তাকওয়ার আলোকে মসজিদ প্রতিষ্ঠা , নামাজ কায়েম ও ধর্মীয় অনুশীলন:সা কা ম আনিছুর রহমান খান

নামাজী তোর নামাজ হলো যে ভুল
মসজিদে তুই রাখলি সিজদা ছাড়ি ঈমানের মূল…
পবিত্র রমজান মাসে সোবহে সাদিকের সময় গীত এই গান প্রতিটি মুমিন মুসলমানের ঈমানী বিবেকবোধকে নাড়া দেয়, জাগ্রত করে। কারণ নামাজ তো শুধু বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা নয় । নামাজ একটি ইবাদত , ইসলাম ধর্মের একটি অন্যতম মূল ভিত্তি । নামাজ কায়েম করতে হলে ধর্মীয় অনুশাসন যথাযথভাবেই অনুসরণ করতে হবে ।
ঝিনাইদহ সার্কিট হাউজ জামে মসজিদের খতিব শাহাদাৎ সাহেব প্রায়শই মুসুল্লীদের উদ্দেশ্যে বলে থাকেন প্রতিটি মুসলমানকে প্রথমে হালাল রুজি এবং তা থেকে হালাল খ্যদ্য গ্রহণের অনুশীলন করতে হবে। কারণ হারাম পন্থায় উপার্জিত অর্থ দিয়ে সংগৃহীত খাদ্য গ্রহণ করার মাধ্যমে শরীরে যে রক্ত ও মাংসের সৃষ্টি হবে-তা হবে দোজখের আগুনের ইন্ধন। তাই হারাম পন্থায় উপার্জিত অর্থ দিয়ে সংগৃহীত খাদ্য ( তা যদি হালাল খাদ্যও হয় ) প্রকৃত পক্ষে হারাম বলেই বিবেচিত হবে। আর খাদ্য ( এক্ষেত্রে প্রবাহিত শোনিত, শুকরের মাংস ইত্যাদি বুঝানো হলো ) যদি প্রকৃতই হারাম হয় তাহলে তো আর কোন কথাই নাই। এরূপ খাদ্য গ্রহণকারীর ইবাদতের তো কোনই দাম নাই ।
বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতায় নামাজ পড়লেই হবে না। সেই সাথে ঈমানদারী থাকতে হবে। আরো থাকতে হবে হারাম হালালের যথার্থ বাছ বিচার।
নামাজ পড়তে হলে চাই মসজিদ । আর সব মসজিদই কি নামাজের উপযোগী ! না , সব মসজিদই নামাজের উপযোগী নয় । যে মসজিদের ভিত্তি সূচনালগ্ন থেকেই তাকওয়া ( অর্থাৎ খোদাভীতি ) এর উপর প্রতিষ্ঠিত সেটাই মুমিন-মুমিনাদের ইবাদতের জন্য উপযুক্ত স্থান । পবিত্র কোরআনের সুরা আত তাওবায় বলা হয়েছে ঃ
১০৭ ঃ যারা মসজিদ নির্মাণ করেছে ইসলামের ক্ষতি সাধনের জন্য , কুফরী করার জন্য , মুমিনদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির জন্য এবং ঐ ব্যক্তির জন্য ঘাঁটি স্বরূপ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে যে পূর্ব থেকেই আল্লাহ ও তাঁর রসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আসছে এবং তারা অবশ্যই কসম করে বলবে ঃ আমরা তো কেবল মঙ্গলই চেয়েছি । কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন , অবশ্যই তারা মিথ্যাবাদী ।
১০৮ঃ আপনি কখনো সে মসজিদে দাঁড়াবেন না। যে মসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন থেকেই তাকওয়ার উপর স্থাপিত সে মসজিদই আপনার জন্য দাঁড়াবার অধিকযোগ্য সেখানে এমন লোক রয়েছে যাঁরা খুব ভালভাবে পবিত্রতা অর্জন করাকে ভালবাসে । আর আল্লাহ উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালবাসেন।
