এপির প্রতিবেদন :ঢাকা টু গাজা: কিভাবে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা সম্ভব?

রাজধানী ঢাকার এক বস্তিতে পরিবারের চার সদস্যের সঙ্গে বসবাস করেন জোছনা বেগম। বিশে^র সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর এই ঢাকা। জোছনা বেগম বললেন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। তার বয়স ৩৫ বছর। ১২ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে তিনি একটি সিঙ্গেল রুমে বসবাস করেন। গৃহকর্মী হিসেবে মাসে আট হাজার টাকার মতো আয় করেন। অন্য ২২টি পরিবারের সঙ্গে একটি অভিন্ন রান্নাঘর শেয়ার করে ব্যবহার করতে হয় তাকে। অথচ দেশজুড়ে শাটডাউন ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকার।
উদ্দেশ্য উচ্চ মাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানো। কারণ, বিদেশে কর্মরত কয়েক লাখ (হানড্রেস অব থাউজেন্ডস) শ্রমিক দেশে ফিরেছেন। তাদের বেশির ভাগই করোনা ভাইরাস সংক্রমিত ইতালি ও অন্যান্য হটস্পট থেকে ফিরেছেন। ফলে ঝুঁকিটাও বেশি। খাবারের মার্কেট, ওষুধের দোকান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দোকান ছাড়া সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জনগণকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে ঘরের ভিতরে অবস্থান করতে। আরো বলা হয়েছে, একজন থেকে অন্যজনকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে। কিন্তু ঢাকায়, যেখানে এক কোটিরও বেশি মানুষ বাস করেন এবং গড়ে প্রতিটি বাসার আয়তন ১২০ বর্গফুট, ১০ লাখের মতো মানুষ বাস করেন বস্তিতে, সেখানে এমন কথা বলা সহজ। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা কঠিন। ‘ফ্রম ঢাকা টু গাজা: হাউ ডু ইউ সোশ্যালি ডিসটেন্স ইন এ ক্রাউড?’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছে বার্তা সংস্থা এপি।

এতে আরো বলা হয়, একই রকম চিত্র বিরাজমান মুম্বই থেকে রিও ডি জেনিরো, জোহানেসবার্গে। এসব স্থানে লাখ লাখ মানুষ ঘনবসতিপূর্ণ বস্তিতে বসবাস করেন। সেখানে নেই পর্যাপ্ত পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা। এ সপ্তাহে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক ড. মাইকেল জে রায়ান বলেছেন, বিশাল ও অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোতে কি ঘটছে, তার ওপর নির্ভর করবে এই মহামারির ভবিষ্যত।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আক্রান্ত মানুষ যখন কথা বলেন, কাশি দেন, হাঁচি দেন তখন তার মুখ ও নাক থেকে বাষ্পাকারে যেসব পানির কণা বেরিয়ে আসে তা থেকে মূলত করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঘটে। এসব বাষ্পকণা বা ড্রপলেটস মাটিতে পড়ার আগে ৩ থেকে ৬ ফুট পর্যন্ত উড়তে পারে। যখন হাল্কা বা তার চেয়ে একটু বেশি কাশি বা জ¦রে আক্রান্ত হন বয়স্ক মানুষ এবং তাদের অন্য শারীরিক সমস্যা থাকে, তাদের মধ্যে নিউমোনিয়া হওয়ার বা তাদের মারা যাওয়ার আশঙ্কা বেশি। এসব মানুষকেই বেশি করে আঁকড়ে ধরে করোনা ভাইরাস।
তাই মানুষ থেকে এত দ্রুত যেহেতু এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে, অন্যকে আক্রান্ত করতে পারে, তাই সামাজিক দূরত্ব একজন মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে উত্তম পন্থা করে দেয়। এমনটা মনে করেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের শহর গবেষণা বিষয়ক প্রফেসর হিউন বাং শিন। তিনি বলেন, বিশেষ করে অনাচার এবং বৈষম্য এই ভয়াবহ মহামারির ঝুঁকিকে বিকশিত করে তুলেছে।

কিভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা কার্যকর হতে পারে তা ঠাহর করতে পারেন না ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার উত্তরাঞ্চলের এক বস্তিতে দুই রুমের বাসায় বসবাস করা ৭৪ বছর বয়স্ক আবু বকর। তিনি ওই বাসায় তিনজন সদস্যকে নিয়ে বসবাস করেন। তিনি বলেন, আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজেকে পরিষ্কার রাখা। পাশর্^বর্তী একটি পানি সংরক্ষণাগার থেকে বর্ষা মৌসুমে পানি উপচে পড়ে মাঝে মাঝেই নিমজ্জিত হয় ওই এলাকা। তাই সেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব। সেখানকার দেয়ালগুলোতে যে চিহ্ন এখনও আছে, তাতে পরিষ্কার বোঝা যায় বর্ষার সময় সেখানে দুই ফুট পর্যন্ত পানি হয়। বিশাল এই বস্তি এলাকায় বসবাস করেন হাজার হাজার মানুষ। সেখানে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নাজুক। হাঁটার পথ সংকীর্ণ। আবু বকর বলেন, তিনি যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন তাহলে তিনি ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নিজেকে আইসোলেট করতে পারবেন না।
জাকার্তা ভিত্তিক রুজাক সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজের এলিসা সুতানুদজাজা বলেন, মূল সমস্যা থেকে এ বিষয়টি এখানে অনেকটা দূরে। ওই এলাকায় ক্লিনিক, পয়ঃনিষ্কাশন ও অন্যান্য ব্যবস্থার বড় রকমের ঘাটতি আছে। তাই অনেকের কাছে সেখানে পর্যাপ্ত স্থান সংকুলান হওয়াটা উদ্বেগের বিষয় নয়।

মুম্বইয়ে ও এর আশপাশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৯০০ মানুষ। ওই শহরে বসবাস করেন ৫৩ বছর বয়সী আবরার সালমানি। তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ১১। ভিমনগর বস্তিতে তাদের বসবাস। সেখানে তার আবাসস্থল এতটাই ছোট যে, অনেককেই নিয়মিত ঘরের বাইরে ঘুমাতে হয়। বেকার আবরার বলেন, বেশির ভাগ পরিবারের কাছে পানির সুবিধা নেই। তারা গোসলের জন্য একটি ওয়াশরুম ব্যবহার করেন। এটা গণহারে ব্যবহার হয়। আবরার বলেন, আমাদের দাবি একটি পানির পাইপলাইন। কিন্তু বছরের পর বছর আমাদের এ দাবির কোনো তোয়াক্কাই করা হয় নি।

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যাকা। সেখানে ১৪০ বর্গমাইলের এলাকা। গাদাগাদি করে বসবাস করেন ২০ লাখ ফিলিস্তিনি। তার মধ্যে অর্ধেকের বেশি বেকার। করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে এ সপ্তাহে সেখানকার হামাস শাসকরা ক্যাফে, বিয়ে অনুষ্ঠানের হল বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। মসজিদে শুক্রবারের জুমার নামাজ বন্ধ করেছে। অধিবাসীদের বাড়িতে অবস্থানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একের সঙ্গে অন্যের ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। কিন্তু মারাত্মক রকম বিদ্যুত সংকট রয়েছে সেখানে। দিনে কমপক্ষে ৮ ঘন্টা বিদ্যুত থাকে না। ফলে গাজায় বসবাসকারীদের এ সময়টাতে ঘরের ভিতর অবস্থান করা খুব কঠিন। সেখানকার বাসিন্দা ৫৩ বছর বয়সী ইয়াসের আনান। তিনি বলেন, করমর্দন না করায় আমার এক বন্ধু হতাশ হয়েছেন। যদিও আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, করোনার কারণে হাত মিলাই নি। তবু আমার ওই বন্ধু আমার ওপর রেগে যান। ফলে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য তার কপালে চুমু খেতে হয়েছে আমাকে।

আফ্রিকাজুড়ে বিশে^র দ্রুত বর্ধনশীল কিছু শহর রয়েছে। রয়েছে নাজুক অবকাঠামো। সেখানকার কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে খুব সহজেই বস্তি ও অনুন্নত শহরগুলোকে বিস্তার লাভ করবে করোনা ভাইরাস। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য করতে বেশ কিছু শহরে কাঁদানে গ্যাস ও বন্দুকের ফাঁকা গুলি ছুড়তে হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই মহাদেশে বসবাসকারী ১৩০ কোটি মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ৩৫০০। কিন্তু করোনা পরীক্ষার কিটের যে সঙ্কট দেখা দিয়েছে সারাবিশে^, তার ফলে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত নাও হতে পারে। আক্রান্তের সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতে পারে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সেখানে আক্রান্তের হার ইউরোপের মতো হতে পারে।

