১৬ জেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত বন্যার আরও অবনতি

চলমান বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে আরও দুটি জেলা। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ১৬ জেলা বন্যা কবলিত। এছাড়া আগে থেকে বন্যাকবলিত জেলাগুলোর নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। আগামী ২১ জুলাই পর্যন্ত এ বন্যা স্থায়ী হতে পারে।

দেশের ভেতরের ভারি বৃষ্টি, উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল ও বানের পানির কারণেই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) নিশ্চিত করেছে।

এদিকে বন্যাদুর্গত এলাকার বাসিন্দাদের মানবেতর দিন কাটছে। অনেকের বসতঘরে হাঁটুপানি। ফলে রান্না-বান্না ও প্রাকৃতিক কাজ নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। তার ওপর গবাদিপশু নিয়েও পড়েছেন বিপদে। অনেকে গরু-ছাগল নিয়ে বাঁধের ওপর বা উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন।

টিউবওয়েল ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে কয়েকশ’ বসতঘর ও বহু ফসলি জমি। কিছু দুর্গত এলাকার ত্রাণ বিতরণ করা হলেও অনেকেই ত্রাণ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। বন্যায় ডুবে গেছে গ্রামীণ সড়ক, ক্ষেতের ফসল।

ভেসে গেছে মাছের খামার। বিভিন্ন স্কুলে পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। রোববারও ১৫ নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে ছিল। আগামী রোববারের মধ্যে ২৪ জেলা বন্যা আক্রান্ত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

এদিকে চলমান বন্যায় এখন পর্যন্ত ১১ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ৭ জন মারা গেছেন গত ২৪ ঘণ্টায়। নানা রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হয়েছেন ৫৫২ জন। আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আছেন মৌলভীবাজার জেলায়। অপরদিকে বন্যার কারণে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে প্রায় দুই হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।

এগুলোর মধ্যে দেড় হাজারই প্রাথমিক বিদ্যালয়। বাকিগুলো মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটি আংশিক আবার কোনোটি পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে আছে। এছাড়া আরও কিছু প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

সেখানে বানভাসি মানুষ অবস্থান করায় লেখাপড়া বন্ধ আছে শিক্ষার্থীদের। বন্যা সামনে রেখে দুর্যোগ ও ত্রাণ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খুলেছে। বন্যা পুনর্বাসন ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রও পৃথক সেল খুলেছে। সেখান থেকে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

রোববার পর্যন্ত বন্যায় আক্রান্ত জেলাগুলোর মধ্যে আছে- লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, বগুড়া, নেত্রকোনা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, কক্সবাজার, জামালপুর, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিরাজগঞ্জ, রংপুর ও কুড়িগ্রাম। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় পাবনা, টাঙ্গাইল এবং মানিকগঞ্জে বন্যা বিস্তৃত হতে পারে। রোববারের মধ্যে রাজবাড়ী, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, ফরিদপুর ও মাদারীপুর বন্যায় আক্রান্ত হতে পারে।

দেশের বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে থাকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)। সংস্থাটির নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া রোববার যুগান্তরকে বলেন, বন্যায় আক্রান্ত জেলাগুলোর মধ্যে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও বান্দরবানে আগামী ২৪ ঘণ্টায় পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাবে। কিন্তু বাকি এলাকাগুলোতে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে। পাশাপাশি নতুন নতুন আরও কিছু এলাকা প্লাবিত হতে পারে।

আবহাওয়া ও বন্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের জলপাইগুড়িতে রোববার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। অথচ আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ১৫৫ মিলিমিটার। তবে চেরাপুঞ্জিতে কমেছে। আগের ২৪ ঘণ্টায় যেখানে ১৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল সেখানে পরের ২৪ ঘণ্টায় হয়েছে ৫১ মিলিমিটার।

কিন্তু বৃষ্টির প্রবণতা বেড়েছে আগরতলায়। রোববার সকাল পর্যন্ত সেখানে ১১৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যার আগের দিনের রেকর্ড ৪১ মিলিলিটার। বৃষ্টির কারণে চীনেও ভয়াবহ বন্যা চলছে। চীনের বন্যার পানির একটি অংশ ব্রহ্মপুত্র হয়ে যমুনায় চলে আসে। আর নেপাল এবং ভারতের বিহারে বন্যার পানি গঙ্গা হয়ে পদ্মায় আসে।

এদিকে শনিবার সকাল থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ১০টি অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের প্রবণতায় দেখা গেছে, কোথাও ১০০ মিলিমিটারের কম বৃষ্টি হয়নি। সবচেয়ে কম ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয় কুমিল্লায়। ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় শ্রীমঙ্গলে ২৫০ মিলিমিটার।

