দীর্ঘদিন থেকে প্রমাণ করছে, এবার আবারও করল, সম্পদের সীমাবদ্ধতা নাগরিককে সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে খুব বড় বাধা নয়। রাষ্ট্র যদি সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তার সম্পদ কোথায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করবে এবং কীভাবে ব্যবহার করবে সেটার মাধ্যমে সম্পদের অভাব অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা যায়। উন্নত দেশগুলো বাদই দেয়া যাক, আমাদের পাশের দেশের উল্লিখিত রাজ্য যখন এত চমৎকার চিকিৎসা এবং অন্যান্য সেবা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে তখন এ দেশের নাগরিক হয়ে সেটি দেখা আমাদের জন্য ভীষণ হতাশার নয় কি?

উন্নয়ন মানে শুধু কয়েকগুণ বেশি খরচ করে কতগুলো ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ নয়। উন্নয়ন মানে মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক অধিকারগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। করোনা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও পদ্মা সেতুর স্প্যানগুলো উঠবে একটার পর একটা। মানুষ দেখবে সরকার আবার এ সেতু বানানোর গর্বে মানুষের সামনে গর্বিতভাবে দাঁড়াচ্ছে; কিন্তু সে ভুলে যাবে না কিছুদিন আগে একটা ভয়াবহ বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে যখন তার জীবন হুমকির মুখে তখন রাষ্ট্র তার পাশে ঠিকমতো দাঁড়ায়নি। দাঁড়ায়নি চিকিৎসার সাহায্য নিয়ে, দাঁড়ায়নি সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তার ভরণপোষণের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব নিয়ে।

আমাদের মতো একটা দেশের স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ হওয়া উচিত। গত অর্থবছরের বাজেটে হয়েছে ১ শতাংশেরও কম। জিডিপির অনুপাতে এটি প্রতি বছর কমছে। করোনা কি এ খাতে বরাদ্দ অতি দ্রুত বাড়াতে এবং দুর্নীতি কমিয়ে মানুষকে মানসম্মত চিকিৎসা দিতে সরকারকে প্রণোদনা জোগাবে?

করোনা কিন্তু আরেকটি বার্তা প্রভাবশালীদের দিল, এমন কোনো রোগ আসতে পারে যখন যে কোনো মুহূর্তে উন্নত কোনো দেশে চিকিৎসা নেয়ার পথ তাদের রুদ্ধ হয়ে যাবে। অসীম আর্থিক সামর্থ্য থাকলেও তাদের চিকিৎসা নিতে হবে এ দেশের একেবারেই অপ্রতুল স্বাস্থ্যব্যবস্থায়।

লেখক: ডা. জাহেদ উর রহমান

শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট