দ. এশিয়ায় প্রান্তিক মানুষকে সুরক্ষা দিতে হবে: অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল করোনাভাইরাসের মহামারী থেকে প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে রক্ষায় জোরালো পদক্ষেপ নিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। বুধবার এক বিবৃতিতে মানবাধিকার সংস্থাটি এ অঞ্চলের দিনমজুর, বাস্তুচ্যুত, স্বাস্থ্যকর্মী ও কারাবন্দিদের সুরক্ষার ওপর জোর দেয়। লকডাউন বা কারফিউ আরোপ করে ভাইরাসটির বিস্তার ঠেকানো সম্ভব না-ও হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। এ অঞ্চলের অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা অ্যামনেস্টির উদ্বেগের মূল কারণ।

বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের অনেক কারাগারে দ্বিগুণের বেশি বন্দি রয়েছে। তাদেরকে অবশ্যই সুরক্ষা দিতে হবে। বাংলাদেশে অবস্থানরত দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকেও সুরক্ষা দেয়ার কথা বলা হয় বিবৃতিতে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া পরিচালক বিরাজ পাটনায়েক বিবৃতিতে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এ সংকটে আঞ্চলিক নেতাদের অবশ্যই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক মানুষের ওপর বিশেষ নজর দিতে হবে। জীবিকা হারানো শ্রমিক, সংঘাতে বাড়ি হারিয়ে জনাকীর্ণ শিবিরে আশ্রয় নেয়া মানুষ, প্রয়োজনীয় উপকরণ না পাওয়া যেসব চিকিৎসক ও নার্স রয়েছেন, তাদের অবশ্যই সুরক্ষা দিতে হবে।

অ্যামনেস্টির বিবৃতিতে বলা হয়, ২৫ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানে এক হাজার ২৬ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন সাতজন। ভারতে ৬০৬ জন আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে দশজন। বিবৃতিতে বলা হয়, প্রতিদিন দ্রুত আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। ধারণা করা হচ্ছে, পরীক্ষার অভাবে এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে যথেষ্ট তথ্য সরবরাহে ব্যর্থতার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার সরকারগুলোর সমালোচনা করেছে অ্যামনেস্টি। সংক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা এবং ভাইরাস ঠেকাতে নেয়া সরকারি পদক্ষেপ নিয়েও যথেষ্ট তথ্য জানানো হচ্ছে না বলে উল্লেখ করে বিবৃতিতে এ বিষয়ে রাষ্ট্রের ভূমিকা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়।

শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষ : অ্যামনেস্টির বিবৃতিতে দক্ষিণ এশিয়ার শরণার্থী এবং অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। পাকিস্তানে প্রায় ত্রিশ লাখ আফগান শরণার্থী ও বাংলাদেশে দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর কথা উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষদের জন্য সামাজিক শিষ্টাচার (সোশ্যাল ডিসট্যান্স) মানার সুযোগ নেই, স্বাস্থ্যসেবা সহজে পাওয়া যায় না, আর দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোও কষ্টসাধ্য। বাংলাদেশের কক্সবাজারে এ সপ্তাহে প্রথম একজনের করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। এ বিষয়ে রোহিঙ্গা শিবিরে সঠিক তথ্য দিতে না পারায় সেখানে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। অ্যামনেস্টির বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরে সামাজিক শিষ্টাচার পালন সম্ভব না। সেখানকার কুতুপালং শিবিরের তাঁবুগুলো একটির সঙ্গে অন্যটি লাগানো। সেখানে চিকিৎসা ও জরুরি সেবারও অভাব রয়েছে।

দিনমজুরদের দুর্ভোগ : দক্ষিণ এশিয়ার বহু মানুষ দৈনিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল। অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে তারা শ্রম দেয়। লকডাউন কার্যকর হওয়ায় এসব নিুআয়ের মানুষ তাদের জীবিকা উপার্জনে ব্যর্থ হচ্ছে বলে জানিয়েছে অ্যামনেস্টি। এসব মানুষের বেশিরভাগই সামাজিক সুরক্ষার আওতায় পড়েন।

বিবৃতিতে বিরাজ পাটনায়েক বলেন, কাউকে ক্ষুধা বা সংক্রমণের মধ্য থেকে কোনো একটা বেছে নিতে বাধ্য করা উচিত নয়। এ সংকটের সময় তাদের জীবিকা রক্ষায় রাষ্ট্রকেই যথাসম্ভব ভূমিকা নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে সংকট উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহায়তার দরকার হবে জানিয়ে বলা হয়, এটা বিশ্বব্যাপী মহামারী আর এর সমাধান বিশ্বজুড়ে হওয়া দরকার।

স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা : দক্ষিণ এশিয়ায় করোনার মহামারীতে চিকিৎসাকর্মীদের নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয় বিবৃতিতে। এদের অনেকেই প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রীর অভাবের কথা বলেছেন। এ সংকটের সময় তারাই ‘নায়ক’ বলে উল্লেখ করা হয়।

বন্দিদের সুরক্ষা : বিবৃতিতে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার কারাগারগুলোয় ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দি রয়েছে। পয়ঃনিষ্কাশনের সীমিত সুবিধার কারণে এ অঞ্চলের বন্দিরা এমনিতেই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মান অনুযায়ী বন্দিদের সেই ধরনের চিকিৎসা সুবিধা দিতে হবে। যা বাইরের নাগরিকেরাও পেয়ে থাকেন।

করোনাভাইরাসের পরীক্ষা, প্রতিরোধ এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রেও সেটা অনুসরণের আহ্বান জানানো হয় ওই বিবৃতিতে।