ছাত্র রাজনীতি :সা কা ম আনিছুর রহমান খান

ডানা ভাঙা হাঁস চোখ মুদলেই যেমন শিয়াল দেখে ৤ তেমনি জন সমর্থনচ্যূত স্বৈর শাসকেরা ছাত্র রাজনীতি দেখলেই নিজেদের পতনের পদধ্বনি শুনতে পায় ৤ পৃথিবীতে জনগণের মুক্তির সংগ্রামে সব সময় ছাত্র যুব সমাজ অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে ৤ আমাদের এই উপমহাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়৤ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর দুঃশাসন থেকে মুক্তি পাবার জন্য জনগণের সংগ্রামের সকল পর্যায়ে ছাত্র যুব সমাজই অগ্রবর্তী ভূমিকা রেখেছে ৤ তারা জনগণকে মুক্তি সংগ্রামের পথ দেখিয়েছে, কৌশল বাতলে দিয়েছে ৤ ‘ আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় ‘ ; দেওবন্দের মাদ্রাসা এর ছাত্ররাই বৃটিশ শাসনের নিগড় থেকে স্বাধীনতা ও মুক্তি অর্জনের জন্য সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে ৤ নির্যাতিত নিপীড়িত জনগণের কাছে এই সব ছাত্রদের আসন ছিল হৃদয়ের অনেক গভীরে ৤ শিক্ষাঙ্গনের প্রকৃতি ও রকম কাল থেকে কালান্তরে পরিবর্তিত হয়ে থাকে ৤ তা সত্ত্বেও যুগে যুগে এই ছাত্র-যুব সমাজ সকল দেশে দেশ জাতি ও জনগণের মুক্তির সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছে ৤ বাংলাদেশে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে এই ছাত্র সমাজই রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে ৤ শিক্ষাঙ্গনের নিয়ম শৃঙ্খলার কারণে ঊণবিংশ শতাব্দীতে ছাত্রদের রাজনীতি চর্চ্চার সুযোগ ছিল না ৤ ঊপনিবেশিক শাসকের অধীনে চাকুরী লাভ করাই ছিল সে যুগের সকল সামাজিক শ্রেণীর ছাত্রদের অভিলাষ ৤

জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হলে ভারতীয় কংগ্রেসের উদ্যোগে ‘নিখিল বঙ্গীয় ছাত্র এসোসিয়েশন‘ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে৤ প্রমোদ কুমার ঘোষাল ও বীরেন্দ্র নাথ দাস যথাক্রমে এর সভাপতি ও সম্পাদক ছিলেন৤ যাদবপুর জাতীয় প্রকৌশল বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন বীরেন্দ্র নাথ দাস ; তিনি ‘ছাত্র` নামীয় একটি পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন৤ ‘ নিখিল বঙ্গীয় ছাত্র এসোসিয়েশন` এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু এবং এতে অতিথি বক্তা ছিলেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু৤ গঠনতন্ত্রে লিখিত না থাকলেও ‘নিখিল বঙ্গীয় ছাত্র এসোসিয়েশন` ছিল ভারতীয় কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন৤ ঐ সময়ে মুসলমান অভিভাবকেরা তাদের পোষ্যদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখতেই পছন্দ করতেন৤ মুসলমান রাজনীতিবিদগণও এ বিষয়ে একই মনোভাব পোষন করতেন৤ কিন্তু ভারতীয় কংগ্রেসের অনুপ্রেরণায় ‘নিখিল বঙ্গীয় ছাত্র এসোসিয়েশন` গঠিত হলে ঢাকার মুসলমান বুদ্ধিজীবীগণ মুসলমানদের নিজস্ব একটি ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন৤ এই লক্ষ্যে ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই জুলাই তারিখে মুসলমান ছাত্রদের একটি সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়৤ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

(পরবর্তীকালে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ)কে মুসলমান ছাত্রদের নিয়ে একটি ছাত্র সংগঠন গড়ার দায়িত্ব দিয়ে এই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়৤ এর প্রেক্ষিতে ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে ‘নিখিল বঙ্গীয় মুসলীম ছাত্র এসোসিয়েশন‘ আত্মপ্রকাশ করে৤ ছাত্রদের রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ না করার বিঘোষিত লক্ষ্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করলেও মুসলমান রাজনীতিবিদগণই এই ছাত্র সংগঠন পরিচালনা করতেন৤ মুসলমান রাজনীতিবিদগণ এই মুসলমান ছাত্র সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন৤ তাই দেখা যায় ‘টেইলর হোষ্টেলে‘র ছাত্রগণ মুসলীম লীগের প্রতি এবং ‘কারমাইকেল হোষ্টেলে‘র ছাত্রগণ কৃষক প্রজা পার্টির প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করেন৤ যদিও উভয় হোষ্টেলের ছাত্রগণই ‘নিখিল বঙ্গীয় মুসলীম ছাত্র এসোসিয়েশন‘ এর সমর্থক ও সদস্য ছিল৤ ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচন মুসলমান ছাত্রদের এই বিভক্তি আরো স্পষ্ট করে তোলে৤ কায়েদে আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে সর্ব ভারত ভিত্তিক ‘ নিখিল ভারত মুসলীম ছাত্র ফেডারেশন‘ নামে মুসলমান ছাত্রদের নিয়ে একটি ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন৤ ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনের আগে ছাত্রদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত সংগঠনের প্রতি আগ্রহ খুবই কম ছিল৤ এই নির্বাচনের সময় থেকে সারা বাংলায় কায়েদে আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন মুসলীম লীগের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটতে থাকে৤ মুসলমান ছাত্রগণও এই মুসলীম লীগ নেতৃত্বের প্রতি আকৃষ্ট ও আগ্রাহান্বিত হতে থাকে৤ ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ‘নিখিল বঙ্গীয় মুসলীম ছাত্র এসোসিয়েশন‘ এর নাম পরিবর্তন করে ‘মুসলীম লীগ‘ নামের সাথে মিল রেখে ‘ নিখিল বঙ্গীয় মুসলীম ছাত্র লীগ‘ রাখা হয়৤ পুনর্গঠিত এই ‘নিখিল বঙ্গীয় মুসলীম ছাত্র লীগ‘ এর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন যথাক্রমে ঢাকার আবদুল ওয়াসেক ও যশোরের শামছুর রহমান৤ ঢাকার নবাব পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতাপুষ্ট এই ছাত্র সংগঠন পূর্ব বাংলার ছাত্রদের ব্যাপক সমর্থন লাভ করে৤ এই ছাত্র সংগঠন পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে ছাত্রদের ব্যাপক সম্পৃক্তি ঘটায়৤

১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এই ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সুবিধাবাদ, প্রতিক্রিয়াশীলতা ও বাংলা ভাষার বিরোধিতার অভিযোগ উঠে৤ তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সংখ্যক নেতৃস্থানীয় ছাত্র একটি নতুন ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন৤ এই উদ্যোগের ফলেই ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলীম ছাত্র লীগ‘ এর অস্থায়ী সাংগাঠনিক কমিটি পঠিত হয়৤ ‘শিক্ষা , শান্তি ,প্রগতি ‘ এই মূলনীতি গ্রহণ করে এই সংগঠন তার যাত্রা শুরু করে৤ এখান থেকেই পূর্ব বাংলায় সাংগাঠনিকভাবে ছাত্র রাজনীতির সূচনা হয় ৤ জাতীয় সমস্যা নিয়েও তারা কথা বলে ৤ ঐ সময় নব গঠিত পাকিস্তানে রাষ্ট্র ভাষা প্রশ্নে বিতর্ক চলছিল ৤ তমদ্দুন মজলিস এর নেতৃত্বে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন শুরু হয় ৤ ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলীম ছাত্র লীগ‘ এই আন্দোলনের সাথে একাত্ম হয় ৤ ফলে ভাষা আন্দোলন নব উদ্যমে বেগবান হতে থাকে৤ এই দাবী পূর্ব বাংলা ( পূর্ব পাকিস্তান) এর জনগণের গণদাবীতে পরিণত হয় ৤ চূড়ান্তভাবে ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ৮ই ফালগুন ( ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ শে ফেব্রুয়ারী ) তারিখের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের ফলে এই দাবী মেনে নিতে মুসলীম লীগ সরকার বাধ্য হয় ৤ এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা এবং প্রভাবে পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে শাসক দল মুসলীগ লীগ শোচনীয় ভাবে পরাভূত হয় ‘যুক্তফ্রন্ট‘ এর কাছে ৤ এই বিজয়ের পথে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে ছাত্রলীগ৤ পাকিস্তানের শাসনতন্ত্রের রূপরেখা নির্ধারণের জন্য গঠিত ‘মূলনীতি কমিশন‘ এর প্রতিবেদনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের আশা আকাংখা অধিকার ও স্বার্থ প্রতিফলিত না হবার কারণে এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ আন্দোলন শুরু করে ৤ এই আন্দোলনের ফলে উক্ত প্রতিবেদন গৃহীত হয়নি৤ উক্ত কমিশন বাতিল করে নতুন কমিশন গঠিত হয়৤ সুয়েজ যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী ইঙ্গ মার্কিন বলয়ের প্রতি সমর্থন দিলেও ছাত্রলীগ ঐ যুদ্ধের বিরোধীতা করে এবং সুয়েজ খালের উপর মিশরের দাবীর প্রতি সমর্থন জানায় ৤ তারা এই সিদ্ধান্তের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল করে৤ স্মরণীয় ঐ সময়ে সোহরাওয়ার্দীকে বহনকারী বিমান মিশরের আকাশসীমায় গেলে তা গুলি করে ভূপাতিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের৤
১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের অব্যবহিত পরে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয় ৤ এভাবে ইসলামী ছাত্র সংঘ , জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন ( এন এস এফ ) , ছাত্র শক্তি , মুসলীম স্টুডেন্টস ব্রাদার্সহুড সহ বেশ কিছু ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয় ৤

১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র গৃহীত হবার পর জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালে ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই অক্টোবর তারিখে প্রেসিডেন্ট ইসকান্দার মির্জা উক্ত শাসনতন্ত্র বাতিল করেন এবং সারা পাকিস্তানে সামরিক আইন জারী করেন৤ সেই সাথে সেনা বাহিনী প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযোগ করেন৤ ২৭ শে অক্টোবর তারিখে প্রেসিডেন্ট ইসকান্দার মির্জাকে সরিয়ে জেনারেল আইয়ুব নিজে পাকিস্তানের সর্বময় কর্তৃত্ব গ্রহন করেন৤ দুর্নীতি বিরোধী অভিযান চালিয়ে অধিকাংশ রাজনীতিবিদকে কারারুদ্ধ করেন৤ এই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ সোচ্চার ভূমিকা পালন করে ৤ গভর্নর জাকির হোসেনের সফরকালে নোয়াখালীতে আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ বিক্ষোভ মিছিল বের করে৤ তারা সামরিক শাসন বিরোধী ধ্বনি দেয় ৤ ফরিদপুরে রাজেন্দ্র কলেজ ছাত্র সংসদের সহ সভাপতি কে এম ওবায়দুর রহমানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ বিক্ষোভ মিছিল করে সামরিক শাসন প্রত্যাহারের দাবী জানায় ৤ এভাবেই ছাত্র সমাজ স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে ৤ ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন