টাইমস অব ইন্ডিয়ার সম্পাদকীয়: সিএবি শুধু মুসলিমদেরকেই বাইরে রাখবে না, সৃষ্টি করবে আরো জটিলতা

সরকার যখন ত্রুটিপূর্ণ নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (সিএবি) পার্লামেন্টে উত্থাপন করছে, তখন তা পার্লামেন্টের ভিতরে এবং বাইরে ঝড়ো পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, এসপি, এনসিপি, ডিএমকে এবং সিপিএমের মতো বিরোধী দলগুলো একত্রিত হয়ে এই বিলের বিরোধিতা করবে। ফলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের শুধু অমুসলিম অভিবাসীদের নাগরিকত্ব দেয়ার মাধ্যমে সিএবি কিভাবে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক নীতিকে খর্ব করে তা জোরালোভাবে প্রকাশ পাবে। বিরোধীরা যদি এনডিএর ধর্মনিরপেক্ষ মিত্র যেমন জেডি(ইউ) এবং এআইএডিএমকে’কে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে আসতে পারে তাহলে রাজ্যসভায় তারা কঠিন ফাইট দিতে পারবে।

এ ছাড়া উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য, বিশেষ করে আসাম থেকে এই বিলের কঠোর বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে সরকার। সিএবি প্রণয়নের জন্য সরকার ২০১৪ সালের ৩১ শে ডিসেম্বরকে সর্বশেষ সময় নির্ধারণ করেছে। (অর্থাৎ এই সময়ের আগে যেসব অমুসলিম ভারতে গিয়েছেন তাদেরকে নাগরিকত্ব দেয়া হবে)। সিএবি প্রণয়নের ওই সময়সীমা ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তির সরাসরি সাংঘর্ষিক।
কারণ, আসাম চুক্তিতে নাগরিকত্ব দেয়ার জন্য সর্বশেষ সময় নির্ধারণ করে দেয়া আছে ১৯৭১ সালের ২৪ শে মার্চ। (অর্থাৎ এর পরে ভারতে অবৈধ উপায়ে কেউ গেলে তাকে নাগরিকত্ব দেয়া হবে না)। ১৯৭৯-৮৫ সাল থেকেই আসাম এজিটেশন বা আসাম আন্দোলন করে যাচ্ছে অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন। তারা এরই মধ্যে এই বিলটির বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হচ্ছে। একই সঙ্গে উত্তর পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে পুরো এলাকায় সিএবি বিরোধী আন্দোলনকে তীব্র করে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে।

এমনকি সিএবি উত্থাপনের আগে আসামজুড়ে সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার দাবি তুলেছে বিজেপির আসামের মিত্র আসাম গণপরিষদ (এজিপি)। এর মধ্যে রয়েছে ইনার লাইন পারমিট (আইএলপি) সিস্টেম। এর অধীনে ওইসব এলাকায় পর্যবেক্ষকদের প্রবেশে বিধিনিষেধ দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

আসামে বিজেপি নেতা হিমান্ত বিশ্বশর্মা বলেছেন, সিএবির অধীনে যারা নাগরিকত্ব পাবেন তারা অব্যাহতিপ্রাপ্ত এলাকায় (এক্সেমটেড এরিয়া) রাজ্য সরকারের অনুমতি ছাড়া বসবাসের অধিকার পাবেন না। সেখানে তারা জমির মালিক হতে পারবেন না। ব্যবসাও করতে পারবেন না। যদি আসামে আইএলপি প্রচলন করা হয় তাহলে সেখানে বসবাস করা কয়েক লাখ মানুষ, যারা দশকের পর দশক ওই রাজ্যে বসবাস করছেন, সেখানে জমির মালিক এবং ব্যবসা করছেন, তাদেরকে নিয়মিতকরণ (নাগরিকত্ব প্রদান) করা হবে। তবে তারা অধিকার বঞ্চিত হবেন। সর্বোপরি সম্প্রতি সম্পাদিক এনআরসি তালিকা থেকে প্রায় ১২ লাখ হিন্দু ও বাংলাভাষী হিন্দুকে বাইরে রাখা হয়েছে।

এছাড়াও আসামের জন্য আইএলপি হবে রাজ্যের উন্নয়ন ও ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট পলিসির জন্য একটি মৃত্যুঘন্টা। এমন বিধিনিষেধের অধীনে ব্যবসা ও বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি আশা করা যেতে পারে না। এটা খুব কঠিন বিষয় যে, জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করেছে বিজেপি এবং তারা ওই রাজ্যের উন্নয়নে সহায়তা দেবে। তার ওপর কাশ্মীরে আরও হতাশার ক্ষেত্র সৃষ্টি করছে সিএবি। এই অবস্থার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি যদি সুপ্রিম কোর্টে যায় তাহলে সেখানে সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জে তা টিকে না-ও থাকতে পারে। কারণ, বিষয়টি সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে। এই অনুচ্ছেদে সম অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। আর অনুচ্ছেদ ১৫ ধর্মীয় কারণে বৈষম্যকে নিষিদ্ধ করেছে।
(টাইমস অব ইন্ডিয়ার সম্পাদকীয়র অনুবাদ)