একের পর এক ধর্মঘটে অস্থিরতা

একের পর এক ‘অরাজনৈতিক’ ধর্মঘটে গোটা দেশে বিরাজ করছে অস্থিরতা। দাবি আদায়ের নামে এসব ধর্মঘটে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। বাস, পণ্যবাহী ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান, নৌযান শ্রমিকদের ধর্মঘট শেষ হতে না হতেই তিন বিভাগে শুরু হয়েছে পেট্রোল পাম্প স্টেশনে ধর্মঘট। অনির্দিষ্টকালের এ ধর্মঘটে আজ থেকে দুর্ভোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিবহন সেক্টরে একের পর এক এমন ধর্মঘটে প্রভাব ফেলছে দ্রব্যমূল্যে। যাতায়াতসহ নানা জরুরি প্রয়োজনে মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এতে তৈরি হচ্ছে অস্থিরতা। ধর্মঘট পালনকালে শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের বেপরোয়া আচরণও লক্ষ্য করা গেছে।
যানবাহন ভাঙচুর, সাধারণ চালকদের উপর আক্রমণসহ নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে এসব ধর্মঘটে। নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়নের পরপরই পরিবহনের প্রায় সব সংগঠনই ধর্মঘটের ডাক দেয়। সর্বশেষ গতকাল দিনভর দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ করে কর্মবিরতি পালন করে বাংলাদেশ ট্যাংকলরি মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ, জ্বালানি তেল পরিবেশক সমিতি, পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতিসহ জ্বালানি ব্যবসায়ীরা। কমিশন বৃদ্ধিসহ ১৫ দফা দাবি আদায়ে তারা এই ধর্মঘট পালন করেন। যদিও ঢাকা থেকে নেতারা বলছেন তারা কোন ধর্মঘট ডাকেননি।

এর আগে গত ১৬ই নভেম্বর বাস মালিক শ্রমিক সমিতি আচমকা বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। খুলনা, রাজশাহীসহ দেশের অন্য জেলায়ও শুরু হয় এই ধর্মঘট। বাস না পাওয়ায় শুরু হয় জনদুর্ভোগ। পরিবহন শ্রমিক নেতাদের দাবি ছিল, দুর্ঘটনার মামলা জামিনযোগ্যসহ সড়ক আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধন চান চালকরা। আইন সংশোধনের পরই এটি কার্যকর করা হোক। এর মধ্যে ১৮ই নভেম্বর ট্রাক মালিক সমিতি ধর্মঘট শুরু করেন। একদিনের মাথায় ১৯শে নভেম্বর তাদের সঙ্গে যোগ হয় পণ্যবাহী কাভার্ডভ্যান মালিক শ্রমিক সমিতি। নয় দফা দাবিতে তারাও ২০শে নভেম্বর দিনভর কর্মবিরতিতে থাকেন। তাদের দাবির মধ্যে ছিল- সড়ক পরিবহন আইন স্থগিত করে মালিক শ্রমিকদের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জরিমানা বিধান ও দন্ড উল্লেখ করে আইন সংশোধন করা, সড়ক সংশ্লিষ্ট যতগুলো কমিটি রয়েছে সেগুলোতে শ্রমিক প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, সড়ক দুর্ঘটনাজনিত কোনও মামলায় চালক আসামি হলে তা অবশ্যই জামিনযোগ্য ধারায় হতে হবে, প্রকৃত দোষী নির্ণয় করতে মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিদের সংযুক্ত করে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিতে হবে, সড়ক দুর্ঘটনা মামলায় কোনও গাড়ির মালিককে হয়রানি করা যাবে না। দাবি পূরণ না হলেও পরিবহন শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাসে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়। একদিন পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকায় দেশজুড়ে বাণিজ্যখাতে নেমে আসে বড় বিপর্যয়। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পণ্য আনা নেয়া ব্যাহত হওয়ায় বাজার দরে আরো অস্থিরতা বিরাজ করে। বাস, ট্রাক কিংবা কাভার্ডভ্যান মালিক শ্রমিক সমিতি ধর্মঘটেই থেমে ছিল না। এগুলো স্থগিতের এক সপ্তাহের মধ্যেই ঘোষণা আসে নৌযান শ্রমিক সমিতির ধর্মঘট। গত ২৯শে নভেম্বর মধ্য রাত থেকে সারদেশের নৌ চলাচল বন্ধের ঘোষণা দেয় সংগঠনটি। ৩০শে নভেম্বর দিনভর রাজধানীর সদরঘাট থেকে কোনো নৌযান ছেড়ে যায়নি। এর ফলে দিনভর দক্ষিণাঞ্চলমুখী যাত্রীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হন। যেসব দাবিতে বাংলাদেশ নৌ-যান শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়ন ধর্মঘট পালন করে সেগুলো হলো- নৌযান শ্রমিক ও কর্মচারীদের খোরাকি ভাতা ফ্রি করতে হবে ও ন্যূনতম মজুরি ২০ হাজার টাকা করতে হবে। মাস্টার ড্রাইভারশিপ পরীক্ষায় ও ডিপিডিসি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সব অনিয়ম বন্ধ করতে হবে এবং কোর্স চলাকালে শ্রমিকদের ছুটি বাধ্যতামূলক করতে হবে। নৌ শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসালয় করতে হবে। নৌপথে মোবাইল কোর্টের নামে হয়রানি বন্ধ করতে হবে এবং বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় নৌ শ্রমিকের মৃত্যু হলে ১২ লাখ টাকা মৃত্যুকালীন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ভারতগামী শ্রমিকদের লোকাল এজেন্টের মাধ্যমে ল্যান্ডিং পাস সার্ভিস ভিসা ও জাহাজের ফ্রিজিং ব্যবস্থা না থাকায় তাদের (শ্রমিকদের) সুবিধা মতো স্থানে বাজার ও অন্যান্য কাজের জন্য আলাদা নৌকার ব্যবস্থা করতে হবে। এসব দাবি নিয়ে নৌ চলাচল বন্ধ রাখলেও ২৪ ঘন্টা পর আবার সেটা প্রত্যাহারও করে সংগঠনটি। নৌযান শ্রমিকদের ধর্মঘট প্রত্যাহার ঘোষণা আসতে না আসতেই পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতিসহ জ্বালানি ব্যবসায়ীরা কর্মবিরতির ঘোষণা দেন। গতকাল দিনভর এই ধর্মঘটের ফলে দুর্ভোগে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে অনির্দিষ্টকালের জন্য এ ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। যদিও সমিতির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন তারা কোন ধর্মঘট ডাকেননি। ধর্মঘট পরিস্থিতি নিয়ে আজ সকালে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জরুরি সভা আহবান করেছে।

