তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা তপন কুমার চক্রবর্তীর নাম, কন্যার ক্ষোভ রাজাকারের তালিকায় নাম, বিস্মিত টিপু

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর রাজাকারদের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে এতে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার নামও উঠে এসেছে বলে অভিযোগ করেছে তাদের পরিবার। এ তালিকায় আছে ’৭১-এ যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুর নাম। তালিকায় নাম আসায় প্রবীণ এই আইনজীবী বিস্মিত ও হতবাক। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে। গতকাল মানবজমিনকে দেয়া প্রতিক্রিয়া তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় যে কাজ করেছে তা সকলের জন্য বিস্ময়কর, লজ্জাজনক। আর এর মাধ্যমে প্রমাণ হচ্ছে-মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম যথাযথভাবে হচ্ছে না। এর পরিণতিতে জিনিসটি এইভাবে হয়েছে। তালিকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তালিকায় আসা নামটি তারই।
টিপু বলেন, এ ঘটনায় দেশের নাগরিক হিসেবেও আমি লজ্জিত। মন্ত্রণালয় তাচ্ছিলের সঙ্গে এই কাজটি করেছে। এর দায়ভার তাদের নিতে হবে। তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি আন্দোলনে যার ভুমিকা ছিল তাকে কারা কেন এই তালিকায় নিয়ে এসেছে এর তদন্ত হওয়া উচিত।

এ দিকে ৪৮ বছর পর প্রকাশিত রাজাকারের এই তালিকা প্রকাশের বিষয়ে নানা প্রতিক্রিয়া আসছে। এতদিন পর এই তালিকা কেন প্রকাশ করা হলো এমন প্রশ্ন তুলেছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। রাজনৈতিকভাবে হেনস্থা করার জন্যই এই তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তালিকা প্রকাশকে স্বাগত জানালেও এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার পর প্রতিক্রিয়া দেয়ার কথা জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। এদিকে তালিকা নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, সরকারি নথিতে যাদের নাম পাওয়া গেছে তাদের নামই তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। নতুন করে কাউকে তালিকাভুক্ত করা হয়নি। যারা চিহ্নিত মুক্তিযোদ্ধা তাদের নাম এই তালিকায় আসার সুযোগ নেই।
রাজশাহী থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে রাজাকারের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তাতে রাজশাহী বিভাগের ৮৯ নম্বর তালিকায় গোলাম আরিফ টিপুসহ ৫ জনের নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে দু’জন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের নামও আছে।

মেয়ের ক্ষোভ: গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধার নাম রাজাকারের তালিকায়:
স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল থেকে জানান, অ্যাডভোকেট তপন কুমার চক্রবর্তী। গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা। ক্রমিক নম্বর ১১২, পৃষ্ঠা নম্বর ৪১১৩। তিনি নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেয়ে থাকেন। বিস্ময়কর হলেও সত্য সদ্য প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় নাম এসেছে এই মুক্তিযোদ্ধার। এ নিয়ে তোলপাড় তৈরি হয়েছে বরিশালে। তপন কুমার চক্রবর্তীর কন্যা বাসদ নেত্রী ডা. মনিষা চক্রবর্তী ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তার রাজনীতির কারণে তার পরিবারকে খেসারত দিতে হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন ডা. মনিষা। ফেসবুকে দেয়া স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ কাজ করার পুরস্কার পেলাম আজ। ধন্যবাদ আওয়ামী লীগকে। সদ্য প্রকাশিত রাজাকারদের গেজেটে আমার বাবা এবং ঠাকুমার নাম প্রকাশিত হয়েছে। আমার বাবা এড. তপন কুমার চক্রবর্তী একজন গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা, ক্রমিক নং ১১২ পৃষ্ঠা ৪১১৩। তিনি নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও পেয়ে থাকেন! আজ রাজাকারের তালিকায় তিনি ৬৩ নাম্বার রাজাকার। আমার ঠাকুরদা এড. সুধির কুমার চক্রবর্ত্তীকে পাকিস্তানি মিলিটারি বাসা থেকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। তিনিও ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃত। তার সহধর্মিণী আমার ঠাকুমা উষা রানী চক্রবর্ত্তীকে রাজাকারের তালিকায় ৪৫ নম্বরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা এ এমজি কবির ভুলু এ ব্যাপারে বলেন, তপন কুমার চক্রবর্তীর বাবাকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে হত্যা করেছে, এটি সত্য। মুক্তিযোদ্ধা এনায়েত চৌধুরী বলেন, সরকার যে তালিকা করেছে তাতে আমাদের দ্বিমত আছে। আমার যে তালিকা দিয়েছি সেই তালিকার সাথে এর মিল নেই। এটি সংশোধন করা দরকার।

ওদিকে বরগুনায় মুক্তিযোদ্ধা মজিবুল হক নয়া ভাইয়ের নামও এসেছে রাজাকারের তালিকায়। তিনি আমৃত্যু আওয়ামী লীগের কর্মী ছিলেন। মজিবুল হক ১৯৭১ সালে বরগুনার পাথরঘাটা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। পাথরঘাটা থানা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি এবং বরগুনা মহকুমা মুক্তি সংগ্রাম কমিটির সদস্য ছিলেন। ৮৬ তে আওয়ামী লীগের হয়ে তিনি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেন। প্রয়াত এই মুক্তিযোদ্ধার নাম রাজাকারের তালিকায় আসায় ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এলাকার মানুষ।
উল্লেখ্য, রোববার প্রথম পর্যায়ে ১০৭৮৯ জন রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ তালিকা প্রকাশ অনুষ্ঠানে মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানান, নতুন করে এই তালিকা করা হয়নি। সরকারি পুরনো নথিই প্রকাশ করা হয়েছে।