নরসিংদীতে বৃষ্টি হয়েছে ২০৮ মিলিমিটার। আর পঞ্চগড়ে বৃষ্টি হয়েছে ২০০ মিলিমিটার। এফএফডব্লিউসির এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় বাংলাদেশ ও ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় বিভিন্ন রাজ্যে মাঝারি থেকে ভারি এবং কোথাও অতি ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে।

ফলে বন্যা পরিস্থিতি দিন দিন অবনতি হতে থাকবে। এফএফডব্লিউসি জানায়, অতিরিক্ত পানি প্রবাহের কারণে দেশের ১৫ নদীর পানি বিপদসীমার উপরে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীগুলো হল- সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, ধলাই, খোয়াই, সোমেশ্বরী, কংস, ধরলা, তিস্তা, ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, হালদা, সাঙ্গু, মাতামুহুরী।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়া চরম বৈরী আচরণ করছে। মৌসুমের শুরুতে এবার তীব্র গরম ছিল। ওই তাপপ্রবাহ সাগর থেকে আর্দ্রতা ও জলীয় বাষ্প নিয়ে আসে।

তা যে সিস্টেম তৈরি করেছে সেটিই এখন ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষায় রূপ নিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র দিক হচ্ছে শীত, গরম, বর্ষা, খরা ইত্যাদি যখন যেটা হবে সেটা রেকর্ড অতিক্রম করবে। এবারের বন্যায়ও আমরা সেটা দেখছি। অল্পসময়ে এত ভারি বৃষ্টি হয়েছে যে তা নজিরবিহীন।
বন্যা পরিস্থিতি মনিটরিংয়ে নৌ মন্ত্রণালয়ের কন্টোল রুম : দেশের বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং নৌ চলাচল পরিস্থিতির তথ্য সংগ্রহ ও মনিটরিং করতে কন্ট্রোল রুম খুলেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। রোববার সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের নবম তলায় ৮০৩ নম্বর কক্ষটিকে কন্ট্রোল রুম ঘোষণা করা হয়। এটি প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। কন্ট্রোল রুমের ফোন নম্বর-৯৫১৫৫৫১। কন্ট্রোল রুমটি ১৮ জুলাই পর্যন্ত খোলা থাকবে। এ রুমের সার্বিক তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব থাকবেন মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্মসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা।

ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
কুড়িগ্রাম, ফুলবাড়ী, চিলমারী ও উলিপুর : ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলার চরাঞ্চলের তিন শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৫২টি ইউনিয়নের ৫৩ হাজার ৫৫১টি পরিবারের প্রায় দুই লাখ মানুষ।

নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যাওয়ায় লোকজন উঁচু বাড়ি, বাঁধ বা রাস্তায় আশ্রয় নিচ্ছে। পানিতে নলকূপ ডুবে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। এছাড়াও ল্যাট্রিন ডুবে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন জলমগ্ন মানুষ। ঘরে খাবার থাকলেও রান্নার অভাবে একবেলা রান্না করে সারাদিনে তা দিয়েই দিন কাটাচ্ছে অনেকে।

মানুষের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে গবাদিপশুর খাদ্য সংকট। এদিকে নদী ভাঙনে এ পর্যন্ত গৃহহীন হয়েছে এক হাজার ৩১টি পরিবার। ভেঙে গেছে দুটি স্কুল- নাগেশ্বরী উপজেলার শংকর মাধবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নাগেশ্বরীর এলাহীরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

এছাড়া স্কুলগৃহে, মাঠে ও চলাচলের রাস্তায় পানি ওঠায় ২৮৫ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। চরাঞ্চলের সব কাঁচা রাস্তা ডুবে যাওয়ায় কলাগাছের ভেলা ও নৌকানির্ভর হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা।
চট্টগ্রাম, মীরসরাই ও রাঙ্গুনিয়া : জেলার ১৫ উপজেলার ১৪টিই বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। একমাত্র সন্দ্বীপ উপজেলাই এখনও বন্যামুক্ত। এছাড়া অন্য সব উপজেলা কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এসব উপজেলার লাখো মানুষ। চট্টগ্রামের সঙ্গে বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া এলাকায় পানি ওঠায় ছোট যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ভারি যানবাহন চলাচল করলেও গতি ছিল ধীর। মহাসড়কজুড়ে দেখা দেয় তীব্র যানজট। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী চৌদ্দ উপজেলার ১১৯টি ইউনিয়ন-পৌরসভার ৩ লাখ ৬৪ হাজার মানুষ পানিবন্দি।