খুলনা থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, খুলনায় জ্বালানি তেল বিক্রির প্রচলিত কমিশন বৃদ্ধিসহ ১৫ দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু হয়েছে । গতকাল ভোর ৬টা থেকে ট্যাঙ্কলরি মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ, জ্বালানি তেল পরিবেশক সমিতি, পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতিসহ জ্বালানি ব্যবসায়ীরা এ কর্মবিরতি শুরু করেন। শ্রমিকরা পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তিনটি তেল ডিপোর তেল উত্তোলন ও বিপণন বন্ধ রেখে এ কর্মসূচি পালন করছেন। ফলে খুলনাসহ বিভাগের ১৫ জেলায় তেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এদিকে, ধর্মঘটের ফলে অতিরিক্ত ট্রাক-লরির চাপে ফিলিং স্টেশন, ট্রাক-লরি স্ট্যান্ডে জায়গা না হওয়ায় ট্রাক-লরিগুলোকে সড়ক-মহাসড়কের দুইপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। আন্দোলনকারীরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক অমীমাংসিত দাবিসমূহ নিয়ে সংশ্লিষ্টরা তালবাহানা করছে। বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। ফিলিং স্টেশন তথা জ্বালানি ব্যবসায়ীদের ওপর অযথা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন দপ্তর থেকে বিভিন্ন ধরনের বিধান। যা মেনে নিয়ে জ্বালানি ব্যবসা করা আদৌ সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়ে জ্বালানি ব্যবসায়ীরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালন করছেন। বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ডিলার ডিস্ট্রিবিউটর ওনার্স এসোসিয়েশনের যুগ্ম-মহাসচিব ও খুলনা বিভাগীয় ট্যাঙ্কলরি ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, জ্বালানি তেল বিক্রির প্রচলিত কমিশন কমপক্ষে সাড়ে সাত শতাংশ প্রদান, জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীরা কমিশন এজেন্ট না-কি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিষয়টি সুনির্দিষ্টকরণ, প্রিমিয়াম পরিশোধ সাপেক্ষে ট্যাংকলরি শ্রমিকদের ৫ লাখ টাকা দুর্ঘটনা বীমা প্রথা প্রণয়ন, ট্যাংকলরির ভাড়া বৃদ্ধি, পেট্রোল পাম্পের জন্য কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের লাইসেন্স গ্রহণ বাতিল, পেট্রোল পাম্পের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের লাইসেন্স গ্রহণ বাতিল, পেট্রোল পাম্পে অতিরিক্ত পাবলিক টয়লেট, জেনারেল স্টোর ও ক্লিনার নিয়োগের বিধান বাতিল, সড়ক ও জনপথ বিভাগ পেট্রোল পাম্পের প্রবেশদ্বারের ভূমির জন্য ইজারা গ্রহণের প্রথা বাতিল, ট্রেড লাইসেন্স ও বিস্ফোরক লাইসেন্স ব্যতিত অন্য দপ্তর বা প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স গ্রহণের সিদ্ধান্ত বাতিল, বিএসটিআই আন্ডারগ্রাউন্ড ট্যাংক ৫ বছর অন্তর বাধ্যতামূলক ক্যালিব্রেশনের সিদ্ধান্ত বাতিল, ট্যাঙ্কলরি চলাচলে পুলিশি হয়রানি বন্ধ, সুনির্দিষ্ট দপ্তর ব্যতিত সরকারি অন্য দাপ্তরিক প্রতিষ্ঠান ডিলার বা এজেন্টদের অযথা হয়রানি বন্ধ, নতুন কোনো পেট্রোল পাম্প নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় জ্বালানি তেল মালিক সমিতির ছাড়পত্রের বিধান চালু, পেট্রোল পাম্পের পাশে যেকোনো স্থাপনা নির্মাণের আগে জেলা প্রশাসকের অনাপত্তি সনদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক ও বিভিন্ন জেলায় ট্যাঙ্কলরি থেকে জোরপূর্বক পৌরসভার চাঁদা গ্রহণ বন্ধ করা। এ ১৫টি দাবিতে আমরা ধর্মঘট পালন করছি। তেল পরিবেশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ মুরাদ হোসেন বলেন, কর্মবিরতি চলাকালে খুলনার পদ্মা, মেঘনা, যমুনা তেল ডিপো থেকে তেল উত্তোলন ও বিপণন বন্ধ রয়েছে। খুলনা বিভাগের ১০ জেলাসহ বৃহত্তর ফরিদপুরের ৫ জেলায় চলছে না ট্যাংকলরির চাকা। একইসঙ্গে পেট্রোল পাম্পে তেল বিক্রি বন্ধ রয়েছে।

