স্বদেশ তুমি কোন পথে: আহমেদ ফজলুররহমান মূরাদ

আমরা এবার করোনা মহামারী এর ৩য় ধাপ এ প্রায় পৌঁছে গিয়েছি। এটি সর্বাধিক আগামী ৬-১০ দিন অতিবাহিত করবে। এ সময় মোট সংক্রমিতদের ৪০-৫০ শতাংশ কোনও লক্ষন ছাড়াই ভাইরাসটি বহন করবে এবং অন্যকে নীরবে-নিভৃতে সংক্রমিত করবে। রোগটি আক্রান্ত হওয়া সবার মাঝেই সাধারন সর্দিকাশি, গলাব্যাথা আর জ্বর সহ উপস্থাপিত হবে। ভাইরাস জনিত রোগটির অস্বাভাবিক বিস্তার / আক্রান্ত হওয়া ঠেকাতে সবার জন্যই সর্বাধিক সাবধানতা অবলম্বনের এটিই চুড়ান্ত আর শেষ সময়। এর পর আর সাবধানতার কোনও সুযোগ নেই। এর পর আর সাবধান হয়েও কোনও লাভ নেই। এর পর আর সাবধান হবার প্রয়োজনও নেই।লেখাটি যখন শুরু করেছি তখন এ সময় শুরু হয়ে গিয়েছে।।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সংক্রমণের ভিত্তিতে কোভিড-১৯ রোগীদের ৪টি স্তরে ভাগ করা যায়। প্রথম স্তর: ইম্পোর্টেড কেস বা অন্য দেশ থেকে আসা কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী।
দ্বিতীয় স্তর: লোকাল ট্রান্সমিশন বা স্থানীয় সংক্রমণ যাতে অন্য দেশ থেকে আসা রোগীর সংস্পর্শে এসে যারা আক্রান্ত হয়।
তৃতীয় স্তর: কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সামাজিক সংক্রমণ যখন বিদেশ থেকে আসা বা কোনো নিশ্চিত কোভিড-১৯ রোগীর সংস্পর্শে না এসেই এই রোগে কেউ আক্রান্ত হয়। অর্থাৎ অজানা উৎসে সংক্রমণ।
চতুর্থ স্তর: এপিডেমিক বা মহামারী, যখন সামাজিক সংক্রমণ ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ে।
দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশে সংস্পর্শে আসা সবাইকে পরীক্ষার আওতায় আনা হয়নি। আইইডিসিআর এ কাজটি করতে পারেনি। পরীক্ষা তো পরের কথা, তারা কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের কাজটাই একেবারে দায়সারা গোছের করেছেন। এমনকি লক্ষণ প্রকাশের পরও তারা সংশ্লিষ্ট ডাক্তারদের পরীক্ষা করতে গড়িমসি করেছেন।তারা রোগীর গোপনীয়তা নিশ্চিতের নামে সব তথ্যই চেপে যাচ্ছেন। অথচ অন্য দেশগুলো কতটা দক্ষতার সঙ্গে রোগীর পরিচয় গোপন রেখেই প্রতিদিন প্রতিটি কেসের কন্টাক্ট ট্রেসিং উন্মুক্ত করে দিচ্ছে।।বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে করোনাভাইরাস সংক্রমণের তৃতীয় স্তরে অবস্থান করছে। এখন পর্যন্ত কোনো দেশই প্রথম এবং দ্বিতীয় স্তরে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসকে আটকে রাখতে পারেনি। তবে যেসব দেশ সফল হয়ছে, তারা মূলত তৃতীয় স্তর থেকে চতুর্থ স্তরে যাওয়ার পথ বন্ধ রাখতে পেরেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য প্রায় তিন মাস সময় পেলেও সরকার পরিস্থিতি বুঝতে এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে টেস্টিং কিট ও পিপিই সংগ্রহ করা বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে। সারা পৃথিবীতেই নভেল করোনাভাইরাস কোভিড-১৯ মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে। যার কারণে টেস্টিং কিটের চাহিদা ব্যাপক। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে পিপিই উৎপাদন করতে পারছে না কাঁচামালের অভাবে। এসবের কাঁচামাল বেশিরভাগই আমদানি করা হয় চীন থেকে। ১৭ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে এক লাখ পিপিই, পাঁচ লাখ সার্জিক্যাল মাস্ক ও সার্জিক্যাল গগলস এবং অন্যান্য সরঞ্জাম চেয়ে চিঠি দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিরাময় কেন্দ্র। তবে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে অগ্রগতি হয়নি বললেই চলে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র বলছে, মন্ত্রণালয়ের অস্বস্তিকর ধীর প্রতিক্রিয়ার কারণেই এই অবস্থা হয়েছে। করোনাভাইরাস ইস্যুতে সরকারের সিদ্ধান্তগুলো অনেক বিলম্বে এসেছে। বিদেশফেরতদের কোয়ারেন্টাইনে রাখতে না পারা সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের চরম অবহেলা ও ব্যর্থতা। প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে সবাইকে যেহেতু রাখা যাবে না, সুতরাং তাদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন ছিল।