১০৯। তবে কি সে ব্যক্তি উত্তম যে স্বীয় গৃহের ভিত্তি আল্লাহ ভীতির উপর এবং তাঁর সন্তুষ্টি বিধানের উপর স্থাপন করেছে , না কি ঐ ব্যক্তি উত্তম যে তার গৃহের ভিত্তি স্থাপন করেছে এক গর্তের পতন্নোমুখ কিনারায় , ফলে সে গৃহ তাকে নিয়ে জাহান্নামের আগুনে পতিত হয় ? আল্লাহ জালিম কওমকে পথ দেখান না।
১১০। তাদের ইমারত , যা তারা নির্মাণ করেছে তাদের অন্তরে সর্বদা খটকা সৃষ্টি করতে থাকবে, যে পর্যন্ত না তাদের অন্তর চৌচির হয়ে যায় । আর আল্লাহ হলেন সর্বজ্ঞ . হেকমতওয়ালা ।
হযরত মুহম্মদ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম ) যখন মক্কা মোয়াজ্জেমা থেকে হিজরত করে মদীনা মুনাওয়ারা আসলেন , তখন প্রথমে শহরের বাইরে বনী আমিরের মহল্লায় কয়েকদিন অবস্থান করেছিলেন । সেখানকার লোকেরা সেখানে “ মসজিদে কুয়তে ইসলাম ” বা “মসজিদে কুব্বা ” নামে একটি মসজিদ তৈরী করে। প্রায় শনিবারেই পাক ( সাঃ ) ঐ মসজিদে যেতেন ও নামাজ পড়াতেন। এই মসজিদকে ধ্বংস বা অনিষ্ট করার জন্য মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবায়ার নেতৃত্বে বার জন নির্বোধ কপট ব্যক্তি উক্ত “মসজিদে কুব্বা’’ এর অদূরে একটি মসজিদ স্থাপন করে। এই মসজিদটিই ‘মসজিদে জেরার’ নামে পরিচিত । ‘মসজিদে জেরার’ নির্মাণের পর নির্মাণকারীরা তার উদ্বোধনের জন্য হুজুর পাক ( সাঃ) এর কাছে দরখাস্ত করে। রসুলে করিম (সাঃ) তাদের প্রস্তাবে রাজি হন। এবং জানান যে তবুক অভিযান শেষে তিনি উক্ত মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়বেন। হযরত মুহম্মদ (সাঃ) তবুক অভিযান শেষে ফিরে আসার পর ঐ দ্বাদশ ব্যক্তি তাঁর দরবারে হাজির হয় এবং তাদের নির্মিত মসজিদে নামাজ পড়ার আহ্বান জানায় । এই কপট ব্যক্তিগণ বলেছিল যে আল্লাহর আরাধনা এবং শীতাতপক্লিষ্ট প্রবাসী অভ্যাগত দিগকে আশ্রয় প্রদানের উদ্দেশ্যেই উক্ত মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু এটা ছিল তাদের কপটতা। প্রাগুক্ত আয়াত নাজিলের মাধ্যমে আল্লাহ পাক এটা রসুলুল্লাহ ( সাঃ) কে অবহিত করেন। আল্লাহ পাক জানিয়ে দিলেন ঐ দ্বাদশ ব্যক্তি ছিল মিথ্যাবাদী ও কপটাচারী । ‘মসজিদে জেরার’ এর নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের অনিষ্টাচারণ ও অবমাননা এবং মুসলমানদেও মধ্যে ভেদ নীতি ও বিচ্ছেদ সংঘটন করা । এই মসজিদে নামাজ পড়তে আল্লাহ নিষেধ করে দিলেন। এই আয়াত অবতীর্ণ হবার পর হযরত মুহম্মদ ( সাঃ ) উক্ত ‘মসজিদে জেরার’ ধ্বংস করার জন্য কতিপয় লোক পাঠালেন এবং তারা ঐ মসজিদকে ভূমিসাৎ ও ধ্বংস করে দিলেন। কথিত আছে যে আল্লাহর আক্রোশের নিদর্শন স্বরূপ অনেক দিন পর্যন্ত ঐ স্থান থেকে অগ্নিশিখা নির্গত হয়েছিল । এর ধ্বংস চিহ্ন এখন পর্যন্ত আছে ।
এ থেকে স্পষ্ট অনুমিত হয় যে মসজিদ নির্মাণ করা মহাপূণ্যের কাজ হলেও অন্যায়ভাবে অসৎ উদ্দেশ্যে ভেদনীতি বিচ্ছেদ ও অবিশ্বাস বর্ধনের সহায়তা এবং এক মসজিদ বিদ্যমান থাকতে তার অহিত কামনায় অনিষ্টকর নতুন প্রতিদ্বন্ধি মসজিদ নির্মাণ করা বড় পাপের কাজ । এরূপ মসজিদ নির্মাণের উপমা নরকের ভগ্ন তীরে অট্টালিকা নির্মাণের তুল্য এবং পরিণাম তন্মোধ্যস্থ শাস্তি। তাই এদেশে যে সকল লোক দলাদলি ও বিবাদ বিসংবাদ করে আত্মাভিমানের বশবর্তী হয়ে পাড়ায় পাড়ায় মসজিদ নির্মাণ করছে এবং যে সকল ‘আলেম’ তুচ্ছ স্বার্থের লোভে বিবেক বিসর্জন দিয়ে ঐ সকল অবৈধ অন্যায় কাজে লোক দিগকে সাহায্য করছে তাদের পক্ষে বিশেষ সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ( দ্রষ্টব্য ঃ ১৩৬৪ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাসে বাবু বাজার ঢাকা থেকে ওসমানিয়া বুক ডিপো কর্তৃক প্রকাশিত মোহাম্মদ আলী হাসান কর্তৃক অনুদিত ও বিস্তৃত তফসীরসহ সম্পাদিত “ কোরান শরিফ ” এর ৬৫১ থেকে ৬৫৪ পৃষ্ঠা এবং ২০০৩ খ্রিঃ এর অক্টোবর মাসে অক্টোবর মাসে বাংলা বাজার ঢাকা থেকে খোশরোজ কিতাব মহল কর্তৃক প্রকাশিত ডঃ মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান কর্তৃক অনুদিত “ কোরআন শরীফ ” এর ২৮১ পৃষ্ঠা )।
‘মসজিদে জেরার’ আল্লাহ ও রসুলের নির্দেশে ধ্বংস করা হলেও এরূপ মসজিদ নির্মাণের প্রবণতা আমাদের দেশে আমাদের মাঝে এখনও রয়েছে । আমার জানা মতে জেলা পর্যায়ের একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে দেখলেন তার জন্য মসজিদের ইমাম সাহেব বা মোয়াজ্জিন সাহেব প্রথম কাতারে মোয়াজ্জিন সাহেবের পার্শ্বে কোন জায়নামাজ পেতে রাখেন নাই। অথচ ডেপুটি কমিশনার সাহেবের জন্য প্রথম কাতারে মোয়াজ্জিন সাহেবের পার্শ্বে জায়নামাজ পাতা রয়েছে । এ দেখে ঐ কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ হলেন । যদিও ইমাম সাহেব জানালেন যে তাদের তরফ থেকে কারো জন্যই জায়নামাজ পেতে রাখা হয়না। ডেপুটি কমিশনার মহোদয় মসজিদে আসার কিছু সময় আগে তাঁর পিওন তাঁর জায়নামাজ বিছিয়ে দিয়েছে । কিন্তু ইক্ত কর্মকর্তার ক্ষোভ মিটলো না । তিনি রাগান্বিত হয়ে মসজিদ থেকে বেরিয়ে গেলেন । তাঁর দফতরের আঙ্গিনায় এরপর একটি মসজিদ নির্মাণ করলেন। সরকারী জায়গায় এরূপ নির্মাণ কাজ করার জন্য সরকার / সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি তিনি গ্রহণ করেন নাই । ঐ কর্মকর্তা তাঁর পদমর্যাদাকে ব্যবহার করে মসজিদ নির্মাণের তহবিল সংগ্রহ করলেন । এক্ষেত্রে তাঁর দাপ্তরিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ালো মসজিদ তহবিলে অর্থ প্রদান। তাঁর দপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যেও সাজ সাজ রব পড়ে গেলো। যার মাসিক বেতন টাকা ৫,০০০/০০ মাত্র ( টাকা পাঁচ হাজার মাত্র ) এর উর্ধে নয় , সেই কর্মকর্তা-কর্মচারীও টাকা ১০, ০০০/০০ মাত্র ( টাকা দশ হাজার মাত্র ) বা তারো বেশী অর্থ মসজিদ তহবিলে দান