তবে স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দাবি এ সংখ্যা ৭-৮ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। রোববার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বৃষ্টি না হওয়ায় দু’একটি উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হলেও সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ উপজেলায় অবনতি হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এরইমধ্যে ৫০০ মেট্রিক টন চাল ও ১৩ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১১ লাখ টাকা ও ৩৩৬ মেট্রিক টন চাল বিতরণের জন্য পাঠানো হয়েছে।
বগুড়া : সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে বসতবাড়ি, ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তায় পানি উঠেছে। এতে জনগণ দুর্ভোগও বেড়েছে। দুর্গতরা নৌকা ও ভেলায় করে বা হেঁটে গবাদিপশু, আসবাবপত্র ও অন্যান্য মালামাল নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছেন। উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ৩৬টি প্রাথমিক এবং ৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে বন্যার পানি উঠেছে। উপজেলা কৃষি অফিসার আবদুল হালিম জানান, পাট, ধান, মরিচ, সবজি ও আমনের বীজতলাসহ এক হাজার ১২৪ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কসবা : ভারি বর্ষণে ব্রা?হ্মণবাড়িয়ার কসবা রেল স্টেশনের কার্যালয় পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে মাস্টারের কার্যালয়ে রাখা ব্যবহারবিহীন টিকিট, জেনারেটর ও ব্যাটারিসহ আসবাবপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অপরদিকে ব্রা?হ্মণগ্রাম রেলসেতু এলাকায় রেললাইন থেকে মাটি সরে যাওয়ায় ঝুঁঁকি নিয়ে ট্রেন চলাচল করছে। সহকারী স্টেশন মাস্টার মো. জসিম উদ্দিন বলেন, রেলওয়ের ডাবল লাইনের কাজ চলছে। এ কারণে বিভিন্ন জায়গায় মাটি ভরাটের কারণে পানি চলাচল করতে পারছে না। এতে করে ৪ দিন ধরে কার্যালয় হাঁটুপানিতে তলিয়ে আছে। সুনামগঞ্জ, দোয়ারাবাজার : জেলার ৮ উপজেলায় পানিবন্দি এক লাখ ৪ হাজার মানুষ। যদিও বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। সরকারি উদ্যোগে ১০টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হলেও দুর্গতরা আশ্রয় কেন্দ্রে যাচ্ছেন না। তবে দুর্গতদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত সহায়তার জন্য ৫০০ টন চাল, সাড়ে ১০ লাখ টাকা এবং ৫২৩৫ প্যাকেট শুকনো খাবার এসেছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ইতিমধ্যে ২৪৮ মে.টন জিআর চাল, ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার জিআর ক্যাশ এবং ৩ হাজার ৭শ’ ৬৫ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। বন্যায় এ জেলায় মোট ২ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি তলিয়ে গেছে। ১২৬৩ হেক্টর আউশ এবং ১২৫ হেক্টর আমন বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২ কোটি ৬২ লাখ ৩৪ হাজার ২শ’ টাকার মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক সভায় জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ফরিদুল হক এসব তথ্য জানান। গাইবান্ধা : জেলার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সদর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। ওইসব এলাকার ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। ফলে বন্যাকবলিত এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জেলা প্রশাসনের বন্যা নিয়ন্ত্রণ সেল থেকে জানা গেছে, ওই ৪ উপজেলার ২০টি ইউনিয়নের ১১৩টি গ্রাম বন্যাকবলিত। এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্রের পানির তোড়ে সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের বাগুড়িয়া এলাকায় রোববার সকালে পরিত্যক্ত বাঁধের ১শ’ ফুট অংশ ধসে গেছে।