প্রতিবেদনে শিক্ষা সংকোচন নীতির কথা বলা হলে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন সহ সকল ছাত্র সংগঠন গণমুখি শিক্ষার দাবীতে আন্দোলন গড়ে তোলে ৤ রক্তক্ষয়ী এই আন্দোলনের কাছে সামরিক সরকার নতি শিকার করে৤ এই বছরই ছাত্র নেতা সিরাজুল আলম খান , আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদ উপলব্ধি করেন পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে বাংলার জনগণের মুক্তি হবে না৤ তার পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে গড়ে তোলেন গোপন সংগঠন ‘নিউক্লিয়াস‘৤ এরাই ছাত্র সমাজের সকল আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে থাকে জনতার মুক্তির সংগ্রাম৤ ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে শেখ মুজিবুর রহমান ৬-দফা কর্মসূচী ঘোষণা করলে আওয়ামী লীগের ঝানু নেতৃবৃন্দ তথা মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ , আব্দুস সালাম খান , আতাউর রহমান খান , শাহ আজিজুর রহমান প্রমুখ নেত্রবর্গ এর সাথে একমত হতে পারেন নাই ৤ এই সময়ে ‘নিউক্লিয়াস‘ ও ছাত্রলীগ ৬ দফা দাবীর প্রতি পূর্ণ সমর্থন দেয় এবং তা আদায়ের জন্য সকল আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় অংশ নেয় ৤ ছাত্র লীগ , ছাত্র ইউনিয়ন ( মতিয়া ) , ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) , জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন ( এন এস এফ ) ( দোলন) সমবেতভাকে প্রণয়ন করে ১১ দফা দাবী ৤ এই দাবী আদায়ের আন্দোলনই রূপ নেয় গণ অভ্যূত্থানে৤ পতন হয় আইয়ুব খানের দশক ব্যাপী শাসনের৤ এই ছাত্র সমাজের ভূমিকার কারণেই মুসলীম লীগ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ৤ জাতীয় নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে৤ ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় এই ছাত্র সমাজই স্বাধীনতার ডাক দেয় , এর জন্য তারা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল ৤ ‘ডাকসু‘এর সহ সভাপতি আ স ম আবদুর রব স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন৤ ছাত্র লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন৤ অকুতোভয়ে তারা এই ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটান৤ জেনারেল ইয়াহিয়ার সেনাদের হামলা প্রতিরোধে এই ছাত্র সমাজই জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে৤ স্বাধীনতা উত্তর কালে এরাই নতুন দেশ গড়ার প্রয়োজনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল দল ও শক্তির সমন্বয়ে ‘জাতীয় বিপ্লবী সরকার‘ গঠনের ডাক দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে ১৫ দফা কর্মসূচী পেশ করে৤ পরম দুঃখের বিষয় মুক্তি যুদ্ধের মাঝ দিয়ে গড়ে ওঠা এই জাতীয় ঐক্যকে কাজে লাগিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করা যায়নি৤ বঙ্গবন্ধু দলীয় সরকার গঠন করলেন ৤ ‘নিউক্লিয়াস‘ এর সাথে সম্পৃক্ত ছাত্র নেতৃবৃন্দকে বললেন , ‘দুধের শিশু ‘ ; ‘নাক টিপলে দুধ বের হয়‘ ৤ কিন্তু দেশে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি৤ দেশ জুরে শুরু হয় অভাব ,অনটন , দুর্ভিক্ষ ৤ রিলিফ চুরি , কম্বল চুরি , লুটপাট , খুন , গুম , মেয়েদের অপহরণ করে তার ও তার পরিবারের ইচ্ছা ও সম্মতির বিরুদ্ধে বিবাহে বাধ্য করার মহোৎসব শুরু হলো ৤ বঙ্গবন্ধু এদের কঠোর হস্তে দমন করার