করলো । এর মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা মাসে বৃদ্ধ পিতা মাতাকেও কোন অর্থ পাঠায় না। আয়ের সাথে সামঞ্জস্যহীন এই দান যখন সমাদরে গৃহীত হলো তখন ঐ সকল কর্মকর্তা কর্মচারীদের মাঝে গোপন উৎসের মাধ্যমে অর্থ আয়ের প্রবণতা বৈধতা পেয়ে গেলো । এই অজ্ঞাত উৎসের আয় হয়ে গেলো প্রশ্নমুক্ত । এই অবস্থায় বিবেকবান মানুষদের মধ্য থেকে প্রশ্ন উঠলো এই মসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন থেকেই কি তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত ?
লক্ষ্মীপুরের মওলানা হারুনের কথা শ্রদ্ধার সাথেই স্মরণযোগ্য । তিনি ছিলেন অফিসার্স কোয়ার্টার সংলগ্ন জামে মসজিদের খতিব ও পেশ ইমাম । মসজিদেও উন্নয়নমূলক কাজের জন্য মুসুল্লিদের কাছে দান করার আহ্বানের সময় তিনি স্পষ্ট করেই বললেন যাঁরা হালাল পথে অর্থ উপার্জন করেন তারাই যেন মসজিদ তহবিলে সামর্থ অনুসারে দান করেন। হারাম পন্থায় উপার্জিত অর্থ যেন কেউ মসজিদ তহবিলে দান করে পাপের ভাগি না হন । তিনি দৃঢ় ও স্পষ্ট ভাষায় বলতেন হারাম উৎস থেকে অর্জিত অর্থ ( তা অংকে যত বেশীই হোক না কেন ) দিয়ে মসজিদ হবে না। ঐ মসজিদের উন্নয়ন কাজের জন্য অনেক অর্থের যখন প্রয়োজন হলো সেই সময় হাউজি ও যাত্রা গানের প্যান্ডেল থেকে এককালীন টাকা ৩০,০০০/০০ মাত্র ( টাকা ত্রিশ হাজার মাত্র) প্রদানের প্রস্তাব এসেছিল । তিনি অত্যন্ত স্পষ্টবাদিতার সাথে ঘৃণাভরে ঐ অর্থ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিলেন যে এই অর্থ দিয়ে মসজিদ হবে না।
মওলানা হারুনের মতো দৃঢ়চেতা , স্পষ্টভাষী , ঈমানদার আলেমের সন্ধান আরো পেয়েছি বিভিন্ন জেলায় । কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখেছি তাঁদের বলিষ্ঠ কন্ঠস্বরও নেকসুরতধারী কপট বিশ্বাসী চক্রের অপ-প্রভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে সক্রিয় আবেদন সৃষ্টি করতে পারে নাই ।
সৈকতের একটি জেলায় যোগদান করে দেখলাম , আদালত ভবনের ভিতরেই বেশ কিছু কর্মকর্তা কর্মচারী বসবাস করছেন। তাঁদের মধ্যে একজন যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ও একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাও আছেন । কারণ জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম যে তাঁরা ‘সরকারী ভবনে বসবাস করি না‘ এই সার্টিফিকেট দিয়ে বেতন বিলের সাথে বাসা ভাড়া ভাতা গ্রহণ পূর্বক তা থেকে কিছু টাকা নিয়মিতভাবে প্রতি মাসে মসজিদে দান করেন। এটা মসজিদের একটা নিয়মিত আয় । একজন সহকারী জজ জানালেন , তাকেও স্ত্রী পুত্র নিয়ে অনুরূপভাবে বাসা ভাড়া ভাতা গ্রহণ করে তা থেকে মসজিদের তহবিলে কিছু অর্থ দান করার শর্তে আদালত ভবনে বসবাস করার অনুরোধ করা হয়েছিল । কিন্তু নৈতিকতা ও বিবেকবোধের কারণে তিনি রাজি হননি । আমি