নাইজেরিয়ার সমুদ্র উপকূলবর্তী শহর লাগোস। আফ্রিকার সবচেয়ে বড় শহর এটি। এখানে বসবাস করেন কমপক্ষে ২ কোটি মানুষ। সেখানকার বস্তি এলাকায় দ্রুত করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। বিশালকায় বস্তি মাকোকো। সেখানে ছালা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে সুউচ্চ বসত। সেখান থেকে পয়ঃনিষ্কাশন হয়ে সোজা গড়িয়ে পড়ছে সমুদ্রে। কিন্তু বেদুইন এডওয়ার্ড দু’হাতের আজলিতে সেই ময়লা পানি তুলে নিলেন এবং তা পান করলেন। তারপর বললেন, কর্তৃপক্ষকে আসতে বলুন এবং এই পানি পরীক্ষা করতে বলুন। এতে কোনো রোগ নেই। তিনি বললেন, বাতাসের ধোয়া সব রোগ, অ্যালকোহলের ক্ষতিকর দিক দূরে রাখবে। এরপরই তিনি তার পকেট থেকে এক খন্ড আদা বের করেন এবং বলেন, এটাই তার সুরক্ষা।
ঘনবসতিপূর্ণ দক্ষিণ আফ্রিকার অনুন্নত শহরে বসবাস করেন লাখ লাখ শ্রমিক। তারা কোনো সুরক্ষা ছাড়াই গাদাগাদি করা ট্যাক্সিতে করে কাজে যান। ঘরে একটি বা দুটি রুমে বসবাস করেন গাদাগাদি করে। পুরো সম্প্রদায় ট্যাপ থেকে একসঙ্গে পানি সংগ্রহ করে। সেখানে দেশজুড়ে লকডাউন শুরু হয়েছে শুক্রবার। জোহানেসবার্গের বাইরে সোয়েতোর এক বাসিন্দা মান্দো মাসিমোলা বলেন, আমরা যখন ছালার তৈরি ঘরে বসবাস করি তখন থেকেই আমাদের মধ্যে করোনা ভাইরাসের ভয় রয়েছে। যদি এই ভাইরাস আমাদেরকে সংক্রমিত করে তাহলে কিভাবে বেঁচে থাকবো জানি না।

ওদিকে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের বিশেষজ্ঞরা সতর্কতা দিয়েছেন। তারা বলেছেন, সেখানকার দরিদ্র সমাজের অকথিত সংখ্যক মানুষ মারা যেতে পারেন এই ভাইরাস সংক্রমণে। সেখানে মানুষ কাজে না গেলে, খেতে পায় না। মানুষ বসবাস করেন ‘প্যাকড’ বা গাদাগাদি হয়ে। খুব কম সংখ্যক মানুষের জন্য রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা। আর তো উন্নত চিকিৎসার কথা কল্পনাই করা যায় না। রিও ডি জেনিরোর বস্তিতে দুটি দাতব্য সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা রাউল সান্তিয়াগো বলেন, এখানে কোয়ারেন্টিন অসম্ভব। এখানে দেয়ালের সঙ্গে দেয়াল লাগানো। দুই বা তিন রুমের বাসা সব। তাতে বসবাস করেন ৬ জনের বেশি মানুষ। তিনি এক টুইটে কমপ্লেক্সো ডো আলেমাও-এর এমন অবস্থা বাড়িঘরের ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, কিভাবে এই কোয়ারেন্টিন করবেন এখানে?

রিও ডি জেনিরোতে প্রথম করোনায় মৃত ব্যক্তি ৬৩ বছর বয়সী নারী ক্লিওনাইস গনকালভেস। তিনি রিও ডি জেনিরোর সবচেয়ে সম্পদশালী এলাকা লেবলনের একটি পরিবারে গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। সম্প্রতি ইতালি সফরের সময় তিনি করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হন। তার ভাই স্থানীয় এক মিডিয়াকে বলেছেন, কিন্তু তিনি তা কারো কাছে প্রকাশ করেন নি। গনকালভেসের ছিল উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ১৭ই মার্চ মারা যান।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ওয়াশিংটন অফিস অন লাতিন আমেরিকার গবেষক জিওফ রামসে বলেন, কর্মজীবী বিপুল জনগোষ্ঠী আছেন। তারা শুধুই ঘরের ভিতর অবস্থান করতে পারেন না। আমরা এমন একটি অঞ্চল দেখতে পাচ্ছি যা ক্রমাগত বৈশি^ক এই মহামারিতে গভীর থেকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে চলেছে।