স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী থেকে জানান, পূর্ব ঘোষিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাজশাহীতেও ধর্মঘট পালন করছেন বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ও ট্যাংক-লরি মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। ১৫ দফা দাবি আদায়ে গতকাল সকাল ৬টা থেকে তারা রাজশাহীসহ বিভাগের আট জেলায় পাম্প থেকে তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে পরিষদের নেতৃবৃন্দ।

স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর থেকে জানান, ১৫ দফা দাবিতে রংপুর বিভাগে জ্বালানি তেল উত্তোলন, বিপণন ও পরিবহন বন্ধ রেখেছে পেট্রোল পাম্প ও ট্যাংকলরী মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির কারণে কোন পাম্প থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে না জ্বালানি তেল। ফলে দুর্ভোগে পড়েছে পাম্প থেকে তেল নিতে আসা মানুষজন। রংপুর পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, রংপুর জেলায় ৫৯টি জ্বালানি তেলের পাম্প রয়েছে। পাম্পগুলো থেকে রংপুর, ঢাকা, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়গামী সহস্রাধিক বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকারসহ মোটরসাইকেল চালকরা জ্বালানী তেল সংগ্রহ করে।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ১৫ দফা দাবিতে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ও ট্যাংকলরি মালিক-শ্রমিকদের ডাকা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ফলে অচল হয়ে পড়েছে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের বাঘাবাড়ি তেল ডিপো। এছাড়াও পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেল বিপণন বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছে হাজারো গ্রাহক। রোববার সকাল থেকে উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ বাঘাবাড়ি তেল ডিপো থেকে জ্বালানি তেল উত্তোলন বন্ধ থাকায় ডিপো থেকে ছেড়ে যায়নি কোনো ট্যাংকলরি। এতে করে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় সম্পূর্ণ রুপে তেল সরবরাহ এবং বিপণন বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশ ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়ন সিরাজগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি মোজাম্মেল হক জানান, ১৫ দফা দাবিতে আমরা দীর্ঘদিন যাবত আন্দোলন করছি। সরকার বার বার প্রতিশ্রুতি দিয়েও আমাদের দাবি মেনে নেয়নি। এ কারণে পেট্রোল পাম্প ও ট্যাংকলরি মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ডাকা হয়েছে।