অপরদিকে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ড ও পোড়ার চর এলাকার প্রায় ৪শ’ পরিবার পানিবন্দি। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস জানিয়েছে বন্যাকবলিত এলাকায় ১১৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বন্যাকবলিত এলাকার লোকজন আশ্রয় নিয়েছে।
ওসমানীনগর ও গোলাপগঞ্জ (সিলেট) : কুশিয়ারা ডাইকের সাদীপুর ইউপির শেষ সীমানা ও নবীগঞ্জের প্রবেশদ্বার ইসলামপুরে ডাইকের প্রায় ৩০-৪০ ফুট অংশ ভেঙে সাদীপুর ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী গ্রাম ও ডাইকের ভেতরে প্রায় ১৫টি গ্রামসহ উপজেলার অর্ধশত গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে সহস্রাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও বাজার ডুবে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এসব গ্রামের বাসিন্দারা। এদিকে গোলাপগঞ্জ উপজেলার নিুাঞ্চলসহ ৮টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের লোকজন পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। অনেকেই কোরবানি ঈদে বিক্রির জন্য গরু লালন-পালন করছিলেন। চারদিকে পানি থাকায় গো খাদ্য নিয়ে সংকটে পড়েছেন তারা। নেত্রকোনা ও কলমাকান্দা : জেলার উদ্ধাখালি, ধনু ও কংস নদীর পানি বাড়ছে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। শনিবার ও রোববার নেত্রকোনা সদর, আটপাড়া ও পূর্বধলার কয়েকটি ইউনিয়ন নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। জেলার ৬টি ইউনিয়নে তিন শতাধিক গ্রামে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যাকবলিত দুর্গাপুর, কলমাকান্দা ও বারহাট্রা উপজেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫০ মেট্রিকটন চাল, এক হাজার ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কলমাকান্দায় পানিবন্দি ১৪৭টি বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ। বান্দরবান ও লামা : বান্দরবানের সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ ছয় দিনেও চালু হয়নি। সাঙ্গু নদীর পানি এখনও বিপদসীমার ওপর। বন্যায় জেলা সদর, রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি, লামা এবং আলীকদম উপজেলায় পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষের ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা। দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ (জামালপুর) : বানভাসি মানুষের মধ্যে শুকনা খাবার ও পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। রোববার যমুনা তীরবর্তী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, চিকাজানী ইউনিয়নের খোলাবাড়ী এলাকায় কিছু পরিবার বাড়িঘর ফেলে চলে গেছে। অনেকে ঘরের চালে আশ্রয় নিয়েছেন। দেওয়ানগঞ্জর একটি পৌরসভাসহ ৯টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এনামুল হাসান জানান, বন্যায় ৩২ হাজার ২৫০টি পরিবারে ১ লাখ ৩৩ হাজার ২২১ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৪শ’ হেক্টর জমির ফসল সম্পন্ন নষ্ট হয়ে গেছে। ৬টি মাধ্যমিক ও ১৭টি প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বকশীগঞ্জে ৪০ গ্রামের ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি। হবিগঞ্জ ও নবীগঞ্জ : খোয়াই নদী এবং কুশিয়ারা নদীর পানি ক্রমেই বাড়ছে। রোববার বিকাল ৪টায় খোয়াই নদীর পানি বিপদসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। আর কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ৪৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। নবীগঞ্জ উপজেলার ৫০টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। মৌলভীবাজার, বড়লেখা, কমলগঞ্জ, জুড়ী ও কুলাউড়া : শনিবার রাতে কুশিয়ারা নদীর বাঁধ ভেঙে ২ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। খলিলপুর ইউপি চেয়ারম্যান অরবিন্দ পোদ্দার বাচ্চু বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় বালুভর্তি বস্তা ফেলে পানি বন্ধ রাখা যায়নি। তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে পরিষদের পক্ষ থেকে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এদিকে হাকালুকি হাওরে বন্যার পানি বাড়ছে দ্রুত গতিতে। বড়লেখা ও জুড়ীর ২০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পানিবন্দি। এগুলোসহ অন্তত অর্ধশত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। কমলগঞ্জে নতুন করে কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ডিমলা : ডিমলা উপজলায় প্রায় এক লাখ মানুষ পানিবন্দি। ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় অনেকে বাঁধ বা উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গত এলাকায় খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। অনেকের কাছে খাবার থাকলেও তা রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারছেন না। এতে করে বানভাসিদের মাঝে শুকনা খাবারের জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে। লালমনিরহাট : রোববার জেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার। এদিন তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে পানি বিপদ সীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

চকরিয়া (কক্সবাজার) : রোববার ভোর রাত থেকে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। চকরিয়া-মহেশখালী সড়কের চকরিয়া থানার পাশের সড়ক ডুবে যাওয়ায় সরাসরি যানবাহন চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। এতে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
মনপুরা (ভোলা) : মাস্টারহাট এলাকার ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে প্লাবিত হয়েছে অন্তত ৪ গ্রাম। পানিতে বেশির ভাগ পুকুর ও ঘেরের মাছ ভেসে গেছে। এতে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আখাউড়া : উপজেলার হাওড়া নদীর বাঁধ ভেঙে নিুাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে দুটি ইউনিয়নের অন্তত ১০টি গ্রামের কৃষকের শাক-সবজির ক্ষেত, পুকুরসহ এলাকার রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। বন্যার ঝুঁকিতে রোহিঙ্গারা : কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা বন্যাঝুঁকিতে রয়েছে। এ কারণে রোহিঙ্গাদের সহায়তায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। ইতিমধ্যে জরুরি খাদ্যসহায়তা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে বিশ্বখাদ্য কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা। তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) : যুগান্তর স্বজন সমাবেশের উদ্যোগে তাহিরপুরে বন্যাকবলিত তিন শতাধিক পরিবারের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। রোববার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাহিরপুরের ট্যাকেরঘাট চুনাপাথর খনি মাধ্যমিক বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে ২৫ গ্রামের বন্যাকবলিত পরিবারের মাঝে এ ত্রাণ বিতরণ করা হয়। কলেজের অধ্যক্ষ মো. খায়রুল আলমের সভাপতিত্বে এলাকার সুশীল সমাজসহ যুগান্তর স্বজন সমাবেশের সদস্যদের উপস্থিতিতে বন্যাকবলিত পরিবারের লোকজনের হাতে ত্রাণ তুলে দেন সাবেক উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আলহাজ রৌজ আলী।