সংশ্লিষ্ট যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম যে তারা মসজিদে কিছু নিয়মিত দান করার শর্তে যে পদ্ধতিতে আদালত ভবনে বাস করেন এবং বাসা ভাড়া ভাতা গ্রহণ করেন তা হালাল কি না ? আরো জানতে চাইলাম মসজিদের তহবিল সংগ্রহের এই পদ্ধতি শরিয়ত অনুমোদন করে কি না ? তারা আমার প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেন নাই । কিছু দিনের মধ্যেই প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং তার সাথে সাথে উচ্চমান ও নি¤œমান সহকারীরা আদালত ভবন থেকে অন্যত্র চলে যান বসবাসের জন্য । ডরমিটরীতে কক্ষ বরাদ্দ দিলে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ সাহেবও আদালত ভবন ত্যাগ করেন।
পাবলিক প্রসিকিউটর সাহেব জানালেন সদ্য বিদায়ী তাঁর পূর্বসূরি তাঁর দপ্তরে একটি মসজিদের দান বাক্স রেখেছিলেন । প্রত্যেক মহরারকে প্রতিদিন ঐ দান বাক্সে বাধ্যতামূলকভাবে টাকা ২০/০০ মাত্র ( টাকা কুড়ি মাত্র ) দিতে হতো। মসজিদের চাঁদা খেলাপী মহরারের কোন দরখাস্তের অনুলিপি পাবলিক প্রসিকিউটরের দপ্তরে গ্রহণ করা হতো না। আদালতের কিছু কর্মচারীও একইভাবে মসজিদের নামে দান বাক্স খুলে চাঁদা আদায়ের কাজে আত্ম নিয়োগ করেছিল । এসব কর্মচারীর বেশভূষা দেখে ও কথবর্তা শুনে তাদেরকে ‘আলেম’ ব্যক্তি বলেই ভ্রম হতো। কিন্তু তাদের বাড়তি আয়ের আরেকটি উৎস ছিল সুদের কারবার । আদালতের কর্মচারী , বিশেষ করে গরিব কর্মচারীরা অর্থ সংকটে পড়লে ঐসব ব্যক্তিগণ চড়া সুদে টাকা ধার দিত এবং মাস শেষে বেতন প্রদানের দিন সুদের টাকাটা আদায় করে নিত। মূলধন বাঁকী থাকতো । বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে মসজিদের চাঁদা আদায় এবং সুদের কারবার এর কোনটাই আমার কাছে ইসলামসম্মত বলে মনে হয়নি। এসব কর্মকান্ড প্রচলিত আইন ও নীতিমালার পরিপন্থি বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে । এরূপ চাঁদা আদায় ও সুদের কারবারের সাথে আমি নিজেকে সম্পৃক্ত করতে অস্বীকার করি। ফলে চাঁদা আদায়ের কার্যক্রমে ভাটা পড়ে যায় এবং ধীরে ধীরে তা বন্ধ হয়ে যায় । কর্মচারীদেরকে সুদ ব্যতীত মূলধন পরিশোধ করতে বলি এবং তাদের উপর জুলুম করে যেন সুদ বা চাঁদা আদায় করতে না পারে সেজন্য কর্মচারীদের বেতন ভাতাদি ‘চেক’ এর মাধ্যমে পরিশোধের নির্দেশ দেই । কারণ প্রতিমাসে কর্মচারীদের বেতন প্রদানের দিনে কুসীদজীবীরা আদালত ভবনে চলে আসতো। আরো জড়ো হতো মসজিদের নামে চাঁদা আদায়কারীরা , চাঁদার বই হাতে নিয়ে । তাদের মাথায় থাকতো টুপি , যদিও তারা দৈনন্দিন জীবনে মাথায় টুপি পরিধান করতো না , সুদ ও চাঁদা আদায়ের দিনে মাথায় টুপি দিয়ে ‘নেকসুরত’ ধারণ করতো । প্রত্যেক কর্মচারীর বেতন ও ভাতা থেকে এই কুসীদজীবী ও চাঁদা আদায়কারীদের দাবী মেটানোর পর বাঁকী অর্থ সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে প্রদান করা হতো। এটা করা হতো বাধ্যতামূলকভাবে । গরিব কর্মচারীরা ছিল নিরুপায় । ‘চেক’এর মাধ্যমে কর্মচারীদের বেতন ভাতা দেবার পদ্ধতি চালু করা হলে কুসীদজীবী ও চাঁদা আদায়কারীদের দাপটের অবসান ঘটে । এতে নি¤œশ্রেণীর গরিব কর্মচারীরা উপকৃত হলেও কর্মচারীদের একাংশের বাড়তি আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল । শুনেছি তারা আশা করেছিল আমি চলে গেলে তারা আবার আগের মতো ‘খাদেম’(!) হবার উপযোগী পরিবেশ পূণঃপ্রতিষ্ঠিত করবে। জানিনা তাদের সে মনস্কামনা পূরণ হয়েছে কি না।
আমার বিশ্বাস নিজের এখতিয়ারাধীন এলাকার জনগণের মসজিদ প্রতিষ্ঠার ‘প্রাণের দাবী’ পূরণ করা একজন জেলা ও দায়রা জজের দায়িত্বের মধ্যে পড়েনা । আবার এরূপ মসজিদ নির্মাণ অথবা চালু রাখা অথবা পুনরায় চালু করার জন্য নিজের জজশীপের বিচার প্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করাও তাঁর দায়িত্ব নয় । এরূপ দাবী নিয়ে ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগতভাবে জেলা ও দায়রা জজের কাছে কোন পেশাজীবী কোন আবেদন করতে আসলে তাদের মধ্যে কোন বিশেষ মতলব আছে বলেই প্রতিভাত হয়। এদের আবেদনে সাড়া দিতে গেলে গোটা জজশীপ তথা বিচার ব্যবস্থা সংকটাপন্ন হবার সমূহ সম্ভাবনা থাকে । এর সাথে কর্মচারীরা যুক্ত হলে সমস্যা আরো প্রকট হয়ে যায়। বিচার কার্যক্রম হয় প্রশ্নবিদ্ধ । যার ফলাফল কখনো ভাল হতে পারে না। এই ধোঁকায় কোন জজশীপ একবার পড়ে গেলে তা থেকে উত্তরণ অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।
আমার দপ্তরে একজন নৈশ প্রহরী ছিল । সে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত । ধর্ম কর্মে তাকে অত্যন্ত আন্তরিক এবং নিয়ম নিষ্ঠ দেখেছি । কথা প্রসঙ্গে সে একদিন আমাকে জানালো ঃ
ক) আত্ম-অহমিকার বশে মসজিদ নির্মাণ করে নিজেকে ধার্মিক বলে জাহির করা এবং পাশাপাশি অসৎ পন্থায় বাড়তি অর্থ উপার্জনকারী ব্যক্তি / ব্যক্তিগণ অথবা
খ) পোশাক আশাক চলনে বলনে ধার্মিক কিন্তু জীবিকার জন্য সুদের কারবার করা ব্যক্তি / ব্যক্তিগণ অথবা
গ) অফিস আদালতের কর্মচারী হয়ে ধর্মীয় লেবাস ধরে তার প্রতি আরোপিত সরকারী দায়িত্ব পালনের সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিকার প্রার্থী ব্যক্তির কাছ থেকে বিধি বহির্ভূতভাবে অর্থ সংগ্রহকারী ব্যক্তি / ব্যক্তিগণ
প্রকৃত পক্ষে নেক সুরতে জনগণকে ধোঁকা দেয় । এদের থেকে সাবধান থাকা উচিত । ছোট কর্মচারী হলেও তার এই বক্তব্য আমার কাছে গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিপূর্ণ বলে মনে হয়েছে ।
