ইসলামিক স্টেটের অধীনে নারীর বাস্তব অভিজ্ঞতা (১ম পর্ব)

ইরাক ও সিরিয়া থেকে উৎখাত হয়েছে ভয়াবহ জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএস। তবে এর সময়কালে সেখানে বসবাসরত মানুষদের দুর্দশাগ্রস্থ জীবনের স্মৃতি এখনো তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। তবে আইএসের শাসনের সবথেকে বড় শিকার হচ্ছেন সে অঞ্চলের নারীরা। এইসব নারীদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা আইএসের বর্বরতায় তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন। অনেকে আছেন যারা ধর্ষিত হয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন। আবার অনেকেই এসব থেকে বাঁচতে বাধ্য হয়েছেন আইএসের হয়ে কাজ করতে। এমনই এক নারী আয়শার আইএসের অধীনে থাকার সময়কার নিজ অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছে আল-জাজিরা।

আয়শার অভিজ্ঞতা
আমার নাম আয়শা।
তবে ইসলামিক স্টেটের অধীনে তারা আমাকে ডাকতো উম কাকা নামে। আমি রাক্কায় বাস করতাম। আমি আইএসের কাছে গিয়েছিলাম শুধুমাত্র আমার অবস্থা বোঝাতে। আমার স্বামী শহিদ হয়েছিলেন। আমার কোনো অর্থ ছিলো না। তাদের হয়ে কাজ করা ছাড়া আমার কাছে আর কোনো পথ খোলা ছিলো না।
আমি সেখানে কাজ পেতে চাইলে তারা প্রথমে আমাকে শরিয়া আইনের ওপর প্রশিক্ষণ নিতে বলে। প্রশিক্ষণ চলাকালীন আমাকে কোরান পড়তে শেখানো হয়। এরপর পরীক্ষার মাধ্যমে পাশ করে বেরুতে হয় সেখান থেকে। আমার তিন মাস লেগেছিলো পাশ করতে। তবে অনেক নারীই ছিলেন যারা লেখা পড়া জানতেন না। তারা পাশও করতে পারতেন না। ফলে তাদেরকে কারাগারে বন্দি করে রাখা হতো।
পাশ করার পর দুই আইএস সদস্য একদিন আমার বাড়িতে এসে জানান, কাল থেকে আমি কাজ শুরু করতে পারবো। প্রথমেই আমাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া হলো। আমার ইউনিটে ছিলো ১০জন নারী। যদি কোনো নারী রাস্তা দিয়ে একা চলাচল করার চেষ্টা করতেন তাহলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতো। তাকে অবশ্যই তার ভাই বা স্বামীর সঙ্গে বেরুতে হবে এমন নিয়ম ছিলো। আমাদের মূলত আশেপাশের বাজারগুলোতে টহল দিতে হতো। খুঁজে বের করা হতো কোনো নারী আইএসের নিয়ম করা পোশাকের বাইরে অন্য পোশাক পরে বাইরে বেরিয়েছে কিনা। এটি করা হতো যাতে নারীরা বাধ্য হয় আইএসের থেকে পোশাক কিনতে। তারা নারীদের আটক করতো এবং তাদেরকে বাধ্য করতো তাদের নির্ধারিত পোশাক কিনতে। একেকটি তারা বিক্রি করতো ৬০০০ থেকে ৭০০০ সিরিয়ান পাউন্ডে। এমনকি একদম শিশু কন্যাদের জন্যও এই আইন চাপিয়ে দিয়েছিলো তারা।
আমাদেরকে বাসভর্তি নারী ধরে নিয়ে পুলিশ স্টেশনে ফেরত আসতে বলা হতো। কখনো আমরা ৩০-৪০ জন করে ধরে নিতাম। কখনো ১০ বা ২০ জন। তবে কখনো খালি হাতে ফিরে যাইনি। নারীদের নিয়ে যাওয়ার পর আইএসের সদস্যরা আসতো এবং তাদেরকে আটক করে রাখতো। বেশ কয়েকদিন আটকে রাখার পর ছেড়ে দেয়ার আগে তাদেরকে আইএসের কাছ থেকে পোশাক কিনতে বাধ্য করা হতো।
তারা একদিন এক নারীকে আটক করেছিলো শুধুমাত্র হাতে নেইল পলিশ দেয়ার জন্য। তারা প্লাস দিয়ে তার আংগুলের নখ তুলে ফেলেছিলো। একবার এক বোবা নারীকে নেকাব না পড়ার অপরাধে তুলে আনা হয়। তিনি বোবা জানা সত্যেও তার ওপর নির্যাতন চলতে থাকে। যাদেরকে ধরে আনা হতো, তাদের অনেকেই ছিলো গর্ভবতী। নির্যাতনের চাপে তাদের গর্ভের সন্তান মারা যেতো। এক নারী একবার ধর্মীয় পুলিশের কার্যালয়ে সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন। তীব্র ব্যাথায় তিনি যখন হাসপাতালে যাচ্ছিলেন তখন তাকে চোখ না ঢাকার অপরাধে তুলে আনা হয়। তিনি যখন সন্তান জন্ম দিলেন তখনো তার ওপর কঠিন নির্যাতন চলতে থাকে। এরকম অনেক নারীর সন্তানই মারা গেছেন। তাদের কোনো দয়ামায়া ছিলো না।
কিছু ছিলেন যারা সরাসরি আইএসের সদস্য। তারা আমাদের জন্য ধুমপান নিষিদ্ধ করেছিলেন কিন্তু নিজেরা ধুমপান করতেন। এমনকি আমাদের দিয়ে তারা সিগারেট আনাতো। তারা মদ নিষিদ্ধ করেছিলেন কিন্তু নিজেরা মদ খেতেন। এটা তাদের জন্য ঠিক ছিলো কিন্তু বাকিদের জন্য ছিলো পাপ।
কোনো নারীকে আটক করা হলে ধর্মীয় পুলিশের প্রধান আসতেন সেটা দেখতে। তার যদি ওই নারীকে পছন্দ হতো তাহলে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হতো। বিয়েতে রাজি হলে তাকে তার বাসায় নিয়ে যেতেন তিনি। নইলে তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হতো, নির্যাতন করা হতো। তাদের মগজ ধোলাই করে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া হতো। যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যাওয়ার পর অন্যদের বোঝানো হতো তারা বেহেস্তে চলে গেছে।
রাক্কায় বিমান হামলা শুরু হওয়ার পর আমি আইএসের হয়ে কাজ করা বন্ধ করে দেই। আমি আমার সন্তানদের নিয়ে পালিয়ে যাই। আমি বাধ্য হয়েছি অনেক নিরিহ মানুষকে অত্যাচার করতে। আর কেউ যেনো এই ভুল না করে।