করোনাভাইরাসে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে আর কেউ আক্রান্ত হয়নি। শনিবারের মতো আজ রোববারও দেশে নতুন করে করোনা আক্রান্তের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ফলে ভাইরাসটিতে আক্রান্তের সংখ্যা আগে যা ছিল তা-ই আছে। অর্থাৎ দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৪৮। দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ১০৯ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এ পরীক্ষায় নতুন করে কারও শরীরে করোনার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।সেইসঙ্গে কোভিড-১৯ সংক্রমিত মোট ১৫ জন সুস্থ আছেন বলে গতকালের মতো আজও জানানো হয়েছে। আর মৃতের সংখ্যা ৫ জনই আছে। রোববার (২৯ মার্চ) বেলা ১২টার পর স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) করোনাভাইরাস সংক্রান্ত অনলাইন লাইভ ব্রিফিংয়ে এ সব তথ্য জানান প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা।কিন্তু ইতিমধ্যে করোনাভাইরাসের লক্ষণ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে বরিশালে দুজন, পটুয়াখালীতে এক, নওগাঁয় এক এবং মানিকগঞ্জে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। যাদের প্রত্যেকের জ্বর-কাশি, শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু, হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সবার মধ্যে করোনাভাইরাসের প্রাথমিক উপসর্গ ছিলো।আইইডিসিআর বা মীরজাদী ফ্লোরা যাহাই বলুন আলামত কিন্তু শুরু হয়েছে।।
ঘুম নেই কারও চোখে। কারফিউ’র জায়গা দখল করেছে লকডাউন। । বাঁচার তাগিদে মানুষ স্বেচ্ছাবন্দি। ঘরে খাবার নেই। তবুও কেউ বের হচ্ছে না খাবারের সন্ধানে। বোমার মধ্যেও মানবতার ডাকে মানুষ হাজির হয় খাবার নিয়ে। এই ভাইরাস মানবতাকে বিপন্ন করে দিয়েছে। এই যখন অবস্থা তখন আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে। কাউকে দোষারোপ করে বলছি না। কোথায় যেন ভুল হচ্ছে। মানবিকতা দেখাতে গিয়ে বিদেশ ফেরৎ বাংলাদেশীদের আমরা পর্যবেক্ষণেই রাখিনি। কেউ বলবে না ওদের আসতে দেবো না। নিজ মাতৃভূমিতে তারা আসবে। কিন্তু ‘স্বেচ্ছাবন্দি’ থাকতে আমরা শুরুর দিকে পরামর্শও দেইনি। বরং ভাইরাসমুক্ত সার্টিফিকেট দিয়েছি। এটা ছিল ভুল। এই ভুলের মাসুল যেন আমাদের আর দিতে না হয়। বলা হচ্ছে সত্য বললে নাকি মানুষ আতঙ্কিত হবে। অঘোষিত লকডাউনে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ঢাকা ছেড়েছেন। ফেরি ঘাটে লাখো মানুষের ভিড় আর আকুতির ছবি আমরা দেখেছি। লকডাউন মানে লকডাউন করতে হবে।
অতি মানবিকতা আমাদের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। জাতিসংঘের ফাঁস হওয়া রিপোর্টে ভয়ঙ্কর চিত্র ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশকে এখান থেকে বার্তা নিতে হবে। জাতিসংঘের অনুমান কতোটা সত্য জানি না। মনে-প্রাণে চাই এটা যেন মিথ্যে হয়। বিদেশি কূটনীতিকদের দলে দলে ঢাকা ছাড়ার খবরে চিন্তার ভাঁজ কপালে। ৪৮ জন আক্রান্তের দেশ ছেড়ে তারা কেন হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর দেশে ফিরছেন তা বুঝতে পারি না।
করোনা সন্দেহে বিনাচিকিৎসায় মারা গেলেন মুক্তিযোদ্ধা আলমাছ উদ্দিন। গত শনিবার ভোরে ব্রেইন স্ট্রোক করলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় রাজধানীর বারেডেম হাসপাতালে। সেখান থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হলে নিয়ে যাওয়া হয় পর্যায়ক্রমে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, পপুলার হাসপাতাল ও কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা আলমাসকে করোনা সন্দেহে কোথাও ভর্তি করে নাই বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। অবশেষে রবিবার মধ্যরাতে মুগদা হাসপাতালে ভর্তি করলে সেখানে সকালে ইন্তেকাল করেছেন। মৃত্যুর পরে ডেথ সার্টিফিকেট দেয়া হলো ব্রেইন ষ্টোক। ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বাসাবো মাঠে বঙ্গবন্ধুর নিকট অস্ত্র সমর্পণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলমাছ উদ্দিন বিনা চিকিৎসায় চিরবিদায় নিলেন স্বাধীনতার মাসেই।
করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতাল এবং শহীদ এম. মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজের ৩০ চিকিৎসক কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালে আগে দৈনিক গড়ে প্রায় ৪শ’ থেকে সাড়ে ৪শ’ রোগী থাকলেও বর্তমান করোনা পরিস্থিতির কারণে রবিবার রোগী ছিলেন মাত্র ৬০ জন। করোনা আক্রান্ত হওয়ার ভয়ের পাশাপাশি জ্বর, সর্দিকাশি ও নিউমোনিয়ার রোগী ভর্তির ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের অলিখিত বা কৌশলগত আপত্তি থাকায় আকস্মিকভাবে রোগী ভর্তির পরিমাণ কমে গেছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। আবার কেউ কেউ ভর্তি হলেও একদিন যেতে না যেতেই তাকে কৌশলে ডিসচার্জ করে চিকিৎসা পরামর্শ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।এটাই এখন আমাদের চিকিৎসা চিত্র। দেশের কোথাও সর্দি, কাশি বা শ্বাসকষ্ট জনিত রোগের সাধারণ চিকিৎসাও দুস্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে।।
সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর শ্রমজীবী মানুষের একটি অংশ শহর ছেড়ে গ্রামে গেছে। কিন্তু, রাজধানীর বস্তিবাসীদের অনেকেরই নিজের বলতে ঘর-বাড়ি নেই। তাই তাদের কোথাও যাওয়ার জায়গাও নেই; কর্মহীন অবস্থায় তারা বস্তিতেই আছেন। ভাইরাসের আতঙ্ক থাকলেও তাদের কাছে করোনা প্রতিরোধের চেয়ে বেশি প্রয়োজন খাবারের নিশ্চয়তা।যাদের সবাই শ্রমজীবী মানুষ যারা দিন আনা দিন খাওয়া।সরকার ইতিমধ্যে তাদের সুরক্ষার জন্য কর্মসূচি গ্রহন করেছেন।এখন আর বিলম্ব নয় দু এক দিনের মধ্যেই এঁদের কাছে সহায়তা পৌছে দিয়ে সবাইকে ঘরবন্দি করে ফেলতে হবে।
সরকারের শহরকেন্দ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এমনিতেই দুর্বল। এই সংকটকালে বস্তিতে থাকা স্বল্প আয়ের শহুরে জনগোষ্ঠীর জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ খুবই দরকারি। এরা এই লকডাউনের সময় গ্রামে চলে যাবে, এই ভাবনা বাস্তবসম্মত নয়। এরা ঘরে বসে থাকবে, তা চাইলে আপত্কালীন অবস্থায় এদের জন্য পর্যাপ্ত সহযোগিতা করতে হবে। যেসব উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান শহুরে দারিদ্র্য নিয়ে কাজ করছে, তাদের অবশ্যই এখন এদের পাশে দ্রুত দাঁড়াতে হবে। সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার মেয়রদের এসব উদ্যোগের কেন্দ্রে থাকতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভাগুলোকে এদের দায়িত্ব নিতে হবে।
এদিকে ঢাকার তেজগাঁও আকিজের হাসপাতাল করতে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা ও ওয়ার্ড কমিশনারের চাদার দাবিতে হাসপাতাল নির্মাণ বন্ধ করে দেওয়া বা মাদারীপুরের শিবচরে কালোবাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে মজুত করে রাখা সরকারি ৬৮ বস্তা চাল জব্দ করেছে পুলিশ। এই চাল মজুত করার অভিযোগে যুবলীগের এক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল শনিবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে উপজেলার বাঁশকান্দি ইউনিয়নের শেখপুর বাজারে ওই যুবলীগ নেতার গুদাম থেকে চালের বস্তাগুলো জব্দ করা হয়।অনেকই বলেন আওয়ামীলীগে সবাই ভেজাল। কিন্তু একাজে আসল আওয়ামীলীগ খুজে পাওয়া যাবে।আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা সেটাই বলে। এবার আশাকরি আওয়ামীলীগ এ কাজে নিজেদের নিবৃত্ত রাখবে কারণ এবার বাচামরার প্রশ্ন।করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে এগুলি কোন কাজে আসবে না।
তাই আসুন আগামী ১০,টি দিন নিজেদের সুরক্ষা করি।নিজেরা ঘরবন্দি থাকি।নিজে বাচি অপরকে বাচতে সহায়তা করি।।