আমার স্পষ্ট মনে আছে ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের ‘জাজেজ লাউঞ্জ’ এ জেলা ও দায়রা জজদের উদ্দেশ্যে মাননীয় প্রধান বিচারপতি জনাব এ টি এম আফজাল অভিভাষণ দিয়েছিলেন। তাতে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছিলেন যে বিচারকের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য অনেক ব্যক্তি মসজিদে গমন করে এবং তারা বিচারকের কাছে নিজের মোকদ্দমার বিষয়ে সুপারিশ করতে চেষ্টা করে। মোয়াজ্জিন সাহেব যখন নামাজ শুরুর প্রারম্ভে ‘আকামত’ দেন তখনও ঐসব ব্যক্তিগণ তাদের সুপারিশের কথা বিচারকের কানে কানে বলা বলার চেষ্টা করতে দ্বিধা করেনা । মাননীয় প্রধান বিচারপতি এই বিব্রতকর অবস্থা পরিহার করতে জেলা ও দায়রা জজদেরকেই সচেতন হয়ে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
বিচারককে প্রভাবিত করার জন্য কপট ব্যক্তিরা নানারূপ ছলনার আশ্রয় গ্রহণ করে। এইজন্য যেরূপ বেশ ধারণ করা প্রয়োজন তারা তাই করে থাকে। যদিও পবিত্র ‘কোরআন শরীফ’ এ বিচারককে প্রভাবিত করার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিতে নিষেধ করা হয়েছে । আরো বলা হয়েছে পিতা মাতার বিরুদ্ধে হলেও সত্য সাক্ষ্য দিতে। কিন্তু সবাই কি ধর্মের কথা শুনে ? এরূপ কপট ব্যক্তিরা ধর্মকে আবরণ হিসাবে গ্রহণ করে বিচারককে ধোঁকা দেয় , মুমিনদেরকে ধোঁকা দেয় , ধোঁকা দেয় জনগণকে। বিচারকগণ মানুষের কাছে অনুসরনীয় । তাঁদের চলন বলন উঠাবসা সব কিছুই জনগণ লক্ষ্য করে এবং নিজেদের জীবনে অনুসরণ করার চেষ্টা করে। তাই ঐসব কপট বিশ্বাসীদেরকে সতর্কতার সাথে চিহ্নিত করে তার সাহচর্য থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাই প্রতিটি বিচারকের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য ।
কপট বিশ্বাসীরা নামাজীর বেশভূষা ও আত্ম-অহমিকার ভিত্তিতে মসজিদের নির্মাতা সেজেই ক্ষান্ত হয় নাই। আলহাজ্ব পদবীটাও তারা নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ব্যবহার করেছে। এই প্রবণতা বিচার অঙ্গণেও বিস্তৃত হবার আশংকা দেখা দিয়েছিল। বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট সময় মত এ বিষয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করে। হজব্রত পালনের সুবাদে নামের পূর্বে আলহাজ্জ পদবী ব্যবহার করতে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদেরকে বারণ করে প্রজ্ঞাপন জারী করা হয় । তাতে বলা হয় ঃ
‘ সংশ্লিষ্টদের অবগতির জন্য জানানো যাইতেছে যে , ইদানিং কোন কোন বিচারক হজব্রত পালন করার অজুহাতে অফিস , আদালত ও বিচারিক কাজে নিজ নামের পূর্বে ‘আলহাজ্ব’ শব্দ ব্যবহার করেন। বিষয়টি সম্পর্কে অত্র কোর্টের জি , এ কমিটির সভায় বিস্তারিত আলোচনান্তে সিদ্ধান্ত হয় যে, অফিস আদালত ও বিচারিক কাজে নামের পূর্বে ‘আলহাজ্ব’ শব্দ ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয় নয় ।
এমতাবস্থায় এখন হইতে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাগণকে অত্র সার্কুলার যথাযথভাবে পালন করার নির্দেশ দেওয়া গেল । ’