হুংকার দিলেন৤ ‘চাটার দল ‘ বলে গালমন্দ করলেন ৤ কিন্তু কোন ফল হলো না৤ ছাত্র সমাজ প্রতিবাদে এগিয়ে এলো ৤ শরিফ নুরুল আম্বিয়া , আ ফ ম মাহবুবুল হক , মাহমুদুর রহমান মান্না প্রমুখের নেতৃত্বে ছাত্র সমাজ আন্দোলন অব্যাহত রাখলো ৤ এরা কেউ যাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদের নেতৃত্বে আসতে না পারে সে জন্য ‘ডাকসু‘ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার আগেই ছিনতাই করা হলো ব্যালট ৤ কিন্তু ছাত্রলীগের অগ্রযাত্রা থেমে থাকে নাই৤ এই সব গণমুখি ভূমিকার কারনেই চির কালই এই ছাত্র সমাজ জনগণের কাছে ছিল এবং আছে প্রিয়ভাজন হয়ে ৤
প্রাগুক্ত মতে আমরা দেখতে পাই প্রায় শতবর্ষ ধরে উপমহাদেশে ছাত্র রাজনীতি চললেও এই রাজনীতি সব সময় জনগণের পক্ষেই কাজ করেছে ৤ সাম্য মৈত্রী ভ্রাতৃত্ব স্বাধীনতা এর বানী প্রচার ও অনুশীলন করেছে৤ উপমহাদেশে এবং বিশ্বে নিপীড়িত বঞ্চিত ব্যাথাহত মানুষের পাশে নিঃস্বার্থভাবে দাঁড়িয়েছে৤ স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তারা লড়াই করেছে নির্ভিক চিত্তে৤ উপমহাদেশে সকল স্বৈরশাসকের পতন হয়েছে ছাত্রছাত্রীদের সংগ্রামী ভূমিকার কারণে ৤ সে কারণেই ছাত্র রাজনীতিকে স্বৈরশাসকেরা ভয় পায় ৤ এই ছাত্রদের মাঝে লোভ লালসা সুবিধাবাদ প্রলোভন কাজ করে না৤ স্বৈরশাসকেরা তাদের অসৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কিছু ছাত্র ছাত্রীকে প্রলোভিত করে ছাত্র রাজনীতিকে বিপথে পরিচালিত করতে চায় ৤ এই ফাঁদে যারা পা দেয় তারাই চাঁদাবাজি , টেন্ডার বাজি , খুন গুম করে ; এই সাহস তারা পায় স্বৈরশাসকের আশির্বাদ পুষ্ঠ হবার কারণে ৤ ইতিহাস বলে এই সব কার্যক্রম সাধারণ ছাত্র সমাজ ও জনগণের কাছে ঘৃণিত হয়েছে এবং এই পথভ্রষ্টরা করুণ পরিণতির শিকার হয়েছে ৤ এই পথভ্রষ্টদের কার্যক্রমকে ছাত্র রাজনীতি বলে গ্রহণ করা যায় না৤ এদের কার্যক্রমকে দমন করাই শিক্ষাঙ্গণের শান্তি শৃংখলা বজায় রাখার মূল শর্ত ৤ সেই সাথে ছাত্র সংগঠনগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় অলিখিত অপ্রকাশিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিতে হবে৤ মুক্ত ছাত্র রাজনীতি চর্চ্চা শুরু হলে সকল অপশক্তি , অপচিন্তার উপসর্গ আপনা আপনিই তিরোহিত হবে৤
জেনারেল আইয়ুব খান, জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরেশাদের শাসন আমলে ‘ডাকসু‘; ‘রাকসু‘সহ প্রায় সকল ছাত্র সংসদের নির্বাচন যথা সময়ে , যথারীতি অনুষ্ঠিত হয়েছে ৤ এসব নির্বাচনে সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ কোন পদে নির্বাচিত হতে পারে নাই৤ কিন্তু গণতন্ত্রের প্রবক্তাদের শাসন আমলে এই নির্বাচন কেন হয়নি ? জনগণের ধারণা ছাত্র রাজনীতিকে কব্জা করতে পারবে কিনা এই অপচিন্তার কারণেই নির্বাচনগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে৤ যার কারণে শিক্ষাঙ্গন সমূহ অনেক সংকটের মধ্যে পড়েছে৤ আজকে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের নামে যদি প্রকৃত ছাত্র রাজনীতির ধারা ব্যাহত করা হয় তা হলে শিক্ষাঙ্গনের সংকট আরো ঘনীভূত হবে৤ খোদা না করুন সেই পরিস্থিতির যদি সৃষ্টি হয় তাহলে আমাদের শিক্ষার মান নেমে যাবে অনেক নীচে ৤ সভ্য জাতির কাতারে আমাদের স্থান হবে অনেক পিছে ৤ শিক্ষাঙ্গণ হবে তথাকথিত ‘বড় ভাই‘দের লীলা ভূমি৤
লেখকঃ সাবেক জেলা ও দায়রা জজ ৤ বর্তমানে অ্যাডভোকেট , বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট , ঢাকা৤