[ দ্রষ্টব্য ঃ বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট , ঢাকা এর সার্কুলার নম্বর-১২৩-এ , তারিখ-৩১/১২/২০০৪ খ্রিঃ ]
ইসলাম ধর্মে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করার সুযোগ নাই । সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে পূর্বে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কারণে অনেক জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা নিশ্চয়ই ধ্বংস হতে চাই না।আমরা চাই সুন্দর জীবন বিকশিত করে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে। সেজন্য প্রথমে চাই ‘তাকওয়া’ অবলম্বন ।
‘তাকওয়া’ হচ্ছে খোদাভীতি । মানুষকে আল্লাহ তায়ালা যে সকল কাজ করতে বলেছেন জীবন যাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে তা পালন করা এবং আল্লাহ তায়ালা মানুষকে যা করতে নিষেধ করেছেন সে সকল কাজ থেকে বিরত থাকাই হচ্ছে ‘তাকওয়া’ । এই ‘তাকওয়া’ অবলম্বন ও ধারণ করেই গড়তে হবে মসজিদ। এই রূপ মসজিদেই পবিত্রতা অবলম্বনে অনুশীলনকারীদের সন্ধান মিলবে। সেখানেই নামাজ হবে শুদ্ধ। কিন্তু বাহ্যিক আবরণ ও লেবাসে নিবেদিত প্রাণ ধার্মিক সেজে আড়ালে যদি লুকিয়ে থাকে কপটতা তাহলে তাকে কি পবিত্রতা অর্জনের অনুশীলনকারী বলা যাবে ? নিশ্চয়ই না। মানুষের কাছে অনেক কিছুই গোপন করা যায় কিন্তু মানুষ অন্তরের গভীরে অত্যন্ত সঙ্গোপনে যা করে বা চিন্তা করে তাতো আল্লাহ জানেন। নেকসুরতে জনগণকে ধোঁকা দেওয়া যায় কিন্তু আল্লাহকে নয় ।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে আমাদের রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম । কপটতা ও বাড়াবাড়ি করে নয় , যথাযথভাবে তাকওয়ার ভিত্তিতেই তা আমাদের অনুসরণ করা উচিত।ধর্ম পালন ও ধর্মীয় উপাসনালয় ( যথা মসজিদ ও মন্দির ) নিয়ে কিছু মানুষের কপটতা ও বাড়াবাড়ি দেখে ব্যথিত চিত্তে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিখ্যাত ‘মানুষ’ কবিতায় বরেছিলেন,
হায় রে ভজনালয় ,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয় ! ……..
নামাজ পড়া , মসজিদ নির্মাণ ও ধর্মের অনুশীলন নিয়ে আমাদের কর্মকান্ড যেন উক্ত কবিতার মোল্লার মত না হয়।

লেখক ঃ সাবেক জেলা ও দায়রা জজ। বর্তমানে সদস্য বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতি .পরিচিতি নং ৫৮৯৪ , ঢাকা
প্রবন্ধটি বিগত ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে ‘বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস এসোসিয়েশন’ এর ৫৫তম বার্ষিক সাধারণ সম্মেলনে উপলক্ষে প্রকাশিত ‘স্মরণিকা’ তে প্রকাশিত হয়েছে ( পৃষ্ঠা ৪২ থেকে ৪৭ ) । লেখক ঐ সময় জেলা ও দায়রা জজ পদে ঝিনাইদহ জেলায় কর্মরত ছিলেন।
aniskamal44@yahoo.com